আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যখন সারাদেশে কোরবানির পশুর প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে ভাইরাসজনিত চর্মরোগ 'লাম্পিং স্কিন ডিজিজ' (এলএসডি)।
চৈত্র ও বৈশাখের এই সন্ধিক্ষণে মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে সারাদেশে সাত লাখেরও বেশি খামারির কাছে থাকা ৫ কোটির অধিক গবাদি পশুর একটি বড় অংশ এই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে এক কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আমদানির অনুমোদন দিয়েছে, পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ওষুধ ও টিকা সরবরাহ জোরদার করা হয়েছে। ঈদের আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর জেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বড়ালিয়া গ্রামে এক অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি কর্মকর্তার খামারে এই রোগের সংক্রমণ নিয়ে সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগ। খবর পেয়ে দ্রুত ওই খামারে গিয়ে আক্রান্ত তিনটি গরুর চিকিৎসা ও গাইডলাইন দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি ডা. আক্তারুজ্জামান। বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, "সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমরা দ্রুত দত্তপাড়ার ওই খামারির বাড়িতে গিয়ে আক্রান্ত পশুগুলো দেখি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করি।" পরবর্তীতে ওই খামারি উপজেলা অফিসে এসেও সরকারি ওষুধ সংগ্রহ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
গবাদি পশুর এই সংকট নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. শেখ শাহিনুর ইসলাম এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, "গরু ও মহিষের লাম্পিং স্কিন ডিজিজ আমাদের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও বর্তমানে এটি বড় আকার ধারণ করেছে। এ রোগের চিকিৎসায় বিদেশ থেকে এক কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশীয়ভাবেও ভ্যাকসিন তৈরি ও সরবরাহ করা হচ্ছে।"
জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি আরও যোগ করেন, "সংবাদমাধ্যমে খবর পাওয়ার পরপরই আমরা বড়ালিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত পশুর দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দিচ্ছি। যেখানেই আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই আমরা ওষুধ সরবরাহ করছি।"
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিনিয়র অফিসার ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এলএসডি মূলত একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা মশা, মাছি ও আঠালি পোকার মাধ্যমে ছড়ায়। এতে পশুর দেহের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যায়, চোখ-নাক দিয়ে লালা ঝরে এবং চামড়ায় গুটি বা নাডিউল দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, "চৈত্র-বৈশাখ মাসে মশা-মাছির কামড়ে এই রোগ বেশি হয়। আক্রান্ত পশুর পা ফুলে যায় এবং বাছুর গরুর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই খামারিদের অবশ্যই গোয়ালঘরে মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং আক্রান্ত পশুকে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আলাদা রাখতে হবে।"
আক্রান্ত খামারের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত টিকাদানই এই রোগের একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ।
এদিকে, আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে পশুর পরিসংখ্যান তৈরির কাজ পুরোদমে চলছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে দেশে ২ কোটি ৫১ লাখ গরু, ১৫ লাখ মহিষ, ২ কোটি ৭২ লাখ ছাগল এবং ৩৯ লাখের বেশি ভেড়া রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, লাম্পিং স্কিন ডিজিজ পশুর উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় বলে এটি একটি মারাত্মক অর্থনৈতিক হুমকি। তাই কোরবানির হাটে সুস্থ পশুর জোগান নিশ্চিত করতে খামারিদের নিকটস্থ পশু হাসপাতালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঈদের আগে খুব দ্রুতই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যখন সারাদেশে কোরবানির পশুর প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে ভাইরাসজনিত চর্মরোগ 'লাম্পিং স্কিন ডিজিজ' (এলএসডি)।
চৈত্র ও বৈশাখের এই সন্ধিক্ষণে মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারে এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে সারাদেশে সাত লাখেরও বেশি খামারির কাছে থাকা ৫ কোটির অধিক গবাদি পশুর একটি বড় অংশ এই ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে এক কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আমদানির অনুমোদন দিয়েছে, পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে উৎপাদিত ওষুধ ও টিকা সরবরাহ জোরদার করা হয়েছে। ঈদের আগেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর জেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের বড়ালিয়া গ্রামে এক অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি কর্মকর্তার খামারে এই রোগের সংক্রমণ নিয়ে সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ বিভাগ। খবর পেয়ে দ্রুত ওই খামারে গিয়ে আক্রান্ত তিনটি গরুর চিকিৎসা ও গাইডলাইন দিয়েছেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেটেরিনারি ডা. আক্তারুজ্জামান। বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, "সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমরা দ্রুত দত্তপাড়ার ওই খামারির বাড়িতে গিয়ে আক্রান্ত পশুগুলো দেখি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করি।" পরবর্তীতে ওই খামারি উপজেলা অফিসে এসেও সরকারি ওষুধ সংগ্রহ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।
গবাদি পশুর এই সংকট নিয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. শেখ শাহিনুর ইসলাম এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, "গরু ও মহিষের লাম্পিং স্কিন ডিজিজ আমাদের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ। ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও বর্তমানে এটি বড় আকার ধারণ করেছে। এ রোগের চিকিৎসায় বিদেশ থেকে এক কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশীয়ভাবেও ভ্যাকসিন তৈরি ও সরবরাহ করা হচ্ছে।"
জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি আরও যোগ করেন, "সংবাদমাধ্যমে খবর পাওয়ার পরপরই আমরা বড়ালিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত পশুর দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দিচ্ছি। যেখানেই আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই আমরা ওষুধ সরবরাহ করছি।"
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিনিয়র অফিসার ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এলএসডি মূলত একটি ভাইরাসজনিত রোগ যা মশা, মাছি ও আঠালি পোকার মাধ্যমে ছড়ায়। এতে পশুর দেহের তাপমাত্রা ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত বেড়ে যায়, চোখ-নাক দিয়ে লালা ঝরে এবং চামড়ায় গুটি বা নাডিউল দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে বলছেন, "চৈত্র-বৈশাখ মাসে মশা-মাছির কামড়ে এই রোগ বেশি হয়। আক্রান্ত পশুর পা ফুলে যায় এবং বাছুর গরুর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই খামারিদের অবশ্যই গোয়ালঘরে মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং আক্রান্ত পশুকে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ আলাদা রাখতে হবে।"
আক্রান্ত খামারের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত টিকাদানই এই রোগের একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ।
এদিকে, আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে পশুর পরিসংখ্যান তৈরির কাজ পুরোদমে চলছে।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে দেশে ২ কোটি ৫১ লাখ গরু, ১৫ লাখ মহিষ, ২ কোটি ৭২ লাখ ছাগল এবং ৩৯ লাখের বেশি ভেড়া রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, লাম্পিং স্কিন ডিজিজ পশুর উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় বলে এটি একটি মারাত্মক অর্থনৈতিক হুমকি। তাই কোরবানির হাটে সুস্থ পশুর জোগান নিশ্চিত করতে খামারিদের নিকটস্থ পশু হাসপাতালের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। ঈদের আগে খুব দ্রুতই এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন