বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘির কুমির একটি কুকুরকে শিকার করেছে। গত বুধবারের এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। এটি কি নিছক একটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো কারণ—তা নিয়ে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিন্ন বয়ান ও নেপথ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
সেদিন যা ঘটেছিল
গত বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে মাজারের প্রধান ঘাটে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একটি কুকুর হঠাৎ করেই নারীদের ঘাটের দিক থেকে দৌড়ে এসে প্রধান ঘাটে থাকা লোকজনকে কামড়াতে শুরু করে। মাজারের খাদেমদের নিয়োগ করা নিরাপত্তা প্রহরী ফোরকান হাওলাদারের পায়েও কামড় দেয় কুকুরটি।
ফোরকান জানান, কুকুরটিকে নিভৃত করার চেষ্টা করলে সেটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে পানিতে নামার চেষ্টা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে দিঘিতে থাকা একমাত্র কুমির ‘ধলা পাহাড়’ এসে ছো মেরে কুকুরটিকে পানির নিচে নিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
ঘটনার সময় উপস্থিত স্থানীয় দোকানদার বিনা আক্তার বলেন, ‘কুকুরটি বেশ অসুস্থ ও হিংস্র ছিল। এটি আমার দোকানের সামনে এক শিশুকে কামড়ায় এবং তিনটি মুরগিও মেরে ফেলে। কুকুরটি যখন পানিতে পড়ে, তখন কুমির তাকে ধরে নিয়ে যায়। এখানে কাউকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই, কারণ হিংস্র কুমিরের মুখ থেকে কুকুর বাঁচানোর সাহস কারও ছিল না।’
স্থানীয় যুবক ও কুমির নিয়ে কাজ করা মেহেদী হাসান তপু জানান, ‘ধলা পাহাড়’ নামের এই কুমিরটি কয়েক দিন আগেই ডিম পেড়েছে। প্রাণিবিজ্ঞানের ভাষায়, ডিম পাড়ার পর মা কুমির অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও হিংস্র হয়ে ওঠে। কুকুরটি যখন পানির একদম কাছে চলে যায়, তখন কুমিরটি তার সহজাত শিকারি স্বভাব থেকেই আক্রমণ করে।
গুজব বনাম বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, কুকুরটিকে হাত-পা বেঁধে কুমিরের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তবে ৫৬ সেকেন্ডের ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কুকুরটি নিজে থেকেই পানিতে নামার চেষ্টা করছে এবং একপর্যায়ে বাঁচার চেষ্টা করলেও কুমিরের গতির কাছে হেরে যায়। মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভিডিও ভাইরালের নেশায় মানুষ ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি। কেউ কুকুরটিকে ঠেলে দেয়নি।’
তদন্তে প্রশাসন ও ল্যাব রিপোর্ট
ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শনিবার (১১ এপ্রিল) বিকেলে মৃত কুকুরটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাহেব আলী জানান, কুকুরটি জলাতঙ্ক (র্যাবিস) রোগে আক্রান্ত ছিল কি না বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে কুকুরের মাথা ঢাকার ‘সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি’তে (সিডিআইএল) পাঠানো হয়েছে। ল্যাব রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও কুকুরের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘কুমিরকে জীবিত প্রাণী খেতে দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই এবং এটি একটি কুসংস্কার। তদন্ত কমিটি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে। কোনো পক্ষ যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকে, তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বর্তমানে দিঘিতে থাকা এই কুমিরটি ২০০৫ সালে ভারত থেকে আনা হয়েছিল। এর আগেও বেশ কয়েকবার কুমিরটি মানুষের ওপর আক্রমণ করেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।
আপনার মতামত লিখুন