মহাকাশের নিঃস্তব্ধতা আর চাঁদের অজানা প্রান্ত ছোঁয়ার ১০ দিন পর অবশেষে বাড়ি ফেরার পথে আর্টেমিস দ্বিতীয় মিশনের চার নভোচারী। চাঁদের চারপাশে ঘুরে ইতিহাস গড়া ওরিয়ন মহাকাশযানটি এখন পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলেছে।
শুক্রবার রাত ৮টার দিকে (স্থানীয় সময়, যা বাংলাদেশের শনিবার সকাল ৬টায়) সান দিয়েগোর উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে নামবে ক্যাপসুলটি।
বুধবার (৮ এপ্রিল) সন্ধ্যায় নভোচারীরা মহাকাশ থেকেই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন। ভাসমান মাইক্রোফনের সামনে হাস্যোজ্জ্বল মুখে জানালেন, চাঁদ থেকে নিয়ে আসছেন ‘দারুণ সব জিনিস’।
অনেক ছবি-গল্প : মিশনের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেন, ‘আমাদের ফিরে যেতেই হবে। কারণ এতক্ষণে আপনারা অনেক তথ্য পেয়েছেন। কিন্তু আসল সব জিনিস আমাদের সঙ্গেই আছে।’ তিনি জানান, এখনো হাতে অনেক ছবি আর অনেক গল্প বাকি। গ্লোভার বলেন, ফিরে যাওয়ার আগে এখনো দুদিন বাকি। এরপরই পুরো অভিযান নিয়ে ভাবা যাবে। আমি সারাজীবন ধরে এই সব ঘটনার স্মৃতি বহন করে যাব।
চাঁদের অদেখা অন্ধকার: সোমবার দুপুর ১টা ৫৬ মিনিটে (ইডিটি) ওরিয়ন মহাকাশযান ৪ লাখ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩-এর রেকর্ড ভেঙে ফেলে। চাঁদের যে দিকটি পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না, ‘ফার সাইড’- তার ওপর দিয়ে উড়ে গেছে ওরিয়ন। স্যাটেলাইট তো আগেই ছবি তুলেছে। তবে সেই বিশাল গহ্বর আর লাভা সমভূমির কিছু অংশ এই প্রথম মানবচোখ দেখল।
ওড়ার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওরিয়ন ক্রুদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আজ তোমরা ইতিহাস তৈরি করলে। সমস্ত আমেরিকাকে সত্যিই খুব গর্বিত করলে।’৪০ মিনিটের নিঃসঙ্গতা: প্রশ্ন ছিল সেই ৪০ মিনিটের কথা, যখন পৃথিবীর সঙ্গে নভোচারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল— এক ‘গভীর নিঃসঙ্গতা’র মুহূর্ত। জবাবে কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান জানান, তখন তারা বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তার ফাঁকেও চার জন কিছু সময় নিজেদের জন্য রাখেন।
‘জেরেমি ম্যাপল কুকি এনেছিলেন। আমরা তিন-চার মিনিট চুপ করে বসে রইলাম। আমরা ঠিক কোথায় আছি, সেটা বুঝতে চাইলাম।’ সেই কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনের আনা ম্যাপল সুগন্ধি কুকি ভাগ করে খাওয়ার গল্পটি যেন অভিযানটাকে আরও মানবিক করে তুলেছে।কান্নায় ভাসলেন কমান্ডার: অভিযানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল ওয়াইজম্যানের জন্য। ২০২০ সালে ক্যানসারে মারা যাওয়া তার স্ত্রী ক্যারলের নাম একটি চন্দ্র গর্তের (ক্রেটার) নামকরণ করা হয়। ওয়াইজম্যান বলেন, ‘জেরেমি যখন ক্যারলের নাম বানান করে বলল... আমার মনে হয় তখন আমি আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম। আমি ক্রিস্টিনার দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনিও কাঁদছেন।’ এটাকেই তিনি তার মিশনের ‘শীর্ষ মুহূর্ত’ বললেন।
সমস্যাগুলোই মূল্যবান: নভোচারী ক্রিস্টিনা কচকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মহাকাশে সবচেয়ে বেশি কী মিস করলেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘সখ্যতা (ক্যামারাডেরি)– একসঙ্গে কাজ করার বন্ধুত্বটা।’ আর কী মিস করলেন?- এমন কিছু নেই বলে জানান। ‘আমরা গভীরে যেতে না পারলে, কিছু অসুবিধা, কিছু ত্যাগ, কিছু ঝুঁকি না নিলেই নয়।আর এসব কিছুই মূল্যবান।’
এবার কঠিন পরীক্ষা: এবার অপেক্ষা পৃথিবীতে ফেরার শেষ ও কঠিন পরীক্ষার। ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার বেগে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়বে ওরিয়ন। প্রচণ্ড উত্তাপ আর বেগ সামলে প্যারাসুটের সাহায্যে প্রশান্ত মহাসাগরে ভেসে পড়া- এই শেষ পর্যায়টাই পরীক্ষা করবে ক্যাপসুলের তাপ ঢাল ও উদ্ধার ব্যবস্থা।
আর্টেমিসের এই অভিযান তাই শুধু ইতিহাস নয়, ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে। আর নভোচারীরা ফিরছেন চাঁদের ‘সব দারুণজিনিস’ নিয়ে- অর্থাৎ তথ্য, ছবি, গল্প আর অজানা সব হিসেব। যা হয়তো একদিন মানুষকে আবার চাঁদের মাটি ছোঁয়াবে। সূত্র: বিবিসি।

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
মহাকাশের নিঃস্তব্ধতা আর চাঁদের অজানা প্রান্ত ছোঁয়ার ১০ দিন পর অবশেষে বাড়ি ফেরার পথে আর্টেমিস দ্বিতীয় মিশনের চার নভোচারী। চাঁদের চারপাশে ঘুরে ইতিহাস গড়া ওরিয়ন মহাকাশযানটি এখন পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলেছে।
শুক্রবার রাত ৮টার দিকে (স্থানীয় সময়, যা বাংলাদেশের শনিবার সকাল ৬টায়) সান দিয়েগোর উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে নামবে ক্যাপসুলটি।
বুধবার (৮ এপ্রিল) সন্ধ্যায় নভোচারীরা মহাকাশ থেকেই ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেন। ভাসমান মাইক্রোফনের সামনে হাস্যোজ্জ্বল মুখে জানালেন, চাঁদ থেকে নিয়ে আসছেন ‘দারুণ সব জিনিস’।
অনেক ছবি-গল্প : মিশনের পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বলেন, ‘আমাদের ফিরে যেতেই হবে। কারণ এতক্ষণে আপনারা অনেক তথ্য পেয়েছেন। কিন্তু আসল সব জিনিস আমাদের সঙ্গেই আছে।’ তিনি জানান, এখনো হাতে অনেক ছবি আর অনেক গল্প বাকি। গ্লোভার বলেন, ফিরে যাওয়ার আগে এখনো দুদিন বাকি। এরপরই পুরো অভিযান নিয়ে ভাবা যাবে। আমি সারাজীবন ধরে এই সব ঘটনার স্মৃতি বহন করে যাব।
চাঁদের অদেখা অন্ধকার: সোমবার দুপুর ১টা ৫৬ মিনিটে (ইডিটি) ওরিয়ন মহাকাশযান ৪ লাখ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩-এর রেকর্ড ভেঙে ফেলে। চাঁদের যে দিকটি পৃথিবী থেকে কখনো দেখা যায় না, ‘ফার সাইড’- তার ওপর দিয়ে উড়ে গেছে ওরিয়ন। স্যাটেলাইট তো আগেই ছবি তুলেছে। তবে সেই বিশাল গহ্বর আর লাভা সমভূমির কিছু অংশ এই প্রথম মানবচোখ দেখল।
ওড়ার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওরিয়ন ক্রুদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আজ তোমরা ইতিহাস তৈরি করলে। সমস্ত আমেরিকাকে সত্যিই খুব গর্বিত করলে।’৪০ মিনিটের নিঃসঙ্গতা: প্রশ্ন ছিল সেই ৪০ মিনিটের কথা, যখন পৃথিবীর সঙ্গে নভোচারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল— এক ‘গভীর নিঃসঙ্গতা’র মুহূর্ত। জবাবে কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান জানান, তখন তারা বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তার ফাঁকেও চার জন কিছু সময় নিজেদের জন্য রাখেন।
‘জেরেমি ম্যাপল কুকি এনেছিলেন। আমরা তিন-চার মিনিট চুপ করে বসে রইলাম। আমরা ঠিক কোথায় আছি, সেটা বুঝতে চাইলাম।’ সেই কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনের আনা ম্যাপল সুগন্ধি কুকি ভাগ করে খাওয়ার গল্পটি যেন অভিযানটাকে আরও মানবিক করে তুলেছে।কান্নায় ভাসলেন কমান্ডার: অভিযানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি ছিল ওয়াইজম্যানের জন্য। ২০২০ সালে ক্যানসারে মারা যাওয়া তার স্ত্রী ক্যারলের নাম একটি চন্দ্র গর্তের (ক্রেটার) নামকরণ করা হয়। ওয়াইজম্যান বলেন, ‘জেরেমি যখন ক্যারলের নাম বানান করে বলল... আমার মনে হয় তখন আমি আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম। আমি ক্রিস্টিনার দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনিও কাঁদছেন।’ এটাকেই তিনি তার মিশনের ‘শীর্ষ মুহূর্ত’ বললেন।
সমস্যাগুলোই মূল্যবান: নভোচারী ক্রিস্টিনা কচকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মহাকাশে সবচেয়ে বেশি কী মিস করলেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘সখ্যতা (ক্যামারাডেরি)– একসঙ্গে কাজ করার বন্ধুত্বটা।’ আর কী মিস করলেন?- এমন কিছু নেই বলে জানান। ‘আমরা গভীরে যেতে না পারলে, কিছু অসুবিধা, কিছু ত্যাগ, কিছু ঝুঁকি না নিলেই নয়।আর এসব কিছুই মূল্যবান।’
এবার কঠিন পরীক্ষা: এবার অপেক্ষা পৃথিবীতে ফেরার শেষ ও কঠিন পরীক্ষার। ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার বেগে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়বে ওরিয়ন। প্রচণ্ড উত্তাপ আর বেগ সামলে প্যারাসুটের সাহায্যে প্রশান্ত মহাসাগরে ভেসে পড়া- এই শেষ পর্যায়টাই পরীক্ষা করবে ক্যাপসুলের তাপ ঢাল ও উদ্ধার ব্যবস্থা।
আর্টেমিসের এই অভিযান তাই শুধু ইতিহাস নয়, ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে। আর নভোচারীরা ফিরছেন চাঁদের ‘সব দারুণজিনিস’ নিয়ে- অর্থাৎ তথ্য, ছবি, গল্প আর অজানা সব হিসেব। যা হয়তো একদিন মানুষকে আবার চাঁদের মাটি ছোঁয়াবে। সূত্র: বিবিসি।

আপনার মতামত লিখুন