গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুরের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় নির্মাণাধীন একটি সড়ক উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সড়কটির নির্মাণমান, ব্যবহৃত উপকরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
প্রাথমিক তদন্তে সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত প্রভাবের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ এবং প্রকৌশলী শামসুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকারের কাছে বরখাস্ত সংক্রান্ত চিঠি হস্তান্তর করেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘উদ্বোধনের আগেই একটি সড়ক ধসে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। নির্মাণ কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতির সুযোগ নেই। প্রাথমিকভাবে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্তে যারা দায়ী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় পূর্বে গঠিত সব তদন্ত কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এর পরিবর্তে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের (ছুটির দিনসহ) মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। জনগণের অর্থে নির্মিত কোনো প্রকল্পে নিম্নমান বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।’
অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের পক্ষ থেকেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্পের পিডি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত মান বজায় রেখেই বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রাকৃতিক কারণ ও স্থানীয় ভূপ্রকৃতির প্রভাবও এ ধরনের ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে, আশা করছি প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হবে।’
প্রকৌশলী শামসুর রহমান বলেন, ‘এটা একটি প্রাকৃতিক কারণজনিত ঘটনা। কাজ যখন চলমান ছিল, তখন আমি ওই স্থানে দায়িত্বে ছিলাম না। তারপরও বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে আমি আশা করি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ ঘটনাকে ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা ও গুঞ্জন শোনা গেছে। কেউ কেউ দাবি করেন, সড়কের যে অংশটি ধসে পড়েছে, অতীতে সেখানে একটি পুরোনো মন্দির ছিল—ফলে বিষয়টি নিয়ে কুসংস্কারভিত্তিক কথাবার্তাও ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি কিছু মানুষ সেখানে ‘পাঠা বলি’ দেওয়ার কথাও বলতে শোনা যায়।
তবে অধিকাংশ সচেতন স্থানীয়রা এ ধরনের ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে প্রকৌশলগত ত্রুটিকেই দায়ী করছেন।
তাদের মতে, সড়কের যে অংশে ধস নেমেছে, সেখানে মাটির গঠন ছিল দুর্বল এবং ওই স্থানে আরও বেশি পাইলিং ও শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল।
স্থানীয়দের আরও দাবি, শুধু একটি অংশেই নয়—ধসে পড়া স্থানের বিপরীতে নদীর অপর পাশেও একই ধরনের মাটি দেবে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। যা ইঙ্গিত করে, পুরো এলাকায় মাটির ধারণক্ষমতা ও ভূপ্রকৃতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তাদের ভাষায়, ‘এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না, পুরো এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি এখনই সঠিকভাবে জরিপ করে মাটি পরীক্ষা ও শক্ত ভিত্তি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি সড়ক ধস নয়—এটি পুরো উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতা, তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণের বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং নিশ্চিত না করলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। একই সঙ্গে দায়ীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে অনিয়মের প্রবণতা কমবে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে।

সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মার্চ ২০২৬
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাশিমপুরের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় নির্মাণাধীন একটি সড়ক উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সড়কটির নির্মাণমান, ব্যবহৃত উপকরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
প্রাথমিক তদন্তে সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত প্রভাবের তথ্য উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ এবং প্রকৌশলী শামসুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকারের কাছে বরখাস্ত সংক্রান্ত চিঠি হস্তান্তর করেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘উদ্বোধনের আগেই একটি সড়ক ধসে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। নির্মাণ কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা গাফিলতির সুযোগ নেই। প্রাথমিকভাবে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্তে যারা দায়ী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় পূর্বে গঠিত সব তদন্ত কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এর পরিবর্তে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ১৫ দিনের (ছুটির দিনসহ) মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। জনগণের অর্থে নির্মিত কোনো প্রকল্পে নিম্নমান বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না।’
অভিযুক্ত প্রকৌশলীদের পক্ষ থেকেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। প্রকল্পের পিডি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত মান বজায় রেখেই বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রাকৃতিক কারণ ও স্থানীয় ভূপ্রকৃতির প্রভাবও এ ধরনের ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে, আশা করছি প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হবে।’
প্রকৌশলী শামসুর রহমান বলেন, ‘এটা একটি প্রাকৃতিক কারণজনিত ঘটনা। কাজ যখন চলমান ছিল, তখন আমি ওই স্থানে দায়িত্বে ছিলাম না। তারপরও বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে বলে আমি আশা করি।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ ঘটনাকে ঘিরে নানা ধরনের আলোচনা ও গুঞ্জন শোনা গেছে। কেউ কেউ দাবি করেন, সড়কের যে অংশটি ধসে পড়েছে, অতীতে সেখানে একটি পুরোনো মন্দির ছিল—ফলে বিষয়টি নিয়ে কুসংস্কারভিত্তিক কথাবার্তাও ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি কিছু মানুষ সেখানে ‘পাঠা বলি’ দেওয়ার কথাও বলতে শোনা যায়।
তবে অধিকাংশ সচেতন স্থানীয়রা এ ধরনের ধারণাকে উড়িয়ে দিয়ে প্রকৌশলগত ত্রুটিকেই দায়ী করছেন।
তাদের মতে, সড়কের যে অংশে ধস নেমেছে, সেখানে মাটির গঠন ছিল দুর্বল এবং ওই স্থানে আরও বেশি পাইলিং ও শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল।
স্থানীয়দের আরও দাবি, শুধু একটি অংশেই নয়—ধসে পড়া স্থানের বিপরীতে নদীর অপর পাশেও একই ধরনের মাটি দেবে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। যা ইঙ্গিত করে, পুরো এলাকায় মাটির ধারণক্ষমতা ও ভূপ্রকৃতির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তাদের ভাষায়, ‘এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না, পুরো এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি এখনই সঠিকভাবে জরিপ করে মাটি পরীক্ষা ও শক্ত ভিত্তি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি সড়ক ধস নয়—এটি পুরো উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতা, তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণের বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং নিশ্চিত না করলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। একই সঙ্গে দায়ীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে অনিয়মের প্রবণতা কমবে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে।

আপনার মতামত লিখুন