সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বাঙালির লোকসংস্কৃতি


রেজাউল করিম খোকন
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২০ পিএম

বাঙালির লোকসংস্কৃতি
নকশিকাঁথা আমাদের লোকশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ

বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি| পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষে তারা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে| সেসবের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে আবির্ভূত হয় বাংলা নববর্ষ, যার ¯^াদ, গন্ধ ও আবেদন অন্যান্য উৎসব থেকে একেবারেই আলাদা| জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ, সব বাঙালি সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একই হৃদয়াবেগে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে পালন করে এই সর্বজনীন উৎসব| চিরায়ত বাঙালিত্বের অহঙ্কার আর সংস্কৃতির উদার আহ্বানে জাগরুক হয়ে নাচে-গানে, গল্পে-আড্ডায়, আহারে-বিহারে চলে নতুন বছরকে বরণ করার পালা| বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালির জীবনে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব| এর মাধ্যমে জাতি তার ¯^কীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তি সঞ্চয় করে; সচেষ্ট হয় আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে|

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো বাংলা বর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ| আর বাঙালির কাছে বাংলা নববর্ষ বরণ একটি প্রাণের উৎসব| বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা| এমন নববর্ষই বাঙালি জাতিকে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল, শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে| চট্টগ্রাম অঞ্চলে শত বছর ধরে গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক হয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘জব্বারের বলী খেলা’| চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির মাঠে বিভিন্ন কুস্তিগীর বা বলীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন আজও দর্শকদের কাছে দারুণ আকর্ষণের বিষয়| প্রতিবছর ১২ বৈশাখ উৎসবমুখর পরিবেশে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়|

বাঙালি নারীর প্রধান পোশাক শাড়ি| যেকোনো উৎসবে-পার্বণে নারীর প্রথম পছন্দ এটি| শাড়ির নানা ধরন রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম জামদানি| এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ| জামদানি শাড়ি তুলা দিয়ে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের শাড়ি, যা মসলিনের উত্তরাধিকার বহন করে| বাংলার মধ্যযুগে মসলিন ছিল অত্যন্ত মূল্যবান কাপড়| পরবর্তীতে মসলিন বিলুপ্ত হলেও জামদানির বিকাশ ঘটে| জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশরা মসলিন শিল্প ধ্বংস করতে কারিগরদের আঙুল কেটে দিয়েছিল| যদিও এ নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, তবু বাস্তবতা হলো— মসলিনের অবসানের পর জামদানি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে| নকশিকাঁথা আমাদের লোকশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ| সাধারণ কাঁথার ওপর নানান নকশা করে এটি ˆতরি করা হয়| পুরনো কাপড়ের সুতা খুলে কিংবা নতুন সুতা কিনে কাঁথা সেলাই করা হয়| ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি নকশা এতে ফুটে ওঠে| ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর অঞ্চলে নকশিকাঁথা বিশেষভাবে বিখ্যাত| তবে এই শিল্পও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে|

একসময় গ্রামীণ জীবনে শিকা, চাঁদোয়া, শীতলপাটি ছিল অপরিহার্য| এখন এগুলো বিলুপ্তির পথে| মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শীতলপাটির কারিগর কমে গেছে| প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের চাপে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকে থাকতে পারছে না| একইভাবে বিয়ের গীত, বৃষ্টি ডাকার গান, ছাদ পেটানোর গান—এসব লোকজ সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে| আধুনিক প্রযুক্তি ও ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন প্রজন্ম এসবের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে|

লোকজ সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা উদ্বেগজনক| বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা নিজের শিকড় ভুলে যাচ্ছি| কাঁসা-পিতলের বাসন, ঢেঁকি, জাঁতা—এসব হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শব্দ, ভাষা ও জীবনধারা| চট্টগ্রামের মেজবান সংস্কৃতি এখনও শক্তভাবে টিকে আছে| এটি শুধু খাবার নয়, সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক| ধারণা করা হয়, ১৬০০-১৮০০ সালের মধ্যে এই সংস্কৃতির প্রচলন শুরু হয়| ‘মেজবান’ শব্দটি ফারসি উৎসের| এই আয়োজন চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র্যকে তুলে ধরে| সংস্কৃতি হলো মানুষের আত্মার প্রকাশ| নৃবিজ্ঞানী Edward Burnett Tylor-এর মতে, সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত আচরণ, বিশ্বাস, শিল্প, আইন, নীতি—সবকিছুর সম্মিলিত রূপই সংস্কৃতি| সংস্কৃতি প্রবহমান; এর স্থবিরতা মানেই ক্ষয়| তাই বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আমাদের সচেতন হতে হবে|

বাংলাদেশ ও বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি|

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬


বাঙালির লোকসংস্কৃতি

প্রকাশের তারিখ : ১১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বাঙালি উৎসব ও আনন্দপ্রিয় জাতি| পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা উপলক্ষে তারা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠে| সেসবের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে আবির্ভূত হয় বাংলা নববর্ষ, যার ¯^াদ, গন্ধ ও আবেদন অন্যান্য উৎসব থেকে একেবারেই আলাদা| জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষ, সব বাঙালি সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একই হৃদয়াবেগে একটি মোহনায় মিলিত হয়ে পালন করে এই সর্বজনীন উৎসব| চিরায়ত বাঙালিত্বের অহঙ্কার আর সংস্কৃতির উদার আহ্বানে জাগরুক হয়ে নাচে-গানে, গল্পে-আড্ডায়, আহারে-বিহারে চলে নতুন বছরকে বরণ করার পালা| বাংলা নববর্ষ তাই বাঙালির জীবনে সবচেয়ে বড় সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব| এর মাধ্যমে জাতি তার ¯^কীয়তা ও জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তি সঞ্চয় করে; সচেষ্ট হয় আত্মপরিচয় ও শিকড়ের সন্ধানে|

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য হলো বাংলা বর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ| আর বাঙালির কাছে বাংলা নববর্ষ বরণ একটি প্রাণের উৎসব| বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা| এমন নববর্ষই বাঙালি জাতিকে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে আবদ্ধ করেছিল, শক্তি ও সাহস জুগিয়েছিল স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে| চট্টগ্রাম অঞ্চলে শত বছর ধরে গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক হয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘জব্বারের বলী খেলা’| চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির মাঠে বিভিন্ন কুস্তিগীর বা বলীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই স্বতঃস্ফূর্ত আয়োজন আজও দর্শকদের কাছে দারুণ আকর্ষণের বিষয়| প্রতিবছর ১২ বৈশাখ উৎসবমুখর পরিবেশে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়|

বাঙালি নারীর প্রধান পোশাক শাড়ি| যেকোনো উৎসবে-পার্বণে নারীর প্রথম পছন্দ এটি| শাড়ির নানা ধরন রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম জামদানি| এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ| জামদানি শাড়ি তুলা দিয়ে প্রস্তুতকৃত এক ধরনের শাড়ি, যা মসলিনের উত্তরাধিকার বহন করে| বাংলার মধ্যযুগে মসলিন ছিল অত্যন্ত মূল্যবান কাপড়| পরবর্তীতে মসলিন বিলুপ্ত হলেও জামদানির বিকাশ ঘটে| জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশরা মসলিন শিল্প ধ্বংস করতে কারিগরদের আঙুল কেটে দিয়েছিল| যদিও এ নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, তবু বাস্তবতা হলো— মসলিনের অবসানের পর জামদানি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে| নকশিকাঁথা আমাদের লোকশিল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ| সাধারণ কাঁথার ওপর নানান নকশা করে এটি ˆতরি করা হয়| পুরনো কাপড়ের সুতা খুলে কিংবা নতুন সুতা কিনে কাঁথা সেলাই করা হয়| ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি নকশা এতে ফুটে ওঠে| ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ফরিদপুর ও যশোর অঞ্চলে নকশিকাঁথা বিশেষভাবে বিখ্যাত| তবে এই শিল্পও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে|

একসময় গ্রামীণ জীবনে শিকা, চাঁদোয়া, শীতলপাটি ছিল অপরিহার্য| এখন এগুলো বিলুপ্তির পথে| মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শীতলপাটির কারিগর কমে গেছে| প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের চাপে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প টিকে থাকতে পারছে না| একইভাবে বিয়ের গীত, বৃষ্টি ডাকার গান, ছাদ পেটানোর গান—এসব লোকজ সংস্কৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে| আধুনিক প্রযুক্তি ও ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে নতুন প্রজন্ম এসবের সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে|

লোকজ সংস্কৃতির পরিবর্তন স্বাভাবিক, কিন্তু সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা উদ্বেগজনক| বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমরা নিজের শিকড় ভুলে যাচ্ছি| কাঁসা-পিতলের বাসন, ঢেঁকি, জাঁতা—এসব হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট শব্দ, ভাষা ও জীবনধারা| চট্টগ্রামের মেজবান সংস্কৃতি এখনও শক্তভাবে টিকে আছে| এটি শুধু খাবার নয়, সামাজিক বন্ধনেরও প্রতীক| ধারণা করা হয়, ১৬০০-১৮০০ সালের মধ্যে এই সংস্কৃতির প্রচলন শুরু হয়| ‘মেজবান’ শব্দটি ফারসি উৎসের| এই আয়োজন চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র্যকে তুলে ধরে| সংস্কৃতি হলো মানুষের আত্মার প্রকাশ| নৃবিজ্ঞানী Edward Burnett Tylor-এর মতে, সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত আচরণ, বিশ্বাস, শিল্প, আইন, নীতি—সবকিছুর সম্মিলিত রূপই সংস্কৃতি| সংস্কৃতি প্রবহমান; এর স্থবিরতা মানেই ক্ষয়| তাই বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে আমাদের সচেতন হতে হবে|

বাংলাদেশ ও বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি|

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত