জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে পুলিশেরই তিন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন সাজা।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে এ রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দুজন হলেন-এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনই গ্রেপ্তার রয়েছেন।
আর যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিনজন হলেন- তখনকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।এ মামলায় মোট ৩০ আসামির সবাই দণ্ডিত হয়েছেন।
বাকি ২৫ আসামির মধ্যে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৫ জনের, পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৮ জনের এবং ১১ জনের হয়েছে ৩ বছরের সাজা। অপর একজনের হাজতবাসের সময়কে দণ্ড হিসেবে গণ্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। দণ্ডিতদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ছয়জন কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণার সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়
১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, গনিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপত মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
৫ বছরের কারাদণ্ড
উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন। এদের মধ্যে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম গ্রেপ্তার রয়েছেন। ৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল গ্রপ্তার রয়েছেন।
তিন বছরের সাজা
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আখতার হোসেন, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল ও এ কে এম আমির হোসেন ওরফে আমু এবং নিরাপত্তা প্রহরী নূর আলম মিয়া।
এছাড়া প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের ইতোমধ্যে খাটা হাজতবাসই দণ্ড হিসেবে গন্য হবে বলে রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তিনিও এই হামলায় গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতে ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার রায় পড়ার শুরুতে এ মন্তব্য করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী।
আবু সাঈদ ভেবেছিলেন তার সামনে যারা ছিল তারা সবাই মানুষ কিন্তু তারা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল: ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান
এদিন দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এ মামলার সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু হয়। প্রথমে বিচারকদের বেঞ্চে বসে আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় নিয়ে কথা বলা শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম। তিনি তার সূচনা বক্তব্যে বলেন, ‘আজ যার রায় ঘোষণা করা হবে, তিনি জুলাই গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন তার সামনে যারা ছিল, তারা সবাই মানুষ। ভেবেছিলেন তার কিছু হবে না। কিন্তু তারা মানুষ ছিল না। তারা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল। ’
জয় বাংলা স্লোগান, ‘ফাঁসানোর’ অভিযোগ মৃতুদন্ডপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার
দুপুরে রাষ ঘোষণা শেষে গ্রেপ্তারকৃত ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালের এজলাস থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেনে মৃত্যুদন্ড সাজা হওয়া পুলিশের এএসআই আমির হোসেন। এ সময় থাকে ক্ষুদ্ধ হয়ে চিৎকার করে বলতে শোনা যায় ‘আমি পুলিশের চাকরি করি, হুকুমের গোলাম। আমাকে কেনো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমি এ রায় মানি না।’
এ সময় অন্য এক সাজাপ্রাপ্ত আসামি জয় বাংলা স্লোগান দিলে, আমির হোসেনও স্লোগান দিয়ে চিৎকার করে বলেন, ‘আমাকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমি তাই করেছি। আর এখন কেন আমাকেই ফাঁসানো হয়েছে।’
মামলার বৃত্তান্ত
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পরদিন থেকে সারা দেশে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এরপর বিক্ষোভে দমন-পীড়ন আর সহিংসতার মধ্যে ১৯ জুলাই কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি শেখ হাসিনা সরকার। গণ-আন্দোলনের মধ্যে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নেয়। এরপর আবু সাঈদের মামলাও ট্রাইব্যুনালে আসে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে ৩০ জনের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে। ২০২৫ সালের ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটের কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। এরপর ৩০ জুন অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
একইসঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পলাতক থাকা ২৪ আসামির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই বছরের ৬ অগাস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-২।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রসিকিউশন এবং ২৭ জানুয়ারি আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এরপর গত ৫ মার্চ রায়ের দিন ঠিক করেছিল ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
আবু সাঈদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিরা এবং পটভূমির সাক্ষী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ আদালতে সাক্ষ্য দেন। এছাড়া ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ভিডিও ও টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের ভিডিও প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়।

বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে পুলিশেরই তিন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন সাজা।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে এ রায় ঘোষণা করে। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দুজন হলেন-এএসআই (সশস্ত্র) আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তারা দুজনই গ্রেপ্তার রয়েছেন।
আর যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিনজন হলেন- তখনকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন ও এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব।এ মামলায় মোট ৩০ আসামির সবাই দণ্ডিত হয়েছেন।
বাকি ২৫ আসামির মধ্যে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৫ জনের, পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়েছে ৮ জনের এবং ১১ জনের হয়েছে ৩ বছরের সাজা। অপর একজনের হাজতবাসের সময়কে দণ্ড হিসেবে গণ্য করেছে ট্রাইব্যুনাল। দণ্ডিতদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে ছয়জন কারাগারে আছেন। রায় ঘোষণার সময় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়
১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদ ওরফে বাচ্চু, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, গনিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপত মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়া।
৫ বছরের কারাদণ্ড
উপপুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ওরফে দিশা, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন। এদের মধ্যে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম গ্রেপ্তার রয়েছেন। ৫ বছরের কারাদণ্ড পাওয়া আসামিদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল গ্রপ্তার রয়েছেন।
তিন বছরের সাজা
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আখতার হোসেন, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল ও এ কে এম আমির হোসেন ওরফে আমু এবং নিরাপত্তা প্রহরী নূর আলম মিয়া।
এছাড়া প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের ইতোমধ্যে খাটা হাজতবাসই দণ্ড হিসেবে গন্য হবে বলে রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তিনিও এই হামলায় গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতে ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার রায় পড়ার শুরুতে এ মন্তব্য করেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী।
আবু সাঈদ ভেবেছিলেন তার সামনে যারা ছিল তারা সবাই মানুষ কিন্তু তারা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল: ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান
এদিন দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এ মামলার সংক্ষিপ্ত রায় পড়া শুরু হয়। প্রথমে বিচারকদের বেঞ্চে বসে আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় নিয়ে কথা বলা শুরু করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম। তিনি তার সূচনা বক্তব্যে বলেন, ‘আজ যার রায় ঘোষণা করা হবে, তিনি জুলাই গণআন্দোলনের প্রথম শহীদ। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। ভেবেছিলেন তার সামনে যারা ছিল, তারা সবাই মানুষ। ভেবেছিলেন তার কিছু হবে না। কিন্তু তারা মানুষ ছিল না। তারা অমানুষ হয়ে গিয়েছিল। ’
জয় বাংলা স্লোগান, ‘ফাঁসানোর’ অভিযোগ মৃতুদন্ডপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার
দুপুরে রাষ ঘোষণা শেষে গ্রেপ্তারকৃত ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালের এজলাস থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেনে মৃত্যুদন্ড সাজা হওয়া পুলিশের এএসআই আমির হোসেন। এ সময় থাকে ক্ষুদ্ধ হয়ে চিৎকার করে বলতে শোনা যায় ‘আমি পুলিশের চাকরি করি, হুকুমের গোলাম। আমাকে কেনো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আমার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমি এ রায় মানি না।’
এ সময় অন্য এক সাজাপ্রাপ্ত আসামি জয় বাংলা স্লোগান দিলে, আমির হোসেনও স্লোগান দিয়ে চিৎকার করে বলেন, ‘আমাকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আমি তাই করেছি। আর এখন কেন আমাকেই ফাঁসানো হয়েছে।’
মামলার বৃত্তান্ত
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। সেদিন দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হলে ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পরদিন থেকে সারা দেশে ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এরপর বিক্ষোভে দমন-পীড়ন আর সহিংসতার মধ্যে ১৯ জুলাই কারফিউ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি শেখ হাসিনা সরকার। গণ-আন্দোলনের মধ্যে ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের উদ্যোগ নেয়। এরপর আবু সাঈদের মামলাও ট্রাইব্যুনালে আসে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনে আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে ৩০ জনের সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে। ২০২৫ সালের ২৪ জুন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটের কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। এরপর ৩০ জুন অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।
একইসঙ্গে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পলাতক থাকা ২৪ আসামির জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চারজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই বছরের ৬ অগাস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচারকাজ শুরু করে ট্রাইব্যুনাল-২।
গত ২১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রসিকিউশন এবং ২৭ জানুয়ারি আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এরপর গত ৫ মার্চ রায়ের দিন ঠিক করেছিল ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৫ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শী, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং পুলিশ সদস্য রয়েছেন।
আবু সাঈদের সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিরা এবং পটভূমির সাক্ষী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ আদালতে সাক্ষ্য দেন। এছাড়া ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ভিডিও ও টেলিভিশনের লাইভ সম্প্রচারের ভিডিও প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন