সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাচ্ছে সরকার


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাচ্ছে সরকার
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাচ্ছে সরকার। ছবি: প্রতীকী

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট হচ্ছে, আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে নয়, বরং বাড়তি সময় নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে চায় সরকার।

গেল ফেব্রুয়ারিতেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারপারসনের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে তিন বছর গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর অনুরোধ করেছে। সরকারের দাবি, কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নির্ধারিত সময়ে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রোববার (৫ এপ্রিল) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের দিকে বাংলাদেশের যাওয়ার সুযোগ নেই।’ অর্থনীতির যে অবস্থা পূর্ববর্তী সরকার থেকে পেয়েছে সরকার, তা কাটিয়ে উঠতে পারলেই এলডিসি নিয়ে ভাবা হবে বলেও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছাড়াও ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব ও জ্বালানি সংকটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।  আমির খসরু বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন করে, দেশের ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে আমরা নির্ধারণ করব কখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের দিকে যেতে পারব।’

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও একই সুরে কথা বলেছেন। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমার সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে ও ধাপে ধাপে উত্তরণের মাধ্যমে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে চায়, যাতে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পখাত কোনো ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন না হয়’। এক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের দাবি, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালে একের পর এক বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকট প্রস্তুতিকে ব্যাহত করেছে। ইআরডির পাঠানো চিঠিতে সরকার উল্লেখ করেছে: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি বৈশ্বিক আর্থিক নীতি কঠিন হয়েছে। তাছাড়া বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা যেভাবে বেড়েছে ঠিক বিপরীতভাবে দেশীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও রাজস্ব আয় কমেছে।জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিবর্তনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর অনুরোধের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব উল্লেখ করা হয়েছে।

পিছিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি হলো- অতিরিক্ত সময় দেশকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে। বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে যে সুবিধাগুলো পাচ্ছে- প্রধানত বাজার প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা, ডব্লিউটিওর বিশেষ ও পৃথক সুবিধা, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা- গ্র্যাজুয়েশনের পর সেগুলো হারাবে। একটু বেশি সময় পেলে এসব সুবিধা হারানোর ধাক্কা সামাল দিতে দেশ প্রস্তুত হতে পারবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিষয়টি জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই গ্র্যাজুয়েশন এগিয়ে নিলে রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

উল্লেখ্য, বিএনপি সরকার গঠনের আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনসহ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছিলেন। গত বছর এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতির ভবিষ্যৎ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় যা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা না করে’। তিনি আরও বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা পোর্ট সংস্কার- এসব দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত অবশ্যই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকেই নিতে হবে’।

ইতিমধ্যে জাতিসংঘের সিডিপির কাছে সরকারি আবেদন জমা পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সিডিপির বৈঠকে এ বিষয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনা হয়েছে। চূড়ান্ত সুপারিশ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে শেষ হবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সূত্রমতে, আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে গ্র্যাজুয়েশনের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে। অর্থমন্ত্রী যেমন বলেছেন, ‘এলডিসি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হবে অর্থনীতির অবস্থা কাটিয়ে ওঠার পর। সে অনুযায়ী আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশ এলডিসি সুবিধা নিয়েই থাকবে।’

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২৬


এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছাচ্ছে সরকার

প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা পেছানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার। অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট হচ্ছে, আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে নয়, বরং বাড়তি সময় নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে চায় সরকার।

গেল ফেব্রুয়ারিতেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারপারসনের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে তিন বছর গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর অনুরোধ করেছে। সরকারের দাবি, কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে নির্ধারিত সময়ে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী রোববার (৫ এপ্রিল) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের দিকে বাংলাদেশের যাওয়ার সুযোগ নেই।’ অর্থনীতির যে অবস্থা পূর্ববর্তী সরকার থেকে পেয়েছে সরকার, তা কাটিয়ে উঠতে পারলেই এলডিসি নিয়ে ভাবা হবে বলেও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতা ছাড়াও ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব ও জ্বালানি সংকটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।  আমির খসরু বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন করে, দেশের ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের মাধ্যমে আমরা নির্ধারণ করব কখন এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের দিকে যেতে পারব।’

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও একই সুরে কথা বলেছেন। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রাবাব ফাতিমার সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরিকল্পিতভাবে ও ধাপে ধাপে উত্তরণের মাধ্যমে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে চায়, যাতে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পখাত কোনো ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন না হয়’। এক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের ধারাবাহিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের দাবি, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালে একের পর এক বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকট প্রস্তুতিকে ব্যাহত করেছে। ইআরডির পাঠানো চিঠিতে সরকার উল্লেখ করেছে: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ জ্বালানি ও খাদ্যমূল্য যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি বৈশ্বিক আর্থিক নীতি কঠিন হয়েছে। তাছাড়া বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা যেভাবে বেড়েছে ঠিক বিপরীতভাবে দেশীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও রাজস্ব আয় কমেছে।জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিবর্তনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর অনুরোধের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব উল্লেখ করা হয়েছে।

পিছিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি হলো- অতিরিক্ত সময় দেশকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করবে। বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে যে সুবিধাগুলো পাচ্ছে- প্রধানত বাজার প্রবেশের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা, ডব্লিউটিওর বিশেষ ও পৃথক সুবিধা, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা- গ্র্যাজুয়েশনের পর সেগুলো হারাবে। একটু বেশি সময় পেলে এসব সুবিধা হারানোর ধাক্কা সামাল দিতে দেশ প্রস্তুত হতে পারবে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বিষয়টি জরুরি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই গ্র্যাজুয়েশন এগিয়ে নিলে রপ্তানি খাতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।

উল্লেখ্য, বিএনপি সরকার গঠনের আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনসহ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছিলেন। গত বছর এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘জাতির ভবিষ্যৎ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় যা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা না করে’। তিনি আরও বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা পোর্ট সংস্কার- এসব দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত অবশ্যই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারকেই নিতে হবে’।

ইতিমধ্যে জাতিসংঘের সিডিপির কাছে সরকারি আবেদন জমা পড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সিডিপির বৈঠকে এ বিষয়ে প্রাথমিক পর্যালোচনা হয়েছে। চূড়ান্ত সুপারিশ ও অনুমোদন প্রক্রিয়া চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে শেষ হবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সূত্রমতে, আবেদন গ্রহণযোগ্য হলে গ্র্যাজুয়েশনের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে। অর্থমন্ত্রী যেমন বলেছেন, ‘এলডিসি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হবে অর্থনীতির অবস্থা কাটিয়ে ওঠার পর। সে অনুযায়ী আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশ এলডিসি সুবিধা নিয়েই থাকবে।’


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত