সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ব্যাংক খাতে কেন নারী কর্মী কমছে


আকতার হোসাইন
আকতার হোসাইন
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬

ব্যাংক খাতে কেন নারী কর্মী কমছে
শুধু ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা কম- এমনটা নয়। দেশের অন্য পেশাতেও তুলনামূলকভাবে নারীর সংখ্যা কম

বাংলাদেশ জনবহুল ছোট্ট একটি দেশ। জনসংখ্যার তুলনায় এখানে কর্মসংস্থানের বড়ই অভাব। ফলে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। কর্মসংস্থান তৈরি করাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে নারীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন উপেক্ষিতই থেকে যায়। অতি সম্প্রতি গণমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নারী ব্যাংকার কমেছে ৭৭০ জন’। বিষয়টি বড়ই উদ্বেগজনক। যেখানে নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি করাই বড় কঠিন, সেখানে নারী কর্মীদের কর্মসংস্থান ধরে রাখা আরও বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু ব্যাখ্যা করা যাক-ব্যাংকিং একটি সম্মানিত পেশা হওয়া সত্ত্বেও কেন নারীর সংখ্যা কমছে।

নারীর ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে নারীর কর্মসংস্থান অবশ্যই জরুরি। কর্মসংস্থান ব্যতীত নারীর ক্ষমতায়ন চিন্তা করাই অসম্ভব। কিন্তু কেন এমন একটি সম্মানিত পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন নারীরা? এর জন্য রয়েছে একাধিক কারণ। তবে প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক অনেক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা কেন বেশি, তার একটু ব্যাখ্যা দেয়া যাক। ২০১৯ ও ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩২৩ বিলিয়ন ডলার, ভারতের ২ হাজার ৬৬০ বিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডের ৫০০ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়ার ৩৩৭ বিলিয়ন ডলার। দেশগুলোর লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যাংকের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশে ৫২টি, ভারতে ৩৪টি, থাইল্যান্ডে ১৮টি এবং মালয়েশিয়ায় ৮টি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই তথ্য। 

আবার বিশাল অর্থনীতির দেশ চীনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ১২টি। অথচ বাংলাদেশে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এবং রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য কারণে-অকারণে ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। তাই ব্যাংকারদের গ্রাহক পর্যায়ে ও ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাছে কদর একদমই কম। গ্রাহক পর্যায়ে গিয়ে ব্যাংকার পরিচয় দিলে কিছু গ্রাহক বলেন একটু আগেই অমুক ব্যাংক এসেছিলেন। এখন আবার আপনারা আসলেন, কি বলবেন বলেন! যা এই অবস্থা নারী সহকর্মীরা মানতে পারে না।

শুধু ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা কম এমনটা নয়। দেশের অন্যান্য পেশাতেও তুলনামূলকভাবে নারীর সংখ্যা কম। যেমন বিক্রয় প্রতিনিধি এবং ফুটপাতের হকার। অনেকেই হয়তো উপহাস করবেন, কিন্তু বাস্তবতা থেকেই বলছি। ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক বেশি হওয়ায় ব্যাংকারদের সম্মানীয় পেশাটি এখন অনেকটা বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় ঢাকা শহরে দেখতাম, ফুটপাতে সিম কার্ড বিক্রির মতো একটি ছাতার নিচে একটি চেয়ার-টেবিল আর বক্স নিয়ে বসে গেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা ব্যাংক হিসাব খুলতে। সঙ্গে অফার দিচ্ছেন, হিসাব খুললেই ডেবিট কার্ড ফ্রি, আরও অনেক কিছু। 

বিষয়টি সত্যিই উপহাসের মতো মনে হয়। যেন ব্যাংকারদের হকার বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অলিগলিতে দেখা যায়-সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। সহজ কথায় যাকে বলে বাজারজাতকরণ। আবার প্রত্যেক ব্যাংকারকে একটি নির্দিষ্ট টার্গেট দেয়া হয়। সেই টার্গেট পূরণ করাও বাধ্যতামূলক। যেমন দিনের শুরুতেই জানতে চাওয়া হয়—আজ কতটি অ্যাকাউন্ট খুলবেন এবং কত টাকা ডিপোজিট আনবেন। দিন শেষে তার হিসাব নেয়া হয়। পারলে ভালো, না পারলে ভদ্রভাবে দু’একটি কথা শুনতে হয়। পরিস্থিতিটা অনেকটা স্কুলজীবনের মতো পড়া হলে ভালো, না হলে শিক্ষকের বেতের প্রহার সইতে হতো। এখানে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, বেতের বদলে ভদ্রভাবে কিছু কথা শুনতে হয়। কিন্তু সেই কথাগুলোও অনেক নারী কর্মীর জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। ফলে অনেকেই নীরবে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। অর্থাৎ তারা চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। অনেক নারী ব্যাংকারের মতে, এটিও নারী কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। যেসব নারীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তাদের অনেকেই এমনটাই জানিয়েছেন। পরিচিত আরও অনেক নারী সহকর্মীও চাকরি ছেড়ে দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

দ্বিতীয় যে কারণটি রয়েছে, তা হলো ব্যাংকারদের কাজের চাপ অনেক বেশি। এই পেশায় নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়, কিন্তু ঠিক কখন বাড়ি ফেরা যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। দিনের সব হিসাব মিলাতে হয় এবং সারাদিনে যে সেবাগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজ একটি নির্দিষ্ট ফাইলে সংরক্ষণ করতে হয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে ব্যাংকারদের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নীতিনির্ধারকদের অতিমাত্রায় চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে একই চেয়ারে বসে সেবা প্রদান করাও এর একটি কারণ। সবকিছু মিলিয়ে এটি এক ব্যতিক্রমধর্মী পেশা যেখানে হয়তো অর্থ আছে, কিন্তু নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তেমন কোনো সময় থাকে না। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনগুলোতেও অফিস করতে বাধ্য হতে হয়। এছাড়া এটি এমন একটি পেশা, যেখানে দেশের জরুরি অবস্থার মধ্যেও সেবা বন্ধ রাখা যায় না; অথচ সেই অনুযায়ী স্বীকৃতি খুব একটা পাওয়া যায় না।

উপরোক্ত বিষয়গুলো সার্বিকভাবে তুলে ধরা হলেও এখানে নারীপুরুষের একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। পুরুষ সহকর্মীদের সাধারণত সংসারের কাজ সামলাতে হয় না। অর্থাৎ পুরুষ সহকর্মীদের সন্তান লালন-পালনে নারীদের তুলনায় খুব বেশি সময় না দিলেও চলে। কিন্তু একজন নারী একই সঙ্গে একজন ব্যাংকার, একজন মা এবং অনেক ক্ষেত্রে সংসারের প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এসব দায়িত্ব একত্রে সামলানো একজন নারী কর্মীর জন্য, বিশেষ করে একজন নারী ব্যাংকারের জন্য, অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাতটা বা আটটায় বাসায় ফিরে আবার সংসারের কাজ সামলানো এবং সন্তানের লালন-পালন করা এটি অনেক সময় এক ধরনের নির্মম জীবনযাপনের মতো হয়ে ওঠে। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক নারী কর্মী স্বেচ্ছায় এই পেশা থেকে সরে দাঁড়ান। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী হলেও শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকেই কর্মক্ষেত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়। তিনি সন্তানের লালন-পালনে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, যাতে সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়। কিন্তু একজন কর্মজীবী, বিশেষ করে একজন ব্যাংকার মায়ের পক্ষে এটি অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই বাধ্য হয়েই অনেক নারী ব্যাংকার স্বেচ্ছায় অবসরে যান।

ফলে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের টক-শো থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে জোরালোভাবে কথা বলি। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি খুব কমই বিবেচনা করি। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে উপরোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিয়ে নারীদের পথ চলা আরও সহজ করতে হবে। তবেই হয়তো সম্ভব হবে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন। তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। এতে নারী যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি দেশ ও জাতিও হবে আরও সমৃদ্ধ।

[লেখক: ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬


ব্যাংক খাতে কেন নারী কর্মী কমছে

প্রকাশের তারিখ : ১৬ মার্চ ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ জনবহুল ছোট্ট একটি দেশ। জনসংখ্যার তুলনায় এখানে কর্মসংস্থানের বড়ই অভাব। ফলে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। কর্মসংস্থান তৈরি করাই যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে নারীদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন উপেক্ষিতই থেকে যায়। অতি সম্প্রতি গণমাধ্যমে এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নারী ব্যাংকার কমেছে ৭৭০ জন’। বিষয়টি বড়ই উদ্বেগজনক। যেখানে নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি করাই বড় কঠিন, সেখানে নারী কর্মীদের কর্মসংস্থান ধরে রাখা আরও বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু ব্যাখ্যা করা যাক-ব্যাংকিং একটি সম্মানিত পেশা হওয়া সত্ত্বেও কেন নারীর সংখ্যা কমছে।

নারীর ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে নারীর কর্মসংস্থান অবশ্যই জরুরি। কর্মসংস্থান ব্যতীত নারীর ক্ষমতায়ন চিন্তা করাই অসম্ভব। কিন্তু কেন এমন একটি সম্মানিত পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন নারীরা? এর জন্য রয়েছে একাধিক কারণ। তবে প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক অনেক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা কেন বেশি, তার একটু ব্যাখ্যা দেয়া যাক। ২০১৯ ও ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, বাংলাদেশের জিডিপির আকার ছিল ৩২৩ বিলিয়ন ডলার, ভারতের ২ হাজার ৬৬০ বিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডের ৫০০ বিলিয়ন ডলার এবং মালয়েশিয়ার ৩৩৭ বিলিয়ন ডলার। দেশগুলোর লাইসেন্সপ্রাপ্ত দেশীয় ব্যাংকের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশে ৫২টি, ভারতে ৩৪টি, থাইল্যান্ডে ১৮টি এবং মালয়েশিয়ায় ৮টি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এই তথ্য। 

আবার বিশাল অর্থনীতির দেশ চীনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ১২টি। অথচ বাংলাদেশে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এবং রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য কারণে-অকারণে ব্যাংক গঠন করা হয়েছে। তাই ব্যাংকারদের গ্রাহক পর্যায়ে ও ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের কাছে কদর একদমই কম। গ্রাহক পর্যায়ে গিয়ে ব্যাংকার পরিচয় দিলে কিছু গ্রাহক বলেন একটু আগেই অমুক ব্যাংক এসেছিলেন। এখন আবার আপনারা আসলেন, কি বলবেন বলেন! যা এই অবস্থা নারী সহকর্মীরা মানতে পারে না।

শুধু ব্যাংকিং খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা কম এমনটা নয়। দেশের অন্যান্য পেশাতেও তুলনামূলকভাবে নারীর সংখ্যা কম। যেমন বিক্রয় প্রতিনিধি এবং ফুটপাতের হকার। অনেকেই হয়তো উপহাস করবেন, কিন্তু বাস্তবতা থেকেই বলছি। ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক বেশি হওয়ায় ব্যাংকারদের সম্মানীয় পেশাটি এখন অনেকটা বীমা কোম্পানির প্রতিনিধিদের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটা সময় ঢাকা শহরে দেখতাম, ফুটপাতে সিম কার্ড বিক্রির মতো একটি ছাতার নিচে একটি চেয়ার-টেবিল আর বক্স নিয়ে বসে গেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা ব্যাংক হিসাব খুলতে। সঙ্গে অফার দিচ্ছেন, হিসাব খুললেই ডেবিট কার্ড ফ্রি, আরও অনেক কিছু। 

বিষয়টি সত্যিই উপহাসের মতো মনে হয়। যেন ব্যাংকারদের হকার বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এছাড়াও শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অলিগলিতে দেখা যায়-সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। সহজ কথায় যাকে বলে বাজারজাতকরণ। আবার প্রত্যেক ব্যাংকারকে একটি নির্দিষ্ট টার্গেট দেয়া হয়। সেই টার্গেট পূরণ করাও বাধ্যতামূলক। যেমন দিনের শুরুতেই জানতে চাওয়া হয়—আজ কতটি অ্যাকাউন্ট খুলবেন এবং কত টাকা ডিপোজিট আনবেন। দিন শেষে তার হিসাব নেয়া হয়। পারলে ভালো, না পারলে ভদ্রভাবে দু’একটি কথা শুনতে হয়। পরিস্থিতিটা অনেকটা স্কুলজীবনের মতো পড়া হলে ভালো, না হলে শিক্ষকের বেতের প্রহার সইতে হতো। এখানে পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, বেতের বদলে ভদ্রভাবে কিছু কথা শুনতে হয়। কিন্তু সেই কথাগুলোও অনেক নারী কর্মীর জন্য মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। ফলে অনেকেই নীরবে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। অর্থাৎ তারা চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। অনেক নারী ব্যাংকারের মতে, এটিও নারী কর্মীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। যেসব নারীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছে, তাদের অনেকেই এমনটাই জানিয়েছেন। পরিচিত আরও অনেক নারী সহকর্মীও চাকরি ছেড়ে দেয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।

দ্বিতীয় যে কারণটি রয়েছে, তা হলো ব্যাংকারদের কাজের চাপ অনেক বেশি। এই পেশায় নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে পৌঁছাতে হয়, কিন্তু ঠিক কখন বাড়ি ফেরা যাবে তার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না। দিনের সব হিসাব মিলাতে হয় এবং সারাদিনে যে সেবাগুলো দেয়া হয়েছে, সেগুলোর কাজ একটি নির্দিষ্ট ফাইলে সংরক্ষণ করতে হয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে ব্যাংকারদের মধ্যেই উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এর প্রধান কারণ অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নীতিনির্ধারকদের অতিমাত্রায় চাপ। দীর্ঘ সময় ধরে একই চেয়ারে বসে সেবা প্রদান করাও এর একটি কারণ। সবকিছু মিলিয়ে এটি এক ব্যতিক্রমধর্মী পেশা যেখানে হয়তো অর্থ আছে, কিন্তু নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য তেমন কোনো সময় থাকে না। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনগুলোতেও অফিস করতে বাধ্য হতে হয়। এছাড়া এটি এমন একটি পেশা, যেখানে দেশের জরুরি অবস্থার মধ্যেও সেবা বন্ধ রাখা যায় না; অথচ সেই অনুযায়ী স্বীকৃতি খুব একটা পাওয়া যায় না।

উপরোক্ত বিষয়গুলো সার্বিকভাবে তুলে ধরা হলেও এখানে নারীপুরুষের একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। পুরুষ সহকর্মীদের সাধারণত সংসারের কাজ সামলাতে হয় না। অর্থাৎ পুরুষ সহকর্মীদের সন্তান লালন-পালনে নারীদের তুলনায় খুব বেশি সময় না দিলেও চলে। কিন্তু একজন নারী একই সঙ্গে একজন ব্যাংকার, একজন মা এবং অনেক ক্ষেত্রে সংসারের প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এসব দায়িত্ব একত্রে সামলানো একজন নারী কর্মীর জন্য, বিশেষ করে একজন নারী ব্যাংকারের জন্য, অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা সাতটা বা আটটায় বাসায় ফিরে আবার সংসারের কাজ সামলানো এবং সন্তানের লালন-পালন করা এটি অনেক সময় এক ধরনের নির্মম জীবনযাপনের মতো হয়ে ওঠে। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক নারী কর্মী স্বেচ্ছায় এই পেশা থেকে সরে দাঁড়ান। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই কর্মজীবী হলেও শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকেই কর্মক্ষেত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে হয়। তিনি সন্তানের লালন-পালনে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দেন, যাতে সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা যায়। কিন্তু একজন কর্মজীবী, বিশেষ করে একজন ব্যাংকার মায়ের পক্ষে এটি অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই বাধ্য হয়েই অনেক নারী ব্যাংকার স্বেচ্ছায় অবসরে যান।

ফলে নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অথচ আমরা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনের টক-শো থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে জোরালোভাবে কথা বলি। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি খুব কমই বিবেচনা করি। নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটাতে গেলে উপরোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় নিয়ে নারীদের পথ চলা আরও সহজ করতে হবে। তবেই হয়তো সম্ভব হবে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন। তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। এতে নারী যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি দেশ ও জাতিও হবে আরও সমৃদ্ধ।

[লেখক: ব্যাংকার]



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত