ইতিহাসকে যদি একটি দীর্ঘ, অবিরাম নদীর মতো ধরা যায়, তবে তার স্রোত কখনও সরল নয়। নদী বাঁকে বাঁকে চলে, কখনও থমথমে হ্রদে থেমে যায়, আবার কখনও ঝরনার মতো উজ্জ্বল হয়ে ছুটে চলে। ইতিহাসও তেমনি—প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয় মানুষের রক্ত, স্বপ্ন, ভুলভ্রান্তি এবং পুনর্জাগরণের মিশেলে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল ছিল সেই নদীর এক প্রবল স্রোতের সংকেত—যেখানে বিশ্ব দেখেছিল এক প্রাচীন সাম্রাজ্যের ক্লান্তি। আজ, পারস্য উপসাগরের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা হরমুজ প্রণালী যেন নতুন করে প্রশ্ন তোলে ইতিহাস কি আবারও কোনো সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে?
সুয়েজ খাল উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ছিল এক কৌশলগত সেতু। ইউরোপ ও এশিয়ার সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে এর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য, সামরিক চলাচল এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব। যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাস্তবতা পরিবর্তিত হতে থাকে; কাঠামোটিতে ফাটল ধরতে শুরু করে।
মিশরের রাষ্ট্রনায়ক কামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে তা ছিল ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি সাহসী রাজনৈতিক উচ্চারণ। প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু তারা যে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, তা তাদের প্রত্যাশার বাইরে।
যুক্তরাষ্ট্র সেই অভিযানের বিরোধিতা করে এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্রিটেনকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন -এর কূটনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলাফল—ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অপমানজনকভাবে সরে আসতে হয়। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, ঔপনিবেশিক যুগের অবসান আসন্ন এবং বিশ্বরাজনীতির নেতৃত্ব নতুন শক্তির হাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
সুয়েজ সংকটের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি একটি প্রতীকী ভাঙন। ব্রিটেনের সামরিক শক্তি তখনও ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে সীমাবদ্ধ করে। ক্ষমতা কেবল অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সমীকরণ, অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক প্রভাব এবং সময়ের চলমান ধারা—সব কিছুর সমন্বয়ে।
আজকের হরমুজ প্রণালী সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি বহন করে। এটি শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়; বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, যার প্রতিটি নৌযান, প্রতিটি কূটনৈতিক বিবৃতি, এমনকি নীরবতাও বহন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ছায়া। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এই প্রণালীকে জটিল ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
সুয়েজের মতো নাটকীয় মুহূর্তের সঙ্গে হরমুজ পরিস্থিতির তুলনা করাটা সরল নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল দৃশ্যমান এবং উপনিবেশভিত্তিক, যার পতনও ছিল সহজে চিহ্নিত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বহুমাত্রিক—সামরিক উপস্থিতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং জোটব্যবস্থা—সবই এতে অন্তর্ভুক্ত।
আধুনিক বিশ্ব আরও জটিল। সুয়েজ সংকটের সময় বিশ্ব ছিল দ্বিমেরু—যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত। বর্তমানে বিশ্ব বহু-মেরু, যেখানে চীন এবং রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বাস্তবতায় কোনো একক ঘটনার মাধ্যমে একটি পরাশক্তির পতন তাড়াহুড়োর ফল নয়।
তবুও, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বড় ধরনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এটি তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে, বিশেষত যদি সে তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। তবে এটিকে একটি ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হিসেবে দেখা যাবে না; কারণ আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতার রূপ অনেক বেশি জটিল এবং বিস্তৃত।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, সাম্রাজ্যের পতন সাধারণত ধীরগতির এবং বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে একটি শক্তি ধীরে ধীরে তার প্রভাব হারায়। সেই অর্থে হরমুজ কোনো চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ।
সুয়েজ থেকে হরমুজ—এই তুলনা আমাদের শেখায় যে, শক্তির স্রোত কখনও স্থির থাকে না। এটি ধীরে ধীরে, নিখুঁতভাবে রূপান্তরিত হয়। নাটকীয় পতনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো গভীর, সূক্ষ্ম পরিবর্তন। কারণ ইতিহাসের সাঁঝবেলা কখনও অন্ধকারের সূচনা নয়; বরং তা নতুন ভোরের প্রস্তুতি।
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
ইতিহাসকে যদি একটি দীর্ঘ, অবিরাম নদীর মতো ধরা যায়, তবে তার স্রোত কখনও সরল নয়। নদী বাঁকে বাঁকে চলে, কখনও থমথমে হ্রদে থেমে যায়, আবার কখনও ঝরনার মতো উজ্জ্বল হয়ে ছুটে চলে। ইতিহাসও তেমনি—প্রতিটি অধ্যায় লেখা হয় মানুষের রক্ত, স্বপ্ন, ভুলভ্রান্তি এবং পুনর্জাগরণের মিশেলে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল ছিল সেই নদীর এক প্রবল স্রোতের সংকেত—যেখানে বিশ্ব দেখেছিল এক প্রাচীন সাম্রাজ্যের ক্লান্তি। আজ, পারস্য উপসাগরের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা হরমুজ প্রণালী যেন নতুন করে প্রশ্ন তোলে ইতিহাস কি আবারও কোনো সন্ধিক্ষণের দিকে এগোচ্ছে?
সুয়েজ খাল উনিশ ও বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে ছিল এক কৌশলগত সেতু। ইউরোপ ও এশিয়ার সংক্ষিপ্ত পথ হিসেবে এর নিয়ন্ত্রণ মানে ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য, সামরিক চলাচল এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব। যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ন্ত্রণকে নিজেদের শক্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাস্তবতা পরিবর্তিত হতে থাকে; কাঠামোটিতে ফাটল ধরতে শুরু করে।
মিশরের রাষ্ট্রনায়ক কামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণের ঘোষণা দিলে তা ছিল ঔপনিবেশিক প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি সাহসী রাজনৈতিক উচ্চারণ। প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু তারা যে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, তা তাদের প্রত্যাশার বাইরে।
যুক্তরাষ্ট্র সেই অভিযানের বিরোধিতা করে এবং অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ব্রিটেনকে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। একই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন -এর কূটনৈতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলাফল—ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে অপমানজনকভাবে সরে আসতে হয়। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয়, ঔপনিবেশিক যুগের অবসান আসন্ন এবং বিশ্বরাজনীতির নেতৃত্ব নতুন শক্তির হাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
সুয়েজ সংকটের গুরুত্ব এখানেই যে, এটি একটি প্রতীকী ভাঙন। ব্রিটেনের সামরিক শক্তি তখনও ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে সীমাবদ্ধ করে। ক্ষমতা কেবল অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সমীকরণ, অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক প্রভাব এবং সময়ের চলমান ধারা—সব কিছুর সমন্বয়ে।
আজকের হরমুজ প্রণালী সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি বহন করে। এটি শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়; বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, যার প্রতিটি নৌযান, প্রতিটি কূটনৈতিক বিবৃতি, এমনকি নীরবতাও বহন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ছায়া। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী অবিশ্বাস, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ এই প্রণালীকে জটিল ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
সুয়েজের মতো নাটকীয় মুহূর্তের সঙ্গে হরমুজ পরিস্থিতির তুলনা করাটা সরল নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল দৃশ্যমান এবং উপনিবেশভিত্তিক, যার পতনও ছিল সহজে চিহ্নিত। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বহুমাত্রিক—সামরিক উপস্থিতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং জোটব্যবস্থা—সবই এতে অন্তর্ভুক্ত।
আধুনিক বিশ্ব আরও জটিল। সুয়েজ সংকটের সময় বিশ্ব ছিল দ্বিমেরু—যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত। বর্তমানে বিশ্ব বহু-মেরু, যেখানে চীন এবং রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বাস্তবতায় কোনো একক ঘটনার মাধ্যমে একটি পরাশক্তির পতন তাড়াহুড়োর ফল নয়।
তবুও, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বড় ধরনের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এটি তার বৈশ্বিক নেতৃত্বের ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে, বিশেষত যদি সে তার মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। তবে এটিকে একটি ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হিসেবে দেখা যাবে না; কারণ আধুনিক বিশ্বে ক্ষমতার রূপ অনেক বেশি জটিল এবং বিস্তৃত।
ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, সাম্রাজ্যের পতন সাধারণত ধীরগতির এবং বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে একটি শক্তি ধীরে ধীরে তার প্রভাব হারায়। সেই অর্থে হরমুজ কোনো চূড়ান্ত পরিণতি নয়; বরং একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ।
সুয়েজ থেকে হরমুজ—এই তুলনা আমাদের শেখায় যে, শক্তির স্রোত কখনও স্থির থাকে না। এটি ধীরে ধীরে, নিখুঁতভাবে রূপান্তরিত হয়। নাটকীয় পতনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো গভীর, সূক্ষ্ম পরিবর্তন। কারণ ইতিহাসের সাঁঝবেলা কখনও অন্ধকারের সূচনা নয়; বরং তা নতুন ভোরের প্রস্তুতি।
[লেখক: সভাপতি, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন