ভৌগোলিক এবং কালিক বিবেচনায় কবি জসীম উদদীন তাঁর সময়ের একজন স্বতন্ত্র ও প্রাকৃতধারার কবি। তাঁর অগ্রজ ও খ্যাতির শীর্ষে থাকা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম যেভাবে গণমানুষের কবি হয়ে উঠেছেন, তিনি সেপথে হাঁটেননি। তিনি গ্রামীণ মানুষের ভাষা ও আবেগ-ভাবালুতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলার মানুষের মন জয় করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন— গ্রামপ্রধান, হরিৎ-সবুজশোভিত এই বাংলার প্রায় নব্বই ভাগ মানুষই গ্রামে বসবাস করেন, এবং গ্রাম ছেড়ে যারা শহরে প্রতিষ্ঠিত হন, তাদের মনের মধ্যে লুকানো থাকে তার একান্ত জন্মগ্রামটি। সেদিক থেকে কবি জসীম উদদীন ছিলেন প্রখর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং প্রকৃত কবির স্বরূপ। মুখে জসীম উদ্দীনকে অনেকে অনগ্রসর, গ্রাম্য কবি, পল্লী কবি অভিধায় অভিহিত করলেও; গ্রামীণ পরিবেশে বড় হওয়া কোনো মানুষই অস্বীকার করতে পারবেন না যে, জসীম উদদীনের কবিতা তার ভাল লাগে না। এই জায়গাটি কবির স্বনির্মিত। তিনি যেমন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গ্রাম্যদৃশ্য কবিতায় ধারণ করতে পেরেছেন, গ্রাম্য প্রকৃতির আচরণকে সংকলিত করতে পেরেছেন, তেমনি তিনি ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এত বেশি কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন, যাতে প্রতিটি পাঠকই মনে করেন এটা যেন তার জন্যই রচনা করেছেন কবি। এবং এ-সময়ের পাঠক মনে মনে নিশ্চয় ভাবেন, গ্রাম বাংলার আঞ্চলিক এবং বহুল ব্যবহৃত কথ্যভাষাকে কীভাবে তিনি অনায়াসে কবিতায় ব্যবহার করতে পেরেছেন।
জসীম উদ্দীন জন্মেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের এক পরাধীন দেশে। তাঁর জন্মের মাত্র চার বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন দুই মহান কবি নজরুল ও জীবনানন্দ (১৮৯৯)। এই দুই কবির কবিতায় প্রবলভাবে এসেছে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। অন্যদিকে কবি জসীম উদ্দীন ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছেন নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও তা সংরক্ষণের প্রাসঙ্গিকতায়। আমাদের সংস্কৃতিতে আজ প্রবল আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্প। ইউরোপীয় আধুনিকতার অনুকরণে আমরা আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিকে উচ্চমান দিতে চেষ্টায় রত। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও যে অঞ্চলভিত্তিক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে, তা আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যে প্রবলতা পায়নি। পাচ্ছে না। আজকের উত্তর-ঔপনিবেশিক চোখে আমরা এটা বুঝতে পারি যে, সে সময়ে কবি জসীম উদ্দীনের লড়াইটা কতটা তীব্র ছিল।
তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা “কবর”। শুধু বিখ্যাত ও জনপ্রিয়ই নয়, অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী, সংবেদনাময় ও করুণ আর্তি মেশানো শোককবিতা। এই কবিতার বর্ণনা ও বিষয়বিন্যাস অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী এবং অনায়াস-স্বচ্ছ; যা কবিতাটিকে অনন্য সাধারণ করে তুলেছে। এক গ্রামীণ বয়সী মানুষ তার এক নাতনি / নাতিকে কয়েকটি নিকটজনের মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠান্তে পাঠকমাত্র অশ্রুসিক্ত হন। নিজের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূ ও নাতনির মৃত্যুর ভিতর দিয়ে প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে কবিতার। ১৯২৫ সালে রচিত ‘কবর’ কবিতাটি একই বছর প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে কবিতাটি ‘গ্রাম্য কবিতা’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। জসীম উদ্দীনের ক্ষেত্রে সেই অবলেহার ধারাটি কিন্তু এখনও বর্তমান আছে, তাঁকে ‘পল্লী কবি’ আখ্যায়িত করে খণ্ডিত করা হয়। এমন ধারার কবিতা যদি বিশ্বের অন্য কোনো ভাষায় লিখিত হতো, তাহলে তা বিশ্বজনীন হতে সময় লাগত না; এবং আজকের বিশ্বের ল্যাটিন কিংবা আফ্রিকান সাহিত্য কিংবা একদার ফরাসি কিংবা ইংরেজি সাহিত্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। এই পোস্ট-কলোনিয়াল অত্যাচার-নিগ্রহের কালে, এই উত্তর-আধুনিক মনন বাস্তবতায় কিংবা অধুনাবাদী চিন্তাচেতনায় সমসাময়িক সমৃদ্ধ সাহিত্য মূলত স্বদেশীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতিনির্ভর, মৃত্তিকালগ্ন ও প্রথাহীন অভিযাত্রায় বিশেষায়িত। এদিক বিবেচনায় কবি জসীম উদ্দীন বাংলা ভাষার কবি হিসেবে, বাঙালির স্বকীয়তা ও বাংলাদেশের নৈসর্গিক বৈচিত্র্যের বাইরে তেমন একটা বিরচণ করেননি। যে কারণে তাঁর কবর কবিতা থেকে নকশিকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট কিংবা যে কোনো কাহিনিকাব্য, লোককবিতা, গানের সংগ্রহ এবং ভ্রমণ কাহিনি, আত্মজৈবনিক রচনাগুলো নিঃসন্দেহে অধুনাবাদী সাহিত্যের মর্যাদা পায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিকগণ তাদের তত্ত্ব তালাশে যদি জসীম উদদীনের রচনাসাগরে অবগাহন করে দেখেন, তাহলে সেখান থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। পোস্টমডার্ন ভাবনায় যে মূল বা শেকড়ে ফেরার গল্প আমরা পাঠ করি, জসীম উদ্দীন তাঁর প্রতিটি কবিতায় সেই গল্পের মালা গেঁথেছেন।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত কবি জসীম উদদীনের “কবর” কবিতাটি একটি দীর্ঘ কবিতা হলেও এটি পাঠ করতে পাঠকের ন্যূনতম পরিশ্রম করতে হয় না। গড়গড় হড়হড় করে পড়ে যেতে পারেন, এবং আরও পাঠের আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। এর অন্যতম কারণ জসীম উদদীনের ছন্দ ও ভাষার ওপর দক্ষতা, অন্ত্যমিলের দুর্দান্ত সমন্বয়, বিষয়ের গভীরতা, ভাবনার স্পর্শকাতরতা, প্রকৃতির স্বভাববৈচিত্র্য দিয়ে অলঙ্করণ, সম্পর্কের নৈকট্যসহ কবির কাব্যপরিমিতিবোধ।
এ কবিতার আরও যে বিষয়টি আশ্বর্যান্বিত করে, তা হলো খুব সহজ ও আটপৌরে ভাষায় কঠিন সত্যটি উচ্চারণের ক্ষমতা। এ কবিতার অধিকাংশ জায়গায় ব্যাপারটি ঘটেছে। এমন দু’একটি জায়গা যেমন—
এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
অথবা
এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।
এমন গভীর শোকার্ত উচ্চারণ কবিতার বিষয়-পরিণতি থেকে পাঠককে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে আরও মনোযোগী করে তোলে এবং কবিতার শেষ লাইনটি পর্যন্ত পাঠ না করে উপায় থাকে না। “কবর” জসীম উদদীনের শ্রেষ্ঠ কবিতা, এতে সন্দেহ নেই। তবে তাঁর অন্যান্য কবিতা ও আখ্যানেও তিনি এমন নিপুণভাবে গ্রাম্য-সহজ-সরল বিষয়াবলিকে উপস্থাপন করেছেন, পাঠক একবার পাঠের আস্বাদ পেয়ে গেলে আর তা থেকে বিচ্যুত হতে পারেন না।
পঞ্চ পণ্ডবের নেতৃত্বে ত্রিশের দশকের আধুনিকতা যখন বাংলা কবিতাকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে, তখন তারা ঘোষণা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে স্বতন্ত্র কাব্যানুরণনের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করেন। তারা পরিবর্তন আনেন ভাষায়, বর্ণনা বিন্যাসে এবং তিরিশীয় বিশ্বমন্দার অবক্ষয়িত চরম বাস্তবতায়। যেখানে স্থান করে নেয় নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব এবং একাকী মানুষের অবাধ-অগাধ যন্ত্রণা-কাতরতা। বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও জীবনানন্দ দাশ— এই পঞ্চ পাণ্ডবের দ্বারা তখনকার কবিতা শাসিত হলেও; সময় কিন্তু জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে মফস্বলীয় উপাধি দিয়ে আলাদা করে দেয়। এবং তাঁর কবিতাকে আনস্মার্ট, অকবিতা বলে আখ্যায়িত করে। একমাত্র বুদ্ধদেব বসু ছাড়া কারো দৃষ্টিতে জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে ইতিবাচক কিছু উচ্চারিত হতে শোনা যায় না। বরং বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দের কবিতাকে বাংলা কবিতার নতুন ও বিস্ময়কর সংযোজন বলে মনে করতেন। কালের নির্মম বিচারে সেই জীবনানন্দ দাশই আজকের কবিতার শ্রেষ্ঠত্বে আসীন। তিনি ইউরোপীয় নকশায় কবিতা লিখলেও তাতে গলগল করে ঢুকে পড়ে গ্রামীণ জনপদের বৃক্ষ-ফুল-ফসল ও নদীমাতৃকতার নৈসর্গিক আবছায়া। ঠিক একই সময়ের কবি হয়েও জসীম উদদীন থেকে যান বৃত্তের বাইরে। যদিও ইতোমধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ ক্লাসে থাকা অবস্থায় তাঁর কবিতা উচ্চমাধ্যমিকে পাঠ্য হওয়ায় তিনি ব্যাপক আলোচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু ইউরোপীয় আধুনিকতাকে কবিতায় স্থান না দেয়ায় তিনি কথিত ‘পল্লী কবি’ই থেকে যান। আধুনিকতার বিপরীতে তাঁর কবিতা গ্রাম্য কবিতা হিসেবে প্রচারিত হয়। কিন্তু জসীম উদ্দীনের কবিতার পাঠক থেকে যান প্রান্তিকজনেরা কিংবা নিবিড় গাঁয়ে শৈশব-কৈশর কাটানো মানুষ; এবং তাদের মুখে মুখেও উচ্চারিত হতে থাকে জসীম উদ্দীনের কবিতা। কারণ তাঁর ভাষা যতটা কাছে টানে পঞ্চ পাণ্ডবের ভাষা ততটা মানুষকে আপন করে নিতে পারে না। তবু কবিতা বিচারে সময় কিন্তু ওই পঞ্চ পাণ্ডবকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। অন্যত্র গ্রাম্য সহজ সরল মানুষ উচ্চারণ করতে থাকে জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতা কিংবা ‘নকশিকাঁথার মাঠ’-এর মতো আখ্যান কাব্য। রাত্রিবেলায় রেডিও খুলে উঠোনে মাদুর পেতে জমায়েত হয়ে শোনে জসীম উদ্দীনের নাটক, কিংবা তাঁর রচিত পল্লীগীতি-লোকগীতি। এর একটাই কারণ: জসীম উদ্দীনের কবিতা খুব সহজেই বোধগম্য হয়।
কবিতা একরকম নয়। বিচিত্র প্রকার। তিরিশীয় আধুনিকতায় যে কবিতার সংজ্ঞা নিরূপিত হয়; তাতে কবিতা বুঝতেই হবে বা বোঝা যাবে— ব্যাপারটা এমন নয়। বরং জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, “যে কবিতা বোঝা লেগ, স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক তার পরম গৌরবময় কবর”। আবার বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, “কবিতা বোঝার জিনিস নয়।” হয়তো বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছে কিংবা সর্বাবস্থায়ই তাঁরা এরকম মনে করে থাকেন। তবে কবিতা যে বোঝা-না-বোঝার মাঝামাঝি একটা উৎকৃষ্ট শিল্প তা স্পষ্ট। ষাটের দশকের খ্যাতিমান কবি মোহাম্মদ রফিক, একবার বলেছিলেন, “শিল্প বিমূর্ত ব্যাপার।” এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কবিতার রহস্যই কবিতাকে স্থায়িত্ব দেয়। সেক্ষেত্রে কবি তাই কখনো সরাসরি বক্তব্য কিংবা বিবৃতিধর্মিতাকে কবিতা বলতে নারাজ। সেখানে আলো-আঁধারি থাকবে, রহস্যময়তা থাকবে, দূর-বোধ্যতা থাকবে, আড়াল থাকবে, অলঙ্কার থাকবে, উপমা-চিত্রকল্প-মেটাফর থাকবে; পরম্পরাযুক্ত অথবা পারম্পর্যহীন বক্তব্যও থাকবে— এটাই স্বাভাবিক।
কবিতা নিয়ে এ ধরনের ব্যাখ্যা-বক্তব্যের কোনো শেষ নেই। তবে যে ভাষা বিন্যাস, অলঙ্কৃত বক্তব্য বা সুনির্বাচিত শব্দের সর্বোত্তম সজ্জা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, মানুষের মনকে আলোড়িত করে, সিক্ত করে, প্রশান্তি দেয়— সেটাই কবিতা বা শিল্প। সেই বিবেচনায় জসীম উদ্দীনের “কবর” কবিতা একটি উৎকৃষ্ট কবিতা ও অনন্য শিল্প। এ কবিতা এতটাই মানুষের মনকে সিক্ত করেছে, স্পর্শ করেছে যে, জসীম উদ্দীনের শিক্ষক, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার, গবেষক দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর “করব” কবিতা পাঠান্তে জসীম উদ্দীনের মতো ছাত্রের শিক্ষক হতে পারাটা তাঁর জন্যে গর্বের বিষয় বলে মনে করতেন। “কবর” কবিতার প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যে অসংখ্য মৃত্যুর করুণ বর্ণনা রয়েছে, তাতে পুরো কবিতাটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠককে বিষাদাক্রান্ত করে রাখে। আবার কবিতায় বাংলার যে নৈসর্গিক উপমা ও দৃশ্যচিত্র আঁকা হয়েছে, তা বাঙালি পাঠকের নিসর্গপ্রেমকে গভীরভাবে উন্মোচিত করে। এতগুলো মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার ফিরে গিয়েছেন কবি প্রকৃতির কাছে, ব্যক্ত করেছেন প্রাকৃত শোকের ভাষা— যা জসীম উদদীনের প্রকৃত কবি পরিচয়কে প্রবল করে তোলে। এমন যেসব বর্ণনা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে তা থেকে কিছুটা উল্লেখ করা যাক:
তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জড়ায়ে ধরি,
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিত সারা দিনমান ভরি।
গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,
ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
কিংবা
জোড় মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরুছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।
জোনাকি-মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
এরকম আরো অনেক অনেক পঙ্ক্তিতে কবি প্রকৃতিকেও বেদনাবিহ্বল করে তোলেন। প্রকৃতি মানুষের সমব্যথী হয়ে ওঠে। কবি “কবর” কবিতায় যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটাই মূলত “জসীমীয় ভাষা” বলে আমরা ধারণা করতে পারি। জসীম উদ্দীন তাঁর ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় সাধু, চলিত, আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষার সংমিশ্রণ ঘটান। “কবর” কবিতায়ও সে কাজটি করেছেন। এ জাতীয় শব্দ প্রয়োগের পর এমন মনে হয় যে, ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই বুঝি অনিবার্য কিংবা অপরিহার্য ছিল, বিকল্প শব্দ বা অন্য কোনো শব্দই এখানে প্রযোজ্য নয়। মূলত এটিই কবির ক্ষমতা বা শক্তিমত্তা।
আজকাল যেমন কঠিন বা দুরারোগ্য নানান অসুখে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যায়, সেই ঔপনিবেশিক কালে কিংবা জসীম উদ্দীনের কালেও কিছু দুরারোগ্য অসুখ ছিল, যাতে মানুষ মারা যেত। এর বাইরে আরও কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে, যাতে মানুষের জীবনাবসান ঘটে। যেমন সেসময় পচা জ্বরে মৃত্যুর বিষয়টি প্রচলিত ছিল, সাপে কাটা মৃত্যুর বিষয়টি অহরহ ছিল, আবার গ্রামীণ মেয়েদের অভিমান করে, শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হয়ে কিংবা পতিহারা হয়ে আত্মহত্যার বিষয়গুলো ছিল অতি স্বাভাবিক ঘটনা। মৃত্যুর কারণ হিসেবে “কবর” কবিতায় এ বিষয়গুলোই লক্ষ্য করা যায়। যদিও আজকের দিনেও এ জাতীয় মৃত্যুর ঘটনা প্রচুর ঘটছে, তবে এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে আরও অনেক অনেক দুর্বোধ্য কারণ।
জসীম উদ্দীন সহজাত কবি। তাঁর কোনো কষ্টকল্পিত কবিতা নেই। তাঁর কল্পনার সমুদ্র গ্রাম বাংলার আনাচকানাচ। তিনি তাঁর সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন নিজের পরিবার ও আশপাশে দেখা পরিবারগুলোর জীবনাচরণ ও স্বভাব প্রকৃতি থেকে। তাঁর “করব” কবিতার খ্যাতির যে উৎসসূত্র, এই কবিতার যে অপার শক্তিমত্ততা তার মূলে আছে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও তাদের জীবনাচারের যথার্থ রূপায়ন।
এই কবিতা যে কতটা শক্তিশালী আজ শত বছর পরে বসেও অনুধাবন করা যায় তখন, যখন একজন তরুণ, প্রৌঢ় কিংবা প্রবীণ কবি কবিতাটি নিয়ে লিখতে বসেছেন। কবিতাটি নিয়ে অগণিত কাজ হচ্ছে কিংবা পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। “কবর” এমনই একটি কবিতা যা পাঠান্তে নির্বিশেষে আমাদেরকে আবেগঘন করে; অশ্রুসিক্ত করে ও কিছু সময়ের জন্য স্বজন হারানোর বেদনায় ব্যথিত ও সিক্ত করে। এ কবিতার আবেদন তাই কখনো শেষ হবে বলে মনে হয় না। যত দিন বাঙালি থাকবে, থাকবে তার ভাষা, ততদিন আয়ু এই “কবর” কবিতার। আর যদি কবিতাটিকে যথার্থ অনুবাদ করে বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে দেয়া যায়, তবে তা বিশ্বপরিসরেও আবেদন সৃষ্টির যথার্থ যোগ্যতা রাখে।
বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্ম নেয়া এই কবি আমাদের গর্ব, আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের অভিভাবক; এবং তাঁর “কবর” কবিতা আমাদের কবিতা ও সাহিত্যসম্ভারে অসম্ভব শক্তিশালী সংযোজন।

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬
ভৌগোলিক এবং কালিক বিবেচনায় কবি জসীম উদদীন তাঁর সময়ের একজন স্বতন্ত্র ও প্রাকৃতধারার কবি। তাঁর অগ্রজ ও খ্যাতির শীর্ষে থাকা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম যেভাবে গণমানুষের কবি হয়ে উঠেছেন, তিনি সেপথে হাঁটেননি। তিনি গ্রামীণ মানুষের ভাষা ও আবেগ-ভাবালুতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলার মানুষের মন জয় করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন— গ্রামপ্রধান, হরিৎ-সবুজশোভিত এই বাংলার প্রায় নব্বই ভাগ মানুষই গ্রামে বসবাস করেন, এবং গ্রাম ছেড়ে যারা শহরে প্রতিষ্ঠিত হন, তাদের মনের মধ্যে লুকানো থাকে তার একান্ত জন্মগ্রামটি। সেদিক থেকে কবি জসীম উদদীন ছিলেন প্রখর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং প্রকৃত কবির স্বরূপ। মুখে জসীম উদ্দীনকে অনেকে অনগ্রসর, গ্রাম্য কবি, পল্লী কবি অভিধায় অভিহিত করলেও; গ্রামীণ পরিবেশে বড় হওয়া কোনো মানুষই অস্বীকার করতে পারবেন না যে, জসীম উদদীনের কবিতা তার ভাল লাগে না। এই জায়গাটি কবির স্বনির্মিত। তিনি যেমন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গ্রাম্যদৃশ্য কবিতায় ধারণ করতে পেরেছেন, গ্রাম্য প্রকৃতির আচরণকে সংকলিত করতে পেরেছেন, তেমনি তিনি ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এত বেশি কাছের মানুষ হয়ে উঠেছেন, যাতে প্রতিটি পাঠকই মনে করেন এটা যেন তার জন্যই রচনা করেছেন কবি। এবং এ-সময়ের পাঠক মনে মনে নিশ্চয় ভাবেন, গ্রাম বাংলার আঞ্চলিক এবং বহুল ব্যবহৃত কথ্যভাষাকে কীভাবে তিনি অনায়াসে কবিতায় ব্যবহার করতে পেরেছেন।
জসীম উদ্দীন জন্মেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের এক পরাধীন দেশে। তাঁর জন্মের মাত্র চার বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন দুই মহান কবি নজরুল ও জীবনানন্দ (১৮৯৯)। এই দুই কবির কবিতায় প্রবলভাবে এসেছে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। অন্যদিকে কবি জসীম উদ্দীন ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে গিয়ে বারবার ফিরে এসেছেন নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও তা সংরক্ষণের প্রাসঙ্গিকতায়। আমাদের সংস্কৃতিতে আজ প্রবল আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্প। ইউরোপীয় আধুনিকতার অনুকরণে আমরা আমাদের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিকে উচ্চমান দিতে চেষ্টায় রত। কিন্তু আমাদের নিজেদেরও যে অঞ্চলভিত্তিক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে, তা আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যে প্রবলতা পায়নি। পাচ্ছে না। আজকের উত্তর-ঔপনিবেশিক চোখে আমরা এটা বুঝতে পারি যে, সে সময়ে কবি জসীম উদ্দীনের লড়াইটা কতটা তীব্র ছিল।
তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা “কবর”। শুধু বিখ্যাত ও জনপ্রিয়ই নয়, অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী, সংবেদনাময় ও করুণ আর্তি মেশানো শোককবিতা। এই কবিতার বর্ণনা ও বিষয়বিন্যাস অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী এবং অনায়াস-স্বচ্ছ; যা কবিতাটিকে অনন্য সাধারণ করে তুলেছে। এক গ্রামীণ বয়সী মানুষ তার এক নাতনি / নাতিকে কয়েকটি নিকটজনের মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছেন, যা পাঠান্তে পাঠকমাত্র অশ্রুসিক্ত হন। নিজের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূ ও নাতনির মৃত্যুর ভিতর দিয়ে প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে কবিতার। ১৯২৫ সালে রচিত ‘কবর’ কবিতাটি একই বছর প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় যে কবিতাটি ‘গ্রাম্য কবিতা’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। জসীম উদ্দীনের ক্ষেত্রে সেই অবলেহার ধারাটি কিন্তু এখনও বর্তমান আছে, তাঁকে ‘পল্লী কবি’ আখ্যায়িত করে খণ্ডিত করা হয়। এমন ধারার কবিতা যদি বিশ্বের অন্য কোনো ভাষায় লিখিত হতো, তাহলে তা বিশ্বজনীন হতে সময় লাগত না; এবং আজকের বিশ্বের ল্যাটিন কিংবা আফ্রিকান সাহিত্য কিংবা একদার ফরাসি কিংবা ইংরেজি সাহিত্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। এই পোস্ট-কলোনিয়াল অত্যাচার-নিগ্রহের কালে, এই উত্তর-আধুনিক মনন বাস্তবতায় কিংবা অধুনাবাদী চিন্তাচেতনায় সমসাময়িক সমৃদ্ধ সাহিত্য মূলত স্বদেশীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতিনির্ভর, মৃত্তিকালগ্ন ও প্রথাহীন অভিযাত্রায় বিশেষায়িত। এদিক বিবেচনায় কবি জসীম উদ্দীন বাংলা ভাষার কবি হিসেবে, বাঙালির স্বকীয়তা ও বাংলাদেশের নৈসর্গিক বৈচিত্র্যের বাইরে তেমন একটা বিরচণ করেননি। যে কারণে তাঁর কবর কবিতা থেকে নকশিকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট কিংবা যে কোনো কাহিনিকাব্য, লোককবিতা, গানের সংগ্রহ এবং ভ্রমণ কাহিনি, আত্মজৈবনিক রচনাগুলো নিঃসন্দেহে অধুনাবাদী সাহিত্যের মর্যাদা পায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিকগণ তাদের তত্ত্ব তালাশে যদি জসীম উদদীনের রচনাসাগরে অবগাহন করে দেখেন, তাহলে সেখান থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। পোস্টমডার্ন ভাবনায় যে মূল বা শেকড়ে ফেরার গল্প আমরা পাঠ করি, জসীম উদ্দীন তাঁর প্রতিটি কবিতায় সেই গল্পের মালা গেঁথেছেন।
মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত কবি জসীম উদদীনের “কবর” কবিতাটি একটি দীর্ঘ কবিতা হলেও এটি পাঠ করতে পাঠকের ন্যূনতম পরিশ্রম করতে হয় না। গড়গড় হড়হড় করে পড়ে যেতে পারেন, এবং আরও পাঠের আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। এর অন্যতম কারণ জসীম উদদীনের ছন্দ ও ভাষার ওপর দক্ষতা, অন্ত্যমিলের দুর্দান্ত সমন্বয়, বিষয়ের গভীরতা, ভাবনার স্পর্শকাতরতা, প্রকৃতির স্বভাববৈচিত্র্য দিয়ে অলঙ্করণ, সম্পর্কের নৈকট্যসহ কবির কাব্যপরিমিতিবোধ।
এ কবিতার আরও যে বিষয়টি আশ্বর্যান্বিত করে, তা হলো খুব সহজ ও আটপৌরে ভাষায় কঠিন সত্যটি উচ্চারণের ক্ষমতা। এ কবিতার অধিকাংশ জায়গায় ব্যাপারটি ঘটেছে। এমন দু’একটি জায়গা যেমন—
এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
অথবা
এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।
এমন গভীর শোকার্ত উচ্চারণ কবিতার বিষয়-পরিণতি থেকে পাঠককে বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে আরও মনোযোগী করে তোলে এবং কবিতার শেষ লাইনটি পর্যন্ত পাঠ না করে উপায় থাকে না। “কবর” জসীম উদদীনের শ্রেষ্ঠ কবিতা, এতে সন্দেহ নেই। তবে তাঁর অন্যান্য কবিতা ও আখ্যানেও তিনি এমন নিপুণভাবে গ্রাম্য-সহজ-সরল বিষয়াবলিকে উপস্থাপন করেছেন, পাঠক একবার পাঠের আস্বাদ পেয়ে গেলে আর তা থেকে বিচ্যুত হতে পারেন না।
পঞ্চ পণ্ডবের নেতৃত্বে ত্রিশের দশকের আধুনিকতা যখন বাংলা কবিতাকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে, তখন তারা ঘোষণা দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে স্বতন্ত্র কাব্যানুরণনের পক্ষে যুক্তি উত্থাপন করেন। তারা পরিবর্তন আনেন ভাষায়, বর্ণনা বিন্যাসে এবং তিরিশীয় বিশ্বমন্দার অবক্ষয়িত চরম বাস্তবতায়। যেখানে স্থান করে নেয় নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব এবং একাকী মানুষের অবাধ-অগাধ যন্ত্রণা-কাতরতা। বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও জীবনানন্দ দাশ— এই পঞ্চ পাণ্ডবের দ্বারা তখনকার কবিতা শাসিত হলেও; সময় কিন্তু জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে মফস্বলীয় উপাধি দিয়ে আলাদা করে দেয়। এবং তাঁর কবিতাকে আনস্মার্ট, অকবিতা বলে আখ্যায়িত করে। একমাত্র বুদ্ধদেব বসু ছাড়া কারো দৃষ্টিতে জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে ইতিবাচক কিছু উচ্চারিত হতে শোনা যায় না। বরং বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দের কবিতাকে বাংলা কবিতার নতুন ও বিস্ময়কর সংযোজন বলে মনে করতেন। কালের নির্মম বিচারে সেই জীবনানন্দ দাশই আজকের কবিতার শ্রেষ্ঠত্বে আসীন। তিনি ইউরোপীয় নকশায় কবিতা লিখলেও তাতে গলগল করে ঢুকে পড়ে গ্রামীণ জনপদের বৃক্ষ-ফুল-ফসল ও নদীমাতৃকতার নৈসর্গিক আবছায়া। ঠিক একই সময়ের কবি হয়েও জসীম উদদীন থেকে যান বৃত্তের বাইরে। যদিও ইতোমধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ ক্লাসে থাকা অবস্থায় তাঁর কবিতা উচ্চমাধ্যমিকে পাঠ্য হওয়ায় তিনি ব্যাপক আলোচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু ইউরোপীয় আধুনিকতাকে কবিতায় স্থান না দেয়ায় তিনি কথিত ‘পল্লী কবি’ই থেকে যান। আধুনিকতার বিপরীতে তাঁর কবিতা গ্রাম্য কবিতা হিসেবে প্রচারিত হয়। কিন্তু জসীম উদ্দীনের কবিতার পাঠক থেকে যান প্রান্তিকজনেরা কিংবা নিবিড় গাঁয়ে শৈশব-কৈশর কাটানো মানুষ; এবং তাদের মুখে মুখেও উচ্চারিত হতে থাকে জসীম উদ্দীনের কবিতা। কারণ তাঁর ভাষা যতটা কাছে টানে পঞ্চ পাণ্ডবের ভাষা ততটা মানুষকে আপন করে নিতে পারে না। তবু কবিতা বিচারে সময় কিন্তু ওই পঞ্চ পাণ্ডবকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। অন্যত্র গ্রাম্য সহজ সরল মানুষ উচ্চারণ করতে থাকে জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতা কিংবা ‘নকশিকাঁথার মাঠ’-এর মতো আখ্যান কাব্য। রাত্রিবেলায় রেডিও খুলে উঠোনে মাদুর পেতে জমায়েত হয়ে শোনে জসীম উদ্দীনের নাটক, কিংবা তাঁর রচিত পল্লীগীতি-লোকগীতি। এর একটাই কারণ: জসীম উদ্দীনের কবিতা খুব সহজেই বোধগম্য হয়।
কবিতা একরকম নয়। বিচিত্র প্রকার। তিরিশীয় আধুনিকতায় যে কবিতার সংজ্ঞা নিরূপিত হয়; তাতে কবিতা বুঝতেই হবে বা বোঝা যাবে— ব্যাপারটা এমন নয়। বরং জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, “যে কবিতা বোঝা লেগ, স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তক তার পরম গৌরবময় কবর”। আবার বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, “কবিতা বোঝার জিনিস নয়।” হয়তো বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কথাগুলো উচ্চারিত হয়েছে কিংবা সর্বাবস্থায়ই তাঁরা এরকম মনে করে থাকেন। তবে কবিতা যে বোঝা-না-বোঝার মাঝামাঝি একটা উৎকৃষ্ট শিল্প তা স্পষ্ট। ষাটের দশকের খ্যাতিমান কবি মোহাম্মদ রফিক, একবার বলেছিলেন, “শিল্প বিমূর্ত ব্যাপার।” এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কবিতার রহস্যই কবিতাকে স্থায়িত্ব দেয়। সেক্ষেত্রে কবি তাই কখনো সরাসরি বক্তব্য কিংবা বিবৃতিধর্মিতাকে কবিতা বলতে নারাজ। সেখানে আলো-আঁধারি থাকবে, রহস্যময়তা থাকবে, দূর-বোধ্যতা থাকবে, আড়াল থাকবে, অলঙ্কার থাকবে, উপমা-চিত্রকল্প-মেটাফর থাকবে; পরম্পরাযুক্ত অথবা পারম্পর্যহীন বক্তব্যও থাকবে— এটাই স্বাভাবিক।
কবিতা নিয়ে এ ধরনের ব্যাখ্যা-বক্তব্যের কোনো শেষ নেই। তবে যে ভাষা বিন্যাস, অলঙ্কৃত বক্তব্য বা সুনির্বাচিত শব্দের সর্বোত্তম সজ্জা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, মানুষের মনকে আলোড়িত করে, সিক্ত করে, প্রশান্তি দেয়— সেটাই কবিতা বা শিল্প। সেই বিবেচনায় জসীম উদ্দীনের “কবর” কবিতা একটি উৎকৃষ্ট কবিতা ও অনন্য শিল্প। এ কবিতা এতটাই মানুষের মনকে সিক্ত করেছে, স্পর্শ করেছে যে, জসীম উদ্দীনের শিক্ষক, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার, গবেষক দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর “করব” কবিতা পাঠান্তে জসীম উদ্দীনের মতো ছাত্রের শিক্ষক হতে পারাটা তাঁর জন্যে গর্বের বিষয় বলে মনে করতেন। “কবর” কবিতার প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যে অসংখ্য মৃত্যুর করুণ বর্ণনা রয়েছে, তাতে পুরো কবিতাটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠককে বিষাদাক্রান্ত করে রাখে। আবার কবিতায় বাংলার যে নৈসর্গিক উপমা ও দৃশ্যচিত্র আঁকা হয়েছে, তা বাঙালি পাঠকের নিসর্গপ্রেমকে গভীরভাবে উন্মোচিত করে। এতগুলো মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার ফিরে গিয়েছেন কবি প্রকৃতির কাছে, ব্যক্ত করেছেন প্রাকৃত শোকের ভাষা— যা জসীম উদদীনের প্রকৃত কবি পরিচয়কে প্রবল করে তোলে। এমন যেসব বর্ণনা কবিতাকে সমৃদ্ধ করেছে তা থেকে কিছুটা উল্লেখ করা যাক:
তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জড়ায়ে ধরি,
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিত সারা দিনমান ভরি।
গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,
ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।
কিংবা
জোড় মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরুছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।
জোনাকি-মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।
এরকম আরো অনেক অনেক পঙ্ক্তিতে কবি প্রকৃতিকেও বেদনাবিহ্বল করে তোলেন। প্রকৃতি মানুষের সমব্যথী হয়ে ওঠে। কবি “কবর” কবিতায় যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, সেটাই মূলত “জসীমীয় ভাষা” বলে আমরা ধারণা করতে পারি। জসীম উদ্দীন তাঁর ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় সাধু, চলিত, আঞ্চলিক ও কথ্য ভাষার সংমিশ্রণ ঘটান। “কবর” কবিতায়ও সে কাজটি করেছেন। এ জাতীয় শব্দ প্রয়োগের পর এমন মনে হয় যে, ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই বুঝি অনিবার্য কিংবা অপরিহার্য ছিল, বিকল্প শব্দ বা অন্য কোনো শব্দই এখানে প্রযোজ্য নয়। মূলত এটিই কবির ক্ষমতা বা শক্তিমত্তা।
আজকাল যেমন কঠিন বা দুরারোগ্য নানান অসুখে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যায়, সেই ঔপনিবেশিক কালে কিংবা জসীম উদ্দীনের কালেও কিছু দুরারোগ্য অসুখ ছিল, যাতে মানুষ মারা যেত। এর বাইরে আরও কিছু সাধারণ কারণ রয়েছে, যাতে মানুষের জীবনাবসান ঘটে। যেমন সেসময় পচা জ্বরে মৃত্যুর বিষয়টি প্রচলিত ছিল, সাপে কাটা মৃত্যুর বিষয়টি অহরহ ছিল, আবার গ্রামীণ মেয়েদের অভিমান করে, শ্বশুর বাড়িতে নির্যাতিত হয়ে কিংবা পতিহারা হয়ে আত্মহত্যার বিষয়গুলো ছিল অতি স্বাভাবিক ঘটনা। মৃত্যুর কারণ হিসেবে “কবর” কবিতায় এ বিষয়গুলোই লক্ষ্য করা যায়। যদিও আজকের দিনেও এ জাতীয় মৃত্যুর ঘটনা প্রচুর ঘটছে, তবে এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে আরও অনেক অনেক দুর্বোধ্য কারণ।
জসীম উদ্দীন সহজাত কবি। তাঁর কোনো কষ্টকল্পিত কবিতা নেই। তাঁর কল্পনার সমুদ্র গ্রাম বাংলার আনাচকানাচ। তিনি তাঁর সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন নিজের পরিবার ও আশপাশে দেখা পরিবারগুলোর জীবনাচরণ ও স্বভাব প্রকৃতি থেকে। তাঁর “করব” কবিতার খ্যাতির যে উৎসসূত্র, এই কবিতার যে অপার শক্তিমত্ততা তার মূলে আছে গ্রামবাংলার প্রকৃতি, মানুষ ও তাদের জীবনাচারের যথার্থ রূপায়ন।
এই কবিতা যে কতটা শক্তিশালী আজ শত বছর পরে বসেও অনুধাবন করা যায় তখন, যখন একজন তরুণ, প্রৌঢ় কিংবা প্রবীণ কবি কবিতাটি নিয়ে লিখতে বসেছেন। কবিতাটি নিয়ে অগণিত কাজ হচ্ছে কিংবা পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। “কবর” এমনই একটি কবিতা যা পাঠান্তে নির্বিশেষে আমাদেরকে আবেগঘন করে; অশ্রুসিক্ত করে ও কিছু সময়ের জন্য স্বজন হারানোর বেদনায় ব্যথিত ও সিক্ত করে। এ কবিতার আবেদন তাই কখনো শেষ হবে বলে মনে হয় না। যত দিন বাঙালি থাকবে, থাকবে তার ভাষা, ততদিন আয়ু এই “কবর” কবিতার। আর যদি কবিতাটিকে যথার্থ অনুবাদ করে বিভিন্ন ভাষায় ছড়িয়ে দেয়া যায়, তবে তা বিশ্বপরিসরেও আবেদন সৃষ্টির যথার্থ যোগ্যতা রাখে।
বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্ম নেয়া এই কবি আমাদের গর্ব, আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের অভিভাবক; এবং তাঁর “কবর” কবিতা আমাদের কবিতা ও সাহিত্যসম্ভারে অসম্ভব শক্তিশালী সংযোজন।

আপনার মতামত লিখুন