সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বৈসাবি উৎসবে মাতোয়ারা তিন পার্বত্যজেলা


শতদল বড়ুয়া
শতদল বড়ুয়া
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৭ পিএম

বৈসাবি উৎসবে মাতোয়ারা তিন পার্বত্যজেলা
পাহাড়িরা চৈত্র মাসের শেষ দিনকে বৈসাবি উৎসব হিসেবে পালন করে

‘কাট্টোল পাযোগ বিজু এজোক্র--অর্থাৎ কাঁঠাল পাঁকবে বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি আসবে| এ বচন দিয়ে লেখা শুরু করছি| যখন বউ কথা কউ পাখিটি ডাকতে শুরু করে, কোকিল যখন কুহু কুহু ডাকবে, তখনি বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের আগমনের বার্তা নিয়ে আসে| 

বিজুর আগমনের প্রতীক্ষায় আবেগ নিবিড় হয়ে অতিবাহিত করতে হয়| কখন যে বিজু আসবে? এভাবে দিনের পর যেতে এমনি মুহূর্তে হঠাৎ চলে আসে বিজু বা ‘বৈসাবি নামক উৎসবটি’| 

গতকাল চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন| আগামীকাল থেকে শুরু হবে নতুন বঙ্গাব্দ| অর্থাৎ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১ বৈশাখ| পাহাড়িরা চৈত্র মাসের শেষ দিনকে ‘বৈসাবি উৎসব হিসেবে পালন করে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে| পাহাড়ের তিন সম্প্রদায় আজকের দিনের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে| পাহাড়ে বসবাসরত সকল মানুষের মাঝে প্রতি বছর এক আনন্দের বন্যা আসে, যা জাতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে একে অন্যের স্নেহ ভালোবাসার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে| 

তাই বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, ‘বৈসাবি অহিংসার প্রতীক, বন্ধুত্বের প্রতীক, মৈত্রীর প্রতীক| বৈসাবি অর্থ- ‘বৈ’ এই প্রথম অক্ষর দিয়ে বৈশাখীও বলতে পারি| বৈ+সা+বি= বৈসাবি, অর্থাৎ ‘বৈ’ মানে ‘বৈষু’- এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘সা’ মানে ‘সাংগ্রাই’- এটি মার্মা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘বি’ মানে ‘বিঝ’-এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| 

সুতরাং বছরের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষ’, মার্মা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’, চাকমা সম্প্রদায় ‘বিষু’ নামে অভিহিত করে থাকে| তিন সম্প্রদায়ের আদি অক্ষর দিয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৈসাবি’| এখন এ বিষয়ে আলোকপাতে যাচ্ছি কোন সম্প্রদায় কীভাবে বৈসাবি উদযাপন করে| 

বষু: পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে ‘বৈষ’ বলে| এরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী| এ দিনে এরা অনাগত দিনগুলোতে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্যে মন্দিরে গিয়ে পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করে| কিশোর-কিশোরীরা এ দিনে প্রতি বাড়িতে গিয়ে ফুল বিতরণ করে এবং যুবক-যুবতীরা তার প্রিয়জনকেও ফুল দিয়ে ভালোবাসার শুভেচ্ছা জানায়| 

ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’ তিনটি পর্বে উদযাপন করে| হারি বৈষু, বিষুমা বৈষু ও বিসিকাতাল বৈষু| এ উৎসবে তারা জাতি ভেদাভেদ, হিংসাবিদ্বেষ, শত্রুতা সবকিছু ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়| বৈষু দিনে এরা পাচন, সেমাই, পিঠা ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করে থাকে| গরু-মহিষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ তিতিক্ষার ফলে তাদের দ্বারা বছরের অন্ন সংস্থান হয় বলে এ দিনে গরু, মহিষকে স্নান করিয়ে দেয়া হয় এবং গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে দেয়া হয়| ধূপ, প্রদীপ জেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মধ্য দিয়ে তারা বৈষু পালন করে| 

সাংগ্রাই: সাংগ্রাই, এটি মার্মা ভাষা| মার্মা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে সাংগ্রাই নামে অভিহিত করে থাকে| বৈশাখের প্রথমদিন তারা সাংগ্রাই উৎসব পালন করে| পিঠা, পাচন, সেমাইয়ের আয়োজন থাকে| সব বয়সী লোকেরা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় ও আনন্দ উৎসব করে| তবে দিনের প্রধান আকর্ষণ জলোৎসব| মার্মা ভাষায় এটিকে বলে ‘রিলংপোয়ে’| জলখেলার জন্যে আগে থেকে প্যান্ডেল তৈরি করে| এখানে যুবক-যুবতীরা একে অন্যকে লক্ষ্য করে জলছিটিয়ে কাবু করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়| বয়োবৃদ্ধরা এ দিনে ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিহারে বা মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হয়| ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা অতর্কিত জল ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে সাংগ্রাই উৎসবকে বিদায় জানায়| 

বিজু: বিজু, এটি চাকমা ভাষা| চাকমারা বিজু উৎসবকে তিন পর্বে ভাগ করে উপভোগ করেন| বছরের শেষ অর্থাৎ ˆচত্র মাসের ২৯ তারিখ ফুল বিজু, ৩০ চৈত্রকে মূল বিজু ও নববর্ষের প্রথমদিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ ‘গজ্যাপজ্যা’ বিজু হিসেবে উৎসব পালন করে| 

ফুল বিজু: ফুল বিজুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নানা রকমের ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা| ফুল সংগ্রহ করার পর চারভাগে ভাগ করে একভাগ দিয়ে নিজের মনের মতো করে বাড়ি সাজায়, অন্য একভাগ দিয়ে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে সমবেতভাবে বুদ্ধের উপাসনা করে এবং ভিক্ষুদের নিকট থেকে পঞ্চশীল গ্রহণপূর্বক ধর্মদেশনা শোনেন| অন্য একভাগ দিয়ে ছড়া বা নদীতে বা পুকুরপাড়ে পূজামণ্ডপ তৈরি করে প্রার্থনা করে যেনো সারা বছর পানির ন্যায় অর্থাৎ পানি যেমন শান্তশিষ্ট সেরূপ নিজেও শান্তশিষ্ট বা ভালোভাবে জীবনযাপন অতিবাহিত করতে পারে| আর একভাগ ফুল নিয়ে প্রিয়জনকে ভালোবাসার উপহার দেয়| কেউ কেউ ফুল দিয়ে বন্ধুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়| 

মূল বিজু: মূল বিজু হচ্ছে বিজুর প্রথমদিন| ফুল বিজুদিনে মূল বিজুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়| এ দিনে ঘরের মহিলারা খুবই ব্যস্ত থাকে| তারা ৩০-৪০ প্রকার তরিতরকারি মিশ্রণে ঘন্ড বা পাচন তৈরি করা হয়| প্রচলিত আছে-এ দিন যে যতো বাড়িতে গিয়ে যতোবেশি পাচন খাবে ততোবেশি মঙ্গল হবে| পাচন ছাড়াও নানা ধরনের পিঠা, বিনিধানের খই, লাড়ু, সেমাই, মদ ইত্যাদির আয়োজন করে| এ দিনে সবার বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যখন যার ইচ্ছে আসতে কোনো বাঁধা নেই| 

যারা বেড়াতে আসে তাদের বাড়ির মালিক যথাযথ আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখে না| উপরে উল্লিখিত আইটেম পরিবেশন করা হয়| সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বাড়ির দরজা, উঠানে, গো-শালায়, বৌদ্ধ বিহারে প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়| 

গজ্যাপজ্যা বিজু: নববর্ষের প্রথমদিনটিকে চাকমারা গজ্যাপাজ্যা বিজু হিসেবে উদযাপন করে| এই দিন বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে বিশ্রামের সঙ্গে দিনটিকে অতিবাহিত করা হয়| ছোটরা বড়দের নমস্কার করে এবং স্নান করিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে| সন্ধ্যায় স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করে অনাগত দিনগুলো যাতে সকলের জন্যে মঙ্গলময় হয় এই প্রার্থনা শেষের পর গজ্যাপজ্যা বিজুর পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়| 

‘বৈসাবি হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের উৎসব| এই উৎসবের মধ্যদিয়ে অতীতের সব দুঃখ, গ্লানি, বেদনা, ক্ষোভ, উঁচু- নিচু, ধনী-গরিব বৈষম্য পরিহার করে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়| একদিকে যেমন ধর্মীয় বিধান, অন্যদিকে সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশও ‘বৈসাবি বহন করে| এটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব হলেও সবার অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন সফলতা লাভ করে| 

 [লেখক: প্রাবন্ধিক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬


বৈসাবি উৎসবে মাতোয়ারা তিন পার্বত্যজেলা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

‘কাট্টোল পাযোগ বিজু এজোক্র--অর্থাৎ কাঁঠাল পাঁকবে বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি আসবে| এ বচন দিয়ে লেখা শুরু করছি| যখন বউ কথা কউ পাখিটি ডাকতে শুরু করে, কোকিল যখন কুহু কুহু ডাকবে, তখনি বিজু বা চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবের আগমনের বার্তা নিয়ে আসে| 

বিজুর আগমনের প্রতীক্ষায় আবেগ নিবিড় হয়ে অতিবাহিত করতে হয়| কখন যে বিজু আসবে? এভাবে দিনের পর যেতে এমনি মুহূর্তে হঠাৎ চলে আসে বিজু বা ‘বৈসাবি নামক উৎসবটি’| 

গতকাল চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন| আগামীকাল থেকে শুরু হবে নতুন বঙ্গাব্দ| অর্থাৎ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১ বৈশাখ| পাহাড়িরা চৈত্র মাসের শেষ দিনকে ‘বৈসাবি উৎসব হিসেবে পালন করে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে| পাহাড়ের তিন সম্প্রদায় আজকের দিনের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে| পাহাড়ে বসবাসরত সকল মানুষের মাঝে প্রতি বছর এক আনন্দের বন্যা আসে, যা জাতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে একে অন্যের স্নেহ ভালোবাসার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে| 

তাই বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, ‘বৈসাবি অহিংসার প্রতীক, বন্ধুত্বের প্রতীক, মৈত্রীর প্রতীক| বৈসাবি অর্থ- ‘বৈ’ এই প্রথম অক্ষর দিয়ে বৈশাখীও বলতে পারি| বৈ+সা+বি= বৈসাবি, অর্থাৎ ‘বৈ’ মানে ‘বৈষু’- এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘সা’ মানে ‘সাংগ্রাই’- এটি মার্মা সম্প্রদায়ের ভাষা| ‘বি’ মানে ‘বিঝ’-এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা| 

সুতরাং বছরের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষ’, মার্মা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’, চাকমা সম্প্রদায় ‘বিষু’ নামে অভিহিত করে থাকে| তিন সম্প্রদায়ের আদি অক্ষর দিয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৈসাবি’| এখন এ বিষয়ে আলোকপাতে যাচ্ছি কোন সম্প্রদায় কীভাবে বৈসাবি উদযাপন করে| 

বষু: পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে ‘বৈষ’ বলে| এরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী| এ দিনে এরা অনাগত দিনগুলোতে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্যে মন্দিরে গিয়ে পরম করুণাময়ের নিকট প্রার্থনা করে| কিশোর-কিশোরীরা এ দিনে প্রতি বাড়িতে গিয়ে ফুল বিতরণ করে এবং যুবক-যুবতীরা তার প্রিয়জনকেও ফুল দিয়ে ভালোবাসার শুভেচ্ছা জানায়| 

ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’ তিনটি পর্বে উদযাপন করে| হারি বৈষু, বিষুমা বৈষু ও বিসিকাতাল বৈষু| এ উৎসবে তারা জাতি ভেদাভেদ, হিংসাবিদ্বেষ, শত্রুতা সবকিছু ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়| বৈষু দিনে এরা পাচন, সেমাই, পিঠা ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করে থাকে| গরু-মহিষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ তিতিক্ষার ফলে তাদের দ্বারা বছরের অন্ন সংস্থান হয় বলে এ দিনে গরু, মহিষকে স্নান করিয়ে দেয়া হয় এবং গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে দেয়া হয়| ধূপ, প্রদীপ জেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মধ্য দিয়ে তারা বৈষু পালন করে| 

সাংগ্রাই: সাংগ্রাই, এটি মার্মা ভাষা| মার্মা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে সাংগ্রাই নামে অভিহিত করে থাকে| বৈশাখের প্রথমদিন তারা সাংগ্রাই উৎসব পালন করে| পিঠা, পাচন, সেমাইয়ের আয়োজন থাকে| সব বয়সী লোকেরা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় ও আনন্দ উৎসব করে| তবে দিনের প্রধান আকর্ষণ জলোৎসব| মার্মা ভাষায় এটিকে বলে ‘রিলংপোয়ে’| জলখেলার জন্যে আগে থেকে প্যান্ডেল তৈরি করে| এখানে যুবক-যুবতীরা একে অন্যকে লক্ষ্য করে জলছিটিয়ে কাবু করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়| বয়োবৃদ্ধরা এ দিনে ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিহারে বা মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হয়| ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েরা অতর্কিত জল ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে সাংগ্রাই উৎসবকে বিদায় জানায়| 

বিজু: বিজু, এটি চাকমা ভাষা| চাকমারা বিজু উৎসবকে তিন পর্বে ভাগ করে উপভোগ করেন| বছরের শেষ অর্থাৎ ˆচত্র মাসের ২৯ তারিখ ফুল বিজু, ৩০ চৈত্রকে মূল বিজু ও নববর্ষের প্রথমদিন অর্থাৎ ১ বৈশাখ ‘গজ্যাপজ্যা’ বিজু হিসেবে উৎসব পালন করে| 

ফুল বিজু: ফুল বিজুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নানা রকমের ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা| ফুল সংগ্রহ করার পর চারভাগে ভাগ করে একভাগ দিয়ে নিজের মনের মতো করে বাড়ি সাজায়, অন্য একভাগ দিয়ে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে সমবেতভাবে বুদ্ধের উপাসনা করে এবং ভিক্ষুদের নিকট থেকে পঞ্চশীল গ্রহণপূর্বক ধর্মদেশনা শোনেন| অন্য একভাগ দিয়ে ছড়া বা নদীতে বা পুকুরপাড়ে পূজামণ্ডপ তৈরি করে প্রার্থনা করে যেনো সারা বছর পানির ন্যায় অর্থাৎ পানি যেমন শান্তশিষ্ট সেরূপ নিজেও শান্তশিষ্ট বা ভালোভাবে জীবনযাপন অতিবাহিত করতে পারে| আর একভাগ ফুল নিয়ে প্রিয়জনকে ভালোবাসার উপহার দেয়| কেউ কেউ ফুল দিয়ে বন্ধুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়| 

মূল বিজু: মূল বিজু হচ্ছে বিজুর প্রথমদিন| ফুল বিজুদিনে মূল বিজুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়| এ দিনে ঘরের মহিলারা খুবই ব্যস্ত থাকে| তারা ৩০-৪০ প্রকার তরিতরকারি মিশ্রণে ঘন্ড বা পাচন তৈরি করা হয়| প্রচলিত আছে-এ দিন যে যতো বাড়িতে গিয়ে যতোবেশি পাচন খাবে ততোবেশি মঙ্গল হবে| পাচন ছাড়াও নানা ধরনের পিঠা, বিনিধানের খই, লাড়ু, সেমাই, মদ ইত্যাদির আয়োজন করে| এ দিনে সবার বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যখন যার ইচ্ছে আসতে কোনো বাঁধা নেই| 

যারা বেড়াতে আসে তাদের বাড়ির মালিক যথাযথ আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখে না| উপরে উল্লিখিত আইটেম পরিবেশন করা হয়| সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বাড়ির দরজা, উঠানে, গো-শালায়, বৌদ্ধ বিহারে প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়| 

গজ্যাপজ্যা বিজু: নববর্ষের প্রথমদিনটিকে চাকমারা গজ্যাপাজ্যা বিজু হিসেবে উদযাপন করে| এই দিন বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে বিশ্রামের সঙ্গে দিনটিকে অতিবাহিত করা হয়| ছোটরা বড়দের নমস্কার করে এবং স্নান করিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে| সন্ধ্যায় স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করে অনাগত দিনগুলো যাতে সকলের জন্যে মঙ্গলময় হয় এই প্রার্থনা শেষের পর গজ্যাপজ্যা বিজুর পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়| 

‘বৈসাবি হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের উৎসব| এই উৎসবের মধ্যদিয়ে অতীতের সব দুঃখ, গ্লানি, বেদনা, ক্ষোভ, উঁচু- নিচু, ধনী-গরিব বৈষম্য পরিহার করে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়| একদিকে যেমন ধর্মীয় বিধান, অন্যদিকে সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশও ‘বৈসাবি বহন করে| এটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব হলেও সবার অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন সফলতা লাভ করে| 

 [লেখক: প্রাবন্ধিক]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত