বাংলা নববর্ষ ১ বৈশাখ| এটি একটি উৎসব| এই উৎসবটি বাংলা জনপদের বসবাসরত সব মানুষের| কারণ এই উৎসবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ-গোত্র বা সম্প্রদায়গত কোনো বিভাজন থাকে না| তাই বাংলা নববর্ষ একটি সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসব| বাংলা জনপদে বসবাসরত সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষের মেল বন্ধন হলো পহেলা ˆবশাখ| হাজার হাজার বছরে ধরে এই জনপদের মানুষ পহেলা বৈশাখকে সাড়াম্বরে পালন করে আসছে| বাংলা জনপদে মুসলিম শাসন শুরুর পর মোগলরা খাজনা আদায়ের এর ব্যবহার ঘটায়| সর্বোপরি, বাংলা জনপদের মানুষের প্রাণের উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ| বাংলাদেশের রাজধানীসহ সারাদেশে জাতির মঙ্গল কামনায় এই উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে| তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে চলছে এক প্রকার অপরাজনীতি| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলা নববর্ষের দিনে প্রতি বছর যে শোভাযাত্রা হয়, ফের সেটির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে| এতদিন এটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত থাকলেও এবার থেকে এর নাম ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করার কথা জানিয়েছে সরকার|
অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন কওে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় বর্তমানে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়| তবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতায় নানা পরিবর্তন এসেছে| অনেকেই মনে করেন যে, মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা সন গণনা শুরু হওয়ার পর খাজনা আদায়ের পর যে উৎসব হত, তা থেকে এর উৎপত্তি| আর তখন থেকে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে| প্রশ্ন হচ্ছে এই শোভা যাত্রাটাত বছরের শুরুতে হচ্ছে তার নামটা কি ˆবশাখী শোভা যাত্রা দেয়া খুবই প্রয়োজন? যেহেতু বছরটা শুরু হয় এই দিনের এই উৎসব দিয়ে, তাই জনপদের মঙ্গল কামনা করে শোভা যাত্রাটি বের করলে কার কি ক্ষতি? কেন এই শোভা যাত্রাটাকে মঙ্গল শোভা যাত্রা বলা যাবে না? মঙ্গল নামটি কি কোন গোষ্ঠি, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি? এটি একটি সার্বজনীন শব্দ| এই উৎপত্তি বাংলা জনপদ থেকে| বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের ধারাবাহিকতায় কখনও আগের বিভিন্ন নিয়ম বাদ দেয়া হয়েছে, আবার কখনও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এই উৎসবের সঙ্গে| ধীরে ধীরে বাঙালি সংস্কৃতি আর রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে এই উৎসব|
‘মঙ্গল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো— কল্যাণ, শুভ, ভালো বা হিত| এটি একটি সংস্কৃত থেকে আসা শব্দ, যার অর্থ উপযুক্ত বা শুভপ্রদ| সাধারণ অর্থ: কল্যাণ, শুভ, মঙ্গলময়| হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা সাহিত্য অকাদেমী থেকে প্রকাশিত বঙ্গীয় শব্দকোষ (প্রথম খণ্ড)| ২০০১ থেকে জানা যায় যে মঙ্গল অর্থ কল্যাণপ্রদায়ক| এর সমার্থক শব্দাবলি হলো
কল্যাণ, মঙ্গল, ভালো, শুভ| তবে শোনা যায় যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আপত্তির মূল কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস| কেউ কেউ বলছেন যে,
বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠনের মতে এটি হিন্দু সংস্কৃতি ও ইসলামী আকিদার পরিপন্থী|| শোভাযাত্রায় বিভিন্ন জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি বা মোটিফ ব্যবহার, শব্দটির ব্যবহার এবং নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে তারা অনৈসলামিক ও বিজাতীয়
সংস্কৃতি বলে মনে করেন| তবে ধর্মের নামে এই মঙ্গল শব্দের অপব্যাখাগুলো ঠিক না| তারপর দেখা যাচ্ছে যে, ১. অনেক ইসলামপন্থী দল মনে করে, মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন মোটিফ ও জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা
মুসলিম সংস্কৃতির বিরোধী| ‘মঙ্গল’ শব্দটি দিয়ে অশুভ দূর করে মঙ্গল কামনা করা হয়, যা ইসলামী দৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহ) ওপর ভরসা বা তওহীদের ধারণার পরিপন্থী বলে তারা মনে করেন| ৩. পহেলা ˆবশাখে বিভিন্ন জীব-জন্তুর মূর্তি, মুখে উল্কি আঁকা এবং নারী-পুরুষের একসঙ্গে চলার বিষয়টিকে তারা ‘বিজাতীয়’ ও ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে গণ্য করেন| ৪. অতীতে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বা সংগঠন এই আয়োজনের বিরোধিতা করে একে ‘হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করেছে (বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে)| ৫. আপত্তির মুখে অনেক সময় এর নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়| এই সমস্ত আপত্তি কেন? এটা তো কোন বিশেষ ধর্মের অনুষ্ঠান না| এর এর প্রচলনটা কোন ধর্মানুসারে হয় নাই| তবে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মঅনুভুতিকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করার জন্য উল্লেখিত অপব্যাখ্যাগুলো দেয়া হচ্ছে| সারা বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের পহেলা ˆবশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মনে করে একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন অনুষ্ঠান| তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবটি ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে| ১৯৬০-এর দশক থেকে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে ছায়ানট| ঢাকার রমনা পার্কে ছায়ানট আয়োজন করে প্রাত্যোষিক সঙ্গীতানুষ্ঠান| এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হতো অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা| এর ফলে সাধারণ মানুষ নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট হয় এই উৎসবে| নাগরিক আবহে সার্বজনীন
পহেলা বৈ শাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করে ছায়ানট|
১৯৮০-র দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ প্রবর্তিত হয়| পরের বছরও চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়| তবে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে| যশোরের সেই শোভাযাত্রায় ছিল- পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরানো বাদ্যযন্ত্রসহ আরও অনেক শিল্পকর্ম| শুরুর বছরেই যশোরে শোভাযাত্রা আলোড়ন ˆতরি করে| পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা| শুরু থেকেই চারুকলার শোভাযাত্রাটির নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিল না| ১৯৯৬ সাল আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করা
হয়| ১৯৮৯ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, হাতি, কুমির, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ
এবং সাজসজ্জা, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য| ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মঙ্গল শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়| ১৯৯১ সালে চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীরাসহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেয়| শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালআকার হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম| কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ড| মিছিলটি নাচে গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে|
এর প্রাচীন ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পহেলা উৎসব পালন করা হত বছরের প্রথম দিনে তার কারণটি ছিল আগত বছরটি যেন প্রতিটি মানুষের জন্য কল্যান বয়ে আনে|
প্রাচীন বাংলার মানুষ একটি কথা বিশ্বাস করতেন, শুরুটা যদি মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে করা যায় তাহলে সারাটা বছরই মঙ্গলময় হবে| সুতরাং এই ধারণা থেকে শোভা যত্রাটার নাম মঙ্গল শোভা যত্রা করা হয়েছে| মঙ্গল শোভাযাত্রাটাকে কেউ বিশেষ মহলের দিকে ঠেলে দেন তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক| মঙ্গল শোভা যাত্রাটা উৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে কোন রাজনৈতিক ধর্মীয় বা কোন সম্প্রদায়ের উপাদান বা সংশ্রবতা খুজে পাওয়া যায় না| এটা বাংলার একটি প্রাচীন উৎসব থেকে আগত| তাই এর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অপব্যাখা দেয়া ঠিক না|
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ এপ্রিল ২০২৬
বাংলা নববর্ষ ১ বৈশাখ| এটি একটি উৎসব| এই উৎসবটি বাংলা জনপদের বসবাসরত সব মানুষের| কারণ এই উৎসবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ-গোত্র বা সম্প্রদায়গত কোনো বিভাজন থাকে না| তাই বাংলা নববর্ষ একটি সার্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসব| বাংলা জনপদে বসবাসরত সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষের মেল বন্ধন হলো পহেলা ˆবশাখ| হাজার হাজার বছরে ধরে এই জনপদের মানুষ পহেলা বৈশাখকে সাড়াম্বরে পালন করে আসছে| বাংলা জনপদে মুসলিম শাসন শুরুর পর মোগলরা খাজনা আদায়ের এর ব্যবহার ঘটায়| সর্বোপরি, বাংলা জনপদের মানুষের প্রাণের উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ| বাংলাদেশের রাজধানীসহ সারাদেশে জাতির মঙ্গল কামনায় এই উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে| তবে বর্তমানে দেখা যাচ্ছে যে, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে চলছে এক প্রকার অপরাজনীতি| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলা নববর্ষের দিনে প্রতি বছর যে শোভাযাত্রা হয়, ফের সেটির নতুন নাম নির্ধারণ করা হয়েছে| এতদিন এটি ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত থাকলেও এবার থেকে এর নাম ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করার কথা জানিয়েছে সরকার|
অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন কওে সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় বর্তমানে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়| তবে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতায় নানা পরিবর্তন এসেছে| অনেকেই মনে করেন যে, মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে বাংলা সন গণনা শুরু হওয়ার পর খাজনা আদায়ের পর যে উৎসব হত, তা থেকে এর উৎপত্তি| আর তখন থেকে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছিল তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে| প্রশ্ন হচ্ছে এই শোভা যাত্রাটাত বছরের শুরুতে হচ্ছে তার নামটা কি ˆবশাখী শোভা যাত্রা দেয়া খুবই প্রয়োজন? যেহেতু বছরটা শুরু হয় এই দিনের এই উৎসব দিয়ে, তাই জনপদের মঙ্গল কামনা করে শোভা যাত্রাটি বের করলে কার কি ক্ষতি? কেন এই শোভা যাত্রাটাকে মঙ্গল শোভা যাত্রা বলা যাবে না? মঙ্গল নামটি কি কোন গোষ্ঠি, ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি? এটি একটি সার্বজনীন শব্দ| এই উৎপত্তি বাংলা জনপদ থেকে| বাংলা নববর্ষ উৎযাপনের ধারাবাহিকতায় কখনও আগের বিভিন্ন নিয়ম বাদ দেয়া হয়েছে, আবার কখনও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এই উৎসবের সঙ্গে| ধীরে ধীরে বাঙালি সংস্কৃতি আর রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে এই উৎসব|
‘মঙ্গল’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো— কল্যাণ, শুভ, ভালো বা হিত| এটি একটি সংস্কৃত থেকে আসা শব্দ, যার অর্থ উপযুক্ত বা শুভপ্রদ| সাধারণ অর্থ: কল্যাণ, শুভ, মঙ্গলময়| হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা সাহিত্য অকাদেমী থেকে প্রকাশিত বঙ্গীয় শব্দকোষ (প্রথম খণ্ড)| ২০০১ থেকে জানা যায় যে মঙ্গল অর্থ কল্যাণপ্রদায়ক| এর সমার্থক শব্দাবলি হলো
কল্যাণ, মঙ্গল, ভালো, শুভ| তবে শোনা যায় যে, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আপত্তির মূল কারণ ধর্মীয় বিশ্বাস| কেউ কেউ বলছেন যে,
বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠনের মতে এটি হিন্দু সংস্কৃতি ও ইসলামী আকিদার পরিপন্থী|| শোভাযাত্রায় বিভিন্ন জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি বা মোটিফ ব্যবহার, শব্দটির ব্যবহার এবং নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণকে তারা অনৈসলামিক ও বিজাতীয়
সংস্কৃতি বলে মনে করেন| তবে ধর্মের নামে এই মঙ্গল শব্দের অপব্যাখাগুলো ঠিক না| তারপর দেখা যাচ্ছে যে, ১. অনেক ইসলামপন্থী দল মনে করে, মঙ্গল শোভাযাত্রার বিভিন্ন মোটিফ ও জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা
মুসলিম সংস্কৃতির বিরোধী| ‘মঙ্গল’ শব্দটি দিয়ে অশুভ দূর করে মঙ্গল কামনা করা হয়, যা ইসলামী দৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহ) ওপর ভরসা বা তওহীদের ধারণার পরিপন্থী বলে তারা মনে করেন| ৩. পহেলা ˆবশাখে বিভিন্ন জীব-জন্তুর মূর্তি, মুখে উল্কি আঁকা এবং নারী-পুরুষের একসঙ্গে চলার বিষয়টিকে তারা ‘বিজাতীয়’ ও ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে গণ্য করেন| ৪. অতীতে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বা সংগঠন এই আয়োজনের বিরোধিতা করে একে ‘হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করেছে (বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে)| ৫. আপত্তির মুখে অনেক সময় এর নাম পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বা ‘ˆবশাখী শোভাযাত্রা’ করা হয়| এই সমস্ত আপত্তি কেন? এটা তো কোন বিশেষ ধর্মের অনুষ্ঠান না| এর এর প্রচলনটা কোন ধর্মানুসারে হয় নাই| তবে বাংলাদেশের মানুষের ধর্মঅনুভুতিকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করার জন্য উল্লেখিত অপব্যাখ্যাগুলো দেয়া হচ্ছে| সারা বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের পহেলা ˆবশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে মনে করে একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন অনুষ্ঠান| তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবটি ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে| ১৯৬০-এর দশক থেকে প্রতি বছর বাংলা নববর্ষকে বরণ করে আসছে ছায়ানট| ঢাকার রমনা পার্কে ছায়ানট আয়োজন করে প্রাত্যোষিক সঙ্গীতানুষ্ঠান| এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আয়োজিত হতো অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা| এর ফলে সাধারণ মানুষ নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট হয় এই উৎসবে| নাগরিক আবহে সার্বজনীন
পহেলা বৈ শাখ উদযাপনে নতুন মাত্রা যোগ করে ছায়ানট|
১৯৮০-র দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ প্রবর্তিত হয়| পরের বছরও চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়| তবে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে| যশোরের সেই শোভাযাত্রায় ছিল- পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরানো বাদ্যযন্ত্রসহ আরও অনেক শিল্পকর্ম| শুরুর বছরেই যশোরে শোভাযাত্রা আলোড়ন ˆতরি করে| পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা| শুরু থেকেই চারুকলার শোভাযাত্রাটির নাম মঙ্গল শোভাযাত্রা ছিল না| ১৯৯৬ সাল আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ করা
হয়| ১৯৮৯ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল বিশালকায় চারুকর্ম পুতুল, হাতি, কুমির, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ
এবং সাজসজ্জা, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য| ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের মঙ্গল শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়| ১৯৯১ সালে চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীরাসহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেয়| শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালআকার হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম| কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ড| মিছিলটি নাচে গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে|
এর প্রাচীন ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পহেলা উৎসব পালন করা হত বছরের প্রথম দিনে তার কারণটি ছিল আগত বছরটি যেন প্রতিটি মানুষের জন্য কল্যান বয়ে আনে|
প্রাচীন বাংলার মানুষ একটি কথা বিশ্বাস করতেন, শুরুটা যদি মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে করা যায় তাহলে সারাটা বছরই মঙ্গলময় হবে| সুতরাং এই ধারণা থেকে শোভা যত্রাটার নাম মঙ্গল শোভা যত্রা করা হয়েছে| মঙ্গল শোভাযাত্রাটাকে কেউ বিশেষ মহলের দিকে ঠেলে দেন তা খুবই দুর্ভাগ্যজনক| মঙ্গল শোভা যাত্রাটা উৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে কোন রাজনৈতিক ধর্মীয় বা কোন সম্প্রদায়ের উপাদান বা সংশ্রবতা খুজে পাওয়া যায় না| এটা বাংলার একটি প্রাচীন উৎসব থেকে আগত| তাই এর রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অপব্যাখা দেয়া ঠিক না|
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন