সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

রাইস ব্র্যান প্রোটিন: বাংলাদেশের ধান শিল্পে নতুন সম্ভাবনা


শহীদুল ইসলাম
শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬

রাইস ব্র্যান প্রোটিন: বাংলাদেশের ধান শিল্পে নতুন সম্ভাবনা
প্রথমে রাইস ব্র্যান থেকে তেল নিষ্কাশন করা হয় এবং এরপর অবশিষ্ট অংশ, যা ডিফ্যাটেড রাইস ব্র্যান নামে পরিচিত, সেখান থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রোটিন আলাদা করা হয়

ধান বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান উৎপাদনকারী দেশ এবং প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদিত হয়। ধান মাড়াইয়ের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপপণ্য হিসেবে উৎপন্ন হয় রাইস ব্র্যান । রাইস ব্র্যান মূলত ধানের বাইরের স্তর, যা ব্রাউন রাইস থেকে সাদা চাল তৈরি করার সময় অপসারণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই উপ-পণ্যটিকে তুলনামূলক কম মূল্যবান বলে মনে করা হতো এবং এটি প্রধানত পোল্ট্রি ফিড, গবাদিপশুর খাদ্য বা তেল উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে রাইস ব্র্যান অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি উপাদান, যার মধ্যে রয়েছে তেল, প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, খনিজ এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এর মধ্যে রাইস ব্র্যান প্রোটিন বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিজ্জ প্রোটিন হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাইস ব্র্যান প্রোটিন বলতে রাইস ব্র্যান থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আলাদা করা প্রোটিনকে বোঝায়। সাধারণত রাইস ব্রানে ১২-১৮ শতাংশ প্রোটিন এবং ১২ থেকে ২০ শতাংশ তেল থাকে, পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যআঁশ ও অন্য পুষ্টি উপাদান থাকে। প্রথমে রাইস ব্র্যান থেকে তেল নিষ্কাশন করা হয় এবং এরপর অবশিষ্ট অংশ, যা ডিফ্যাটেড রাইস ব্র্যান নামে পরিচিত, সেখান থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রোটিন আলাদা করা হয়। বিভিন্ন পরিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা যায় রাইস ব্র্যান প্রোটিন কনসেন্ট্রেট বা প্রোটিন আইসোলেট, যেখানে প্রোটিনের পরিমাণ ৬০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই প্রোটিনটি গøুটেনমুক্ত, সহজপাচ্য এবং সাধারণত অ্যালার্জি সৃষ্টি করে না। ফলে এটি ভেগান প্রোটিন পাউডার, প্রোটিন বার, স্বাস্থ্যকর পানীয়, শিশু খাদ্য এবং বিভিন্ন ফাংশনাল ফুডে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে রাইস ব্র্যান দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল, কারণ এর মধ্যে তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এটি দ্রæত নষ্ট হয়ে যায়। ব্রানের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক এনজাইম তেলকে দ্রæত ভেঙে ফেলে এবং এতে দুর্গন্ধ তৈরি হয়। এ কারণে অতীতে রাইস ব্র্যান মূলত পশুখাদ্য বা সার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে রাইস ব্র্যানকে স্থিতিশীল করে তেল নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়। এর ফলে রাইস ব্র্যান তেল শিল্প গড়ে ওঠে এবং তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট ব্র্যান থেকে প্রোটিন, খাদ্যআঁশ এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণসম্পন্ন উপাদান উৎপাদনের পথ উন্মুক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী রাইস ব্র্যানকে আর বর্জ্য হিসেবে নয়, বরং মূল্যবান কৃষিজ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই রাইস ব্র্যান প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলেছে। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র রাইস ব্র্যান থেকে তেল, খাদ্য উপাদান এবং প্রোটিন উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চাহিদা দ্রæত বাড়ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং প্রাণিজ খাদ্যের বিকল্প খোঁজার কারণে অনেক মানুষ এখন উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে। ফলে ভেগান খাদ্য, স্পোর্টস নিউট্রিশন পণ্য এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্যে রাইস প্রোটিনের ব্যবহার দ্রæত বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে রাইস প্রোটিন এবং রাইস ব্র্যান থেকে উৎপন্ন পণ্যের বাজার দ্রæত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাইস প্রোটিনের বৈশ্বিক বাজার ইতোমধ্যে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের এবং আগামী বছরগুলোতে এটি আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে রাইস ব্র্যান থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পণ্যের মোট বাজার ইতোমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। ধান উৎপাদনে এশিয়া এগিয়ে থাকায় উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র এই অঞ্চল, তবে ভোগের ক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ বড় বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এই শিল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদিত হয় এবং ধান মাড়াইয়ের সময় মোট উৎপাদনের প্রায় ৮-১০ শতাংশ রাইস ব্র্যান হিসেবে পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন রাইস ব্র্যান উৎপন্ন হয়। বর্তমানে এর বেশিরভাগই পোল্ট্রি ফিড বা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যার অর্থনৈতিক মূল্য তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এই রাইস ব্র্যানকে যদি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে রাইস ব্র্যান প্রোটিন উৎপাদন করা যায়, তাহলে এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেকগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমানের রাইস প্রোটিন সাধারণত প্রতি কেজি প্রায় ৫ মার্কিন ডলার বা তার বেশি দামে বিক্রি হয়। যদি ধরা হয় বাংলাদেশে বছরে উৎপন্ন প্রায় ৩৫ লাখ টন রাইস ব্রানের মাত্র ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টন ব্র্যান, প্রোটিন উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং সেখান থেকে গড়ে ১৫ শতাংশ প্রোটিন নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়, তাহলে বছরে প্রায় ৫০ হাজার টন রাইস ব্র্যান প্রোটিন উৎপাদন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রোটিন বিক্রি করলে বছরে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হতে পারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২,৭৫০ কোটি টাকা।

যদি এই শিল্প আরও সম্প্রসারিত হয়ে মোট রাইস ব্রানের ২০ শতাংশ ব্যবহার করা যায়, তাহলে বছরে প্রায় ৭ লাখ টন ব্র্যান প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। একই হারে প্রোটিন নিষ্কাশন করলে তখন বছরে প্রায় ১ লাখ টন রাইস ব্র্যান প্রোটিন উৎপাদন করা যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই পরিমাণ প্রোটিন বিক্রি করলে সম্ভাব্য আয় হতে পারে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫,৫০০ কোটি টাকা। এ হিসাব থেকেই বোঝা যায় যে রাইস ব্র্যান প্রোটিন শিল্প ভবিষ্যতে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্পে পরিণত হতে পারে।

এই শিল্প গড়ে উঠলে দেশের অর্থনীতিতে আরও নানা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রথমত, ধান শিল্পে নতুন মূল্য সংযোজন হবে এবং একটি কমমূল্যের উপপণ্য থেকে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, প্রযুক্তি খাত, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, দেশীয় খাদ্য ও পুষ্টি শিল্পে ব্যবহৃত উদ্ভিজ্জ প্রোটিন আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সারাদেশে হাজার হাজার চালকল রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাইস ব্র্যান উৎপন্ন হয়। যদি এই ব্র্যান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার জন্য আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে সহজেই একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। কৃষক, চালকল মালিক, শিল্প উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিকারকদের সমন্বয়ে একটি নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্পখাত গড়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যেটিকে এতদিন ধান শিল্পের একটি সাধারণ উপপণ্য হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই রাইস ব্র্যানই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাপী উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চাহিদা দ্রæত বাড়ছে। তাই এখনই যদি পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ খুব সহজেই বৈশ্বিক রাইস ব্র্যান প্রোটিন বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬


রাইস ব্র্যান প্রোটিন: বাংলাদেশের ধান শিল্পে নতুন সম্ভাবনা

প্রকাশের তারিখ : ১৫ মার্চ ২০২৬

featured Image

ধান বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান উৎপাদনকারী দেশ এবং প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদিত হয়। ধান মাড়াইয়ের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপপণ্য হিসেবে উৎপন্ন হয় রাইস ব্র্যান । রাইস ব্র্যান মূলত ধানের বাইরের স্তর, যা ব্রাউন রাইস থেকে সাদা চাল তৈরি করার সময় অপসারণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই উপ-পণ্যটিকে তুলনামূলক কম মূল্যবান বলে মনে করা হতো এবং এটি প্রধানত পোল্ট্রি ফিড, গবাদিপশুর খাদ্য বা তেল উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে যে রাইস ব্র্যান অত্যন্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি উপাদান, যার মধ্যে রয়েছে তেল, প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, ভিটামিন, খনিজ এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এর মধ্যে রাইস ব্র্যান প্রোটিন বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিজ্জ প্রোটিন হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

রাইস ব্র্যান প্রোটিন বলতে রাইস ব্র্যান থেকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আলাদা করা প্রোটিনকে বোঝায়। সাধারণত রাইস ব্রানে ১২-১৮ শতাংশ প্রোটিন এবং ১২ থেকে ২০ শতাংশ তেল থাকে, পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যআঁশ ও অন্য পুষ্টি উপাদান থাকে। প্রথমে রাইস ব্র্যান থেকে তেল নিষ্কাশন করা হয় এবং এরপর অবশিষ্ট অংশ, যা ডিফ্যাটেড রাইস ব্র্যান নামে পরিচিত, সেখান থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রোটিন আলাদা করা হয়। বিভিন্ন পরিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা যায় রাইস ব্র্যান প্রোটিন কনসেন্ট্রেট বা প্রোটিন আইসোলেট, যেখানে প্রোটিনের পরিমাণ ৬০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই প্রোটিনটি গøুটেনমুক্ত, সহজপাচ্য এবং সাধারণত অ্যালার্জি সৃষ্টি করে না। ফলে এটি ভেগান প্রোটিন পাউডার, প্রোটিন বার, স্বাস্থ্যকর পানীয়, শিশু খাদ্য এবং বিভিন্ন ফাংশনাল ফুডে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে রাইস ব্র্যান দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল, কারণ এর মধ্যে তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এটি দ্রæত নষ্ট হয়ে যায়। ব্রানের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক এনজাইম তেলকে দ্রæত ভেঙে ফেলে এবং এতে দুর্গন্ধ তৈরি হয়। এ কারণে অতীতে রাইস ব্র্যান মূলত পশুখাদ্য বা সার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে রাইস ব্র্যানকে স্থিতিশীল করে তেল নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়। এর ফলে রাইস ব্র্যান তেল শিল্প গড়ে ওঠে এবং তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট ব্র্যান থেকে প্রোটিন, খাদ্যআঁশ এবং অন্যান্য পুষ্টিগুণসম্পন্ন উপাদান উৎপাদনের পথ উন্মুক্ত হয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী রাইস ব্র্যানকে আর বর্জ্য হিসেবে নয়, বরং মূল্যবান কৃষিজ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই রাইস ব্র্যান প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলেছে। চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র রাইস ব্র্যান থেকে তেল, খাদ্য উপাদান এবং প্রোটিন উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চাহিদা দ্রæত বাড়ছে। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত উদ্বেগ এবং প্রাণিজ খাদ্যের বিকল্প খোঁজার কারণে অনেক মানুষ এখন উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে। ফলে ভেগান খাদ্য, স্পোর্টস নিউট্রিশন পণ্য এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্যে রাইস প্রোটিনের ব্যবহার দ্রæত বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে রাইস প্রোটিন এবং রাইস ব্র্যান থেকে উৎপন্ন পণ্যের বাজার দ্রæত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাইস প্রোটিনের বৈশ্বিক বাজার ইতোমধ্যে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের এবং আগামী বছরগুলোতে এটি আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে রাইস ব্র্যান থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পণ্যের মোট বাজার ইতোমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়েছে। ধান উৎপাদনে এশিয়া এগিয়ে থাকায় উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র এই অঞ্চল, তবে ভোগের ক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ বড় বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এই শিল্পের সম্ভাবনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মিলিয়ন টন ধান উৎপাদিত হয় এবং ধান মাড়াইয়ের সময় মোট উৎপাদনের প্রায় ৮-১০ শতাংশ রাইস ব্র্যান হিসেবে পাওয়া যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন রাইস ব্র্যান উৎপন্ন হয়। বর্তমানে এর বেশিরভাগই পোল্ট্রি ফিড বা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যার অর্থনৈতিক মূল্য তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এই রাইস ব্র্যানকে যদি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে রাইস ব্র্যান প্রোটিন উৎপাদন করা যায়, তাহলে এর অর্থনৈতিক মূল্য অনেকগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমানের রাইস প্রোটিন সাধারণত প্রতি কেজি প্রায় ৫ মার্কিন ডলার বা তার বেশি দামে বিক্রি হয়। যদি ধরা হয় বাংলাদেশে বছরে উৎপন্ন প্রায় ৩৫ লাখ টন রাইস ব্রানের মাত্র ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টন ব্র্যান, প্রোটিন উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং সেখান থেকে গড়ে ১৫ শতাংশ প্রোটিন নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়, তাহলে বছরে প্রায় ৫০ হাজার টন রাইস ব্র্যান প্রোটিন উৎপাদন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রোটিন বিক্রি করলে বছরে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হতে পারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২,৭৫০ কোটি টাকা।

যদি এই শিল্প আরও সম্প্রসারিত হয়ে মোট রাইস ব্রানের ২০ শতাংশ ব্যবহার করা যায়, তাহলে বছরে প্রায় ৭ লাখ টন ব্র্যান প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে। একই হারে প্রোটিন নিষ্কাশন করলে তখন বছরে প্রায় ১ লাখ টন রাইস ব্র্যান প্রোটিন উৎপাদন করা যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই পরিমাণ প্রোটিন বিক্রি করলে সম্ভাব্য আয় হতে পারে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫,৫০০ কোটি টাকা। এ হিসাব থেকেই বোঝা যায় যে রাইস ব্র্যান প্রোটিন শিল্প ভবিষ্যতে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক শিল্পে পরিণত হতে পারে।

এই শিল্প গড়ে উঠলে দেশের অর্থনীতিতে আরও নানা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রথমত, ধান শিল্পে নতুন মূল্য সংযোজন হবে এবং একটি কমমূল্যের উপপণ্য থেকে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, প্রযুক্তি খাত, পরিবহন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত, দেশীয় খাদ্য ও পুষ্টি শিল্পে ব্যবহৃত উদ্ভিজ্জ প্রোটিন আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সারাদেশে হাজার হাজার চালকল রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাইস ব্র্যান উৎপন্ন হয়। যদি এই ব্র্যান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার জন্য আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, তাহলে সহজেই একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি তৈরি করা সম্ভব। কৃষক, চালকল মালিক, শিল্প উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিকারকদের সমন্বয়ে একটি নতুন কৃষিভিত্তিক শিল্পখাত গড়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, যেটিকে এতদিন ধান শিল্পের একটি সাধারণ উপপণ্য হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই রাইস ব্র্যানই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাপী উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চাহিদা দ্রæত বাড়ছে। তাই এখনই যদি পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ খুব সহজেই বৈশ্বিক রাইস ব্র্যান প্রোটিন বাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

[লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী]


সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত