সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

তিন সপ্তাহের সংঘাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে হোয়াইট হাউস

ইরান যুদ্ধের গোলকধাঁধায় ট্রাম্প


প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০২৬

ইরান যুদ্ধের গোলকধাঁধায় ট্রাম্প

তিন সপ্তাহ আগে ঘটা করে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক রাজনৈতিক ও সামরিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প একে একটি ‘সাময়িক অভিযান’ হিসেবে প্রচার করলেও বর্তমানে পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
রবিবার (২২ মার্চ) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি যেখানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প একতরফাভাবে ‘সামরিক বিজয় অর্জিত হয়েছে’ বলে ঘোষণা দিলেও পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; সেখানে ইরান কার্যত তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
রয়র্টা‌সের তথ‌্য ম‌তে, ​যুদ্ধের এই চোরাবালিতে আটকে পড়া ট্রাম্প এখন তাঁর মিত্রদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন। বিশেষ করে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষায় সৈন্য পাঠাতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি তাদের ‘কাপুরুষ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে ন্যাটোর পাশে না দাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিচ্ছিন্নতা আসলে গত ১৪ মাসে মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের তুচ্ছতাচ্ছিল্যেরই প্রতিফল। এমনকি ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গেও সমন্বহীনতা প্রকাশ পেয়েছে; ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে খোদ ট্রাম্পই অন্ধকারে ছিলেন বলে দাবি করেছেন, যদিও ইসরায়েল বলছে ভিন্ন কথা। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
​অভ্যন্তরীণভাবেও ট্রাম্প এখন দ্বিমুখী সংকটে। একদিকে ‘নির্বোধ সামরিক হস্তক্ষেপ’ থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা, অন্যদিকে নিজের শুরু করা যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট ‘প্রস্থান পরিকল্পনা’ না থাকা; এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ভয়ে তটস্থ দলের নীতিনির্ধারকরা।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টাদের মতে, ট্রাম্প এখন সংবাদপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে গণমাধ্যমের ওপর ‘দেশদ্রোহিতার’ অভিযোগ তুলছেন, যা আসলে তাঁর চরম হতাশাকেই প্রকাশ করে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত হাজার হাজার নৌ সেনা মোতায়েন করা হলেও যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে কোনো পরিষ্কার রূপরেখা নেই।
​ইরান যুদ্ধের এই বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার একটি ‘স্বনির্মিত খাঁচা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইরান তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে যেভাবে বিশ্ব তেলের বাজার ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে আঘাত হানছে, তা ট্রাম্পের হিসাব-নিকাশকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। এখন ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা; হয় সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক দায়বদ্ধতার ঝুঁকি নেওয়া, অথবা তড়িঘড়ি বিজয় ঘোষণা করে সরে আসা।
তবে দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব আরও বাড়বে এবং মিত্ররা স্থায়ীভাবে মার্কিন বলয় থেকে ছিটকে যাবে। সব মিলিয়ে ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এখন হরমুজ প্রণালির উত্তাল ঢেউয়ে দুলছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬


ইরান যুদ্ধের গোলকধাঁধায় ট্রাম্প

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মার্চ ২০২৬

featured Image

তিন সপ্তাহ আগে ঘটা করে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক রাজনৈতিক ও সামরিক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প একে একটি ‘সাময়িক অভিযান’ হিসেবে প্রচার করলেও বর্তমানে পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
রবিবার (২২ মার্চ) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প এখন এমন এক সংকটের মুখোমুখি যেখানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী, মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার ট্রাম্প একতরফাভাবে ‘সামরিক বিজয় অর্জিত হয়েছে’ বলে ঘোষণা দিলেও পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; সেখানে ইরান কার্যত তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
রয়র্টা‌সের তথ‌্য ম‌তে, ​যুদ্ধের এই চোরাবালিতে আটকে পড়া ট্রাম্প এখন তাঁর মিত্রদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন। বিশেষ করে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা রক্ষায় সৈন্য পাঠাতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি তাদের ‘কাপুরুষ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে ন্যাটোর পাশে না দাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছেন।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিচ্ছিন্নতা আসলে গত ১৪ মাসে মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের তুচ্ছতাচ্ছিল্যেরই প্রতিফল। এমনকি ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গেও সমন্বহীনতা প্রকাশ পেয়েছে; ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে খোদ ট্রাম্পই অন্ধকারে ছিলেন বলে দাবি করেছেন, যদিও ইসরায়েল বলছে ভিন্ন কথা। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েন ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
​অভ্যন্তরীণভাবেও ট্রাম্প এখন দ্বিমুখী সংকটে। একদিকে ‘নির্বোধ সামরিক হস্তক্ষেপ’ থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা, অন্যদিকে নিজের শুরু করা যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট ‘প্রস্থান পরিকল্পনা’ না থাকা; এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ভয়ে তটস্থ দলের নীতিনির্ধারকরা।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টাদের মতে, ট্রাম্প এখন সংবাদপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে গণমাধ্যমের ওপর ‘দেশদ্রোহিতার’ অভিযোগ তুলছেন, যা আসলে তাঁর চরম হতাশাকেই প্রকাশ করে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত হাজার হাজার নৌ সেনা মোতায়েন করা হলেও যুদ্ধের শেষ কোথায়, তা নিয়ে হোয়াইট হাউসের কাছে কোনো পরিষ্কার রূপরেখা নেই।
​ইরান যুদ্ধের এই বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলার একটি ‘স্বনির্মিত খাঁচা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইরান তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে যেভাবে বিশ্ব তেলের বাজার ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে আঘাত হানছে, তা ট্রাম্পের হিসাব-নিকাশকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। এখন ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ খোলা; হয় সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক দায়বদ্ধতার ঝুঁকি নেওয়া, অথবা তড়িঘড়ি বিজয় ঘোষণা করে সরে আসা।
তবে দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের প্রভাব আরও বাড়বে এবং মিত্ররা স্থায়ীভাবে মার্কিন বলয় থেকে ছিটকে যাবে। সব মিলিয়ে ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এখন হরমুজ প্রণালির উত্তাল ঢেউয়ে দুলছে।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত