সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন

স্মৃতির অনুরণন ও জীবনের খণ্ডচিত্র


লাবণী মণ্ডল
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৬ এএম

স্মৃতির অনুরণন ও জীবনের খণ্ডচিত্র

কবিতা কোনো যান্ত্রিক উৎপাদন নয়; কবিতা হলো কবির অন্তরের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। প্রখ্যাত প্রগতিশীল উর্দু কবি ও ভাষাসৈনিক নওশাদ নূরীর সন্তান হাইকেল হাশমী ঠিক এই স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর ভর করেই নির্মাণ করেছেন তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’। বিখ্যাত পিতার সন্তান হওয়ার এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপ থাকে। সেই চাপের কারণে দীর্ঘকাল নিজের সৃষ্টিকে জনসমক্ষে আনতে দ্বিধাবোধ করেছেন তিনি। পরবর্তীতে শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় তার এই আত্মপ্রকাশ বাংলা কবিতাপ্রেমীদের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি। ২০২০ সালের করোনাকালের অবরুদ্ধ সময়, জীবনের ফেলে আসা স্মৃতি, হারানো দিনের নস্টালজিয়া, প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং চারপাশের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে এই বইয়ের পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে।

আলোচ্য গ্রন্থটির নাম ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মনের ভেতরে সবসময় শব্দের খেলা চলতে থাকে। কখনো কখনো সেই শব্দরা অভিমান করে দূরে সরে যায়। মনের আকাশে মেঘ জমে, চারপাশে শূন্যতা বিরাজ করে। ঠিক এমন এক মানসিক অবস্থার কথা কবি তার নাম-কবিতা ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’-এ তুলে ধরেছেন। কবির মস্তিষ্ক যখন অন্ধকার গলিতে পথহারা, যখন শব্দরা দ্বীপান্তরিত এবং কল্পনা বহিষ্কৃত, তখন প্রিয়তমার কবিতার অনুরোধ তাকে এক অদ্ভুত সংকটে ফেলে। প্রিয়তমার নিবেদনে তিনি স্বপ্নের জাল বুনতে রাজি হন, তবে তার বিনিময়ে দাবি করেন ‘অনন্তচিন্তা করার অধিকার’। এই অনন্ত চিন্তা করার অধিকারই মূলত একজন সৃজনশীল মানুষের পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

সৃষ্টিশীলতার এই সংকট ও উত্তরণের আরেক রূপ দেখা যায় ‘অক্ষর, শব্দ, ধ্বনি’ কবিতায়। এখানে কবি শব্দের উৎস ও তার বিস্তার নিয়ে এক দার্শনিক চিন্তার অবতারণা করেছেন। শব্দ আকাশের নীলিমায় আবদ্ধ, ধ্বনি নির্জনতার কারাগারে বন্দি এবং অক্ষর মস্তিষ্কের বরফ ঢাকা চূড়ায় নিদ্রামগ্ন— এই চিত্রকল্পগুলো পাঠকের মনে এক বিশাল শূন্যতার ছবি আঁকে। পরবর্তীতে সেই শব্দ, অক্ষর ও ধ্বনি একত্রিত হয়ে কবির সত্তার মরুভূমিতে অদ্ভুত সুর তোলে। কবির মতে, শব্দ বা ধ্বনির কোনো মৃত্যু নেই; এরা ইথারের ডানায় ভর করে অনন্তকাল বেঁচে থাকে।

বইটির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নস্টালজিয়া বা অতীত রোমন্থন। ‘১৯৬৯-স্মৃতি রোমন্থন’ কবিতাটি পাঠকদের এক ধাক্কায় নিয়ে যায় কয়েক দশক পেছনের এক সহজ-সরল জীবনে। বর্তমান সময়ের ইট-পাথরের বন্দি জীবনের বিপরীতে ষাটের দশকের সেই প্রশস্ত বারান্দা, ছোট ফুলের বাগান, পাড়া-পড়শীর অবাধ যাতায়াত এবং পারস্পরিক সম্পর্কের উষ্ণতা কবিকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। তখনকার দিনে পুরো পাড়ার সব ঘরকেই নিজের বাসা মনে হতো। আজ সেই মানুষও নেই, নেই সেই অদৃশ্য সম্পর্কের বন্ধন। বর্তমানের বাসাকে কবি ‘ছোট ছোট খাঁচা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে মানুষের স্বপ্ন ও আশা বন্দিদশায় দিন কাটায়। নাগরিক জীবনের এই দমবন্ধ করা রূপ কবির কলমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মূর্ত হয়েছে।

এই অতীতচারিতার আরেকটি অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে ‘চেনা-অচেনা প্রাঙ্গণ’ কবিতায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন, বটতলা, আমতলা ও অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ একসময় কবির পদচারণায় মুখরিত ছিল। আজ সেই চিরচেনা প্রাঙ্গণে ফিরে এসে নিজেকে তার একজন ‘আগন্তুক’ মনে হয়। বয়সে কনিষ্ঠ শিক্ষকের কণ্ঠে নিজের নাম উচ্চারণ এবং এক কিশোরী ছাত্রীর বিস্ময়ভরা প্রশ্ন— ‘আপনিও কি কোনো দিন ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী?’— কবির মনে সময়ের নির্মম বয়ে চলার সত্যটিকে প্রকট করে তোলে। চেনা জায়গা কীভাবে সময়ের ব্যবধানে অচেনা হয়ে ওঠে, তার এক বিষণ্ন দলিল এই কবিতা।

মহামারি করোনার প্রভাব এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম মূল উপজীব্য। লকডাউনের সেই ভয়াবহ সময়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর আতঙ্ক অনুভব করেছেন কবি। ‘সামাজিক দূরত্ব’ কবিতায় এই মহামারীর এক ভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে। মানুষের বিষাক্ত রূপ ও সংক্রামক ব্যাধির উৎস হয়ে ওঠার বিষয়টি পশু-পাখিরাও যেন টের পেয়েছিল। বারান্দায় আসা কাক বা কার্নিশে বসা চড়ুইয়ের উড়ে যাওয়া দেখে কবির মনে হয়েছে, মানবকুল থেকে প্রাণিকুলও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে। মানুষের প্রতি প্রকৃতির এই নীরব প্রত্যাখ্যান এক গভীর চিন্তার উদ্রেক করে।

ব্যক্তিগত শোক ও শূন্যতাবোধ হাইকেল হাশমীর কবিতার এক বড় অনুষঙ্গ। প্রয়াত মায়ের স্মৃতিতে নিবেদিত ‘তুমি নেই আছে শুধু শূন্যতা’ কবিতাটি এক হাহাকারের মতো শোনায়। মায়ের প্রয়াণের পর কবির আত্মায় নেমে আসা গভীর, গাঢ় ও রংহীন শূন্যতার বর্ণনা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মায়ের অনুপস্থিতিতে কবিতার অক্ষরগুলো স্বেচ্ছা নির্বাসনে যায়, ছবির ক্যানভাস ফাঁকা হয়ে যায় এবং সমস্ত অস্তিত্বে কেবলই খঁ াখাঁ শূন্যতা বিরাজ করে। শোক কীভাবে একজন মানুষকে বাকরুদ্ধ ও সৃজনশীলতা-শূন্য করে দিতে পারে, এটি তার এক নিখুঁত উদাহরণ।

প্রেম ও সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি কবিতায়। ‘গন্তব্য’ কবিতায় দুজন আলাদা সত্তার সমান্তরাল রেখার মতো পাশাপাশি চলার চিত্র আঁকা হয়েছে। দুটি ভিন্ন সত্তা নদীর আঁকাবাঁকা স্রোত হয়ে শেষ পর্যন্ত একই গন্তব্যে মিলিত হওয়ার এক সুন্দর আশা এখানে ব্যক্ত হয়েছে। আবার ‘তুমি আছো, আমি আছি’ কবিতায় দেখা যায় বিরহ ও দূরত্বের মাঝেও বেঁচে থাকার আকুতি। দীর্ঘ নিঃশ্বাস, মিথ্যা আশ্বাস, না পাওয়ার হতাশা এবং চাপা কান্নার মাঝেও একে-অপরের ভাবনায় বেঁচে থাকার এই সমীকরণ অত্যন্ত বাস্তব।

প্রেমের কবিতায় কবির সবচেয়ে বড় মুন্সিয়ানা সম্ভবত ‘অবিশ্বাস’ কবিতাটি। এখানে প্রিয়তমার প্রতি অধিকারবোধের এক চরম শিখর দেখানো হয়েছে। প্রিয়তমার চোখের দৃষ্টি, ঠোঁটের কম্পন, হৃদয়ের ব্যথা, বিশৃঙ্খল ঘুম— সবকিছুর ওপর কবি নিজের একচ্ছত্র অধিকার দাবি করেছেন। এত গভীর অধিকারবোধ ও ভালোবাসার পরও কবিতার শেষে এসে এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক মোড় নেয়। কবির মনে ভয় জাগে, যদি স্বপ্নে প্রবেশ করার পর প্রিয়তমা হঠাৎ করে বলে বসে, ‘আমি তোমার কে?’ সম্পর্কের এই চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা ও হারানোর ভয় কবিতাটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।

‘স্বাধীন স্বপ্ন’ কবিতায় প্রেমের এক রোমান্টিক রূপ ফুটে ওঠে। দূরত্বের দেয়াল অতিক্রম করে প্রিয়তমার কাছে পৌঁছানোর আকুলতা এবং রাতের আকাশে নিজেদের ভাগ্যের তারা খোঁজার মাঝে এক চিরায়ত প্রেমের সুর ধ্বনিত হয়। চোখের মণির স্বপ্নকে কোনো কারাগারেই বন্দি রাখা সম্ভব নয়— এই অমোঘ সত্যটি কবি এখানে উচ্চারণ করেছেন।

ব্যক্তিগত আবেগ ও স্মৃতির বাইরে গিয়ে কবি সমাজ ও বিশ্বের বৃহত্তর বাস্তবতা নিয়েও কলম ধরেছেন। ‘তৃতীয় বিশ্ব’ কবিতায় এক বিশাল সমুদ্রের দ্বারা অবরুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বের মানুষের নিয়তির কথা বলা হয়েছে। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির নিচে সক্রিয় লাভার উত্তাপের চিত্রকল্পটি মূলত তৃতীয় বিশ্বের বঞ্চিত মানুষের চাপা ক্ষোভ ও বিদ্রোহের ইঙ্গিত দেয়। শান্ত সমুদ্র সৈকতে ডলফিনের আড়ালে হাঙ্গরের ধারালো আঙুল যেন সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নীরব রূপ।

হাইকেল হাশমীর কবিতার ভাষা অত্যন্ত সহজ, মেদহীন এবং সরাসরি পাঠকের সাথে কথা বলে। তিনি কোনো অহেতুক শব্দজট বা জটিল রূপকের আশ্রয় নেননি। তার কবিতায় জীবনের খুব সাধারণ ঘটনাগুলো অসাধারণ দর্শনের রূপ পেয়েছে। ব্যাংকার পেশার কাঠিন্য তার ভেতরের নরম ও সংবেদনশীল সত্তাকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং জীবনের বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখার কারণে তার কবিতায় এক ধরনের পরিণত বোধ তৈরি হয়েছে।

বইটির ভূমিকায় কবি জানিয়েছেন, ইদানীং মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে এবং কবিতার বইয়ের পাঠক আরও বিরল। এমন হতাশার যুগেও তিনি বইয়ের কোনো বিকল্প নেই বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’ পাঠকদের সেই আশাবাদের সাথে যুক্ত করবে। এই গ্রন্থটি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি একজন মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতা, কষ্ট, স্মৃতি ও স্বপ্নের এক অকৃত্রিম দলিল। হাইকেল হাশমীর এই কবিতাগুচ্ছ পাঠকের মনে দীর্ঘক্ষণ অনুরণিত হবে এবং জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা নতুন করে ভাবতে শেখাবে।

শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন। হাইকেল হাশমী। প্রকাশক : অভিযান। মূল্য : ৩৫০। প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬


স্মৃতির অনুরণন ও জীবনের খণ্ডচিত্র

প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

কবিতা কোনো যান্ত্রিক উৎপাদন নয়; কবিতা হলো কবির অন্তরের এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। প্রখ্যাত প্রগতিশীল উর্দু কবি ও ভাষাসৈনিক নওশাদ নূরীর সন্তান হাইকেল হাশমী ঠিক এই স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর ভর করেই নির্মাণ করেছেন তার পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’। বিখ্যাত পিতার সন্তান হওয়ার এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপ থাকে। সেই চাপের কারণে দীর্ঘকাল নিজের সৃষ্টিকে জনসমক্ষে আনতে দ্বিধাবোধ করেছেন তিনি। পরবর্তীতে শুভাকাঙ্ক্ষী ও স্ত্রীর অনুপ্রেরণায় তার এই আত্মপ্রকাশ বাংলা কবিতাপ্রেমীদের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি। ২০২০ সালের করোনাকালের অবরুদ্ধ সময়, জীবনের ফেলে আসা স্মৃতি, হারানো দিনের নস্টালজিয়া, প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং চারপাশের সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে এই বইয়ের পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে।

আলোচ্য গ্রন্থটির নাম ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মনের ভেতরে সবসময় শব্দের খেলা চলতে থাকে। কখনো কখনো সেই শব্দরা অভিমান করে দূরে সরে যায়। মনের আকাশে মেঘ জমে, চারপাশে শূন্যতা বিরাজ করে। ঠিক এমন এক মানসিক অবস্থার কথা কবি তার নাম-কবিতা ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’-এ তুলে ধরেছেন। কবির মস্তিষ্ক যখন অন্ধকার গলিতে পথহারা, যখন শব্দরা দ্বীপান্তরিত এবং কল্পনা বহিষ্কৃত, তখন প্রিয়তমার কবিতার অনুরোধ তাকে এক অদ্ভুত সংকটে ফেলে। প্রিয়তমার নিবেদনে তিনি স্বপ্নের জাল বুনতে রাজি হন, তবে তার বিনিময়ে দাবি করেন ‘অনন্তচিন্তা করার অধিকার’। এই অনন্ত চিন্তা করার অধিকারই মূলত একজন সৃজনশীল মানুষের পরম কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

সৃষ্টিশীলতার এই সংকট ও উত্তরণের আরেক রূপ দেখা যায় ‘অক্ষর, শব্দ, ধ্বনি’ কবিতায়। এখানে কবি শব্দের উৎস ও তার বিস্তার নিয়ে এক দার্শনিক চিন্তার অবতারণা করেছেন। শব্দ আকাশের নীলিমায় আবদ্ধ, ধ্বনি নির্জনতার কারাগারে বন্দি এবং অক্ষর মস্তিষ্কের বরফ ঢাকা চূড়ায় নিদ্রামগ্ন— এই চিত্রকল্পগুলো পাঠকের মনে এক বিশাল শূন্যতার ছবি আঁকে। পরবর্তীতে সেই শব্দ, অক্ষর ও ধ্বনি একত্রিত হয়ে কবির সত্তার মরুভূমিতে অদ্ভুত সুর তোলে। কবির মতে, শব্দ বা ধ্বনির কোনো মৃত্যু নেই; এরা ইথারের ডানায় ভর করে অনন্তকাল বেঁচে থাকে।

বইটির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নস্টালজিয়া বা অতীত রোমন্থন। ‘১৯৬৯-স্মৃতি রোমন্থন’ কবিতাটি পাঠকদের এক ধাক্কায় নিয়ে যায় কয়েক দশক পেছনের এক সহজ-সরল জীবনে। বর্তমান সময়ের ইট-পাথরের বন্দি জীবনের বিপরীতে ষাটের দশকের সেই প্রশস্ত বারান্দা, ছোট ফুলের বাগান, পাড়া-পড়শীর অবাধ যাতায়াত এবং পারস্পরিক সম্পর্কের উষ্ণতা কবিকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে। তখনকার দিনে পুরো পাড়ার সব ঘরকেই নিজের বাসা মনে হতো। আজ সেই মানুষও নেই, নেই সেই অদৃশ্য সম্পর্কের বন্ধন। বর্তমানের বাসাকে কবি ‘ছোট ছোট খাঁচা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যেখানে মানুষের স্বপ্ন ও আশা বন্দিদশায় দিন কাটায়। নাগরিক জীবনের এই দমবন্ধ করা রূপ কবির কলমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মূর্ত হয়েছে।

এই অতীতচারিতার আরেকটি অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে ‘চেনা-অচেনা প্রাঙ্গণ’ কবিতায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন, বটতলা, আমতলা ও অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ একসময় কবির পদচারণায় মুখরিত ছিল। আজ সেই চিরচেনা প্রাঙ্গণে ফিরে এসে নিজেকে তার একজন ‘আগন্তুক’ মনে হয়। বয়সে কনিষ্ঠ শিক্ষকের কণ্ঠে নিজের নাম উচ্চারণ এবং এক কিশোরী ছাত্রীর বিস্ময়ভরা প্রশ্ন— ‘আপনিও কি কোনো দিন ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী?’— কবির মনে সময়ের নির্মম বয়ে চলার সত্যটিকে প্রকট করে তোলে। চেনা জায়গা কীভাবে সময়ের ব্যবধানে অচেনা হয়ে ওঠে, তার এক বিষণ্ন দলিল এই কবিতা।

মহামারি করোনার প্রভাব এই কাব্যগ্রন্থের অন্যতম মূল উপজীব্য। লকডাউনের সেই ভয়াবহ সময়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর আতঙ্ক অনুভব করেছেন কবি। ‘সামাজিক দূরত্ব’ কবিতায় এই মহামারীর এক ভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে। মানুষের বিষাক্ত রূপ ও সংক্রামক ব্যাধির উৎস হয়ে ওঠার বিষয়টি পশু-পাখিরাও যেন টের পেয়েছিল। বারান্দায় আসা কাক বা কার্নিশে বসা চড়ুইয়ের উড়ে যাওয়া দেখে কবির মনে হয়েছে, মানবকুল থেকে প্রাণিকুলও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে। মানুষের প্রতি প্রকৃতির এই নীরব প্রত্যাখ্যান এক গভীর চিন্তার উদ্রেক করে।

ব্যক্তিগত শোক ও শূন্যতাবোধ হাইকেল হাশমীর কবিতার এক বড় অনুষঙ্গ। প্রয়াত মায়ের স্মৃতিতে নিবেদিত ‘তুমি নেই আছে শুধু শূন্যতা’ কবিতাটি এক হাহাকারের মতো শোনায়। মায়ের প্রয়াণের পর কবির আত্মায় নেমে আসা গভীর, গাঢ় ও রংহীন শূন্যতার বর্ণনা পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। মায়ের অনুপস্থিতিতে কবিতার অক্ষরগুলো স্বেচ্ছা নির্বাসনে যায়, ছবির ক্যানভাস ফাঁকা হয়ে যায় এবং সমস্ত অস্তিত্বে কেবলই খঁ াখাঁ শূন্যতা বিরাজ করে। শোক কীভাবে একজন মানুষকে বাকরুদ্ধ ও সৃজনশীলতা-শূন্য করে দিতে পারে, এটি তার এক নিখুঁত উদাহরণ।

প্রেম ও সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন উঠে এসেছে বেশ কয়েকটি কবিতায়। ‘গন্তব্য’ কবিতায় দুজন আলাদা সত্তার সমান্তরাল রেখার মতো পাশাপাশি চলার চিত্র আঁকা হয়েছে। দুটি ভিন্ন সত্তা নদীর আঁকাবাঁকা স্রোত হয়ে শেষ পর্যন্ত একই গন্তব্যে মিলিত হওয়ার এক সুন্দর আশা এখানে ব্যক্ত হয়েছে। আবার ‘তুমি আছো, আমি আছি’ কবিতায় দেখা যায় বিরহ ও দূরত্বের মাঝেও বেঁচে থাকার আকুতি। দীর্ঘ নিঃশ্বাস, মিথ্যা আশ্বাস, না পাওয়ার হতাশা এবং চাপা কান্নার মাঝেও একে-অপরের ভাবনায় বেঁচে থাকার এই সমীকরণ অত্যন্ত বাস্তব।

প্রেমের কবিতায় কবির সবচেয়ে বড় মুন্সিয়ানা সম্ভবত ‘অবিশ্বাস’ কবিতাটি। এখানে প্রিয়তমার প্রতি অধিকারবোধের এক চরম শিখর দেখানো হয়েছে। প্রিয়তমার চোখের দৃষ্টি, ঠোঁটের কম্পন, হৃদয়ের ব্যথা, বিশৃঙ্খল ঘুম— সবকিছুর ওপর কবি নিজের একচ্ছত্র অধিকার দাবি করেছেন। এত গভীর অধিকারবোধ ও ভালোবাসার পরও কবিতার শেষে এসে এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক মোড় নেয়। কবির মনে ভয় জাগে, যদি স্বপ্নে প্রবেশ করার পর প্রিয়তমা হঠাৎ করে বলে বসে, ‘আমি তোমার কে?’ সম্পর্কের এই চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা ও হারানোর ভয় কবিতাটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।

‘স্বাধীন স্বপ্ন’ কবিতায় প্রেমের এক রোমান্টিক রূপ ফুটে ওঠে। দূরত্বের দেয়াল অতিক্রম করে প্রিয়তমার কাছে পৌঁছানোর আকুলতা এবং রাতের আকাশে নিজেদের ভাগ্যের তারা খোঁজার মাঝে এক চিরায়ত প্রেমের সুর ধ্বনিত হয়। চোখের মণির স্বপ্নকে কোনো কারাগারেই বন্দি রাখা সম্ভব নয়— এই অমোঘ সত্যটি কবি এখানে উচ্চারণ করেছেন।

ব্যক্তিগত আবেগ ও স্মৃতির বাইরে গিয়ে কবি সমাজ ও বিশ্বের বৃহত্তর বাস্তবতা নিয়েও কলম ধরেছেন। ‘তৃতীয় বিশ্ব’ কবিতায় এক বিশাল সমুদ্রের দ্বারা অবরুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বের মানুষের নিয়তির কথা বলা হয়েছে। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির নিচে সক্রিয় লাভার উত্তাপের চিত্রকল্পটি মূলত তৃতীয় বিশ্বের বঞ্চিত মানুষের চাপা ক্ষোভ ও বিদ্রোহের ইঙ্গিত দেয়। শান্ত সমুদ্র সৈকতে ডলফিনের আড়ালে হাঙ্গরের ধারালো আঙুল যেন সাম্রাজ্যবাদী শোষণের নীরব রূপ।

হাইকেল হাশমীর কবিতার ভাষা অত্যন্ত সহজ, মেদহীন এবং সরাসরি পাঠকের সাথে কথা বলে। তিনি কোনো অহেতুক শব্দজট বা জটিল রূপকের আশ্রয় নেননি। তার কবিতায় জীবনের খুব সাধারণ ঘটনাগুলো অসাধারণ দর্শনের রূপ পেয়েছে। ব্যাংকার পেশার কাঠিন্য তার ভেতরের নরম ও সংবেদনশীল সত্তাকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং জীবনের বাস্তবতাকে খুব কাছ থেকে দেখার কারণে তার কবিতায় এক ধরনের পরিণত বোধ তৈরি হয়েছে।

বইটির ভূমিকায় কবি জানিয়েছেন, ইদানীং মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে এবং কবিতার বইয়ের পাঠক আরও বিরল। এমন হতাশার যুগেও তিনি বইয়ের কোনো বিকল্প নেই বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ‘শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন’ পাঠকদের সেই আশাবাদের সাথে যুক্ত করবে। এই গ্রন্থটি কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়; এটি একজন মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতা, কষ্ট, স্মৃতি ও স্বপ্নের এক অকৃত্রিম দলিল। হাইকেল হাশমীর এই কবিতাগুচ্ছ পাঠকের মনে দীর্ঘক্ষণ অনুরণিত হবে এবং জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা নতুন করে ভাবতে শেখাবে।

শব্দের স্বেচ্ছা নির্বাসন। হাইকেল হাশমী। প্রকাশক : অভিযান। মূল্য : ৩৫০। প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত