সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বিদেশি সাহিত্য

সাদেক হেদায়েত: অকালে নক্ষত্রের পতন


ফজল হাসান
ফজল হাসান
প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

সাদেক হেদায়েত: অকালে নক্ষত্রের পতন
সাদেক হেদায়েত

‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’
                            — কবি জীবনানন্দ দাশ।

এই উক্তিটিতে নক্ষত্রের অস্থায়ী জীবনের সঙ্গে মানুষের সীমিত জীবনের তুলনা করা হয়েছে এবং জীবনযুদ্ধে পরাজিত একজনের বেদনার্ত কাহিনীর মাধ্যমে এই সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে যে, মৃত্যু সবার জন্য অবশ্যম্ভাবী। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও মৃত্যুকে অবশ্যম্ভাবীরূপে দেখানো হয়েছে। এছাড়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছেন, ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে২।’

মৃত্যু জীবনের অনিবার্য পরিণতি। আর তাই মানুষের দীর্ঘ জীবন এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যু হলে সেটা স্বাভাবিক নিয়ম হিসাবে গ্রহণ করা হয়। তবে যদি বিখ্যাত কারোর মৃত্যু হয় চল্লিশের কোঠায় এবং অস্বাভাবিক কারণে, তাহলে সেটা মেনে নেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।

ইরানি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, নাট্যকার এবং অনুবাদক সাদেক হেদায়েতের জীবনে ঘটেছে এমন অস্বাভাবিক ঘটনা। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তিনি আত্মঘাতী হন। তাঁকে ইরানের প্রথম আত্মঘাতী সাহিত্যিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

‘সাদেক হেদায়েত: অকালে নক্ষত্রের পতন’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো যেভাবে সাদেক হেদায়েত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর আলোচিত সম্ভাব্য কারণ, আত্মঘাতীর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতা এবং সাদেক হেদায়েতের সাহিত্য কর্মের নিষিদ্ধ করণ (সেন্সরশিপ) ও তাঁর উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি)।  তবে এসবের আগে লেখকের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া যাক। উল্লেখ্য, এই লেখায় লেখকের সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়নি, তবে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখযোগ্য রচনার কথা এসেছে।

সাদেক হেদায়েতের জীবন ও সাহিত্যকর্ম : সাদেক হেদায়েতের জন্ম ১৯০৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর ইরানের বিখ্যাত কবি এবং ইতিহাসবিদ রেজাকলি খান হেদায়েতের উত্তরসূরি। শৈশবে সাদেক হেদায়াত তেহরানের ফরাসি মিশনারি স্কুলে লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য, বিশেষ করে দন্ত চিকিৎসা এবং প্রকৌশল শাস্ত্র শিক্ষার জন্য তিনি বৃত্তি নিয়ে ফ্রান্সে যান এবং তা অসমাপ্ত রেখেই প্রাচীন পারস্য ও ইরানি পুরাণ অধ্যয়ন করার জন্য বেলজিয়ামে গমন করেন। কিন্তু সেখানেও পড়াশোনা সমাপ্ত না করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক বছর বসবাস করেন এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। এ সময় মোপাঁসা, কাফকা, এলান পোঁ এবং দস্তয়েভস্কির মতো বিখ্যাত লেখকদের লেখায় আসক্ত হন। এছাড়া একাকিত্বের সময় তিনি জীবন ও মৃত্যুর রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তায় মশগুল ছিলেন। জানা যায়, বিখ্যাত কবি রাইনের মারিয়া রিলকের মৃত্যু তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করেছিল।

যাহোক, একসময় স্কলারশিপ ফেরত দিয়ে সাদেক হেদায়েত তেহরানে ফিরে আসেন এবং প্রথম ছোটগল্প সংকলন বেরিড অ্যালাইভ (১৯৩০) প্রকাশ করেন। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের পরপরই তিনি তৎকালীন ইরানের স্বনামধন্য এবং প্রতিষ্ঠিত লেখকদের নজর কাড়তে সক্ষম হন। তিনি ১৯৩৬ সালে ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণে বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) যান। সেখানে এক বছরের বেশি সময় অবস্থান করে পুনরায় তেহরানে ফিরে আসেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

সাদেক হেদায়েতের সাহিত্য জীবনের পরিধি মূলত ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত। সেই সময়ে তিনি ফরাসি সাহিত্য এবং শিল্পকলার আধুনিকতার ধারা প্রবর্তন করে ইরানের ফার্সি গদ্য সাহিত্যে, বিশেষ করে ছোটগল্পে, আমূল পরিবর্তন আনেন এবং ইরানের প্রথম আধুনিকতাবাদী কথাসাহিত্যিকদের একজন হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সাদেক হেদায়েতের বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন ‘থ্রী ড্রপস্ অফ ব্লাড’ (১৯৩২) এবং সফল উপন্যাস ‘ব্লাইন্ড আউল’ (১৯৩৭)। উল্লেখ্য, ‘ব্লাইন্ড আউল’কে ফারসি সাহিত্যের ‘মাস্টারপিস’ হিসাবে ধরা হয়। এ গ্রন্থ দু’টি মাতৃভূমি ইরান ছাড়াও ইউরোপ ও আমেরিকায় উচ্চ প্রশংসিত এবং অনূদিত হয়েছে। ‘থ্রী ড্রপস্ অফ ব্লাড’ গল্পের কাহিনী অবলম্বনে ১৯৭০ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। এছাড়া দ্য স্ট্রে ডগ (১৯৪২) এবং হাজী আকা (১৯৪৫) তাঁর অন্য দু’টি ছোটগল্প সংকলন। বলা হয়, তাঁর গল্পগুলো মূলত সমালোচনামূলক বাস্তববাদের শৈলীতে লেখা হয়েছে। আর তাই আধুনিকতাবাদী ও অবাস্তববাদী বিভিন্ন কলা-কৌশল পারস্য কথাসাহিত্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কারণে তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাঁকে ‘বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ইরানিয়ান লেখক’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও তাঁকে ‘আধুনিক ইরানিয়ান সাহিত্যের জনক’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মৌলিক রচনা ছাড়াও সাদেক হেদায়েত ফরাসি ভাষায় লেখা এবং অনূদিত বেশ কয়েকজন বিশ্ববিখ্যাত লেখকের উপন্যাস অনুবাদ করেন। সেগুলোর মধ্যে আন্তন চেকভের ‘গুজবেরিজ’, ফ্রানৎস কাফকার ‘ইন দ্য পেনাল কলোনি’, ‘বিফোর দ্য ল’ ও ‘দি মেটামরফোসিস” (হাসান কায়েমিয়ানের সঙ্গে) এবং জাঁ-পল সার্ত্রের ‘দ্য ওয়াল’ উল্লেখযোগ্য। ইস্পাহান: হাফ অব দ্য ওয়ার্ল্ড শিরোনামে তাঁর একটি ভ্রমণ গল্প গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

মাত্র ৪৮ বছর বয়সে সাদেক হেদায়েত ১৯৫১ সালে প্যারিসে আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে তাঁকে প্যারিসের প্যার লাশেজ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

যেভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন সাদেক হেদায়েত: সাদেক হেদায়েত চরম হতাশা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার আশায় ১৯৫১ সালের গোড়ার দিকে তেহরান ছেড়ে প্যারিসে পাড়ি জমান এবং সেখানে তিনি একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন। সেই একই বছরের ৪ এপ্রিল তিনি তাঁর ভাড়া করা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নেন। প্রথমে তিনি ঘরের প্রতিটি ফাটল তোয়ালে দিয়ে বন্ধ করেন এবং দরজা ও জানালা এমনভাবে লাগিয়েছিলেন, যেন কিছুতেই গ্যাস (বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড) ঘরের বাইরে যেতে না পারে। তারপর তিনি গ্যাসের ভালভ খুলে দেন, যাতে তিনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় সমস্ত কষ্ট, হতাশা আর আঘাত থেকে মুক্তি পান। দু’দিন পর পুলিশ তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করে। তাঁর মৃতদেহের পাশে বন্ধু ও সতীর্থদের উদ্দেশ্য করে লেখা একটা চিরকুট (সুইসাইড নোট) পাওয়া গিয়েছে এবং তাতে লেখা ছিল, ‘আমি চলে গেলাম এবং তোমাদের হৃদয় ভেঙে ফেললাম। এটুকুই।’

জানা যায়, ১৯২৮ সালে সাদেক হেদায়েত প্রথমবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেবার তিনি নিজেকে মার্ন নদীতে (প্যারিসের পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এলাকায় সেইন নদীর একটি পূর্বদিকের উপনদী) ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কিন্তু আশপাশের উপস্থিত লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে। যদিও সেই যাত্রায় তিনি বেঁচে যান, তবে তাঁর মধ্যে পরম শান্তি লাভের জন্য আত্মহননের যে প্রলোভন ছিল, তা তাঁকে পুরোপুরি ছাড়েনি এবং দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় তিনি সফল হন। উল্লেখ্য, তাঁর মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি তাঁর সমস্ত অপ্রকাশিত লেখা ছিঁড়ে ফেলেন।

সাদেক হেদায়েতের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পরে ইংরেজ কবি জন হিথ-স্টাবস৩ ১৯৫৪ সালে ‘আ চর্ম এগেইনস্ট দ্য টুথঅ্যাক’ কাব্যগ্রন্থে ‘এ ক্যাসিদা ফর সাদেক হেদায়াত’ শিরোনামে একটি শোককবিতা প্রকাশ করেছিলেন।

সাদেক হেদায়েতের আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ: সাদেক হেদায়াতের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর থেকে তাঁর আত্মহত্যা আলোচনা এবং বিশ্লেষণের একটি বিষয় হয়ে উঠেছিল। কারণ তাঁর আত্মঘাতীর বিষয়টি ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমস্যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব এবং আত্মহনন সংক্রান্ত সম্ভাবনার বিষয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে তাঁর আত্মহত্যার সঠিক কারণ এখনও সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে, দার্শনিক বিশ্বাস এবং তাঁর সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সাদেক হেদায়েতের মধ্যে হতাশার জন্ম হয়েছিল। তাঁরা যুক্তি দেন যে, মৃত্যুর বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা, যা তাঁর প্রায় সকল লেখায় বারবার উঠে এসেছে, তাঁর জীবনের হতাশা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ‘দ্য ব্লাইন্ড আউল’ উপন্যাস তিনি শুরু করেছেন এভাবে, ‘জীবনে ক্ষতের মতো কিছু হতাশা আর দুঃখ-বেদনা থাকে, যা একাকীত্বকে ধুঁকে ধুঁকে জ্বালায় এবং ক্রমশ নিঃশেষ করে।’ তাই হয়তো সমালোচক তাঁর জীবনের সত্য এবং তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন না। যেমন তিনি বলেছেন, ‘একমাত্র মৃত্যু কখনও মিথ্যা বলে না!’

অন্যদিকে অনেকে মনে করেন যে, সাদেক হেদায়েতের ব্যক্তিগত বিষণ্নতা এবং জীবনের অনর্থকতার অনুভূতি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেপথ্যে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। কেননা এক সময় তিনি মদ্যপান এবং মাদকদ্রব্যে আশ্রয় খুঁজেছিলেন।

যদিও সাদেক হেদায়েতের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুকে ফরাসি পুলিশ আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করেছিল, কিন্তু কয়েকজন বন্ধু এবং পরবর্তীতে গবেষকরা সরকারি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, যেখানে তাঁরা অসঙ্গতি এবং অনুপস্থিত কাগজপত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া এমনও অনেকে রয়েছেন যারা মনে করেন যে, সাদেক হেদায়েতের আত্মহত্যার পেছনে তাঁর সময়ের বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য অবদান রেখেছিল, যেমন সংবিধানিক বিপ্লব (১৯০৫-১৯১১), যা রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত করতে এবং রাষ্ট্রকে আধুনিকীকরণের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল; আধুনিকীকরণকারী ও কর্তৃত্ববাদী রেজা শাহের উত্থান (১৯২৫-১৯৪১); এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪১-১৯৪৫), যখন ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী ইরান দখল করেছিল। ইরানের বিশিষ্ট মনোবিশ্লেষক এবং লেখক মোহাম্মদ সানাতি সাদেক হেদায়াতের বিষণ্নতার পেছনে উদ্দীপনা নিয়ে গবেষণা করে দেখেন যে, সাদেক হেদায়েতের ব্যক্তিত্বের বৌদ্ধিক এবং আধুনিক দিকগুলোর সঙ্গে তাঁর সময়ের প্রচলিত সমাজের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য ছিল।

এছাড়া সাদেক হেদায়েতের ছিল আর্থিক সমস্যা, গ্রন্থ প্রকাশের জন্য সংগ্রাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংকটপূর্ণ সমাজ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাঁর সম্প্রদায়ের অজ্ঞতা ও সরলতার ধারণা। তাঁর বিদ্রূপাত্মক লেখার ধরন এবং হাস্যকর, এমনকি আশাবাদী মনোভাব থাকা সত্ত্বেও, গ্রন্থ প্রকাশের উপায় খুঁজতে ইরান ছেড়ে প্যারিস যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করেছিল। ইউরোপে বসবাস করার সময় বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল ফ্রান্সে বসবাসের বৈধ অনুমতি পাওয়া, কিংবা সুইজারল্যান্ডে ভিসা প্রাপ্তি এবং এমনকি লন্ডনে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাঁর কোনো চাকরি ছিল না, এমনকি চাকরি করার অনুমতিও ছিল না, যা তাঁকে ইউরোপে থাকার সুযোগ দিবে। তাঁর কাছে যে পরিমাণ অর্থকড়ি ছিল, তা দিয়ে তিনি সাময়িকভাবে অল্প কয়েক দিন থাকতে পারতেন। এছাড়া কয়েকজন তাঁর পরিচিত লোকজন ও বন্ধু ৭ মার্চ ১৯৫১-এ তেহরানে তাঁর ভগ্নিপতি প্রধানমন্ত্রী হাজী আলি রজমারা (১৯০১-১৯৫১) হত্যার পর তাঁকে উপেক্ষা করতে শুরু করে এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। আর তাই তিনি সেই সমাজে, অর্থাৎ তেহরানে, ফিরে যেতে চাননি। কেননা সেখান থেকে তিনি ফ্রান্সে পালিয়ে এসেছেন। অবশেষে চুপচাপ থাকা এবং নিজেকে আলাদা করে রাখা অথবা সমাজকে তাচ্ছিল্য করার পরিবর্তে তিনি তাঁর হতাশাগ্রস্ত এবং অনিশ্চিত জীবন শেষ করার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

তবে আজও একটি প্রশ্ন গবেষক এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে বারবার ফিরে আসছে। সাদেক হেদায়াতের মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখকের গভীর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা, তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তীব্র ও তেজদীপ্ত লেখনী শক্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি হঠাৎ কেন আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেবেন? অথচ জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি জীবনের কঠিন সময়ের সম্মুখীন হওয়ার মতো অনভিজ্ঞ যুবক ছিলেন না। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জীবন, মৃত্যু এবং পরকাল নিয়ে সম্পূর্ণ পরিচিত। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, তিনি প্রতিটি কাহিনীকে যৌক্তিক এবং চূড়ান্ত সমাপ্তিতে পৌঁছে দেখার জন্য নিবেদিত ছিলেন। আত্মহত্যা যৌক্তিক এবং চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়।

উল্লেখ্য, কেজার রাজতন্ত্রের শাসনামলের গোপন নথিপত্র শেষ পর্যন্ত জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। হয়তো একদিন পাহলভি রাজত্বের গোপন নথিপত্র প্রকাশিত হবে। আর তখনই হয়তো সাদেক হেদায়াতের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।

সাদেক হেদায়েতের সাহিত্যকর্মের নিষিদ্ধ করণ (সেন্সরশিপ) ও তাঁর উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি): ইরানে সাদেক হেদায়াতের সাহিত্যকর্ম পাহলভি রাজতন্ত্র এবং ইসলামিক রিপাবলিক উভয় শাসন আমলে নিষিদ্ধ ছিল। রাজতন্ত্র তাঁকে ‘নিহিলিজম’৪ এবং অবিশ্বাসের জন্য অপরাধী হিসাবে সাব্যস্ত করেছিল; অন্যদিকে ইসলামিক রিপাবলিক তাঁকে ধৃষ্টতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য দোষারোপ করেছিল। জানা যায়, এমন বৈরী পরিবেশে দ্য ব্লাইন্ড আউল মাইমোগ্রাফ কপি করে অত্যন্ত গোপনে প্রচারিত হয়েছিল এবং শিক্ষার্থী ও চিন্তাবিদদের মধ্য দিয়ে এক হাত থেকে অন্য হাতে পৌঁছাত। সেই সেন্সরশিপের মধ্যেও তাঁর সাহিত্যকর্ম বেঁচে ছিল। এছাড়া তাঁকে চুপ করানোর প্রতিটি সরকারি প্রচেষ্টার কারণে নতুন এক প্রজন্ম তাঁর সাহিত্যকে আবিষ্কার করেছিল, যার প্রমাণ হলো যে, তাঁর বিদ্রোহ প্রতিটি শাসন ব্যবস্থাকে অতিক্রম করেছে।

সাদেক হেদায়াতের উত্তরাধিকার ইরানি সাহিত্যে গভীর প্রভাব এবং পারস্য কথাসাহিত্যে আধুনিকতাবাদী কৌশলে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য অত্যন্ত পরিচিত। তাঁর একাধিক গ্রন্থ, যেমন দ্য ব্লাইন্ড আউল এবং থ্রী ড্রপস্ অফ ব্লাড, মানসিক গভীরতা এবং বিশেষ করে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

শুধু স্বদেশেই নয়, সাদেক হেদায়াতের প্রভাব ইরানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, তাঁর একাধিক গ্রন্থ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে পাঠকদের মধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে, বিশেষ করে ফ্রান্সে। ফরাসি সমালোচকেরা তাঁকে ‘বিরল অ-পশ্চিমা (নন-ওয়েস্টার্ন) আধুনিকতাবাদী লেখক’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন যে, তাঁর গদ্য ইউরোপীয় সাহিত্যিকদের সঙ্গে সমানভাবে আলোচিত এবং সমালোচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এছাড়া বর্তমানে প্যারিস এবং লায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক আধুনিকতাবাদের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসাবে তাঁর সাহিত্যকর্ম পড়ানো হয়।

পরিশেষে বলা যায়, মানব অস্তিত্বের জটিলতা অন্বেষণে সাদেক হেদায়াতের গভীর নেশা এবং তাঁর সময়ের সামাজিক নিয়মের প্রতি কঠোর সমালোচনা তাঁকে সাহিত্য জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসাবে স্থায়ী আসনে স্থান দিয়েছে।

শেষকথা : যদিও সাদেক হেদায়াতের স্বেচ্ছামৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও কিছুটা রহস্যময়ই থেকে গেছে, তবে অস্বাভাবিক মৃত্যুর পঁচাত্তর বছর পরেও তাঁর জীবন এবং আত্মহননের উদ্দেশ্য তাঁর প্রভাববিস্তারী সাহিত্যকর্মের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবন কেটেছে দুঃখ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাই হয়তো নিজেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সম্ভবত এটি সেই মহার্ঘ সাহিত্যসম্ভার, যা তিনি মানব জাতির জন্য রেখে গেছেন। এ কথা সত্যি যে, মৃত্যুর এত বছর পরেও তিনি ইরানের জনগণের কাছে ‘ইরানিয়ান জাতীয়তার অন্যতম প্রধান প্রতীক’ হিসাবে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

টীকা:

১ কবিতার নাম: বঙ্গভূমির প্রতি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

২ পুরো নাম জন ফ্রান্সিস আলেকজান্ডার হিথ-স্টাবস (১৯১৮-২০০৬)। তিনি একজন ইংরেজ কবি এবং অনুবাদক ছিলেন।

৩ নিহিলিজম— দর্শনের মধ্যে মতামতের বিশেষ এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, যা মানব অস্তিত্বের সাধারণভাবে গৃহীত অথবা মৌলিক বিষয়গুলোকে, যেমন জ্ঞান বা নৈতিকতা, প্রত্যাখ্যান করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বর্তমান প্রবন্ধ লেখার জন্য অসংখ্য গবেষণাপত্র ও রচনা, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধ এবং মনস্তাত্ত্বিক জার্নাল ও অনলাইন ম্যাগাজিনের বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করেছি। আমি সমস্ত লেখকদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬


সাদেক হেদায়েত: অকালে নক্ষত্রের পতন

প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

‘নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়’
                            — কবি জীবনানন্দ দাশ।

এই উক্তিটিতে নক্ষত্রের অস্থায়ী জীবনের সঙ্গে মানুষের সীমিত জীবনের তুলনা করা হয়েছে এবং জীবনযুদ্ধে পরাজিত একজনের বেদনার্ত কাহিনীর মাধ্যমে এই সত্যটি তুলে ধরা হয়েছে যে, মৃত্যু সবার জন্য অবশ্যম্ভাবী। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও মৃত্যুকে অবশ্যম্ভাবীরূপে দেখানো হয়েছে। এছাড়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছেন, ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে২।’

মৃত্যু জীবনের অনিবার্য পরিণতি। আর তাই মানুষের দীর্ঘ জীবন এবং প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যু হলে সেটা স্বাভাবিক নিয়ম হিসাবে গ্রহণ করা হয়। তবে যদি বিখ্যাত কারোর মৃত্যু হয় চল্লিশের কোঠায় এবং অস্বাভাবিক কারণে, তাহলে সেটা মেনে নেওয়া খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।

ইরানি ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প লেখক, নাট্যকার এবং অনুবাদক সাদেক হেদায়েতের জীবনে ঘটেছে এমন অস্বাভাবিক ঘটনা। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তিনি আত্মঘাতী হন। তাঁকে ইরানের প্রথম আত্মঘাতী সাহিত্যিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

‘সাদেক হেদায়েত: অকালে নক্ষত্রের পতন’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো যেভাবে সাদেক হেদায়েত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর আলোচিত সম্ভাব্য কারণ, আত্মঘাতীর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতা এবং সাদেক হেদায়েতের সাহিত্য কর্মের নিষিদ্ধ করণ (সেন্সরশিপ) ও তাঁর উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি)।  তবে এসবের আগে লেখকের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া যাক। উল্লেখ্য, এই লেখায় লেখকের সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়নি, তবে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখযোগ্য রচনার কথা এসেছে।

সাদেক হেদায়েতের জীবন ও সাহিত্যকর্ম : সাদেক হেদায়েতের জন্ম ১৯০৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর ইরানের বিখ্যাত কবি এবং ইতিহাসবিদ রেজাকলি খান হেদায়েতের উত্তরসূরি। শৈশবে সাদেক হেদায়াত তেহরানের ফরাসি মিশনারি স্কুলে লেখাপড়া করেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষার জন্য, বিশেষ করে দন্ত চিকিৎসা এবং প্রকৌশল শাস্ত্র শিক্ষার জন্য তিনি বৃত্তি নিয়ে ফ্রান্সে যান এবং তা অসমাপ্ত রেখেই প্রাচীন পারস্য ও ইরানি পুরাণ অধ্যয়ন করার জন্য বেলজিয়ামে গমন করেন। কিন্তু সেখানেও পড়াশোনা সমাপ্ত না করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক বছর বসবাস করেন এবং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। এ সময় মোপাঁসা, কাফকা, এলান পোঁ এবং দস্তয়েভস্কির মতো বিখ্যাত লেখকদের লেখায় আসক্ত হন। এছাড়া একাকিত্বের সময় তিনি জীবন ও মৃত্যুর রহস্য নিয়ে গভীর চিন্তায় মশগুল ছিলেন। জানা যায়, বিখ্যাত কবি রাইনের মারিয়া রিলকের মৃত্যু তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করেছিল।

যাহোক, একসময় স্কলারশিপ ফেরত দিয়ে সাদেক হেদায়েত তেহরানে ফিরে আসেন এবং প্রথম ছোটগল্প সংকলন বেরিড অ্যালাইভ (১৯৩০) প্রকাশ করেন। প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের পরপরই তিনি তৎকালীন ইরানের স্বনামধন্য এবং প্রতিষ্ঠিত লেখকদের নজর কাড়তে সক্ষম হন। তিনি ১৯৩৬ সালে ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণে বোম্বে (বর্তমানে মুম্বাই) যান। সেখানে এক বছরের বেশি সময় অবস্থান করে পুনরায় তেহরানে ফিরে আসেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

সাদেক হেদায়েতের সাহিত্য জীবনের পরিধি মূলত ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত। সেই সময়ে তিনি ফরাসি সাহিত্য এবং শিল্পকলার আধুনিকতার ধারা প্রবর্তন করে ইরানের ফার্সি গদ্য সাহিত্যে, বিশেষ করে ছোটগল্পে, আমূল পরিবর্তন আনেন এবং ইরানের প্রথম আধুনিকতাবাদী কথাসাহিত্যিকদের একজন হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

সাদেক হেদায়েতের বিখ্যাত ছোটগল্প সংকলন ‘থ্রী ড্রপস্ অফ ব্লাড’ (১৯৩২) এবং সফল উপন্যাস ‘ব্লাইন্ড আউল’ (১৯৩৭)। উল্লেখ্য, ‘ব্লাইন্ড আউল’কে ফারসি সাহিত্যের ‘মাস্টারপিস’ হিসাবে ধরা হয়। এ গ্রন্থ দু’টি মাতৃভূমি ইরান ছাড়াও ইউরোপ ও আমেরিকায় উচ্চ প্রশংসিত এবং অনূদিত হয়েছে। ‘থ্রী ড্রপস্ অফ ব্লাড’ গল্পের কাহিনী অবলম্বনে ১৯৭০ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। এছাড়া দ্য স্ট্রে ডগ (১৯৪২) এবং হাজী আকা (১৯৪৫) তাঁর অন্য দু’টি ছোটগল্প সংকলন। বলা হয়, তাঁর গল্পগুলো মূলত সমালোচনামূলক বাস্তববাদের শৈলীতে লেখা হয়েছে। আর তাই আধুনিকতাবাদী ও অবাস্তববাদী বিভিন্ন কলা-কৌশল পারস্য কথাসাহিত্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কারণে তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাঁকে ‘বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ইরানিয়ান লেখক’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়াও তাঁকে ‘আধুনিক ইরানিয়ান সাহিত্যের জনক’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

মৌলিক রচনা ছাড়াও সাদেক হেদায়েত ফরাসি ভাষায় লেখা এবং অনূদিত বেশ কয়েকজন বিশ্ববিখ্যাত লেখকের উপন্যাস অনুবাদ করেন। সেগুলোর মধ্যে আন্তন চেকভের ‘গুজবেরিজ’, ফ্রানৎস কাফকার ‘ইন দ্য পেনাল কলোনি’, ‘বিফোর দ্য ল’ ও ‘দি মেটামরফোসিস” (হাসান কায়েমিয়ানের সঙ্গে) এবং জাঁ-পল সার্ত্রের ‘দ্য ওয়াল’ উল্লেখযোগ্য। ইস্পাহান: হাফ অব দ্য ওয়ার্ল্ড শিরোনামে তাঁর একটি ভ্রমণ গল্প গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

মাত্র ৪৮ বছর বয়সে সাদেক হেদায়েত ১৯৫১ সালে প্যারিসে আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে তাঁকে প্যারিসের প্যার লাশেজ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

যেভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন সাদেক হেদায়েত: সাদেক হেদায়েত চরম হতাশা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার আশায় ১৯৫১ সালের গোড়ার দিকে তেহরান ছেড়ে প্যারিসে পাড়ি জমান এবং সেখানে তিনি একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন। সেই একই বছরের ৪ এপ্রিল তিনি তাঁর ভাড়া করা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে স্বেচ্ছামৃত্যুকে বেছে নেন। প্রথমে তিনি ঘরের প্রতিটি ফাটল তোয়ালে দিয়ে বন্ধ করেন এবং দরজা ও জানালা এমনভাবে লাগিয়েছিলেন, যেন কিছুতেই গ্যাস (বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড) ঘরের বাইরে যেতে না পারে। তারপর তিনি গ্যাসের ভালভ খুলে দেন, যাতে তিনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় সমস্ত কষ্ট, হতাশা আর আঘাত থেকে মুক্তি পান। দু’দিন পর পুলিশ তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করে। তাঁর মৃতদেহের পাশে বন্ধু ও সতীর্থদের উদ্দেশ্য করে লেখা একটা চিরকুট (সুইসাইড নোট) পাওয়া গিয়েছে এবং তাতে লেখা ছিল, ‘আমি চলে গেলাম এবং তোমাদের হৃদয় ভেঙে ফেললাম। এটুকুই।’

জানা যায়, ১৯২৮ সালে সাদেক হেদায়েত প্রথমবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেবার তিনি নিজেকে মার্ন নদীতে (প্যারিসের পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব এলাকায় সেইন নদীর একটি পূর্বদিকের উপনদী) ঝাঁপ দিয়েছিলেন, কিন্তু আশপাশের উপস্থিত লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে। যদিও সেই যাত্রায় তিনি বেঁচে যান, তবে তাঁর মধ্যে পরম শান্তি লাভের জন্য আত্মহননের যে প্রলোভন ছিল, তা তাঁকে পুরোপুরি ছাড়েনি এবং দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় তিনি সফল হন। উল্লেখ্য, তাঁর মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি তাঁর সমস্ত অপ্রকাশিত লেখা ছিঁড়ে ফেলেন।

সাদেক হেদায়েতের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পরে ইংরেজ কবি জন হিথ-স্টাবস৩ ১৯৫৪ সালে ‘আ চর্ম এগেইনস্ট দ্য টুথঅ্যাক’ কাব্যগ্রন্থে ‘এ ক্যাসিদা ফর সাদেক হেদায়াত’ শিরোনামে একটি শোককবিতা প্রকাশ করেছিলেন।

সাদেক হেদায়েতের আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ: সাদেক হেদায়াতের অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর থেকে তাঁর আত্মহত্যা আলোচনা এবং বিশ্লেষণের একটি বিষয় হয়ে উঠেছিল। কারণ তাঁর আত্মঘাতীর বিষয়টি ব্যক্তিগত ও সামাজিক সমস্যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব এবং আত্মহনন সংক্রান্ত সম্ভাবনার বিষয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে তাঁর আত্মহত্যার সঠিক কারণ এখনও সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি।

কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে, দার্শনিক বিশ্বাস এবং তাঁর সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সাদেক হেদায়েতের মধ্যে হতাশার জন্ম হয়েছিল। তাঁরা যুক্তি দেন যে, মৃত্যুর বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা, যা তাঁর প্রায় সকল লেখায় বারবার উঠে এসেছে, তাঁর জীবনের হতাশা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ‘দ্য ব্লাইন্ড আউল’ উপন্যাস তিনি শুরু করেছেন এভাবে, ‘জীবনে ক্ষতের মতো কিছু হতাশা আর দুঃখ-বেদনা থাকে, যা একাকীত্বকে ধুঁকে ধুঁকে জ্বালায় এবং ক্রমশ নিঃশেষ করে।’ তাই হয়তো সমালোচক তাঁর জীবনের সত্য এবং তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন না। যেমন তিনি বলেছেন, ‘একমাত্র মৃত্যু কখনও মিথ্যা বলে না!’

অন্যদিকে অনেকে মনে করেন যে, সাদেক হেদায়েতের ব্যক্তিগত বিষণ্নতা এবং জীবনের অনর্থকতার অনুভূতি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেপথ্যে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। কেননা এক সময় তিনি মদ্যপান এবং মাদকদ্রব্যে আশ্রয় খুঁজেছিলেন।

যদিও সাদেক হেদায়েতের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুকে ফরাসি পুলিশ আত্মহত্যা বলে ঘোষণা করেছিল, কিন্তু কয়েকজন বন্ধু এবং পরবর্তীতে গবেষকরা সরকারি প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, যেখানে তাঁরা অসঙ্গতি এবং অনুপস্থিত কাগজপত্রের কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া এমনও অনেকে রয়েছেন যারা মনে করেন যে, সাদেক হেদায়েতের আত্মহত্যার পেছনে তাঁর সময়ের বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য অবদান রেখেছিল, যেমন সংবিধানিক বিপ্লব (১৯০৫-১৯১১), যা রাজতন্ত্রের ক্ষমতা সীমিত করতে এবং রাষ্ট্রকে আধুনিকীকরণের উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল; আধুনিকীকরণকারী ও কর্তৃত্ববাদী রেজা শাহের উত্থান (১৯২৫-১৯৪১); এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪১-১৯৪৫), যখন ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী ইরান দখল করেছিল। ইরানের বিশিষ্ট মনোবিশ্লেষক এবং লেখক মোহাম্মদ সানাতি সাদেক হেদায়াতের বিষণ্নতার পেছনে উদ্দীপনা নিয়ে গবেষণা করে দেখেন যে, সাদেক হেদায়েতের ব্যক্তিত্বের বৌদ্ধিক এবং আধুনিক দিকগুলোর সঙ্গে তাঁর সময়ের প্রচলিত সমাজের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য ছিল।

এছাড়া সাদেক হেদায়েতের ছিল আর্থিক সমস্যা, গ্রন্থ প্রকাশের জন্য সংগ্রাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংকটপূর্ণ সমাজ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাঁর সম্প্রদায়ের অজ্ঞতা ও সরলতার ধারণা। তাঁর বিদ্রূপাত্মক লেখার ধরন এবং হাস্যকর, এমনকি আশাবাদী মনোভাব থাকা সত্ত্বেও, গ্রন্থ প্রকাশের উপায় খুঁজতে ইরান ছেড়ে প্যারিস যাওয়ার জন্য প্ররোচিত করেছিল। ইউরোপে বসবাস করার সময় বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল ফ্রান্সে বসবাসের বৈধ অনুমতি পাওয়া, কিংবা সুইজারল্যান্ডে ভিসা প্রাপ্তি এবং এমনকি লন্ডনে যাওয়ার সম্ভাবনা। তাঁর কোনো চাকরি ছিল না, এমনকি চাকরি করার অনুমতিও ছিল না, যা তাঁকে ইউরোপে থাকার সুযোগ দিবে। তাঁর কাছে যে পরিমাণ অর্থকড়ি ছিল, তা দিয়ে তিনি সাময়িকভাবে অল্প কয়েক দিন থাকতে পারতেন। এছাড়া কয়েকজন তাঁর পরিচিত লোকজন ও বন্ধু ৭ মার্চ ১৯৫১-এ তেহরানে তাঁর ভগ্নিপতি প্রধানমন্ত্রী হাজী আলি রজমারা (১৯০১-১৯৫১) হত্যার পর তাঁকে উপেক্ষা করতে শুরু করে এবং তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। আর তাই তিনি সেই সমাজে, অর্থাৎ তেহরানে, ফিরে যেতে চাননি। কেননা সেখান থেকে তিনি ফ্রান্সে পালিয়ে এসেছেন। অবশেষে চুপচাপ থাকা এবং নিজেকে আলাদা করে রাখা অথবা সমাজকে তাচ্ছিল্য করার পরিবর্তে তিনি তাঁর হতাশাগ্রস্ত এবং অনিশ্চিত জীবন শেষ করার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

তবে আজও একটি প্রশ্ন গবেষক এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে বারবার ফিরে আসছে। সাদেক হেদায়াতের মতো একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখকের গভীর জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা, তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তীব্র ও তেজদীপ্ত লেখনী শক্তি থাকা সত্ত্বেও তিনি হঠাৎ কেন আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেবেন? অথচ জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি জীবনের কঠিন সময়ের সম্মুখীন হওয়ার মতো অনভিজ্ঞ যুবক ছিলেন না। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জীবন, মৃত্যু এবং পরকাল নিয়ে সম্পূর্ণ পরিচিত। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, তিনি প্রতিটি কাহিনীকে যৌক্তিক এবং চূড়ান্ত সমাপ্তিতে পৌঁছে দেখার জন্য নিবেদিত ছিলেন। আত্মহত্যা যৌক্তিক এবং চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়।

উল্লেখ্য, কেজার রাজতন্ত্রের শাসনামলের গোপন নথিপত্র শেষ পর্যন্ত জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। হয়তো একদিন পাহলভি রাজত্বের গোপন নথিপত্র প্রকাশিত হবে। আর তখনই হয়তো সাদেক হেদায়াতের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর আসল কারণ জানা যাবে।

সাদেক হেদায়েতের সাহিত্যকর্মের নিষিদ্ধ করণ (সেন্সরশিপ) ও তাঁর উত্তরাধিকার (লেগ্যাসি): ইরানে সাদেক হেদায়াতের সাহিত্যকর্ম পাহলভি রাজতন্ত্র এবং ইসলামিক রিপাবলিক উভয় শাসন আমলে নিষিদ্ধ ছিল। রাজতন্ত্র তাঁকে ‘নিহিলিজম’৪ এবং অবিশ্বাসের জন্য অপরাধী হিসাবে সাব্যস্ত করেছিল; অন্যদিকে ইসলামিক রিপাবলিক তাঁকে ধৃষ্টতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য দোষারোপ করেছিল। জানা যায়, এমন বৈরী পরিবেশে দ্য ব্লাইন্ড আউল মাইমোগ্রাফ কপি করে অত্যন্ত গোপনে প্রচারিত হয়েছিল এবং শিক্ষার্থী ও চিন্তাবিদদের মধ্য দিয়ে এক হাত থেকে অন্য হাতে পৌঁছাত। সেই সেন্সরশিপের মধ্যেও তাঁর সাহিত্যকর্ম বেঁচে ছিল। এছাড়া তাঁকে চুপ করানোর প্রতিটি সরকারি প্রচেষ্টার কারণে নতুন এক প্রজন্ম তাঁর সাহিত্যকে আবিষ্কার করেছিল, যার প্রমাণ হলো যে, তাঁর বিদ্রোহ প্রতিটি শাসন ব্যবস্থাকে অতিক্রম করেছে।

সাদেক হেদায়াতের উত্তরাধিকার ইরানি সাহিত্যে গভীর প্রভাব এবং পারস্য কথাসাহিত্যে আধুনিকতাবাদী কৌশলে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য অত্যন্ত পরিচিত। তাঁর একাধিক গ্রন্থ, যেমন দ্য ব্লাইন্ড আউল এবং থ্রী ড্রপস্ অফ ব্লাড, মানসিক গভীরতা এবং বিশেষ করে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

শুধু স্বদেশেই নয়, সাদেক হেদায়াতের প্রভাব ইরানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, তাঁর একাধিক গ্রন্থ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনে পাঠকদের মধ্যে পরিচিতি লাভ করেছে, বিশেষ করে ফ্রান্সে। ফরাসি সমালোচকেরা তাঁকে ‘বিরল অ-পশ্চিমা (নন-ওয়েস্টার্ন) আধুনিকতাবাদী লেখক’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং মন্তব্য করেছিলেন যে, তাঁর গদ্য ইউরোপীয় সাহিত্যিকদের সঙ্গে সমানভাবে আলোচিত এবং সমালোচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। এছাড়া বর্তমানে প্যারিস এবং লায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক আধুনিকতাবাদের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসাবে তাঁর সাহিত্যকর্ম পড়ানো হয়।

পরিশেষে বলা যায়, মানব অস্তিত্বের জটিলতা অন্বেষণে সাদেক হেদায়াতের গভীর নেশা এবং তাঁর সময়ের সামাজিক নিয়মের প্রতি কঠোর সমালোচনা তাঁকে সাহিত্য জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসাবে স্থায়ী আসনে স্থান দিয়েছে।

শেষকথা : যদিও সাদেক হেদায়াতের স্বেচ্ছামৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও কিছুটা রহস্যময়ই থেকে গেছে, তবে অস্বাভাবিক মৃত্যুর পঁচাত্তর বছর পরেও তাঁর জীবন এবং আত্মহননের উদ্দেশ্য তাঁর প্রভাববিস্তারী সাহিত্যকর্মের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবন কেটেছে দুঃখ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। তাই হয়তো নিজেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। সম্ভবত এটি সেই মহার্ঘ সাহিত্যসম্ভার, যা তিনি মানব জাতির জন্য রেখে গেছেন। এ কথা সত্যি যে, মৃত্যুর এত বছর পরেও তিনি ইরানের জনগণের কাছে ‘ইরানিয়ান জাতীয়তার অন্যতম প্রধান প্রতীক’ হিসাবে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

টীকা:

১ কবিতার নাম: বঙ্গভূমির প্রতি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

২ পুরো নাম জন ফ্রান্সিস আলেকজান্ডার হিথ-স্টাবস (১৯১৮-২০০৬)। তিনি একজন ইংরেজ কবি এবং অনুবাদক ছিলেন।

৩ নিহিলিজম— দর্শনের মধ্যে মতামতের বিশেষ এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি, যা মানব অস্তিত্বের সাধারণভাবে গৃহীত অথবা মৌলিক বিষয়গুলোকে, যেমন জ্ঞান বা নৈতিকতা, প্রত্যাখ্যান করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: বর্তমান প্রবন্ধ লেখার জন্য অসংখ্য গবেষণাপত্র ও রচনা, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধ এবং মনস্তাত্ত্বিক জার্নাল ও অনলাইন ম্যাগাজিনের বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করেছি। আমি সমস্ত লেখকদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত