সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সাযযাদ কাদির : হিরণ্ময় স্মৃতি-অর্ঘ্য


মুমির সরকার
মুমির সরকার
প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৭ এএম

সাযযাদ কাদির : হিরণ্ময় স্মৃতি-অর্ঘ্য
সাযযাদ কাদির

২০০৫ সালে বাদাবন ঘেঁষা সাতক্ষীরা জেলায় গাজী শাহজাহান সিরাজকে আহ্বায়ক করে মোট এগারো সদস্যবিশিষ্ট ‘কবি সাযযাদ কাদির স্মরণসভা কমিটি’ গঠন করা হয়। সে স্মরণসভায় কবি সস্ত্রীক এবং তাঁর বন্ধুসম ওপার বাংলার স্বনামধন্য আরও বেশ ক’জন কবি ও লেখক যোগদান করেছিলেন। জীবদ্দশাতেই কেন সেই স্মরণসভা এবং সে সভায় সস্ত্রীক এবং বন্দু-বান্ধবসহ যোগদান করার বিষয়টি আপাত কৌতুকময় মনে হলেও তাঁর স্পষ্টজ্ঞান কথা বলে উঠেছে, একজন মানুষের মৃত্যুর পর স্মরণসভায় ব্যক্তি মানুষটির মোক্ষম মূল্যায়ন করা হলেও মৃত মানুষটির কী লাভ! কারণ, মূল্যায়ন সাপেক্ষে তার পক্ষে নিজেকে অভিযোজন করা তো সম্ভবপর হবে না কখনই। কিন্তু জীবদ্দশাতেই যদি মানুষটির সিকিভাগও মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে, তবে আমৃত্যু সংশ্লিষ্ট মানুষটির পক্ষে কিছুটা যোগ-বিয়োগ করে হলেও আরও সিকিভাগ সংশোধন ও পরিমার্জন  করার হয়তবা সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকে বৈ কি! এরই ধারাবাহিকতা হয়তো কবি সাযযাদ কাদির স্মরণসভা।

যা হোক, উক্তরূপ  স্মরণ-সভা  উপলক্ষ্যে প্রান্তিক জনপদের স্বনামধন্য লেখক গাজী শাহজাহান সিরাজ এবং বিশিষ্ট কবি ও ছড়াকার নিশিকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক যৌথ সম্পাদনায় প্রথামাফিক ‘স্মৃতি-অর্ঘ্য’, একটি স্মরণিকা’ও বের করা হয়। উক্ত স্মরণিকা ‘মফস্বলীয় গন্ধবাস’ হলেও এই জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, পুরোটা জুড়ে কবি সাযযাদ কাদির সম্মানার্থে লেখাগুলো অপেক্ষা বিভিন্নজন সাযযাদ কাদির বিরচিত কাব্য, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং গবেষণা ও সংকলন নিয়ে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক পাঠকগোষ্ঠী হতে অতি সাধারণ পাঠককুলের যে মৌলিক ও একক সত্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে যা কিছুই উচ্চারণ করেছেন এবং তা নির্মোহভাবেই করেছেন বিধায় উহাদের প্রত্যেকটিই একেকজন সাযযাদ কাদির।

বিশিষ্ট কবি ও লেখক শাহজাহান সিরাজ, তাঁকে এক লাফে ‘সাহিত্য শাসক’ বলেই ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর প্রকাশিত কবিতার স্ব-রূপ আবিষ্কার করেও বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এভাবে যে,

“অভিন্ন দু’টি ছোট্ট শাদা হাতে

এমন কিছু কুসুম গুঁজে রাখি

আসবে তুমি প্রহর তবু শেষ—

অচিনপুরে উড়েই গেছে পাখি! 

                     (প্রতীক্ষা)

—এই কবিতায় একটি প্রছন্ন বার্তা আছে। কবিতাটির ভাষা সহজ এবং উচ্চারিত ভাবও দুর্বোধ্যতার মোড়কে ঢাকা নয়। কিন্তু প্রকাশভঙ্গিতে অন্তর্নিহিত বিষয়ের অনিবার্য সুঘ্রাণ!

ওপার বাংলার বিশিষ্ট গল্পকার ও কবিবন্ধু শ্রী নৃপেন চ্যাটার্জী ‘বন্ধু সাযযাদ: আনন্দে, অভিমানে ও আন্ত্রিকতায়’ শিরোনামে কবি সাযযাদ কাদিরের কবি-সত্তা ব্যতিরেকে ব্যক্তি মানসিকতা উন্মোচন করেছেন ঠিকই—

“এরপর গন্তব্যস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলারই কালিগঞ্জে। সেখানে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক বন্ধু অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমানের ‘নদী’ পত্রিকার একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আমরা সকলেই আমন্ত্রিত অতিথি।

কালিগঞ্জে আমাদের থাকার জন্যে নির্দিষ্ট করা ছিল স্থানীয় ওয়াপদার বাংলো। ছিমছাম। পাশ দিয়েই চলে গেছে ছোট্ট নদীর শাখা। গাছপালায় ঘেরা অতি মনোরম পরিবেশ। প্রথম রাত্রিটা একরকম গল্প কথায় কেটে গেল। পরিচয় হলো সাযযাদ কাদিরের স্ত্রীর সংগেও। তিনিও খুব মিশুক স্বভাবের। এক ফাঁকে অবশ্য আমাদের আড্ডাটা জমে উঠেছিল গাজী আজিজুর রহমানের বাড়ির সামনের এক চিলতে উঠোনে। অনেক রাত্রি পর্যন্ত সে সব গল্প কথার সংগী হয়ে রইল আকাশের নক্ষত্রমালা!”

কবি সাযযাদ কাদির সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সবচেয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লষণ করেছেন স্বনামধন্য কবি, লেখক এবং সমধিক পরিচিত বিদগ্ধ সাহিত্য সমালোচক হিসেবেই, মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেছেন, “সমকালীন বাংলাদেশের কৃতবিদ্য সব্যসাচীদেরই একজন আমার বন্ধু সাযযাদ কাদির। আমার আনন্দ, আমি তাঁর সহযাত্রী। ‘যথেচ্ছ ধ্রুপদ’-এর বৃন্তে অপ্রকাশিত হওয়ার মুহূর্ত থেকে আমি তার সৃষ্টিশীলতার আনুপূর্বিক স্বাক্ষী: কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়া নেই অকারণ; তাতে শুধু প্রাকৃতিক অনিবার্যতার কাছে মুগ্ধ আত্মসমর্পণ। দীর্ঘ সৃষ্টিজীবনে সাযযাদ গদ্যেপদ্যে ফসল ফলিয়েছে বিভিন্নমুখী, পরিমাণও উল্লেখযোগ্য; সর্বাধিক শনাক্তযোগ্য মনে করি তার আবেগ ও ভাষার পরিশীলন। মননকে মননশাসিত ঘরে ভাষাকে স্ব-মুদ্রায় বশীভূত রাখতে এক কুশলী। শিল্প তার পরিচর্যা-লব্ধ। স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টির চেয়ে পরিমার্জিত বুননই তাকে বারংবার তাকে শ্রমসুখী করে রেখেছে। এক ধরনের স্বসৃষ্ট স্বেচ্ছাচারিতা তার স্বভাববিরুদ্ধ, যা তাকে তার প্রাপ্য বৈষয়িক অর্জন ও স্বীকৃতি থেকেও খানিকটা দূরে সরিয়ে রেখেছে। কবি-কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক-নাট্যকার-প্রাবন্ধিক-ভাষাবিদ এই বহুমাত্রিক স্রষ্টা সমকালে এবং উত্তরকালে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হবেন। যুগ-যুগ জিয়ো, হে বন্ধু আমার।”

এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, সাযযাদ কাদির বহুধা মেধাসম্পন্ন হয়েও আপাদমস্তক ছিলেন মূলত কবি। এবং এও সত্য্য যে, তাঁর মেধা বিভিন্ন খাতে প্রয়োগ করলেও তা করেছেন একান্তই কাব্য ভাবনা ও কাব্যচর্চাকে সুসংহত করতেই! পেরেছেন কিনা কিংবা কতটুকু পেরেছেন তার অনুপাত অপেক্ষা অনেক বেশি মহান কবি এই জন্য যে, কবিতার প্রতি কতটা দায়বদ্ধ থাকলে একজন কবি ‘পপুলার’ কিংবা তথাকথিত ঊর্ধ্বক্রমিক রোল নম্বরধারী হওয়ার চেয়েও কিংবা বিপন্ন প্রায় সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার দৌড়ে না গিয়ে নীরবে ও নিভৃতে একক আনন্দে কবিতাকে নিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় আমৃত্যু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন আলস্য বিনা অবলীলায়! এ যে কী পরিমাণ মনোদৈহিক— উভয়ের জন্যেই ভীষণ শ্রমঘন ক্রিয়া-কলাপ ভাবতে গেলে অবাক হতে হয়।

এতসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে ভাগিনা মামা-কে কোনো ফরম্যাটটি কাব্যচর্চার জন্য মোক্ষম জানতে চাইলে কোনো কিছু না ভেবেই অবলীলাক্রমে বললেন, সনেট অবশ্যই। কেন? কারণ সনেটের ৪টি দশা থাকে। এই ধরা যাক, পেত্রাকীয় অন্ত্যমিল সম্পন্ন প্রথম ০৪টি চরণ যদি কোনো একটি বিষয় বা ভাবের সূচনা বা উত্থাপন হয় তবে দত্ত ফরম্যাটের অন্ত্যমিলসম্পন্ন পরের ০৪টি চরণ হবে অবশ্যই উত্থাপিত বিষয়ের কায়িক বর্ণনা কিংবা নিরাকার কিছুর আকার পাওয়ার প্রচেষ্টা। এরপর শেক্সপিয়র ফরম্যাটের পরের ০৩টি চরণ-কে হতেই হবে কায়িক বা অ-কায়িক কিছুর বর্ণনায় ওঠে আসা কোনো বাস্তব যুক্তি যা কিনা বিশ্বাস-এর প্রতিনিদিত্ব করে বা বাস্তবতা বিবর্জিত যুক্তিহীন অযুক্তি অবিশ্বাস-কে সহজাত করে তোলে। সর্বশেষ শেক্সপিয়রীয় অন্ত্যমিল ফরম্যাটের শেষ ০৩টি চরণ ইতঃপূর্বে সংশ্লেষিত বিশ্বাস আর বিশ্লেষিত অবিশ্বাস-এ দু’য়ের মধ্যে কোনটি প্রথম ০৪ চরণে উত্থাপিত বিষয় বা ভাব-এর তুলনামূলক স্পষ্ট এবং আপাত পূর্ণ চিত্র তৈরি করে তাকে সাব্যস্ত করে মতামত, সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত প্রদান করে সনেট সমাপ্ত করতে হয়। অর্থাৎ সনেট-ই হচ্ছে কাব্যচর্চা শুরু করার জন্যে একমাত্র পরিপূর্ণ কাঠামো— যা কিনা প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সংগীতের মতই সমাপ্তযোগ্য এবং কখনই মাঝপথে হারিয়ে যাবে না কিংবা রহস্য তৈরি করবে না বরং সর্বদাই একটি পূর্ণ চিত্র ভাসিয়ে রাখবে চোখে-চোখে।’

অথচ কবির সনেট রচনা নেই বললেই চলে। এ থেকেও খুব গভীর বোধ প্রমাণিত হয় যে, সাযযাদ কাদির কবি হিসেবে যে ঘরানার কাব্যচর্চা থেকে দূরে থেকেছেন অথচ সে ঘরাণা কবিতাচর্চার জন্য সর্বোত্তম বলতেও দ্বিধা করেননি কিংবা বিরক্তি বা বিদ্বেষ প্রদর্শন করেননি। এইতো মহান কবি। এইতো সত্যদৃষ্ট কবি। ব্যক্তিগতভাবে আমি কবিতা নিয়ে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গদ্য-পদ্য (prose-poem)-এর গুণমুগ্ধ একজন ভক্ত বটে। বাংলা সাহিত্যে তো বটেই, খোদ বিশ্বসাহিত্যেই গদ্য-পদ্যের চর্চা খুবই সীমিত পেয়েছি। এর কারণ জানতে চাইলে মামা এইবার বেশ কিছুক্ষণ দম ধরে তারপর বেলুন হতে অল্প অল্প বাতাস বের করার মতো করে বললেন, এটি আমি সঠিক জানি না রেহ! তবে আন্দাজ করতে পারছি যে, পাঠক পাঠে শেষতক তা গদ্য হয়েই ওঠে কিনা কিংবা গদ্য নাকি পদ্য এহেন সন্দেহের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা রয়েছে বলেই হয়তো গদ্য-পদ্য খুব বেশি এগুতে পারে নি এবং তা সারা বিশ্বেই! তবে কি বিশেষ প্রকার সতকর্তা অবলম্বন করা জরুরি? অবশ্যই। তবে কোনো বিশেষ প্রকার এটিও আমি সঠিক বলতে পারব না। তবে আমার ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি, গদ্য-পদ্য দুইটি প্যারাগ্রাফের বেশি হওয়া সমীচিন না; প্রথম প্যারায় আনন্দানুভূতি প্রকাশ পেলে দ্বিতীয় প্যারা অবশ্যই বিচ্ছেদময় হিসেবে যেন কিছুটা হলেও প্রকাশ পায়। প্রতিটি শব্দ যেন হয় পাঠক সমাজে প্রচলিত পরিচিত এবং বাক্য গঠন ‘simple sentence’-এর ব্যকরণ মান্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে কোনো বস্তু বা কোনো জীব-এর চরিত্রায়ণে দীর্ঘ বাক্য আবশ্যকীয় হলে অই বাক্যকে ছোট-ছোট ভাগে ভাগ করতে যথোপযুক্ত যতিচিহ্নের প্রয়োগে সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শন খুবই জরুরি। আরও দু’টি বিষয় হলো, হয়ত, যেন, বুঝি ইত্যাদি পদ দ্বারা বাক্যের কোনো বক্তব্যকে দূরবর্তী না করা এবং চরিত্র চিত্রায়নে পারিপার্শ্বিকতা খুব বেশি টেনে না আনাই ভাল— যেটি ছাড়া সিনেমা ভাল নয়।

শেষের পর্যায়ে আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে, মামার এহেন কাব্য ভাবনা কোনো টেক্সট কিংবা সহায়ক শিক্ষাক্রম থেকে পাঠকৃত নয় বরং অন্তর থেকে উঠে আসা বেদবাক্য— যাকে চ্যালেঞ্জ করে পরবর্তীতেও কোনো টেক্সট বা সহায়িকা পাঠক্রম রচিত হবে না। হবে না। কস্মিনকালেও যেন হবে না। এই যেমন,

“যা কিছু শিউলি ও স্টীমারে থাকে, যা কিছু মিছিল ও জিরাফে, তাই নিয়ে সংসারের কাছে কড়ি কোমল কিছু আনাই যাবে না, নিজস্ব বেসরকারি-হয়ে-যাওয়া প্রাণের অকথ্য উপমা যত এ ভাবে পাশপাশি, এ ভাবে সুদূর- মধুর করে হবে কি সৃষ্টির গোলমেলে আলোচনা শুরু?” 

সাযযাদ কাদির বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের অন্যতম পুরোধা কবি, সাংবাদিক এবং প্রাবন্ধিক হিসেবে স্বনামধন্য হলেও অন্য কবির মতো সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা হতে রস আস্বাদন করার প্রচেষ্টা করেছেন শুধুমাত্র কাব্যরসে সিক্ত হতেই এবং কবিতার সে জারণরসে সিক্ত হয়েই কাব্যানুরাগ পাকাপোক্ত করে ফিরে এসেছেন; এবং আমৃত্যু কাব্য-ভাবনা নিয়েই ঊনসত্তর বছর বেঁচে থেকে ৬ এপ্রিল ২০১৭ তারিখ মৃত্যুবরণ করেন। 

সাযযাদ কাদির সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনেও আপাদমস্তক ছিলেন কবি। কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশুতোষ রচনা, গবেষণা, সম্পাদনা, সংকলন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।  শিক্ষা, শিল্প এবং সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় ৬০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

কবি সাযযাদ কাদিরের কবিসত্তা, কাব্যানুরাগ, কাব্যভাবনা, কাব্যচর্চা, কাব্য-রচনার সময়কাল ও দশা (phase) সাপেক্ষে তাঁর কবিতার গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করাও সম্ভব হয়।

কবি সাযযাদ কাদিরের সাহিত্য-পথ বিচরণ বহুমুখী (versetail) ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। যেন বিশ্বকাব্য সাহিত্যের বরেণ্য অনেক কবির মতো তিনিও কিছুটা ভিন্নপথ ঘুরে এসেই ফের কবিতার বরপুত্র সম্মানে থিতু হয়েছেন কবিতায়। তাই বোধ করি, সকল পরিচয় ছাপিয়ে সাযযাদ কাদির কবি হিসেবেই সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছেন। সাহিত্য দরবারে যে ক’জন প্রথিতযশা কবি কবিতায় ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সফল হয়েছেন কিংবা ব্যর্থ হয়েছেন, কবি সাযযাদ কাদির তাঁদের-ই শামিল। তিনি অনেক আনন্দঘন পরিশ্রম করে তাঁর কবিতায় প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এ ধরনের কার্যক্রমকে ‘কাব্য-গবেষণা’ বলাই সমীচীন হবে। উপযুক্ত প্রমাণ হিসেবে তাঁর কবিতায় জ্যামিতিক কাঠামোর বিন্যাস চোখে পড়ার মতো বৈকি! 

কবি সাযযাদ কাদিরের কবিতার প্যাটার্ন লক্ষ্য করলে সহজেই প্রতিভাত হয় যে, তাঁর কাব্য-ভাবনা বরাবরই সুঠাম হলেও ঔদ্ধত্যপূণ নয় কোনভাবেই; বরং অত্যন্ত পরিশীলিত। সময়কাল বিবেচনায় প্রথমদিকে তাঁর লেখা কবিতা এবং মাঝের দিকে কিংবা শেষদিকে লেখা কবিতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম chronological ফারাক স্পষ্টত দৃশ্যমান। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬


সাযযাদ কাদির : হিরণ্ময় স্মৃতি-অর্ঘ্য

প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

২০০৫ সালে বাদাবন ঘেঁষা সাতক্ষীরা জেলায় গাজী শাহজাহান সিরাজকে আহ্বায়ক করে মোট এগারো সদস্যবিশিষ্ট ‘কবি সাযযাদ কাদির স্মরণসভা কমিটি’ গঠন করা হয়। সে স্মরণসভায় কবি সস্ত্রীক এবং তাঁর বন্ধুসম ওপার বাংলার স্বনামধন্য আরও বেশ ক’জন কবি ও লেখক যোগদান করেছিলেন। জীবদ্দশাতেই কেন সেই স্মরণসভা এবং সে সভায় সস্ত্রীক এবং বন্দু-বান্ধবসহ যোগদান করার বিষয়টি আপাত কৌতুকময় মনে হলেও তাঁর স্পষ্টজ্ঞান কথা বলে উঠেছে, একজন মানুষের মৃত্যুর পর স্মরণসভায় ব্যক্তি মানুষটির মোক্ষম মূল্যায়ন করা হলেও মৃত মানুষটির কী লাভ! কারণ, মূল্যায়ন সাপেক্ষে তার পক্ষে নিজেকে অভিযোজন করা তো সম্ভবপর হবে না কখনই। কিন্তু জীবদ্দশাতেই যদি মানুষটির সিকিভাগও মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে, তবে আমৃত্যু সংশ্লিষ্ট মানুষটির পক্ষে কিছুটা যোগ-বিয়োগ করে হলেও আরও সিকিভাগ সংশোধন ও পরিমার্জন  করার হয়তবা সুযোগ ও সম্ভাবনা থাকে বৈ কি! এরই ধারাবাহিকতা হয়তো কবি সাযযাদ কাদির স্মরণসভা।

যা হোক, উক্তরূপ  স্মরণ-সভা  উপলক্ষ্যে প্রান্তিক জনপদের স্বনামধন্য লেখক গাজী শাহজাহান সিরাজ এবং বিশিষ্ট কবি ও ছড়াকার নিশিকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক যৌথ সম্পাদনায় প্রথামাফিক ‘স্মৃতি-অর্ঘ্য’, একটি স্মরণিকা’ও বের করা হয়। উক্ত স্মরণিকা ‘মফস্বলীয় গন্ধবাস’ হলেও এই জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, পুরোটা জুড়ে কবি সাযযাদ কাদির সম্মানার্থে লেখাগুলো অপেক্ষা বিভিন্নজন সাযযাদ কাদির বিরচিত কাব্য, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং গবেষণা ও সংকলন নিয়ে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক পাঠকগোষ্ঠী হতে অতি সাধারণ পাঠককুলের যে মৌলিক ও একক সত্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে যা কিছুই উচ্চারণ করেছেন এবং তা নির্মোহভাবেই করেছেন বিধায় উহাদের প্রত্যেকটিই একেকজন সাযযাদ কাদির।

বিশিষ্ট কবি ও লেখক শাহজাহান সিরাজ, তাঁকে এক লাফে ‘সাহিত্য শাসক’ বলেই ক্ষান্ত হননি বরং তাঁর প্রকাশিত কবিতার স্ব-রূপ আবিষ্কার করেও বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন এভাবে যে,

“অভিন্ন দু’টি ছোট্ট শাদা হাতে

এমন কিছু কুসুম গুঁজে রাখি

আসবে তুমি প্রহর তবু শেষ—

অচিনপুরে উড়েই গেছে পাখি! 

                     (প্রতীক্ষা)

—এই কবিতায় একটি প্রছন্ন বার্তা আছে। কবিতাটির ভাষা সহজ এবং উচ্চারিত ভাবও দুর্বোধ্যতার মোড়কে ঢাকা নয়। কিন্তু প্রকাশভঙ্গিতে অন্তর্নিহিত বিষয়ের অনিবার্য সুঘ্রাণ!

ওপার বাংলার বিশিষ্ট গল্পকার ও কবিবন্ধু শ্রী নৃপেন চ্যাটার্জী ‘বন্ধু সাযযাদ: আনন্দে, অভিমানে ও আন্ত্রিকতায়’ শিরোনামে কবি সাযযাদ কাদিরের কবি-সত্তা ব্যতিরেকে ব্যক্তি মানসিকতা উন্মোচন করেছেন ঠিকই—

“এরপর গন্তব্যস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলারই কালিগঞ্জে। সেখানে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক বন্ধু অধ্যাপক গাজী আজিজুর রহমানের ‘নদী’ পত্রিকার একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আমরা সকলেই আমন্ত্রিত অতিথি।

কালিগঞ্জে আমাদের থাকার জন্যে নির্দিষ্ট করা ছিল স্থানীয় ওয়াপদার বাংলো। ছিমছাম। পাশ দিয়েই চলে গেছে ছোট্ট নদীর শাখা। গাছপালায় ঘেরা অতি মনোরম পরিবেশ। প্রথম রাত্রিটা একরকম গল্প কথায় কেটে গেল। পরিচয় হলো সাযযাদ কাদিরের স্ত্রীর সংগেও। তিনিও খুব মিশুক স্বভাবের। এক ফাঁকে অবশ্য আমাদের আড্ডাটা জমে উঠেছিল গাজী আজিজুর রহমানের বাড়ির সামনের এক চিলতে উঠোনে। অনেক রাত্রি পর্যন্ত সে সব গল্প কথার সংগী হয়ে রইল আকাশের নক্ষত্রমালা!”

কবি সাযযাদ কাদির সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সবচেয়ে তাত্ত্বিক বিশ্লষণ করেছেন স্বনামধন্য কবি, লেখক এবং সমধিক পরিচিত বিদগ্ধ সাহিত্য সমালোচক হিসেবেই, মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেছেন, “সমকালীন বাংলাদেশের কৃতবিদ্য সব্যসাচীদেরই একজন আমার বন্ধু সাযযাদ কাদির। আমার আনন্দ, আমি তাঁর সহযাত্রী। ‘যথেচ্ছ ধ্রুপদ’-এর বৃন্তে অপ্রকাশিত হওয়ার মুহূর্ত থেকে আমি তার সৃষ্টিশীলতার আনুপূর্বিক স্বাক্ষী: কোনো কিছুতেই তাড়াহুড়া নেই অকারণ; তাতে শুধু প্রাকৃতিক অনিবার্যতার কাছে মুগ্ধ আত্মসমর্পণ। দীর্ঘ সৃষ্টিজীবনে সাযযাদ গদ্যেপদ্যে ফসল ফলিয়েছে বিভিন্নমুখী, পরিমাণও উল্লেখযোগ্য; সর্বাধিক শনাক্তযোগ্য মনে করি তার আবেগ ও ভাষার পরিশীলন। মননকে মননশাসিত ঘরে ভাষাকে স্ব-মুদ্রায় বশীভূত রাখতে এক কুশলী। শিল্প তার পরিচর্যা-লব্ধ। স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টির চেয়ে পরিমার্জিত বুননই তাকে বারংবার তাকে শ্রমসুখী করে রেখেছে। এক ধরনের স্বসৃষ্ট স্বেচ্ছাচারিতা তার স্বভাববিরুদ্ধ, যা তাকে তার প্রাপ্য বৈষয়িক অর্জন ও স্বীকৃতি থেকেও খানিকটা দূরে সরিয়ে রেখেছে। কবি-কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক-নাট্যকার-প্রাবন্ধিক-ভাষাবিদ এই বহুমাত্রিক স্রষ্টা সমকালে এবং উত্তরকালে অবশ্যই ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হবেন। যুগ-যুগ জিয়ো, হে বন্ধু আমার।”

এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, সাযযাদ কাদির বহুধা মেধাসম্পন্ন হয়েও আপাদমস্তক ছিলেন মূলত কবি। এবং এও সত্য্য যে, তাঁর মেধা বিভিন্ন খাতে প্রয়োগ করলেও তা করেছেন একান্তই কাব্য ভাবনা ও কাব্যচর্চাকে সুসংহত করতেই! পেরেছেন কিনা কিংবা কতটুকু পেরেছেন তার অনুপাত অপেক্ষা অনেক বেশি মহান কবি এই জন্য যে, কবিতার প্রতি কতটা দায়বদ্ধ থাকলে একজন কবি ‘পপুলার’ কিংবা তথাকথিত ঊর্ধ্বক্রমিক রোল নম্বরধারী হওয়ার চেয়েও কিংবা বিপন্ন প্রায় সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার দৌড়ে না গিয়ে নীরবে ও নিভৃতে একক আনন্দে কবিতাকে নিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় আমৃত্যু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন আলস্য বিনা অবলীলায়! এ যে কী পরিমাণ মনোদৈহিক— উভয়ের জন্যেই ভীষণ শ্রমঘন ক্রিয়া-কলাপ ভাবতে গেলে অবাক হতে হয়।

এতসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে ভাগিনা মামা-কে কোনো ফরম্যাটটি কাব্যচর্চার জন্য মোক্ষম জানতে চাইলে কোনো কিছু না ভেবেই অবলীলাক্রমে বললেন, সনেট অবশ্যই। কেন? কারণ সনেটের ৪টি দশা থাকে। এই ধরা যাক, পেত্রাকীয় অন্ত্যমিল সম্পন্ন প্রথম ০৪টি চরণ যদি কোনো একটি বিষয় বা ভাবের সূচনা বা উত্থাপন হয় তবে দত্ত ফরম্যাটের অন্ত্যমিলসম্পন্ন পরের ০৪টি চরণ হবে অবশ্যই উত্থাপিত বিষয়ের কায়িক বর্ণনা কিংবা নিরাকার কিছুর আকার পাওয়ার প্রচেষ্টা। এরপর শেক্সপিয়র ফরম্যাটের পরের ০৩টি চরণ-কে হতেই হবে কায়িক বা অ-কায়িক কিছুর বর্ণনায় ওঠে আসা কোনো বাস্তব যুক্তি যা কিনা বিশ্বাস-এর প্রতিনিদিত্ব করে বা বাস্তবতা বিবর্জিত যুক্তিহীন অযুক্তি অবিশ্বাস-কে সহজাত করে তোলে। সর্বশেষ শেক্সপিয়রীয় অন্ত্যমিল ফরম্যাটের শেষ ০৩টি চরণ ইতঃপূর্বে সংশ্লেষিত বিশ্বাস আর বিশ্লেষিত অবিশ্বাস-এ দু’য়ের মধ্যে কোনটি প্রথম ০৪ চরণে উত্থাপিত বিষয় বা ভাব-এর তুলনামূলক স্পষ্ট এবং আপাত পূর্ণ চিত্র তৈরি করে তাকে সাব্যস্ত করে মতামত, সুপারিশ বা সিদ্ধান্ত প্রদান করে সনেট সমাপ্ত করতে হয়। অর্থাৎ সনেট-ই হচ্ছে কাব্যচর্চা শুরু করার জন্যে একমাত্র পরিপূর্ণ কাঠামো— যা কিনা প্রাচ্যের শাস্ত্রীয় সংগীতের মতই সমাপ্তযোগ্য এবং কখনই মাঝপথে হারিয়ে যাবে না কিংবা রহস্য তৈরি করবে না বরং সর্বদাই একটি পূর্ণ চিত্র ভাসিয়ে রাখবে চোখে-চোখে।’

অথচ কবির সনেট রচনা নেই বললেই চলে। এ থেকেও খুব গভীর বোধ প্রমাণিত হয় যে, সাযযাদ কাদির কবি হিসেবে যে ঘরানার কাব্যচর্চা থেকে দূরে থেকেছেন অথচ সে ঘরাণা কবিতাচর্চার জন্য সর্বোত্তম বলতেও দ্বিধা করেননি কিংবা বিরক্তি বা বিদ্বেষ প্রদর্শন করেননি। এইতো মহান কবি। এইতো সত্যদৃষ্ট কবি। ব্যক্তিগতভাবে আমি কবিতা নিয়ে তাঁর নিরবচ্ছিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গদ্য-পদ্য (prose-poem)-এর গুণমুগ্ধ একজন ভক্ত বটে। বাংলা সাহিত্যে তো বটেই, খোদ বিশ্বসাহিত্যেই গদ্য-পদ্যের চর্চা খুবই সীমিত পেয়েছি। এর কারণ জানতে চাইলে মামা এইবার বেশ কিছুক্ষণ দম ধরে তারপর বেলুন হতে অল্প অল্প বাতাস বের করার মতো করে বললেন, এটি আমি সঠিক জানি না রেহ! তবে আন্দাজ করতে পারছি যে, পাঠক পাঠে শেষতক তা গদ্য হয়েই ওঠে কিনা কিংবা গদ্য নাকি পদ্য এহেন সন্দেহের পর্যাপ্ত স্বাধীনতা রয়েছে বলেই হয়তো গদ্য-পদ্য খুব বেশি এগুতে পারে নি এবং তা সারা বিশ্বেই! তবে কি বিশেষ প্রকার সতকর্তা অবলম্বন করা জরুরি? অবশ্যই। তবে কোনো বিশেষ প্রকার এটিও আমি সঠিক বলতে পারব না। তবে আমার ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি, গদ্য-পদ্য দুইটি প্যারাগ্রাফের বেশি হওয়া সমীচিন না; প্রথম প্যারায় আনন্দানুভূতি প্রকাশ পেলে দ্বিতীয় প্যারা অবশ্যই বিচ্ছেদময় হিসেবে যেন কিছুটা হলেও প্রকাশ পায়। প্রতিটি শব্দ যেন হয় পাঠক সমাজে প্রচলিত পরিচিত এবং বাক্য গঠন ‘simple sentence’-এর ব্যকরণ মান্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে কোনো বস্তু বা কোনো জীব-এর চরিত্রায়ণে দীর্ঘ বাক্য আবশ্যকীয় হলে অই বাক্যকে ছোট-ছোট ভাগে ভাগ করতে যথোপযুক্ত যতিচিহ্নের প্রয়োগে সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শন খুবই জরুরি। আরও দু’টি বিষয় হলো, হয়ত, যেন, বুঝি ইত্যাদি পদ দ্বারা বাক্যের কোনো বক্তব্যকে দূরবর্তী না করা এবং চরিত্র চিত্রায়নে পারিপার্শ্বিকতা খুব বেশি টেনে না আনাই ভাল— যেটি ছাড়া সিনেমা ভাল নয়।

শেষের পর্যায়ে আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে, মামার এহেন কাব্য ভাবনা কোনো টেক্সট কিংবা সহায়ক শিক্ষাক্রম থেকে পাঠকৃত নয় বরং অন্তর থেকে উঠে আসা বেদবাক্য— যাকে চ্যালেঞ্জ করে পরবর্তীতেও কোনো টেক্সট বা সহায়িকা পাঠক্রম রচিত হবে না। হবে না। কস্মিনকালেও যেন হবে না। এই যেমন,

“যা কিছু শিউলি ও স্টীমারে থাকে, যা কিছু মিছিল ও জিরাফে, তাই নিয়ে সংসারের কাছে কড়ি কোমল কিছু আনাই যাবে না, নিজস্ব বেসরকারি-হয়ে-যাওয়া প্রাণের অকথ্য উপমা যত এ ভাবে পাশপাশি, এ ভাবে সুদূর- মধুর করে হবে কি সৃষ্টির গোলমেলে আলোচনা শুরু?” 

সাযযাদ কাদির বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের অন্যতম পুরোধা কবি, সাংবাদিক এবং প্রাবন্ধিক হিসেবে স্বনামধন্য হলেও অন্য কবির মতো সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা হতে রস আস্বাদন করার প্রচেষ্টা করেছেন শুধুমাত্র কাব্যরসে সিক্ত হতেই এবং কবিতার সে জারণরসে সিক্ত হয়েই কাব্যানুরাগ পাকাপোক্ত করে ফিরে এসেছেন; এবং আমৃত্যু কাব্য-ভাবনা নিয়েই ঊনসত্তর বছর বেঁচে থেকে ৬ এপ্রিল ২০১৭ তারিখ মৃত্যুবরণ করেন। 

সাযযাদ কাদির সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনেও আপাদমস্তক ছিলেন কবি। কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ, শিশুতোষ রচনা, গবেষণা, সম্পাদনা, সংকলন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।  শিক্ষা, শিল্প এবং সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় ৬০টির বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

কবি সাযযাদ কাদিরের কবিসত্তা, কাব্যানুরাগ, কাব্যভাবনা, কাব্যচর্চা, কাব্য-রচনার সময়কাল ও দশা (phase) সাপেক্ষে তাঁর কবিতার গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করাও সম্ভব হয়।

কবি সাযযাদ কাদিরের সাহিত্য-পথ বিচরণ বহুমুখী (versetail) ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। যেন বিশ্বকাব্য সাহিত্যের বরেণ্য অনেক কবির মতো তিনিও কিছুটা ভিন্নপথ ঘুরে এসেই ফের কবিতার বরপুত্র সম্মানে থিতু হয়েছেন কবিতায়। তাই বোধ করি, সকল পরিচয় ছাপিয়ে সাযযাদ কাদির কবি হিসেবেই সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রকাশিত হয়েছেন। সাহিত্য দরবারে যে ক’জন প্রথিতযশা কবি কবিতায় ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সফল হয়েছেন কিংবা ব্যর্থ হয়েছেন, কবি সাযযাদ কাদির তাঁদের-ই শামিল। তিনি অনেক আনন্দঘন পরিশ্রম করে তাঁর কবিতায় প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এ ধরনের কার্যক্রমকে ‘কাব্য-গবেষণা’ বলাই সমীচীন হবে। উপযুক্ত প্রমাণ হিসেবে তাঁর কবিতায় জ্যামিতিক কাঠামোর বিন্যাস চোখে পড়ার মতো বৈকি! 

কবি সাযযাদ কাদিরের কবিতার প্যাটার্ন লক্ষ্য করলে সহজেই প্রতিভাত হয় যে, তাঁর কাব্য-ভাবনা বরাবরই সুঠাম হলেও ঔদ্ধত্যপূণ নয় কোনভাবেই; বরং অত্যন্ত পরিশীলিত। সময়কাল বিবেচনায় প্রথমদিকে তাঁর লেখা কবিতা এবং মাঝের দিকে কিংবা শেষদিকে লেখা কবিতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম chronological ফারাক স্পষ্টত দৃশ্যমান। 



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত