কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকিনীর-পাঠ বাজার। হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে গরুর মাংস বিক্রি বন্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সেই প্রথা ভেঙে বাজারে গরু জবাই করার ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে ব্যক্তিগত মালিকানায় এই বাজারটির যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে এটি ছোট থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষেরা সেখানে দোকানপাট গড়ে তোলেন।
বাজারের মাঝখানে একটি কালীমন্দির থাকায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি হয় যে মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় বাজারে কোনো গরু জবাই করা হবে না।
বিগত চার দশক ধরে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগসহ সব সরকারের আমলেই এই প্রথা মেনে বাজারটি পরিচালিত হয়ে আসছিল।
তবে গত ১২ এপ্রিল ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আজিজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি বাজারে একটি গরু জবাই করেন। দীর্ঘদিনের প্রথা ভাঙার এই ঘটনা জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। স্থানীয়দের মধ্যেও দেখা দেয় উত্তেজনা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ৭ এপ্রিল দুই সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নাগেশ্বরী থানায় বৈঠকে বসেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে বাজারে আগের মতোই কোনো গরু জবাই বা মাংস বিক্রি করা হবে না। অর্থাৎ, পূর্বের প্রথা বহাল থাকবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর থেকে এখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে আছি। কখনো কোনো বিবাদ হয়নি। এবার হঠাৎ গরু জবাইয়ের ঘটনায় একটু বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আমরা কোনো অশান্তি চাই না।’
বাজারের কালীমন্দির কমিটির সদস্য কাঞ্চন কুমার বর্মন বলেন, ‘৪০ বছর আগে মুসলিম ভাইদের অনুরোধেই এখানে বাজার গড়ে ওঠে। মন্দিরটি বাজারের একদম মাঝে হওয়ায় আমরা অনুরোধ করেছিলাম যেন এখানে গরু জবাই না করা হয়। তাঁরা সেই অনুরোধ রেখেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর সেই প্রথাটি এবার ভেঙে গেছে।’
অন্যদিকে, গরু জবাই করা আজিজুল হক বলেন, ‘সময়ের প্রয়োজনে এখানে মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে, মাংসের চাহিদাও আছে। হিন্দুদের কোনো আপত্তি নেই বলে আমি মনে করি। কিছু মানুষ রাজনৈতিক ফায়দা নিতে বাধা দিচ্ছে।’
ভিতরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শফিউল আলম বলেন, মন্দিরের পবিত্রতা ও পারস্পরিক সমঝোতার খাতিরেই এতদিন এখানে গরু জবাই হয়নি। একটি পক্ষ এখন সেই সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ হিল জামান বলেন, সম্প্রীতি বজায় রাখতে বাজার মালিকপক্ষ নিজ উদ্যোগেই মাংস বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো চাপ ছিল না। পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে এবং পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন