বাংলাদেশে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হাম আবারও জন¯^াস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে| সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে টেকসই সাফল্য সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে এ রোগের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে| ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত তিন-চার সপ্তাহে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১০০ শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি|
দেশের ৫৬টি জেলায় ৭,৫০০-এর বেশি শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে, যার অধিকাংশ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে| এ পরিস্থিতিতে ১০ লক্ষাধিক শিশুকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে| সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে প্রায় ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভাকে অধিক সংক্রমণপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে| দক্ষিণাঞ্চল—বিশেষ করে বরগুনা, বরিশাল ও ঝালকাঠি— এ তিনটি জেলা ঝুঁকিতে রয়েছে|
নদীবিধৌত ও দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে এসব অঞ্চলে নিয়মিত ¯^াস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়, ফলে অনেক শিশু টিকাদান থেকে বঞ্চিত থাকে| দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার ও চাঁদপুরেও সংক্রমণের হার বেশি| কক্সবাজারে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সারা দেশের মানুষের চলাচল এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী উপস্থিতি সংক্রমণ বৃদ্ধি এর কারণ হিসেবে কাজ করছে| উত্তরাঞ্চল—বিশেষ করে পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ—হাম সংক্রমণের একটি বড় ক্লাস্টার হিসেবে দেখা দিয়েছে| একই জেলার একাধিক উপজেলায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে| ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর প্রভৃতি জেলাগুলো মাঝারি ঝুঁকিতে থাকলেও; দ্রুত নগরায়ণ, বস্তি এলাকার আধিক্যের কারণে এসব এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে|
একই প্রবণতা ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণাতেও দেখা যায়, সচেতনতার অভাবও অন্যতম চ্যালেঞ্জ| সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে| ২০২৬ সালের শুরু থেকে হাম রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে| ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে-এ রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে| হাম রোগটি আক্রান্ত শিশুর দেহে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যুর মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে টিকাবঞ্চিত বা কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও প্রকট|
অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু ১০ বছরের নিচে, এবং ৫ বছরের নিচের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে| আক্রান্তদের বড় অংশই টিকা নেয়নি অথবা সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেনি বলে তথ্য পাওয়া গেছে| এই পরিস্থিতির পেছনে—নিয়মিত টিকাদানে অবহেলা, ড্রপ-আউট শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিচ্ছন্ন, ঘনবসতি এবং দুর্গম এলাকায় ¯^াস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি কারণগুলো অন্যতম|
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে| ইপিআই কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ১০ লাখ শিশুকে নতুন করে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে| সাম্প্রতিক ক্যাম্পেইনে ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, বিশেষ করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কঠোরভাবে তা পালন করা হবে| এছাড়া ‘হটস্পট’ ভিত্তিক জরীপ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে| সংক্রমণ নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করা যায়| রোগ নির্ণয়, রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং এবং প্রাদুর্ভাব তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে| জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গুরুতর রোগীদের জন্য উন্নত সেবার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে|
¯^াস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রান্তিক পর্যায়ে ¯^াস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং ডঐঙ, টঘওঈঊঋ, ও এঅঠও-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা এই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করছে| পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও কমিউনিটি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে| এই প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| সময়মতো শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা, গুজব ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া অপরিহার্য|
মনে রাখা দরকার যে, টিকাবঞ্চিত শিশু শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি ˆতরি করে| বাংলাদেশ ইতোমধ্যে হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে| তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই অর্জন ধরে রাখতে হলে সমšি^ত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে| টিকাদান আওতা বৃদ্ধি, কার্যকর নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব| এখনই সময়—সমšি^ত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে মুক্ত রাখা|
[ লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশে বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হাম আবারও জন¯^াস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে| সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে টেকসই সাফল্য সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে এ রোগের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে| ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত তিন-চার সপ্তাহে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রায় ১০০ শিশুর হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে রাজশাহী অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি|
দেশের ৫৬টি জেলায় ৭,৫০০-এর বেশি শিশুর দেহে হাম শনাক্ত হয়েছে, যার অধিকাংশ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে| এ পরিস্থিতিতে ১০ লক্ষাধিক শিশুকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে| সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে প্রায় ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভাকে অধিক সংক্রমণপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে| দক্ষিণাঞ্চল—বিশেষ করে বরগুনা, বরিশাল ও ঝালকাঠি— এ তিনটি জেলা ঝুঁকিতে রয়েছে|
নদীবিধৌত ও দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে এসব অঞ্চলে নিয়মিত ¯^াস্থ্যসেবা ব্যাহত হয়, ফলে অনেক শিশু টিকাদান থেকে বঞ্চিত থাকে| দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার ও চাঁদপুরেও সংক্রমণের হার বেশি| কক্সবাজারে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সারা দেশের মানুষের চলাচল এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী উপস্থিতি সংক্রমণ বৃদ্ধি এর কারণ হিসেবে কাজ করছে| উত্তরাঞ্চল—বিশেষ করে পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁ—হাম সংক্রমণের একটি বড় ক্লাস্টার হিসেবে দেখা দিয়েছে| একই জেলার একাধিক উপজেলায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে| ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর প্রভৃতি জেলাগুলো মাঝারি ঝুঁকিতে থাকলেও; দ্রুত নগরায়ণ, বস্তি এলাকার আধিক্যের কারণে এসব এলাকায় সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে|
একই প্রবণতা ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণাতেও দেখা যায়, সচেতনতার অভাবও অন্যতম চ্যালেঞ্জ| সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে| ২০২৬ সালের শুরু থেকে হাম রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, ফলে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে| ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে-এ রোগীর সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে| হাম রোগটি আক্রান্ত শিশুর দেহে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যুর মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে টিকাবঞ্চিত বা কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও প্রকট|
অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু ১০ বছরের নিচে, এবং ৫ বছরের নিচের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে| আক্রান্তদের বড় অংশই টিকা নেয়নি অথবা সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেনি বলে তথ্য পাওয়া গেছে| এই পরিস্থিতির পেছনে—নিয়মিত টিকাদানে অবহেলা, ড্রপ-আউট শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিচ্ছন্ন, ঘনবসতি এবং দুর্গম এলাকায় ¯^াস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি কারণগুলো অন্যতম|
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে| ইপিআই কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ১০ লাখ শিশুকে নতুন করে টিকার আওতায় আনা হচ্ছে| সাম্প্রতিক ক্যাম্পেইনে ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, বিশেষ করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে কঠোরভাবে তা পালন করা হবে| এছাড়া ‘হটস্পট’ ভিত্তিক জরীপ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে| সংক্রমণ নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, যাতে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ দ্রুততার সঙ্গে নিশ্চিত করা যায়| রোগ নির্ণয়, রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং এবং প্রাদুর্ভাব তদন্ত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে| জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গুরুতর রোগীদের জন্য উন্নত সেবার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে|
¯^াস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রান্তিক পর্যায়ে ¯^াস্থ্যকর্মীদের সম্পৃক্ততা এবং ডঐঙ, টঘওঈঊঋ, ও এঅঠও-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা এই প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করছে| পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম ও কমিউনিটি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে| এই প্রেক্ষাপটে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| সময়মতো শিশুদের টিকা নিশ্চিত করা, গুজব ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া অপরিহার্য|
মনে রাখা দরকার যে, টিকাবঞ্চিত শিশু শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি ˆতরি করে| বাংলাদেশ ইতোমধ্যে হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে| তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, এই অর্জন ধরে রাখতে হলে সমšি^ত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে| টিকাদান আওতা বৃদ্ধি, কার্যকর নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে হামমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব| এখনই সময়—সমšি^ত উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিটি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে মুক্ত রাখা|
[ লেখক: পরিচালক, মেডিকেল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

আপনার মতামত লিখুন