শক্তিশালী স্থানীয় ইকোসিস্টেমই বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ
তিন দশকের বেশি সময় ধরে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করছেন ইন্টারনেট অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষক ওয়ারেন ফিঞ্চ। বর্তমানে তিনি ইন্টারনেট সোসাইটির আইএক্সপি ডেভেলপমেন্ট এক্সপার্ট হিসেবে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ইন্টারনেট অবকাঠামো উন্নয়ন ও ইন্টারকানেকশন জোরদারে কাজ করছেন। ২০২৫ সালের জুনে ইন্টারনেট সোসাইটিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি এপনিকে সিনিয়র নেটওয়ার্ক অ্যানালিস্ট ও টেকনিক্যাল ট্রেইনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেখানে তিনি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ইন্টারনেট অপারেটরদের জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়েছেন। সম্প্রতি বিডিনগ-২১ এ প্রশিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ সফরে এসে তিনি দেশের ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ অবকাঠামো, ডিজিটাল স্থিতিশীলতা, স্থানীয় কনটেন্ট হোস্টিং এবং ভবিষ্যৎ ডিজিটাল অবকাঠামো নিয়ে কথা বলেছেন সংবাদ এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মোহাম্মদ কাওছার উদ্দীন।সংবাদ: বাংলাদেশে ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ অবকাঠামো সম্প্রসারণ হচ্ছে। বর্তমান অগ্রগতি ও এর প্রভাব কীভাবে দেখছেন?ওয়ারেন ফিঞ্চ: বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট বা আইএক্সপি ইন্টারনেটের স্থিতিশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ এটি স্থানীয় ইন্টারনেট ট্রাফিক দেশেই রাখে, আন্তর্জাতিক রুটে পাঠাতে হয় না। ফলে সাবমেরিন ক্যাবল বিচ্ছিন্নতা বা আন্তর্জাতিক সংযোগে সমস্যা হলেও স্থানীয়ভাবে হোস্ট করা সরকারি সেবা ও গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু রাখা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে দেশে অন্তত আটটি আইএক্সপি কার্যকর রয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসপি), ব্যাংক, কনটেন্ট প্রোভাইডারসহ বিভিন্ন নেটওয়ার্ক দ্রুত ও কার্যকরভাবে ট্রাফিক বিনিময় করতে পারছে। এর প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক- দুই ধরনের সুফল রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দুটি ভিন্ন আইএসপির ইন্টারেনট ব্যবহারকারী ব্যাংকের মধ্যে লেনদেন এখন স্থানীয়ভাবেই সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। এতে সিঙ্গাপুরের মতো আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হাব ঘুরে আসতে হচ্ছে না। ফলে ল্যাটেন্সি কমছে, গতি বাড়ছে এবং খরচও কমছে।সংবাদ: রাজশাহীতে নতুন আঞ্চলিক নিক্স পপ চালুর ফলে ব্যবহারকারীরা কী ধরনের বাস্তব সুবিধা পাবেন?ফিঞ্চ: আগে রাজশাহী অঞ্চলের অনেক আইএসপিকে স্থানীয় ট্রাফিক বিনিময়ের জন্যও ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে ব্যয় বাড়তো এবং গতি কমতো। এখন স্থানীয় আইএক্সপি থাকায় আঞ্চলিক পর্যায়েই ট্রাফিক বিনিময় করা সম্ভব হবে। এর ফলে তিনটি বড় সুবিধা পাওয়া যাবে। প্রথমত, ল্যাটেন্সি কমবে এবং ইন্টারনেটের গতি বাড়বে। দ্বিতীয়ত, আইএসপিগুলোর আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ওপর নির্ভরতা কমবে, ফলে খরচ কমবে। তৃতীয়ত, ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়বে। বিশেষ করে শিক্ষাখাতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হবে। উদাহরণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম স্থানীয়ভাবে দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব হবে।সংবাদ: আইএক্সপি কীভাবে ব্যান্ডউইথ খরচ কমায় এবং ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট অভিজ্ঞতা উন্নত করে?ফিঞ্চ: আইএক্সপি স্থানীয় ট্রাফিক স্থানীয়ভাবেই বিনিময় করতে দেয়। ফলে অপ্রয়াজনীয় আন্তর্জাতিক রাউটিং কমে যায়। এতে ব্যান্ডউইথ খরচ কমে এবং নেটওয়ার্কের ওপর চাপও কমে। যদি কোনো আইএক্সপি না থাকে, তাহলে একই দেশের দুটি নেটওয়ার্কের তথ্যও বিদেশ ঘুরে আসতে পারে। এতে সময় বাড়ার সাথে সাথে ব্যয়ও বাড়ে। ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন শিক্ষা ও গেমিংয়ের মতো সেবার ক্ষেত্রে এর সুফল বেশি দেখা যায়। কনটেন্ট যদি স্থানীয়ভাবে ক্যাশ বা হোস্ট করা যায়, তাহলে ব্যবহারকারীরা দ্রুত সেবা পান এবং অভিজ্ঞতাও উন্নত হয়।সংবাদ: শক্তিশালী ও টেকসই ইন্টারকানেকশন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?ফিঞ্চ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক (সিডিএন) ও বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্থানীয়ভাবে যুক্ত করা। অনেক দেশে শক্তিশালী আইএক্সপি থাকলে বড় কনটেন্ট প্রোভাইডাররা স্থানীয় ক্যাশিং অবকাঠামো স্থাপন করে। বাংলাদেশেও ট্রাফিকের চাহিদা বাড়ছে, তবে হয়তো কিছু নীতিগত বা পরিচালনাগত বাধা রয়েছে।নীতিগত স্থিতিশীলতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি উন্মুক্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য ইন্টারনেট পরিবেশ চায়। ইন্টারনেট শাটডাউন বা অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রযুক্তিগতভাবে বাংলাদেশের ভিত্তি শক্তিশালী। তরুণ প্রকৌশলীদের দক্ষতা বাড়ছে এবং বিডিনগ এর মতো সংগঠন প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।সংবাদ: আইএক্সপি’র সর্বোচ্চ সুফল পেতে স্থানীয় কনটেন্ট হোস্টিং ও ক্যাশিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ?ফিঞ্চ: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় কনটেন্টই একটি আইএক্সপির সফলতা নির্ধারণ করে। যদি ব্যাংকিং, ই-কমার্স, শিক্ষা বা স্ট্রিমিং সেবাগুলো দেশের ভেতরে হোস্ট করা যায়, তাহলে ব্যবহারকারীরা দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সেবা পাবেন। তবে শুধু আইএক্সপি স্থাপন করলেই হবে না। স্থানীয় ডিজিটাল উদ্যোক্তা, কনটেন্ট নির্মাতা ও ব্যবসাকে উৎসাহ দিতে হবে, যাতে তারা স্থানীয়ভাবে সেবা তৈরি ও হোস্ট করতে আগ্রহী হন।সংবাদ: বাংলাদেশের ইন্টারনেট প্রকৌশলীদের সম্পর্কে আপনার মতামত কি?ফিঞ্চ: বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের শেখার খুব আগ্রহ। বিডিনগ একটি সক্রিয় কমিউনিটি তৈরি করেছে। ফলে স্থানীয় প্রকৌশলীরা সীমিত সম্পদ নিয়েও দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে পারেন। তবে আরও বেশি বাংলা ভাষায় প্রযুক্তিগত কনটেন্ট দরকার। কারণ অধিকাংশ ডকুমেন্টেশন ইংরেজিতে হওয়ায় নতুনদের জন্য বিষয়গুলো কঠিন হয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে আমি একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অবকাঠামো দেখতে চাই। শুধু সংযোগ দিলেই হবে না, ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সচেতনতাও বাড়াতে হবে।সংবাদ: আইএক্সপি– সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের কীভাবে আরও দক্ষ করা যেতে পারে?ফিঞ্চ: ইন্টারনেট অবকাঠামোর বিষয়গুলো অনেক সময় সাংবাদিকদের জন্য জটিল হয়ে যায়। এজন্য ইন্টারনেট সোসাইটি পালস ইন্টারনেট মেজারমেন্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে বিভিন্ন দেশের ইন্টারনেটের সার্বিক অবস্থা, আইএক্সপি তথ্য, ট্রাফিক ডেটা ও ইন্টারনেট শাটডাউনের তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া ইন্টারনেট সোসাইটির স্থানীয় চ্যাপ্টারগুলোর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সাংবাদিক, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইন্টারনেট প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য বিনা মূল্যে অনলাইন প্রশিক্ষণও রয়েছে।সংবাদ: রাজশাহী নিক্স পপের মতো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে কী প্রয়োজন?ফিঞ্চ: দীর্ঘমেয়াদি টেকসই হওয়ার জন্য একটি কার্যকর ব্যবসায়িক ও পরিচালন কাঠামো প্রয়োজন। শুরুতে সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিচালন ব্যয় বেশি হয়। তাই আইএসপি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কনটেন্ট প্রোভাইডারদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। কমিউনিটিভিত্তিক মডেল শুরুতে ভালো কাজ করলেও পরে পেশাদার ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর জরুরি হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও দক্ষ জনবল ছাড়া আইএক্সপি টেকসই রাখা কঠিন।সংবাদ: আগামী পাঁচ বছরে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের কী অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?ফিঞ্চ: বাংলাদেশকে আরও স্থিতিশীল ও স্থানীয়ভাবে আন্তসংযুক্ত ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। স্যাটেলাইট সংযোগ বাড়লেও এর গ্রাউন্ড স্টেশন দেশের ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ট্রাফিক স্থানীয়ভাবে রাখা যায়।এ ছাড়া ফাইবার নেটওয়ার্কের বিকল্প ও রিডানড্যান্ট রুট তৈরি করা জরুরি। বর্তমানে অনেক নেটওয়ার্ক একই ইউটিলিটি খুঁটির ওপর নির্ভরশীল, যা ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি স্থানীয় কনটেন্ট, ক্যাশিং অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী ইন্টারনেট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর।