সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

মুক্তগদ্য

দূর পৃথিবীর গন্ধ


মামুন হুসাইন
মামুন হুসাইন
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম

দূর পৃথিবীর গন্ধ
নিখিলবঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন কর্তৃক প্রদত্ত পুরস্কার গ্রহণ করছেন কবি জীবনানন্দ দাশ

বন্ধুদের উচ্চারিত শব্দ জমা করে এতদিন পর আবার বাক্য বানাই  ভয়, ভুল, মৃত্যু ও গ্লানি সমাচ্ছন্ন পৃথিবীতে আজ আর ভালো আলো নেই! কথাটি বলছি বটে, কিন্তু আমি পলাতক মানুষের মত তক্ষুণি পেছন ফিরে হাঁটতে থাকি। দৃষ্টিক্ষীণ হয়ে আসা চোখে তখন তিন দশকের প্রাচীন বরেন্দ্র শহর, রুগ্ন ঘোড়াগাড়ি, মুমূর্ষু নদী এবং অভয়ারণ্যের মত একখণ্ড সবুজ মতিহার-ক্যাম্পাস মৃদু আলো-আঁধার হয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে। আমি এ-সবের পিছুপিছু দৌড়াই, বিশ্রাম নিই, হাঁটতে থাকি, অথবা হাঁটতে হাঁটতে নিঁখোজ সেই স্বপ্ন-রাজ্য খুঁজতে থাকি সারা সকাল-সন্ধ্যা। দেখি জামরুল ফুলের ভেতর মৌমাছি ঘরকন্যা শুরু করেছে। কমলা রঙের শাল গায়ে কন্যা-বন্ধুরা হাঁটছেন। বৃষ্টির মত কুয়াশা। জলের বুকে মাছরাঙার ছায়া পড়েছে। যে পাখিটার নাম জানি না, তার নাম দিই মিছেমিছি ডোডোপাখি। দূর আকাশ থেকে নীল আলো আসে। জ্যোস্নার নদীতে রুপালি ঢেউয়ের মাথায় হেঁটে বেড়ায় ডোডোপাখির মত অচীন দুই রাজহাঁস। আমরা ঘাসের রাজ্যে ধানের খোসা, খড় এবং শুকনো পাতা দেখি। পাতা উড়ে-উড়ে নদীর ভেতর হেঁটে বেড়ায়। নদীর ভেতর মাটি গুঁড়িয়ে যাওয়ার শব্দ হয়। আমরা ঘাসের ভেতর হেঁটে বেড়ানো দুই যমজ বোনকে শনাক্ত করি এবং মস্তিষ্কে ও হৃদয়ে চিরকালীন ব্যথা পাওয়ার জন্য তাদের ভুলে যাই তৎক্ষণাৎ। আমাদের ঘাসরাজ্যে ইঁদুর, সাপ এবং কতিপয় দরিদ্র গাই গরু বেড়াতে-বেড়াতে মুগ্ধ চোখে আমাদেরকে দেখে। আমাদের সামান্য ক্লান্তি হয়। আবার বাদামী পাতার ঘ্রাণ এসে সেই ক্লান্তি দূরে সরিয়ে দেয়। অঘ্রান মাসের বিবর্ণ বাদামি পাখি তখন মাঠ থেকে হলুদ বিচালি কুড়োয়। কেউ আমাদের ছবি আঁকে, অথবা বুক পকেটজুড়ে ঘাসের ঘ্রাণ জমা করে। পাখির পালক উড়ে যায় মাঠের নির্জন বাথান বরাবর। বন্ধুদের কেউ ফিসফিস করে সুজাতাকে ভালবাসতাম আমি, এখনো কি ভালোবাসি? মনে হয় সূর্য নিভে যাচ্ছে আর আলো-আঁধারের এক তীব্র কলধ্বনি!

খুব ধীরে মোমের আলো আঁধার হয়ে আসছে। কবে এক দুপুরে চিলের গান এসেছিল আমাদের উঠোনে, সে সুর কানে আসে। আমরা একবার নক্ষত্রের দিকে চাই, একবার চাই প্রান্তরের দিকে। ঘাসের ভেতর চড়ুইয়ের ভাঙা ডিম দেখতে-দেখতে, কদম অথবা মউরির মৃদু গন্ধ আসে। গন্ধ আসে জ্যোস্নার, পেঁচার, হিজলের, কাঁচপোকাটিপের, রাতের শালিকের এবং কল্কাপাড় আঁচলের! নির্জন ক্যাম্প খাটে ভাসতে ভাসতে আমরা তখন দেশ-গাঁ জুড়ে বেড়ে ওঠা বন্দুক যুদ্ধের আভাস পাই। আমাদের অনেক কজন বন্ধু সবুজ ক্যাম্পাসের ভেতর তীব্র ক্রিমসন ছড়িয়ে বুলেট বুকে নিয়ে ঘাস-পাতার রূপকাহিনীতে নিঁখোজ হয়ে যায়। আমরা শিশিরের জল পায়ে মেখে অকালমৃত বন্ধুদের শরীর ছুঁয়ে উড়ে-বেড়ানো বাঁশপাতা দেখি অথবা খুঁজে-খুঁজে মাটির ফাটল আবিষ্কার করি। বন্ধুদের কেউ-কেউ ততদিনে আমাদের পরিত্যাগ করে নিষিদ্ধ বন্দুকে শরীর জাপটে ধরেছে, নল থেকে উদ্ভুত ক্ষমতায় সম্ভাব্য রাজ্য-উদ্বোধনের সুতীব্র কারু বাসনা। নীলাকাশ সেদিন বড্ড ভিজে এবং সকরুণ মনে হয়।

বন্ধুদের কেউ দেখতে পাই  অশ্বত্থ ও আমপাতা আড়াল করে দূর গাঁয়ের ভেতর-বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে শহরকে বৃত্তাবদ্ধ করার প্রতিজ্ঞায়। অন্য বন্ধুদের কেউ তখন পদ্য মগ্ন হয়, কেউ গলায় গনগনে আওয়াজ তোলে দিন বদলের, কেউ নাট্যপাগল হয়, কেই স্বপ্ন দেখে ছবি তৈরির, অথবা কেউ যায় ফোটোগ্রাফির ওয়ার্কশপে, অথবা এসব-ই আড়াল করে কেউ অজান্তে আটক হয়ে যায় হ্যালুসিনেজেনিক ওষুধ-সাম্রাজ্যে। আমরা কতিপয় অর্বাচীন মানুষ তখন বন্ধু হারানোর ব্যথা অনুভব করি, অথবা অনুভব করি হারানো এক পৃথিবীর গন্ধ; অথবা নিঁখোজ হতে থাকি পৃথিবীর সেই তীব্র অন্ধকার শীতরাজ্যে। হয়ত আলস্যে তখন আমরা কুয়াশা ভাললাগার গল্প করি, অথবা মেঠো-চাঁদের রাজ্যে পৌঁছে হঠাৎ আবিষ্কার করি বন্ধুদের ফেলে যাওয়া সারি সারি বন্দুকের নল। গোপন-হত্যা হয়ে যাওয়া বন্ধুদের কাদা-মাটি, লেন্স, বন্দুক দিয়ে আমরা এবার আমাদের ‘মেমোরাবিলিয়া’ তৈরির আয়োজন নিই ব্যক্তিগত শুশ্রুষার জন্য — পরিত্যক্ত বন্দুকের সরু নল আর মোটা নল কাঠের ফ্রেমের ওপর সাজিয়ে, দুটি ধাতব কাঠি দিয়ে আমরা কতিপয় মধ্যবয়স্ক মানুষ অনেক রাতে আনন্দ-বেদনার একখণ্ড সুর তৈরির চেষ্টা করি। আমরা ব্যর্থ হই, অথবা সফল হই সামান্য-ই! কারণ মাটির জগতে ‘নলতরঙ্গ’ নামক এই যন্ত্রে কেবল সুর তুলতে জানতেন বাবা আলাউদ্দীন খাঁ। ক্লান্ত, বহু ব্যবহৃত ইন্দ্রিয় দিয়ে দুর মাইহার-আকাশের নক্ষত্র থেকে চুইয়ে পড়া একদা সেই সুর খুঁজতে-খুঁজতে বহুদিনপর এবার দূর পৃথিবীর গন্ধ আন্দাজ হয় যৎসামান্য। সুর আমাদেরকে বিহ্বল করে, সুর আমাদেরকে হতচকিত করে, বিদ্ধ করে, সিক্ত করে, আর হঠাৎ-হঠাৎ অনুমান হয়, বন্ধুদের তালিকা থেকে এখন নাম মুছে ফেলার দিন যেন ক্রমাগত বাড়ছে — বন্ধু নিখোঁজ হয়, মুমূর্ষু হয়, কোমাতে যায় এবং মৃত্যুবরণ করে। পুরনো নোটবই খুলে মৃত বন্ধুর নাম-ঠিকানায় ঢ্যারা কাটি। মৃত বন্ধুরা ভালবেসে-মায়ায়-অভিমানে পার্কের বেঞ্চ খালি করে দেয়, আর ব্যাংকের করিডোরে পেনশান নেয়ার কিউ অনেককানি খাটো করে ফেলে— যেন আমরা অবশিষ্ট জীবিত ক’জন স্বাস্থ্য উদ্ধারের দৌড় শেষে পার্কের নির্জন বেঞ্চে হাত-পা ছড়িয়ে বসি, যেন মাংসের গোঁয়াড় আঁশের হ্যাংলা ঘর্ষণে আমরা পরস্পর চূর্ণ-বিচূর্ণ না হই, যেন শরীর থেকে গন্ধ তাড়ানোর জন্য আমাদের ডিওডোরেন্টের খরচ বাঁচে, আর আমরা যেন ভুলে যাই আড্ডা নামক এক অলৌকিক পৃথিবীর কাব্য-গান ও রূপকথা। 

নিরুপায় হয়ে এবেলা খুলে বসি সেই সব ধূসর গন্ধময়-ধুলো জমা স্ক্র্যাপ বুক — যেখানে বন্ধুদের ছবি, বন্ধুদের মুখ, বন্ধুদের নষ্ট হাতঘড়ি, এবং আমাদের হারানো ঘরবাড়ির আবছা-বিবর্ণ ছবি সেঁটে আছে ডাকটিকেটের মত। বন্ধুদের কেউ ছিল নেহায়েৎ কেজো, কেউ ছিল অফুরান আনন্দ বিতরণকারী, আর কেউ ছিল নিতান্ত ভালআত্মার! কান্ট বলতেন, মানুষ চেনা যায় তিনে  তার চোখ, তার বন্ধুবর্গ এবং তার পছন্দের উদ্ধৃতিতে। ছবির সীপিয়া রঙে আঙুল ঘষে, মাকড়সা এবং পোকামাকড়ের সংসার নস্যাত করে — এবার আবিষ্কার করি নিখোঁজ এক পৃথিবী থেকে যেন আলো এসে পড়েছে আমাদের জীর্ণকায় বসার ঘরে; আর খানিকটা ভেজামাটির, খানিকটা পাতার, খানিকটা জলস্রোতের এক অনিঃশেষ গন্ধ, মায়া ও বিভ্রম   এবার সেই আলোর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে: বন্ধুরা এখন যেন বা দূরের সেই তারকাখচিত আকাশ, সব বেলায় — সব সন্ধ্যায় দেখা হয় না বটে, কিন্তু অনুভব হয়, প্রাচীন সেই বন্ধুবলয় আমার শরীর-রক্তে প্রতিমুহূর্তে বর্তমান। অনভিব হয়, আমার যখন সবকুটু অব্যক্ত, তখন বন্ধুরাজ্য সেই শব্দ-ধ্বনি এখনও শুনতে পায় স্পষ্ট। স্মরণ হয়  আমি যখন ডানা মেলতে পারিনি, বন্ধুসকল আমাকে জাপ্টে উর্ধমুখী  করেছে। একা আলোর ভেতর না হেঁটে আমি বন্ধুর সঙ্গে একদা আঁধার-পথ হাঁটার আনন্দ-গান শিখেছিলাম। বিপুল-বিচিত্র গলিঘোঁজের পরেও বন্ধু গৃহে পোঁছনোর রাস্তা  সেদিন আবিষ্কৃত হয় সবচেয়ে কম দূরুত্বের। বন্ধুসভা আমার বুকের ভেতর উৎপাদিত সুর, সম্মেলক গান হিসেবে অনুশীলন করে অনবরত যখন গানের পুরো লিরিক বিদায় আমার বিস্মৃতির রাজ্যে। আমরা হাঁটি, সুররাজ্য মিলিয়ে গেলে স্তব্ধ হই ও পরস্পরের অদৃশ্য বাক্য রূপান্তর করি। আমরা পরস্পরকে কদাচিৎ বিদায়-সম্ভাষণ জ্ঞাপন করি, কেবল দীর্ঘ অসাক্ষাতে অনুভব হয় এ যাত্রা আমরা অজান্তে পরস্পরকে অসমর্থ-অসমতল-অসমঞ্জস এক দু’টি বরাদ্ধ করেছি মাত্র, কেবল দীর্ঘ-অসাক্ষাতে অনুভব হয় এ যাত্রা আমরা অজান্তে পরস্পরকে অসমর্থ-অসমতল-অসমঞ্জস এক দু’টি বরাদ্ধ করেছি মাত্র। পুরণো রসদ-সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে  আমরা আবার অসংহত-অসংস্কৃত-অসঙ্গ এক পথ নির্মান করি স্তব্ধ হই, আমাদের যৌথ ছবির সীপিয়া রং দেখি, আর অনিঃশেষ মায়া ও বিভ্রম হঠাৎ-ই বহুদিন অদেখা বন্ধুসভার কথা ভেবে ধন্ধে পড়ি: আমরা কী সত্যিই কখনও  কোনদিন অন্যিন্দ এক বন্ধুত্ব-বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলাম? তাহলে বন্ধুত্ব কী কোন চুক্তিপত্র, বন্ধুত্ব কী কোন আলোড়ন, বন্ধুত্ব আদতে কী কোন ঘটনা, নাকি শেষ পর্যন্ত অসামাল- অসাদৃশ্য জগৎ সংসারে আমরা ছিলাম নিছক কয়েকঘর অচেনা-অদেখা মানুষ, যাদের সঞ্চয় ছিল কেবলমাত্র যৎকিঞ্চিৎ স্মৃতি, স্বপ্ন, ভয় ও আনন্দের তৃষ্ণা; যখন বন্ধুত্ব নামক এক সাঁঝের-ছায়া, কেবলই বিস্তৃত হয়েছিল ডুবন্ত- সূর্যের আলো পাল্লা দিয়ে আদিগন্ত  বিস্তীর্ণ, বিতীর্ণ ও প্রসারিত। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬


দূর পৃথিবীর গন্ধ

প্রকাশের তারিখ : ১১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বন্ধুদের উচ্চারিত শব্দ জমা করে এতদিন পর আবার বাক্য বানাই  ভয়, ভুল, মৃত্যু ও গ্লানি সমাচ্ছন্ন পৃথিবীতে আজ আর ভালো আলো নেই! কথাটি বলছি বটে, কিন্তু আমি পলাতক মানুষের মত তক্ষুণি পেছন ফিরে হাঁটতে থাকি। দৃষ্টিক্ষীণ হয়ে আসা চোখে তখন তিন দশকের প্রাচীন বরেন্দ্র শহর, রুগ্ন ঘোড়াগাড়ি, মুমূর্ষু নদী এবং অভয়ারণ্যের মত একখণ্ড সবুজ মতিহার-ক্যাম্পাস মৃদু আলো-আঁধার হয়ে দৌড়াতে শুরু করেছে। আমি এ-সবের পিছুপিছু দৌড়াই, বিশ্রাম নিই, হাঁটতে থাকি, অথবা হাঁটতে হাঁটতে নিঁখোজ সেই স্বপ্ন-রাজ্য খুঁজতে থাকি সারা সকাল-সন্ধ্যা। দেখি জামরুল ফুলের ভেতর মৌমাছি ঘরকন্যা শুরু করেছে। কমলা রঙের শাল গায়ে কন্যা-বন্ধুরা হাঁটছেন। বৃষ্টির মত কুয়াশা। জলের বুকে মাছরাঙার ছায়া পড়েছে। যে পাখিটার নাম জানি না, তার নাম দিই মিছেমিছি ডোডোপাখি। দূর আকাশ থেকে নীল আলো আসে। জ্যোস্নার নদীতে রুপালি ঢেউয়ের মাথায় হেঁটে বেড়ায় ডোডোপাখির মত অচীন দুই রাজহাঁস। আমরা ঘাসের রাজ্যে ধানের খোসা, খড় এবং শুকনো পাতা দেখি। পাতা উড়ে-উড়ে নদীর ভেতর হেঁটে বেড়ায়। নদীর ভেতর মাটি গুঁড়িয়ে যাওয়ার শব্দ হয়। আমরা ঘাসের ভেতর হেঁটে বেড়ানো দুই যমজ বোনকে শনাক্ত করি এবং মস্তিষ্কে ও হৃদয়ে চিরকালীন ব্যথা পাওয়ার জন্য তাদের ভুলে যাই তৎক্ষণাৎ। আমাদের ঘাসরাজ্যে ইঁদুর, সাপ এবং কতিপয় দরিদ্র গাই গরু বেড়াতে-বেড়াতে মুগ্ধ চোখে আমাদেরকে দেখে। আমাদের সামান্য ক্লান্তি হয়। আবার বাদামী পাতার ঘ্রাণ এসে সেই ক্লান্তি দূরে সরিয়ে দেয়। অঘ্রান মাসের বিবর্ণ বাদামি পাখি তখন মাঠ থেকে হলুদ বিচালি কুড়োয়। কেউ আমাদের ছবি আঁকে, অথবা বুক পকেটজুড়ে ঘাসের ঘ্রাণ জমা করে। পাখির পালক উড়ে যায় মাঠের নির্জন বাথান বরাবর। বন্ধুদের কেউ ফিসফিস করে সুজাতাকে ভালবাসতাম আমি, এখনো কি ভালোবাসি? মনে হয় সূর্য নিভে যাচ্ছে আর আলো-আঁধারের এক তীব্র কলধ্বনি!

খুব ধীরে মোমের আলো আঁধার হয়ে আসছে। কবে এক দুপুরে চিলের গান এসেছিল আমাদের উঠোনে, সে সুর কানে আসে। আমরা একবার নক্ষত্রের দিকে চাই, একবার চাই প্রান্তরের দিকে। ঘাসের ভেতর চড়ুইয়ের ভাঙা ডিম দেখতে-দেখতে, কদম অথবা মউরির মৃদু গন্ধ আসে। গন্ধ আসে জ্যোস্নার, পেঁচার, হিজলের, কাঁচপোকাটিপের, রাতের শালিকের এবং কল্কাপাড় আঁচলের! নির্জন ক্যাম্প খাটে ভাসতে ভাসতে আমরা তখন দেশ-গাঁ জুড়ে বেড়ে ওঠা বন্দুক যুদ্ধের আভাস পাই। আমাদের অনেক কজন বন্ধু সবুজ ক্যাম্পাসের ভেতর তীব্র ক্রিমসন ছড়িয়ে বুলেট বুকে নিয়ে ঘাস-পাতার রূপকাহিনীতে নিঁখোজ হয়ে যায়। আমরা শিশিরের জল পায়ে মেখে অকালমৃত বন্ধুদের শরীর ছুঁয়ে উড়ে-বেড়ানো বাঁশপাতা দেখি অথবা খুঁজে-খুঁজে মাটির ফাটল আবিষ্কার করি। বন্ধুদের কেউ-কেউ ততদিনে আমাদের পরিত্যাগ করে নিষিদ্ধ বন্দুকে শরীর জাপটে ধরেছে, নল থেকে উদ্ভুত ক্ষমতায় সম্ভাব্য রাজ্য-উদ্বোধনের সুতীব্র কারু বাসনা। নীলাকাশ সেদিন বড্ড ভিজে এবং সকরুণ মনে হয়।

বন্ধুদের কেউ দেখতে পাই  অশ্বত্থ ও আমপাতা আড়াল করে দূর গাঁয়ের ভেতর-বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে শহরকে বৃত্তাবদ্ধ করার প্রতিজ্ঞায়। অন্য বন্ধুদের কেউ তখন পদ্য মগ্ন হয়, কেউ গলায় গনগনে আওয়াজ তোলে দিন বদলের, কেউ নাট্যপাগল হয়, কেই স্বপ্ন দেখে ছবি তৈরির, অথবা কেউ যায় ফোটোগ্রাফির ওয়ার্কশপে, অথবা এসব-ই আড়াল করে কেউ অজান্তে আটক হয়ে যায় হ্যালুসিনেজেনিক ওষুধ-সাম্রাজ্যে। আমরা কতিপয় অর্বাচীন মানুষ তখন বন্ধু হারানোর ব্যথা অনুভব করি, অথবা অনুভব করি হারানো এক পৃথিবীর গন্ধ; অথবা নিঁখোজ হতে থাকি পৃথিবীর সেই তীব্র অন্ধকার শীতরাজ্যে। হয়ত আলস্যে তখন আমরা কুয়াশা ভাললাগার গল্প করি, অথবা মেঠো-চাঁদের রাজ্যে পৌঁছে হঠাৎ আবিষ্কার করি বন্ধুদের ফেলে যাওয়া সারি সারি বন্দুকের নল। গোপন-হত্যা হয়ে যাওয়া বন্ধুদের কাদা-মাটি, লেন্স, বন্দুক দিয়ে আমরা এবার আমাদের ‘মেমোরাবিলিয়া’ তৈরির আয়োজন নিই ব্যক্তিগত শুশ্রুষার জন্য — পরিত্যক্ত বন্দুকের সরু নল আর মোটা নল কাঠের ফ্রেমের ওপর সাজিয়ে, দুটি ধাতব কাঠি দিয়ে আমরা কতিপয় মধ্যবয়স্ক মানুষ অনেক রাতে আনন্দ-বেদনার একখণ্ড সুর তৈরির চেষ্টা করি। আমরা ব্যর্থ হই, অথবা সফল হই সামান্য-ই! কারণ মাটির জগতে ‘নলতরঙ্গ’ নামক এই যন্ত্রে কেবল সুর তুলতে জানতেন বাবা আলাউদ্দীন খাঁ। ক্লান্ত, বহু ব্যবহৃত ইন্দ্রিয় দিয়ে দুর মাইহার-আকাশের নক্ষত্র থেকে চুইয়ে পড়া একদা সেই সুর খুঁজতে-খুঁজতে বহুদিনপর এবার দূর পৃথিবীর গন্ধ আন্দাজ হয় যৎসামান্য। সুর আমাদেরকে বিহ্বল করে, সুর আমাদেরকে হতচকিত করে, বিদ্ধ করে, সিক্ত করে, আর হঠাৎ-হঠাৎ অনুমান হয়, বন্ধুদের তালিকা থেকে এখন নাম মুছে ফেলার দিন যেন ক্রমাগত বাড়ছে — বন্ধু নিখোঁজ হয়, মুমূর্ষু হয়, কোমাতে যায় এবং মৃত্যুবরণ করে। পুরনো নোটবই খুলে মৃত বন্ধুর নাম-ঠিকানায় ঢ্যারা কাটি। মৃত বন্ধুরা ভালবেসে-মায়ায়-অভিমানে পার্কের বেঞ্চ খালি করে দেয়, আর ব্যাংকের করিডোরে পেনশান নেয়ার কিউ অনেককানি খাটো করে ফেলে— যেন আমরা অবশিষ্ট জীবিত ক’জন স্বাস্থ্য উদ্ধারের দৌড় শেষে পার্কের নির্জন বেঞ্চে হাত-পা ছড়িয়ে বসি, যেন মাংসের গোঁয়াড় আঁশের হ্যাংলা ঘর্ষণে আমরা পরস্পর চূর্ণ-বিচূর্ণ না হই, যেন শরীর থেকে গন্ধ তাড়ানোর জন্য আমাদের ডিওডোরেন্টের খরচ বাঁচে, আর আমরা যেন ভুলে যাই আড্ডা নামক এক অলৌকিক পৃথিবীর কাব্য-গান ও রূপকথা। 

নিরুপায় হয়ে এবেলা খুলে বসি সেই সব ধূসর গন্ধময়-ধুলো জমা স্ক্র্যাপ বুক — যেখানে বন্ধুদের ছবি, বন্ধুদের মুখ, বন্ধুদের নষ্ট হাতঘড়ি, এবং আমাদের হারানো ঘরবাড়ির আবছা-বিবর্ণ ছবি সেঁটে আছে ডাকটিকেটের মত। বন্ধুদের কেউ ছিল নেহায়েৎ কেজো, কেউ ছিল অফুরান আনন্দ বিতরণকারী, আর কেউ ছিল নিতান্ত ভালআত্মার! কান্ট বলতেন, মানুষ চেনা যায় তিনে  তার চোখ, তার বন্ধুবর্গ এবং তার পছন্দের উদ্ধৃতিতে। ছবির সীপিয়া রঙে আঙুল ঘষে, মাকড়সা এবং পোকামাকড়ের সংসার নস্যাত করে — এবার আবিষ্কার করি নিখোঁজ এক পৃথিবী থেকে যেন আলো এসে পড়েছে আমাদের জীর্ণকায় বসার ঘরে; আর খানিকটা ভেজামাটির, খানিকটা পাতার, খানিকটা জলস্রোতের এক অনিঃশেষ গন্ধ, মায়া ও বিভ্রম   এবার সেই আলোর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে: বন্ধুরা এখন যেন বা দূরের সেই তারকাখচিত আকাশ, সব বেলায় — সব সন্ধ্যায় দেখা হয় না বটে, কিন্তু অনুভব হয়, প্রাচীন সেই বন্ধুবলয় আমার শরীর-রক্তে প্রতিমুহূর্তে বর্তমান। অনভিব হয়, আমার যখন সবকুটু অব্যক্ত, তখন বন্ধুরাজ্য সেই শব্দ-ধ্বনি এখনও শুনতে পায় স্পষ্ট। স্মরণ হয়  আমি যখন ডানা মেলতে পারিনি, বন্ধুসকল আমাকে জাপ্টে উর্ধমুখী  করেছে। একা আলোর ভেতর না হেঁটে আমি বন্ধুর সঙ্গে একদা আঁধার-পথ হাঁটার আনন্দ-গান শিখেছিলাম। বিপুল-বিচিত্র গলিঘোঁজের পরেও বন্ধু গৃহে পোঁছনোর রাস্তা  সেদিন আবিষ্কৃত হয় সবচেয়ে কম দূরুত্বের। বন্ধুসভা আমার বুকের ভেতর উৎপাদিত সুর, সম্মেলক গান হিসেবে অনুশীলন করে অনবরত যখন গানের পুরো লিরিক বিদায় আমার বিস্মৃতির রাজ্যে। আমরা হাঁটি, সুররাজ্য মিলিয়ে গেলে স্তব্ধ হই ও পরস্পরের অদৃশ্য বাক্য রূপান্তর করি। আমরা পরস্পরকে কদাচিৎ বিদায়-সম্ভাষণ জ্ঞাপন করি, কেবল দীর্ঘ অসাক্ষাতে অনুভব হয় এ যাত্রা আমরা অজান্তে পরস্পরকে অসমর্থ-অসমতল-অসমঞ্জস এক দু’টি বরাদ্ধ করেছি মাত্র, কেবল দীর্ঘ-অসাক্ষাতে অনুভব হয় এ যাত্রা আমরা অজান্তে পরস্পরকে অসমর্থ-অসমতল-অসমঞ্জস এক দু’টি বরাদ্ধ করেছি মাত্র। পুরণো রসদ-সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে  আমরা আবার অসংহত-অসংস্কৃত-অসঙ্গ এক পথ নির্মান করি স্তব্ধ হই, আমাদের যৌথ ছবির সীপিয়া রং দেখি, আর অনিঃশেষ মায়া ও বিভ্রম হঠাৎ-ই বহুদিন অদেখা বন্ধুসভার কথা ভেবে ধন্ধে পড়ি: আমরা কী সত্যিই কখনও  কোনদিন অন্যিন্দ এক বন্ধুত্ব-বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলাম? তাহলে বন্ধুত্ব কী কোন চুক্তিপত্র, বন্ধুত্ব কী কোন আলোড়ন, বন্ধুত্ব আদতে কী কোন ঘটনা, নাকি শেষ পর্যন্ত অসামাল- অসাদৃশ্য জগৎ সংসারে আমরা ছিলাম নিছক কয়েকঘর অচেনা-অদেখা মানুষ, যাদের সঞ্চয় ছিল কেবলমাত্র যৎকিঞ্চিৎ স্মৃতি, স্বপ্ন, ভয় ও আনন্দের তৃষ্ণা; যখন বন্ধুত্ব নামক এক সাঁঝের-ছায়া, কেবলই বিস্তৃত হয়েছিল ডুবন্ত- সূর্যের আলো পাল্লা দিয়ে আদিগন্ত  বিস্তীর্ণ, বিতীর্ণ ও প্রসারিত। 



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত