শেলী সেনগুপ্তা একজন সংবেদনশীল লেখক। লেখালেখি করে পেয়েছেন সম্মান ও মর্যাদা। পরিশ্রমী ও মেধাবী সাহিত্যকর্মী হিসেবে ইতোমধ্যে তিনি সুপরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও শিক্ষা গবেষণায় স্নাতক শেলী সেনগুপ্তার যা কিছু অর্জন সবই নিজের চেষ্টায়। লেখালিখির মধ্য দিয়ে নিজের সঙ্গে নিরন্তর প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছেন। উপন্যাস রচনায় তিনি অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ।
শেলী সেনগুপ্তার নতুন উপন্যাস ‘বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’ বর্ণিত প্লটটিকে প্রেমের গল্প বলা যায় আবার না-ও বলা যায়। তবে এটি এক নারীর অদম্য ভালোবাসা এবং হেরে যাওয়ার চিরায়ত কাহিনি বা সুনিপুণ বয়ান। শেলী সেনগুপ্তা দেশে ও বিদেশে বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্যচর্চাকেই জীবনের একমাত্র পাথেয় করে নিয়েছেন তিনি।
‘শহর জেগে উঠছে একটু একটু করে। আলো-আঁধারি সকালে কাকের স্বরে থাকে অলসতা। অন্ধকার কেটে গেছে, আলো ফুটে গেলে তাদের স্বরে আসে কর্মতৎপরতা। এমন সকালে কাকগুলো খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে গেছে। মোড়ের চা দোকানি করমালী চুলোতে আগুন দিলো, বিশাল কেটলিটা আঁচে তুলে দিয়ে কাপগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে। প্যাকেট কেটে কাচের বয়ামে বিস্কুট পুরে রাখছে। মাঝে মাঝে অলস দৃষ্টি রাখছে রাস্তার দিকে। গুটিগুটি পায়ে হেঁটে আসছে বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের মালিক। দেখে করমালীর ঠোঁটে হাসি ফুটল। ওর চায়ের দোকানের প্রতিদিনের প্রথম খদ্দের তিনি। করমালী খুব যত্ন করে চা বানিয়ে খাওয়ায়। ওর বিশ্বাস, বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের মালিক খুব পয়মন্ত। তিনি চা পান করে খুশি হলে সারাদিন খুব ভালো বিক্রিবাট্টা হয়। কথাটা সে আশেপাশের দোকানদারদেরও বলে। ওরা হাসে, তবে করমালী অটল, প্রতিদিন চুলোয় আগুন দিয়ে চোখ রাখে বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের দিকে। দোকানের শাটার তোলার শব্দে ওর বুকের মধ্যে মেঘ গুড়গুড় করে ওঠে। ধোয়া চায়ের কাপ আবার ধুয়ে যত্ন করে চা ঢালে, পিরিচে দুটো বিস্কুট সাজায়। তখন বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের মালিক দোকানে পানি ছিটিয়ে ধূপধুনো দেয়, পেছন থেকে করমালী ডেকে ওঠে— দিদি, আপনার চা।’
মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কেউ স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্নের মোহে হেঁটে চলে আরেকজন। অতঃপর চলে স্বপ্নভঙ্গের খেলা... কেউ থেমে যায়। কেউ-বা নতুন করে প্রতীক্ষা করে প্রতিশোধের জাল পাতে। ‘বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’ উপন্যাসে আমরা দেখতে পাব— প্রতিশোধের প্রতীক্ষার বিষয়টি। দুঃসাহসী ও অভিনব বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত এই কাহিনি। এক অদ্ভুত আলো-আঁধারির সন্নিবেশে হেরে যেতে যেতেও সাধনা ও সংগ্রামে নিমগ্ন থাকার বিদগ্ধ এই উপন্যাসটি।
‘মালবিকা রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। শামসুন্নাহার হলে থাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি নাচগান আর আবৃত্তিতে দক্ষতার জন্য সবার বেশ প্রিয় মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রূপের স্নিগ্ধতা। মালবিকার ব্যক্তিত্বও চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে মালবিকা একটা নাম, একটা শ্রদ্ধা, একটা ভালোবাসা, একটা আকাঙ্ক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সবাই এক নামে চেনে। পড়তে পড়তে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিল বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও মালবিকার অবদান অপরিসীম।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটাকে খুব উপভোগ করছে। ছুটিছাটায় বাড়ি আসে। মা-বাবার সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফিরে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। দিনে দিনে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে যেন। মিষ্টি আচরণের জন্য রুমমেটরাও খুব পছন্দ করে।
মালবিকাকে নিজের এলাকার মানুষও খুব চেনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এলাকার লোকজন ওর সম্পর্কে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। নরসুন্দরপুর গ্রামে কোনো অনুষ্ঠান হলে মালবিকাকে প্রত্যাশা করে, সেও উপস্থিত হয়, অনুষ্ঠানে গান গায়। বড়ো বড়ো অনুষ্ঠান পরিচালনা করার জন্যও মালবিকাকে অনেক আগেই গ্রামে চলে যেতে হয়।’
‘মালবিকা হলে ফিরে এসেছে। ওরা ঠিক করেছে, মালবিকার পরীক্ষা শেষ হলে চাকরির চেষ্টা করবে। এর মধ্যে রাজনও কয়েকটা টিউশনি খুঁজে নেবে, তারপর একটা বাসা নিয়ে একসঙ্গে থাকবে। তার আগ পর্যন্ত দুজন হলে থাকবে। আপাতত পরিবারকে কিছু জানাবে না।
জানে। মাসখানেক হয়ে গেছে ওদের বিয়ের। এই বিয়ের খবর শুধু বন্ধুরা জানে।
এখন দুজনেই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে রাজন দুটো টিউশনিও খুঁজে নিয়েছে। আজকাল ওদের দেখা হয় কম।
মালবিকাও পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে লেখালেখিটা চালিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ কী মনে হলো, বন্ধুদের অবাক করে দিয়ে মালবিকা ‘বাংলাদেশ আইন ইনস্টিটিউট-এ ল-এর ক্লাসে ভর্তি হয়ে গেল। মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। ফার্স্ট ইয়ার শেষ করল বেশ সাফল্যের সঙ্গে। ফাইনাল ইয়ারের সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস আর বিকেলে আইনের ক্লাস করে বেশ ক্লান্ত হয়ে যায়। তবুও সে খুশি।
নিজেকে ব্যস্ততার মধ্যে রেখে সেই কষ্টের ট্রমা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনের সিদ্ধান্তে সপ্তাহে একদিন বিকেলে ওদের দেখা হয়। হাকিম চত্বর কিংবা টিএসসির সামনে বসে চা খায়। রাজন কিছুক্ষণ বসেই উসখুস করে।
একসময় মালবিকাকে হলের দরজায় পৌঁছে দিয়ে ফিরে যায়। দেখতে দেখতে সাত মাস হয়ে গেছে। মালবিকার ল ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। খুব ভালো পরীক্ষা দিয়েছে।
এখন অপেক্ষা রেজাল্টের।
বাড়ি থেকে খবর এসেছে যেতে হবে, বাবা ডেকেছে। বাবা নিশ্চয় অসুস্থ, তাই ডেকেছে, মালবিকা আর দেরি করল না। রাজনকে ফোন দিয়েই ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। দু-একটা জামাকাপড় নিয়ে বের হয়ে এলো।’
শেলী সেনগুপ্তা তার উপন্যাসে গল্প বলার ভঙ্গিটা নিজস্ব এবং সাবলীল। ক্রমশ আরও স্বকীয়, আরও অসামান্য হয়ে ওঠে। নির্লিপ্ত আর কিছুটা একরোখাভাবে মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, সামাজিক অসংগতি আর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে কটাক্ষ করে গল্প বলে গেলেও শেলী সেনগুপ্তার উপন্যাসে ভেতরে পাঠককে ঢোকাতে থাকেন সুকৌশলে, এমনকি তিনি পাঠককে দম নেওয়ার জন্য গল্পের ফাঁকে অনেকটা ‘স্পেস’ দেন।
অতএব, তিনি তার উপন্যাসে অনায়াসেই লিখে ফেলেন এমন বাক্য— ‘মালবিকা চুপ করে বসে আছে। গলায় এবং বুকে আঁচড়ের দাগ থেকে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। বেশ জ্বালাও করছে। তবুও মালবিকা চুপচাপ, যেন এ দহনটুকু ওর দরকার ছিল।
রাজন অনেক কথা জানতে চাইছে, কিন্তু কোনো কথার জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না। মাথা নুইয়ে বসে আছে। তপন পুলিশের কাছে যেতে চাইলে মালবিকা মাথা নেড়ে নিষেধ করল। এ অবস্থায়ও সে এটুকু বুঝেছে, পুলিশের সাধ্য নেই এর প্রতিকার করা। এ যাতনা মালবিকাকে একাই বহন করতে হবে। ওরা ফিরে যাবে, সবার সারা শরীর ব্যথা, এর মধ্যে ধীরে ধীরে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে নিল।
দাউদ আর তপন ব্যাগ হাতে বের হয়ে এলো। রাজন মালবিকাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে হাঁটছে। এত সকালে ডাউকি যাওয়ার কোনো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। মালবিকাও ক্লান্ত হয়ে আসছে, হাঁটতে গিয়ে কঁকিয়ে উঠছে। চোখ থেকে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে। বারবার দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনের কাঁধে ভর দিয়েও হাঁটতে পারছে না আর। আরও খানিকটা এসে ওরা আরেকটা হোটেলে উঠল।
একটা রুমে মালবিকাকে শুইয়ে দিয়ে রাজন পাশে বসে আছে। দাউদ পাশের ফার্মেসি থেকে একটা ঘুমের ওষুধ এনে মালবিকাকে খাইয়ে দিলো। কাঁদতে কাঁদতে মালবিকা একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। একটু দূরে বসে ওরা ভাবছে এখন কী করা উচিত।
ওষুধের প্রভাবেও মালবিকা ঘুমাতে পারছে না। কিছুক্ষণ পরপর কঁকিয়ে উঠছে, মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে। মায়াভরা চোখে রাজন ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছে। ঠোঁট কামড়ে বসে আছে।’
ভালোবাসা কাউকে মহান করেনি, আবার এই হেরে যাওয়া কাউকে পিছিয়েও দেয়নি। বরং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দেয় এবং যার যা প্রাপ্তি তা বুঝিয়ে দেয়।
‘বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’ উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্রটিকে ভালোবেসেছে তার চেয়ে কমবয়সি এক যুবক। সময় ও ঘটনার প্রবাহে যখন নারীও ভালোবাসায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত ঠিক তখন যুবক আপন চেহারায় আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বাসটুকু তছনছ করে দিয়ে বিয়ে করেছে অন্য এক নারীকে। প্রতারিত নারীটি ফিরে গেছে আদি বাসভূমে এবং অপেক্ষার আঁচল পেতে বসে আছে। জীবন সমুদ্রের মতো, কিছুই নেয় না, সময় হলেই সব ফিরিয়ে দেয়— যার যা প্রাপ্য।
বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর। শেলী সেনগুপ্তা। প্রকাশক : পাঞ্জেরী পাবলিকেশন লি.। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৬। প্রচ্ছদ : মানব। মূল্য : ৩০০ টাকা।

রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
শেলী সেনগুপ্তা একজন সংবেদনশীল লেখক। লেখালেখি করে পেয়েছেন সম্মান ও মর্যাদা। পরিশ্রমী ও মেধাবী সাহিত্যকর্মী হিসেবে ইতোমধ্যে তিনি সুপরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও শিক্ষা গবেষণায় স্নাতক শেলী সেনগুপ্তার যা কিছু অর্জন সবই নিজের চেষ্টায়। লেখালিখির মধ্য দিয়ে নিজের সঙ্গে নিরন্তর প্রতিযোগিতা করে যাচ্ছেন। উপন্যাস রচনায় তিনি অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ।
শেলী সেনগুপ্তার নতুন উপন্যাস ‘বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’ বর্ণিত প্লটটিকে প্রেমের গল্প বলা যায় আবার না-ও বলা যায়। তবে এটি এক নারীর অদম্য ভালোবাসা এবং হেরে যাওয়ার চিরায়ত কাহিনি বা সুনিপুণ বয়ান। শেলী সেনগুপ্তা দেশে ও বিদেশে বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্যচর্চাকেই জীবনের একমাত্র পাথেয় করে নিয়েছেন তিনি।
‘শহর জেগে উঠছে একটু একটু করে। আলো-আঁধারি সকালে কাকের স্বরে থাকে অলসতা। অন্ধকার কেটে গেছে, আলো ফুটে গেলে তাদের স্বরে আসে কর্মতৎপরতা। এমন সকালে কাকগুলো খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে গেছে। মোড়ের চা দোকানি করমালী চুলোতে আগুন দিলো, বিশাল কেটলিটা আঁচে তুলে দিয়ে কাপগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে। প্যাকেট কেটে কাচের বয়ামে বিস্কুট পুরে রাখছে। মাঝে মাঝে অলস দৃষ্টি রাখছে রাস্তার দিকে। গুটিগুটি পায়ে হেঁটে আসছে বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের মালিক। দেখে করমালীর ঠোঁটে হাসি ফুটল। ওর চায়ের দোকানের প্রতিদিনের প্রথম খদ্দের তিনি। করমালী খুব যত্ন করে চা বানিয়ে খাওয়ায়। ওর বিশ্বাস, বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের মালিক খুব পয়মন্ত। তিনি চা পান করে খুশি হলে সারাদিন খুব ভালো বিক্রিবাট্টা হয়। কথাটা সে আশেপাশের দোকানদারদেরও বলে। ওরা হাসে, তবে করমালী অটল, প্রতিদিন চুলোয় আগুন দিয়ে চোখ রাখে বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের দিকে। দোকানের শাটার তোলার শব্দে ওর বুকের মধ্যে মেঘ গুড়গুড় করে ওঠে। ধোয়া চায়ের কাপ আবার ধুয়ে যত্ন করে চা ঢালে, পিরিচে দুটো বিস্কুট সাজায়। তখন বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোরের মালিক দোকানে পানি ছিটিয়ে ধূপধুনো দেয়, পেছন থেকে করমালী ডেকে ওঠে— দিদি, আপনার চা।’
মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। কেউ স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্নের মোহে হেঁটে চলে আরেকজন। অতঃপর চলে স্বপ্নভঙ্গের খেলা... কেউ থেমে যায়। কেউ-বা নতুন করে প্রতীক্ষা করে প্রতিশোধের জাল পাতে। ‘বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’ উপন্যাসে আমরা দেখতে পাব— প্রতিশোধের প্রতীক্ষার বিষয়টি। দুঃসাহসী ও অভিনব বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত এই কাহিনি। এক অদ্ভুত আলো-আঁধারির সন্নিবেশে হেরে যেতে যেতেও সাধনা ও সংগ্রামে নিমগ্ন থাকার বিদগ্ধ এই উপন্যাসটি।
‘মালবিকা রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী। শামসুন্নাহার হলে থাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি নাচগান আর আবৃত্তিতে দক্ষতার জন্য সবার বেশ প্রিয় মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রূপের স্নিগ্ধতা। মালবিকার ব্যক্তিত্বও চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে মালবিকা একটা নাম, একটা শ্রদ্ধা, একটা ভালোবাসা, একটা আকাঙ্ক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সবাই এক নামে চেনে। পড়তে পড়তে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিল বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও মালবিকার অবদান অপরিসীম।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটাকে খুব উপভোগ করছে। ছুটিছাটায় বাড়ি আসে। মা-বাবার সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটিয়ে ফিরে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। দিনে দিনে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাচ্ছে যেন। মিষ্টি আচরণের জন্য রুমমেটরাও খুব পছন্দ করে।
মালবিকাকে নিজের এলাকার মানুষও খুব চেনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এলাকার লোকজন ওর সম্পর্কে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। নরসুন্দরপুর গ্রামে কোনো অনুষ্ঠান হলে মালবিকাকে প্রত্যাশা করে, সেও উপস্থিত হয়, অনুষ্ঠানে গান গায়। বড়ো বড়ো অনুষ্ঠান পরিচালনা করার জন্যও মালবিকাকে অনেক আগেই গ্রামে চলে যেতে হয়।’
‘মালবিকা হলে ফিরে এসেছে। ওরা ঠিক করেছে, মালবিকার পরীক্ষা শেষ হলে চাকরির চেষ্টা করবে। এর মধ্যে রাজনও কয়েকটা টিউশনি খুঁজে নেবে, তারপর একটা বাসা নিয়ে একসঙ্গে থাকবে। তার আগ পর্যন্ত দুজন হলে থাকবে। আপাতত পরিবারকে কিছু জানাবে না।
জানে। মাসখানেক হয়ে গেছে ওদের বিয়ের। এই বিয়ের খবর শুধু বন্ধুরা জানে।
এখন দুজনেই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। এর মধ্যে রাজন দুটো টিউশনিও খুঁজে নিয়েছে। আজকাল ওদের দেখা হয় কম।
মালবিকাও পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে লেখালেখিটা চালিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ কী মনে হলো, বন্ধুদের অবাক করে দিয়ে মালবিকা ‘বাংলাদেশ আইন ইনস্টিটিউট-এ ল-এর ক্লাসে ভর্তি হয়ে গেল। মনোযোগ দিয়ে পড়ছে। ফার্স্ট ইয়ার শেষ করল বেশ সাফল্যের সঙ্গে। ফাইনাল ইয়ারের সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস আর বিকেলে আইনের ক্লাস করে বেশ ক্লান্ত হয়ে যায়। তবুও সে খুশি।
নিজেকে ব্যস্ততার মধ্যে রেখে সেই কষ্টের ট্রমা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনের সিদ্ধান্তে সপ্তাহে একদিন বিকেলে ওদের দেখা হয়। হাকিম চত্বর কিংবা টিএসসির সামনে বসে চা খায়। রাজন কিছুক্ষণ বসেই উসখুস করে।
একসময় মালবিকাকে হলের দরজায় পৌঁছে দিয়ে ফিরে যায়। দেখতে দেখতে সাত মাস হয়ে গেছে। মালবিকার ল ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। খুব ভালো পরীক্ষা দিয়েছে।
এখন অপেক্ষা রেজাল্টের।
বাড়ি থেকে খবর এসেছে যেতে হবে, বাবা ডেকেছে। বাবা নিশ্চয় অসুস্থ, তাই ডেকেছে, মালবিকা আর দেরি করল না। রাজনকে ফোন দিয়েই ব্যাগ গোছাতে শুরু করল। দু-একটা জামাকাপড় নিয়ে বের হয়ে এলো।’
শেলী সেনগুপ্তা তার উপন্যাসে গল্প বলার ভঙ্গিটা নিজস্ব এবং সাবলীল। ক্রমশ আরও স্বকীয়, আরও অসামান্য হয়ে ওঠে। নির্লিপ্ত আর কিছুটা একরোখাভাবে মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব, সামাজিক অসংগতি আর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে কটাক্ষ করে গল্প বলে গেলেও শেলী সেনগুপ্তার উপন্যাসে ভেতরে পাঠককে ঢোকাতে থাকেন সুকৌশলে, এমনকি তিনি পাঠককে দম নেওয়ার জন্য গল্পের ফাঁকে অনেকটা ‘স্পেস’ দেন।
অতএব, তিনি তার উপন্যাসে অনায়াসেই লিখে ফেলেন এমন বাক্য— ‘মালবিকা চুপ করে বসে আছে। গলায় এবং বুকে আঁচড়ের দাগ থেকে রক্ত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। বেশ জ্বালাও করছে। তবুও মালবিকা চুপচাপ, যেন এ দহনটুকু ওর দরকার ছিল।
রাজন অনেক কথা জানতে চাইছে, কিন্তু কোনো কথার জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না। মাথা নুইয়ে বসে আছে। তপন পুলিশের কাছে যেতে চাইলে মালবিকা মাথা নেড়ে নিষেধ করল। এ অবস্থায়ও সে এটুকু বুঝেছে, পুলিশের সাধ্য নেই এর প্রতিকার করা। এ যাতনা মালবিকাকে একাই বহন করতে হবে। ওরা ফিরে যাবে, সবার সারা শরীর ব্যথা, এর মধ্যে ধীরে ধীরে উঠে ব্যাগ গুছিয়ে নিল।
দাউদ আর তপন ব্যাগ হাতে বের হয়ে এলো। রাজন মালবিকাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে হাঁটছে। এত সকালে ডাউকি যাওয়ার কোনো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। মালবিকাও ক্লান্ত হয়ে আসছে, হাঁটতে গিয়ে কঁকিয়ে উঠছে। চোখ থেকে অবিরাম জল গড়িয়ে পড়ছে। বারবার দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। রাজনের কাঁধে ভর দিয়েও হাঁটতে পারছে না আর। আরও খানিকটা এসে ওরা আরেকটা হোটেলে উঠল।
একটা রুমে মালবিকাকে শুইয়ে দিয়ে রাজন পাশে বসে আছে। দাউদ পাশের ফার্মেসি থেকে একটা ঘুমের ওষুধ এনে মালবিকাকে খাইয়ে দিলো। কাঁদতে কাঁদতে মালবিকা একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। একটু দূরে বসে ওরা ভাবছে এখন কী করা উচিত।
ওষুধের প্রভাবেও মালবিকা ঘুমাতে পারছে না। কিছুক্ষণ পরপর কঁকিয়ে উঠছে, মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে। মায়াভরা চোখে রাজন ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছে। ঠোঁট কামড়ে বসে আছে।’
ভালোবাসা কাউকে মহান করেনি, আবার এই হেরে যাওয়া কাউকে পিছিয়েও দেয়নি। বরং যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দেয় এবং যার যা প্রাপ্তি তা বুঝিয়ে দেয়।
‘বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’ উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্রটিকে ভালোবেসেছে তার চেয়ে কমবয়সি এক যুবক। সময় ও ঘটনার প্রবাহে যখন নারীও ভালোবাসায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত ঠিক তখন যুবক আপন চেহারায় আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্বাসটুকু তছনছ করে দিয়ে বিয়ে করেছে অন্য এক নারীকে। প্রতারিত নারীটি ফিরে গেছে আদি বাসভূমে এবং অপেক্ষার আঁচল পেতে বসে আছে। জীবন সমুদ্রের মতো, কিছুই নেয় না, সময় হলেই সব ফিরিয়ে দেয়— যার যা প্রাপ্য।
বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর। শেলী সেনগুপ্তা। প্রকাশক : পাঞ্জেরী পাবলিকেশন লি.। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৬। প্রচ্ছদ : মানব। মূল্য : ৩০০ টাকা।

আপনার মতামত লিখুন