সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

কথোপকথনে জানালেন চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ

যেভাবে লেখা হলো ‘লোরকার দেশে’


সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সংবাদ সাময়িকী
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সংবাদ সাময়িকী
প্রকাশ: ৬ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৪১ পিএম

যেভাবে লেখা হলো ‘লোরকার দেশে’
ফুয়েন্তে বাকেরোজ, লোরকার জন্মস্থানে শিল্পী কায়েতানো আনিবেল নির্মিত লোরকার ভাস্কর্যের সামনে চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে থেমে যাওয়া এক বিস্ময় প্রতিভা। কবিতা, নাটক, চিত্রকলা, সঙ্গীতসহ শিল্পের প্রায় প্রতিটি শাখায় বিচরণ করেছেন ঈর্ষণীয়ভাবে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীগণ। এমনই একজন তাঁর বাঙালি অনুরাগী চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ। প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, কবি ও নাট্যসংগঠক। লোরকার প্রতি আসক্ত হয়ে ভ্রমণ করেছেন লোরকার জন্মভূমি স্পেনসহ লোরকার বিচরণভূমি আমেরিকা, আর্জেন্টিনা, কিউবায়— শুধুমাত্র লোরকার স্মৃতির সন্ধানে। তাঁর এই ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘লোরকার দেশে’ নামে ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি হিসেবে মুদ্রিত হয় সংবাদ সাময়িকীতে। এরপর এটি ২০২৬-এর অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় গ্রন্থাকারে। বইটি পাঠকের মধ্যে বেশ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। কীভাবে লেখা হলো বইটি— এই প্রশ্নটিকে মাথায় রেখে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে লোরকার প্রতি তাঁর আগ্রহের কারণ, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং লোরকার দেশের নানান প্রসঙ্গ অনুষঙ্গ। সংবাদ সাময়িকীর সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘লোরকার দেশে’ গ্রন্থটির রচনাগাথা। 

সংবাদ সাময়িকী: অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে আপনার একটি অসাধারণ গ্রন্থ ‘লোরকার দেশে’। বইটি একটি ভ্রমণ কাহিনি বলে জানি। আপনি লোরকা এবং তার দেশকে কেন বেছে নিলেন?

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ: ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা আমার প্রিয় কবি। প্রিয় কবির দেশটিও যে প্রিয় হবে, এ তো স্বাভাবিক। লোরকার কবিতার বিষয় ও ভাব স্বদেশকে নিয়ে হলেও তাঁর সৃষ্টির একটি বিশ্বজনীন রূপ আছে, যা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। স্পেন ছাড়িয়ে লোরকা পরিভ্রমণ করেছেন আরো কয়েকটি দেশ— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা ও আজেন্টিনা। স্পেনের সীমানা পেরিয়ে এসব দেশও হয়ে গেছে লোরকার দেশ। এখানেও লোরকার স্মৃতি খুঁজে বেরিয়েছি। তার বৃত্তান্ত ‘লোরকার দেশে’ বইটিতে দেয়া আছে।

স. সা: বইটির বিষয় ভ্রমণ কাহিনি হলেও স্পেনের ইতিহাস ঐতিহ্য মিথ সংস্কৃতি আলোচিত হয়েছে। আপনি আসলে এই বইটির মাধ্যমে আপনার পাঠককে কী মেসেজ দিতে চেয়েছেন?

চৌ. সা. মা: ভ্রমণ কাহিনির অনুষঙ্গ হিসেবে ইতিহাস ঐতিহ্য মিথ সংস্কৃতি চলে আসে। এসব ছাড়া একটি ভ্রমণ কাহিনি অপূর্ণ থাকে। ইতিহাস ঐতিহ্য মিথ লোরকার কবিতা ও নাটকের মূল বিষয়। এসব বিষয়ের আলোচনা লোরকার কবিতার প্রেক্ষাপট বুঝতে অনেক সহায়তা করবে। এক অস্থির সময়ে লোরকার জন্ম, বেড়ে ওঠা, আর তাঁর কবিতা ও নাটকের সৃষ্টি। তাঁর কবিতাকে, নাটককে বুঝতে হলে সে সময়কে, সে ইতিহাসকে জানতে হবে। স্পেন ছাড়া লোরকা আরো যেসব দেশ ভ্রমণ করেছেন—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা, আর্জেন্টিনা— এসব দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপরেও কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে ‘লোরকার দেশে’ বইটিতে। 

স. সা: ‘লোরকার দেশে’ বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন। যাতে আপনার এই বক্তব্য শুনে পাঠক বইটি পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়।

চৌ. সা. মা: এখানে ভ্রমণ কাহিনি ও লোরকার স্মৃতিচারণা সমান্তরালভাবে অবস্থান করেছে। ভ্রমণ কাহিনির সাথে সেসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। স্মৃতিচারণার মাঝে মাঝে লোরকার সাহিত্য জীবনের বিশেষ দিকগুলি উল্লিখিত হয়েছে। সাথে উঠে এসেছে লোরকার পরিবারের বর্ণনা, তাঁর বিভিন্ন স্থানে বসবাসের চিত্র, তাঁর কাব্য ও নাট্য জীবনের মূল সহযোগীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। 

স. সা: বইটি লিখতে গিয়ে আপনি কোন কোন জায়গাগুলো ঘুরেছেন?

চৌ. সা. মা: আমি সপরিবারে ঘুরেছি স্পেনের বিভিন্ন শহরে, গ্রামে। প্রথমেই যাই লোরকার শহর গ্রানাদায়। সেখান থেকে ১০ মাইল দূরের এক গ্রাম ফুয়েন্তে বাকেরোজ এ যাই। এখানেই ছোট  এক বাড়িতে লোরকার জন্ম, যা এখন একটি জাদুঘর—কাসা মুজেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। গ্রানাদায় আছে লোরকার ওপর এক আধুনিক প্রদর্শনী ও গবেষণা কেন্দ্র— সেন্ট্রো দ্য ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা— সেটি দেখা ছিল এক মূল্যবান অভিজ্ঞতা। এরপর দেখেছি লোরকার পরিবারের গ্রীষ্মকালীন আবাস, যা এখন এক স্মৃতি যাদুঘর—কাসা মুজেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা: হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে। পাশেই বিশাল ও সুন্দর এক পার্ক—পার্কে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। লোরকাকে যে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তা এখন এক হোটেল— ক্রিস্টিনা হোটেল— সেখানে কয়েকদিন সপরিবারে ছিলাম। গ্রানাদা থেকে ১২ মাইল দূরের এক পাহাড়ি স্থান— আলফাকার ও ভিজনার-এর কোনো এক স্থানে লোরকাকে হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে লোরকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এসেছি।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যাই মরক্কোর মাঝে স্পেনের এক শহর মেলিইয়াতে। এরপর আবার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ফিরে আসি স্পেনের মূল ভূখণ্ডে— মালাগা শহরে। এটি পিকাসোর জন্মস্থান হলেও লোরকার অনেক স্মৃতি আছে এখানে, দেখলাম সেসব। এল কাফে দে চিনিতাস বিখ্যাত হয়ে আছে লোরকা ও পিকাসোর স্মৃতিতে, তাঁরা সেখানে প্রায়ই যেতেন। ক্যাফেটির কেন্দ্রে রয়েছে লোরকার একটি ভাস্কর্য।

আন্দালুসিয়া ছিল লোরকার আত্মা, যা বারবার উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। এর প্রথম বিন্দু গ্রানাদা দিয়ে আমাদের ভ্রমণ শুরু। এরপর আন্দালুসিয়ার ত্রিভুজের শেষ দুটি বিন্দু— সেভিয়া ও কর্ডোভা দেখতে যাই।১৯২৭ এর মাঝামাঝি সময়ে কবি লিউইস দে গঙ্গোরার ত্রিশততম মৃত্যুবার্ষিকীতে সেভিয়া শহরে মিলিত হয়েছিলেন কিছু কবি ও শিল্পী, যার মাঝে ছিলেন লোরকা, দালি ও বুনুয়েল। এ ছিল এক নতুন কাব্য আন্দোলনের সূচনাপর্ব, যা পরিচিতি পেয়েছিল ‘জেনারেসিওন দেল ২৭’ অর্থাৎ, ‘জেনারেশান ২৭’ নামে। সেভিয়াতে দেখেছি লোরকার স্মরণে নির্মিত এক সুন্দর পার্ক। 

আন্দালুসিয়া থেকে গেলাম কাতালুনিয়ায়, এ যেন ছিল নতুন এক জগতে পদার্পণ। কাতালুনিয়ার কেন্দ্র বার্সেলোনা মহান শিল্পী গাউদির সৃষ্টি দিয়ে ভরা— তার মাঝেও রয়েছে লোরকার অনেক স্মৃতি।  এর মধ্যে বিখ্যাত হয়ে আছে মাঝারি আকারের এক থিয়েটার হল, তেয়াথ্রো গয়া—২৪ জুন ১৯২৭-এর রাতে এখানে লোরকার ট্র্যাজেডি নাটক ‘মারিয়ানা পিনেদা’র শুভ মহরত অনুষ্ঠিত হয়।

সবশেষে গেলাম স্পেনের কেন্দ্রে— রাজধানী মাদ্রিদে। এখানে ছাত্রাবাস রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস-এ লোরকা ছিলেন প্রায় এক দশক। এসময় কবিতা-নাটক-চিত্রাঙ্কন-পিয়ানো বাজনা— সব মিলিয়ে তাঁর সৃষ্টির শত প্রবাহ বইতে থাকে এক অনুকুল পরিবেশে। চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালি, চলচ্চিত্রকার লুই বুনুয়েল এবং সুরকার-গীতিকার ম্যানুয়েল দে ফাইয়ার সাথে লোরকার বন্ধুত্ব গড়েওঠে। লোরকার ওপর এদের প্রভাব ছিল সুগভীর। এদের সাথে যে কক্ষটিতে বসে লোরকা বহু সময় কাটিয়েছেন শিল্প-সাহিত্যের আলোচনায়, সে কক্ষটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। 

মাদ্রিদের সুবিখ্যাত থিয়েথ্রো এসপানিয়ল-এ প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল লোরকার নাটক ইয়ের্মা ২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে। তার ৫০ বছর পূর্তিতে এর সামনে বসানো হয় লোরকার পূর্ণাকার এক ভাস্কর্য। মাদ্রিদে লোরকার এ রকম আরো অনেক স্মৃতি দেখলাম।  

মাদ্রিদে এক উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হলো শহরের পূর্ব প্রান্তে লাস ভেনথাস-এ বুল ফাইটিং দেখা। স্পেনের এই বিশিষ্ট ঐতিহ্য লোরকার কবিতায় ফুটে উঠেছে তাঁর বুল ফাইটার বন্ধুর মৃত্যুতে শোক-গাথায়। 

মাদ্রিদ থেকে গেলাম স্পেনের পুরনো রাজধানী তোলেদোতে— যাকে বলা হয় সিয়োদাদ দে লাস থ্রেস কুলথুরাস— তিন সংস্কৃতির শহর। কারণ খ্রিস্টান, মুসলিম ও ইহুদিদের সহাবস্থানের এক বড় দৃষ্টান্ত তোলেদো। লোরকা, দালি, বুনুয়েল— এ তিনজনের বন্ধুত্বের কথা আমরা জানি। এদের সাথে যোগ দিল পেপিন বেয়ো। বুনুয়েল এদের সবাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন অরদেন দে তোলেদো— এ সংগঠনের উদ্দেশ্য এ শহরটির অনুসন্ধান ও উদযাপন। লোরকা ও তাঁর বন্ধুদের পথ ধরে আমরাও সুন্দর ও ঐতিহাসিক এ শহরটিকে দেখলাম। 

লোরকাকে অনুসরণ করে আবার গেলাম নিউ ইয়র্ক। এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক জগত। নিসর্গের গীতিময় আন্দালুসিয়া থেকে নিউ ইয়র্কের এক বস্তুবাদী আধুনিক শহরে আসা লোরকার জন্য ছিল এক বড় ধাক্কা। এখানে এসে দেখেন পুঁজিবাদী সমাজের অমানবিকতা ও অসাম্য। তারই ফলশ্রুতি লোরকার পরাবাস্তববাদী কাব্য ‘পয়েথা এন নুয়েভা ইয়র্ক’।  

নিউ ইয়র্ক থেকে হাবানা এসে লোরকা যেন খুঁজে পেলেন আন্দালুসিয়াকে। কিউবার মানুষও লোরকাকে তাদের একজন হিসেবে বুকে বরণ করে নেয়। হাবানাতে গেলাম লোরকার স্মৃতির খোঁজে। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত থিয়েটার হল গ্রান থ্রিয়েথ্রো দে লা হাবানাআলিসিয়া আলনসোতে রয়েছে লোরকার স্মরণে এক প্লাক। বিখ্যাত এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—সেনথ্রো কুলথুরাল দুলছে মারিয়া লয়নাস-এর প্রধান হলঘরটি লোরকার নামে—সেনথ্রো ফেদিরিকো গার্সিয়া লোরকা। এই কেন্দ্রে লোরকা প্রায়ই আসতেন, এর স্মরণে আঙিনায় রাখা আছে লোরকার এক আবক্ষ মূর্তি। কিউবায় একমাত্র কবিতা লিখেছেন লোরকা ‘আমি সান্তিয়াগো যাবো’— এটি কিউবার এক বিশেষ সঙ্গীত সন-এর ভাব ও ছন্দ নিয়ে রচিত।

১৯৩৩ সালের ২৯ শে জুলাই বোদাস দে সাংগ্রে-এর প্রিমিয়ার হয় বুয়েনেস আইরেস এর নাট্যশালা তেয়াত্রো মাইপোতে, যা দর্শকদের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলে। এতে উৎসাহিত হয়ে এর প্রযোজক লোরকাকে আমন্ত্রণ জানান আর্জেন্টিনা সফরে, যাতে তিনি নিজেই দিতে পারেন নাটকটির নির্দেশনা। আর সেই সাথে অংশ নিতে পারেন কয়েকটি বক্তৃতামালায়। ১৩ অক্টোবর, ১৯৩৩ সালে লোরকা বুয়েনোস আইরেস পৌঁছেন। পরিকল্পনা ছিল তিনি এ শহরে ৩ সপ্তাহ থাকবেন। কিন্তু এখানকার অভ্যর্থনা ও আন্তরিকতা লোরকাকে বুয়েনোস আইরেসে ধরে রাখে ৬ মাস।

লোরকার স্মৃতির খোঁজে বুয়েনোস আইরেস চলে যাই, দেখি তাঁর অনেক স্মৃতি। বিখ্যাত ক্যাফেথরথনিতে লোরকা প্রায়ই যেতেন, কারণ এটি ছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের এক মিলনস্থল। এখানে প্রধান হলে শোভা পাচ্ছে লোরকার ছবি ও সাথে এক প্লাক। বুয়েনোস আইরেস-এর এক বড় ও সুন্দর পার্ক এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরো, এর অংশ কবিদের বাগান হার্দিন দে লস পয়েতাস-এ বিশ্বের ২১ জন শিল্পী-সাহিত্যিকের সাথে দেখলাম লোরকার আবক্ষ মূর্তি। সাথে ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। বুয়েনোস আইরেসে রয়েছে এ দু’কবির আরো অনেক স্মৃতি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শহরের বাইরে সান ইসিদ্রোর ভিলা ওকাম্পো-তে আরো অনেকের সাথে প্রিয় এ দুজনের স্মৃতি।

স. সা: লোরকার প্রতি আপনার কীভাবে আগ্রহ তৈরি হলো? লোরকার কবিতা/নাটক পড়ে নাকি তার ঘটনাবহুল জীবন কাহিনি জেনে?

চৌ. সা. মা: সত্যি বলতে গেলে লোরকার কবিতা পড়ে, একই সাথে তাঁর জীবন কাহিনি জেনে তাঁর প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। যতই লোরকার কবিতা পড়ি, যতই তাঁর জীবনের কাহিনি জানি, ততই এ আগ্রহ ও অনুরাগ গভীরতর হতে থাকে।

স. সা: আপনি তো লোরকা সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন, এখন লোরকার দেশ ঘুরে এসে আপনার কি লোরকা সম্পর্কে ধারণায় কোনো পরিবর্তন এসেছে?

চৌ. সা. মা: বই পড়ে আগে যা জানতাম তার চেয়ে অনেক বেশি সৃষ্টিশীল ও ভুবন-বিস্তৃত ছিলেন লোরকা। এ রকম প্রতিভা সহস্র বছরে দু’একজন আসে। মাত্র ৩৮ বছরের জীবনে তাঁর এত সৃষ্টি-সম্ভার, উনি দীর্ঘ আয়ু পেলে কি বিশাল হয়ে উঠত তাঁর সৃষ্টি-সম্পদ। মানব জাতির কি দুর্ভাগ্য, অকালে ঘাতকের হাতে প্রাণ হারাতে হলো এ প্রতিভার, আমরা তাঁর আরো সৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হলাম।

স. সা: লোরকা যেখানে যেখানে ঘুরেছেন, আপনি সেসব জায়গা যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। লোরকা আসলে কেন এসব জায়গায় ঘুরেছেন বলে আপনার মনে হয়? এসব জায়গায় ঘুরে আপনারই-বা কেমন অভিজ্ঞতা হলো?

চৌ. সা. মা: জীবন ও জগতকে দেখা তো একজন কবির বড় লক্ষ্য। এ ছিল লোরকার মৌলিক তাড়না। জীবনকে তিনি প্রাণোচ্ছ্বাসে উদযাপন করেছেন দিগি¦দিক ঘুরে। এরপর আসে নাট্য নির্দেশনা, বক্তৃতা প্রদান ও অন্যান্য আমন্ত্রণ— যা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে নিউ ইয়র্ক, হাবানা ও বুয়েনোস আইরেসে ভ্রমণে যেতে। নতুন স্থান, নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা— লোরকাকে সব সময় হাতছানি দিয়ে ডাকত। 

স. সা: ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার অকৃত্রিম ভক্ত বলেই আপনি এই বইটি লিখেছেন। লোরকাকে নিয়ে কি আপনার আর কোনো কাজ করার ইচ্ছা আছে? যদি করেন, তাহলে তার কোন দিকটি নিয়ে কাজ করবেন?  

চৌ. সা. মা: লোরকার সৃষ্টি সম্পদ নিয়ে কিছু লেখাপড়ার ইচ্ছে আছে। এরপর কোনো একদিন লোরকার এক সাহিত্য-জীবনী লিখব বলে আশা করছি। 

স. সা: ‘লোরকার দেশে’ বইটি পড়ে দিনশেষে একজন কবি বা লেখক তার অভিজ্ঞতায় কোন অজানা দিকগুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন বলে আপনার বিশ্বাস।

চৌ. সা. মা: লোরকার কার্যক্রমের বিরাট বিস্তৃতি নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এ জায়গাগুলি দেখে তাঁর কর্মবহুল ও সৃষ্টিমুখর জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পারলাম। অনেকের জানা নাও থাকতে পারে একটি মজার তথ্য। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্পেন সফরের প্রস্তুতিতে জড়িত ছিলেন লোরকা। পরে অবশ্য দুজনের সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা সে ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

স. সা: বইটি সম্পর্কে আপনি কি পাঠককে আর কিছু ধারণা দিতে চান, যে বিষয়ে আপনার কাছে কিছু জানতে চাওয়া হয়নি?

চৌ. সা. মা: এ বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক এর সাথে অনেক ছবি সংযোজন করা হয়েছে। ছবিগুলি প্রতিটি এলাকার প্রতিনিধিত্বমূলক। সাথে রয়েছে লোরকার স্মৃতি-সম্বলিত বহু ছবি যা লোরকাকে আরো বুঝতে সহায়তা করবে বলে আমার বিশ্বাস। আর তথ্য-সূত্রে অনেক তথ্য দেয়া আছে যা অনেক কিছুর ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করবে। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬


যেভাবে লেখা হলো ‘লোরকার দেশে’

প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে থেমে যাওয়া এক বিস্ময় প্রতিভা। কবিতা, নাটক, চিত্রকলা, সঙ্গীতসহ শিল্পের প্রায় প্রতিটি শাখায় বিচরণ করেছেন ঈর্ষণীয়ভাবে। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীগণ। এমনই একজন তাঁর বাঙালি অনুরাগী চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ। প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, কবি ও নাট্যসংগঠক। লোরকার প্রতি আসক্ত হয়ে ভ্রমণ করেছেন লোরকার জন্মভূমি স্পেনসহ লোরকার বিচরণভূমি আমেরিকা, আর্জেন্টিনা, কিউবায়— শুধুমাত্র লোরকার স্মৃতির সন্ধানে। তাঁর এই ভ্রমণবৃত্তান্ত ‘লোরকার দেশে’ নামে ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি হিসেবে মুদ্রিত হয় সংবাদ সাময়িকীতে। এরপর এটি ২০২৬-এর অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় গ্রন্থাকারে। বইটি পাঠকের মধ্যে বেশ আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। কীভাবে লেখা হলো বইটি— এই প্রশ্নটিকে মাথায় রেখে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে লোরকার প্রতি তাঁর আগ্রহের কারণ, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং লোরকার দেশের নানান প্রসঙ্গ অনুষঙ্গ। সংবাদ সাময়িকীর সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বর্ণনা করেছেন ‘লোরকার দেশে’ গ্রন্থটির রচনাগাথা। 

সংবাদ সাময়িকী: অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে আপনার একটি অসাধারণ গ্রন্থ ‘লোরকার দেশে’। বইটি একটি ভ্রমণ কাহিনি বলে জানি। আপনি লোরকা এবং তার দেশকে কেন বেছে নিলেন?

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ: ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা আমার প্রিয় কবি। প্রিয় কবির দেশটিও যে প্রিয় হবে, এ তো স্বাভাবিক। লোরকার কবিতার বিষয় ও ভাব স্বদেশকে নিয়ে হলেও তাঁর সৃষ্টির একটি বিশ্বজনীন রূপ আছে, যা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। স্পেন ছাড়িয়ে লোরকা পরিভ্রমণ করেছেন আরো কয়েকটি দেশ— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা ও আজেন্টিনা। স্পেনের সীমানা পেরিয়ে এসব দেশও হয়ে গেছে লোরকার দেশ। এখানেও লোরকার স্মৃতি খুঁজে বেরিয়েছি। তার বৃত্তান্ত ‘লোরকার দেশে’ বইটিতে দেয়া আছে।

স. সা: বইটির বিষয় ভ্রমণ কাহিনি হলেও স্পেনের ইতিহাস ঐতিহ্য মিথ সংস্কৃতি আলোচিত হয়েছে। আপনি আসলে এই বইটির মাধ্যমে আপনার পাঠককে কী মেসেজ দিতে চেয়েছেন?

চৌ. সা. মা: ভ্রমণ কাহিনির অনুষঙ্গ হিসেবে ইতিহাস ঐতিহ্য মিথ সংস্কৃতি চলে আসে। এসব ছাড়া একটি ভ্রমণ কাহিনি অপূর্ণ থাকে। ইতিহাস ঐতিহ্য মিথ লোরকার কবিতা ও নাটকের মূল বিষয়। এসব বিষয়ের আলোচনা লোরকার কবিতার প্রেক্ষাপট বুঝতে অনেক সহায়তা করবে। এক অস্থির সময়ে লোরকার জন্ম, বেড়ে ওঠা, আর তাঁর কবিতা ও নাটকের সৃষ্টি। তাঁর কবিতাকে, নাটককে বুঝতে হলে সে সময়কে, সে ইতিহাসকে জানতে হবে। স্পেন ছাড়া লোরকা আরো যেসব দেশ ভ্রমণ করেছেন—যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা, আর্জেন্টিনা— এসব দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপরেও কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে ‘লোরকার দেশে’ বইটিতে। 

স. সা: ‘লোরকার দেশে’ বইটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু বলুন। যাতে আপনার এই বক্তব্য শুনে পাঠক বইটি পড়তে উদ্বুদ্ধ হয়।

চৌ. সা. মা: এখানে ভ্রমণ কাহিনি ও লোরকার স্মৃতিচারণা সমান্তরালভাবে অবস্থান করেছে। ভ্রমণ কাহিনির সাথে সেসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। স্মৃতিচারণার মাঝে মাঝে লোরকার সাহিত্য জীবনের বিশেষ দিকগুলি উল্লিখিত হয়েছে। সাথে উঠে এসেছে লোরকার পরিবারের বর্ণনা, তাঁর বিভিন্ন স্থানে বসবাসের চিত্র, তাঁর কাব্য ও নাট্য জীবনের মূল সহযোগীদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। 

স. সা: বইটি লিখতে গিয়ে আপনি কোন কোন জায়গাগুলো ঘুরেছেন?

চৌ. সা. মা: আমি সপরিবারে ঘুরেছি স্পেনের বিভিন্ন শহরে, গ্রামে। প্রথমেই যাই লোরকার শহর গ্রানাদায়। সেখান থেকে ১০ মাইল দূরের এক গ্রাম ফুয়েন্তে বাকেরোজ এ যাই। এখানেই ছোট  এক বাড়িতে লোরকার জন্ম, যা এখন একটি জাদুঘর—কাসা মুজেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। গ্রানাদায় আছে লোরকার ওপর এক আধুনিক প্রদর্শনী ও গবেষণা কেন্দ্র— সেন্ট্রো দ্য ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা— সেটি দেখা ছিল এক মূল্যবান অভিজ্ঞতা। এরপর দেখেছি লোরকার পরিবারের গ্রীষ্মকালীন আবাস, যা এখন এক স্মৃতি যাদুঘর—কাসা মুজেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা: হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে। পাশেই বিশাল ও সুন্দর এক পার্ক—পার্কে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা। লোরকাকে যে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তা এখন এক হোটেল— ক্রিস্টিনা হোটেল— সেখানে কয়েকদিন সপরিবারে ছিলাম। গ্রানাদা থেকে ১২ মাইল দূরের এক পাহাড়ি স্থান— আলফাকার ও ভিজনার-এর কোনো এক স্থানে লোরকাকে হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে লোরকার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে এসেছি।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যাই মরক্কোর মাঝে স্পেনের এক শহর মেলিইয়াতে। এরপর আবার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ফিরে আসি স্পেনের মূল ভূখণ্ডে— মালাগা শহরে। এটি পিকাসোর জন্মস্থান হলেও লোরকার অনেক স্মৃতি আছে এখানে, দেখলাম সেসব। এল কাফে দে চিনিতাস বিখ্যাত হয়ে আছে লোরকা ও পিকাসোর স্মৃতিতে, তাঁরা সেখানে প্রায়ই যেতেন। ক্যাফেটির কেন্দ্রে রয়েছে লোরকার একটি ভাস্কর্য।

আন্দালুসিয়া ছিল লোরকার আত্মা, যা বারবার উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। এর প্রথম বিন্দু গ্রানাদা দিয়ে আমাদের ভ্রমণ শুরু। এরপর আন্দালুসিয়ার ত্রিভুজের শেষ দুটি বিন্দু— সেভিয়া ও কর্ডোভা দেখতে যাই।১৯২৭ এর মাঝামাঝি সময়ে কবি লিউইস দে গঙ্গোরার ত্রিশততম মৃত্যুবার্ষিকীতে সেভিয়া শহরে মিলিত হয়েছিলেন কিছু কবি ও শিল্পী, যার মাঝে ছিলেন লোরকা, দালি ও বুনুয়েল। এ ছিল এক নতুন কাব্য আন্দোলনের সূচনাপর্ব, যা পরিচিতি পেয়েছিল ‘জেনারেসিওন দেল ২৭’ অর্থাৎ, ‘জেনারেশান ২৭’ নামে। সেভিয়াতে দেখেছি লোরকার স্মরণে নির্মিত এক সুন্দর পার্ক। 

আন্দালুসিয়া থেকে গেলাম কাতালুনিয়ায়, এ যেন ছিল নতুন এক জগতে পদার্পণ। কাতালুনিয়ার কেন্দ্র বার্সেলোনা মহান শিল্পী গাউদির সৃষ্টি দিয়ে ভরা— তার মাঝেও রয়েছে লোরকার অনেক স্মৃতি।  এর মধ্যে বিখ্যাত হয়ে আছে মাঝারি আকারের এক থিয়েটার হল, তেয়াথ্রো গয়া—২৪ জুন ১৯২৭-এর রাতে এখানে লোরকার ট্র্যাজেডি নাটক ‘মারিয়ানা পিনেদা’র শুভ মহরত অনুষ্ঠিত হয়।

সবশেষে গেলাম স্পেনের কেন্দ্রে— রাজধানী মাদ্রিদে। এখানে ছাত্রাবাস রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস-এ লোরকা ছিলেন প্রায় এক দশক। এসময় কবিতা-নাটক-চিত্রাঙ্কন-পিয়ানো বাজনা— সব মিলিয়ে তাঁর সৃষ্টির শত প্রবাহ বইতে থাকে এক অনুকুল পরিবেশে। চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালি, চলচ্চিত্রকার লুই বুনুয়েল এবং সুরকার-গীতিকার ম্যানুয়েল দে ফাইয়ার সাথে লোরকার বন্ধুত্ব গড়েওঠে। লোরকার ওপর এদের প্রভাব ছিল সুগভীর। এদের সাথে যে কক্ষটিতে বসে লোরকা বহু সময় কাটিয়েছেন শিল্প-সাহিত্যের আলোচনায়, সে কক্ষটি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। 

মাদ্রিদের সুবিখ্যাত থিয়েথ্রো এসপানিয়ল-এ প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল লোরকার নাটক ইয়ের্মা ২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে। তার ৫০ বছর পূর্তিতে এর সামনে বসানো হয় লোরকার পূর্ণাকার এক ভাস্কর্য। মাদ্রিদে লোরকার এ রকম আরো অনেক স্মৃতি দেখলাম।  

মাদ্রিদে এক উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা হলো শহরের পূর্ব প্রান্তে লাস ভেনথাস-এ বুল ফাইটিং দেখা। স্পেনের এই বিশিষ্ট ঐতিহ্য লোরকার কবিতায় ফুটে উঠেছে তাঁর বুল ফাইটার বন্ধুর মৃত্যুতে শোক-গাথায়। 

মাদ্রিদ থেকে গেলাম স্পেনের পুরনো রাজধানী তোলেদোতে— যাকে বলা হয় সিয়োদাদ দে লাস থ্রেস কুলথুরাস— তিন সংস্কৃতির শহর। কারণ খ্রিস্টান, মুসলিম ও ইহুদিদের সহাবস্থানের এক বড় দৃষ্টান্ত তোলেদো। লোরকা, দালি, বুনুয়েল— এ তিনজনের বন্ধুত্বের কথা আমরা জানি। এদের সাথে যোগ দিল পেপিন বেয়ো। বুনুয়েল এদের সবাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন অরদেন দে তোলেদো— এ সংগঠনের উদ্দেশ্য এ শহরটির অনুসন্ধান ও উদযাপন। লোরকা ও তাঁর বন্ধুদের পথ ধরে আমরাও সুন্দর ও ঐতিহাসিক এ শহরটিকে দেখলাম। 

লোরকাকে অনুসরণ করে আবার গেলাম নিউ ইয়র্ক। এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক জগত। নিসর্গের গীতিময় আন্দালুসিয়া থেকে নিউ ইয়র্কের এক বস্তুবাদী আধুনিক শহরে আসা লোরকার জন্য ছিল এক বড় ধাক্কা। এখানে এসে দেখেন পুঁজিবাদী সমাজের অমানবিকতা ও অসাম্য। তারই ফলশ্রুতি লোরকার পরাবাস্তববাদী কাব্য ‘পয়েথা এন নুয়েভা ইয়র্ক’।  

নিউ ইয়র্ক থেকে হাবানা এসে লোরকা যেন খুঁজে পেলেন আন্দালুসিয়াকে। কিউবার মানুষও লোরকাকে তাদের একজন হিসেবে বুকে বরণ করে নেয়। হাবানাতে গেলাম লোরকার স্মৃতির খোঁজে। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত থিয়েটার হল গ্রান থ্রিয়েথ্রো দে লা হাবানাআলিসিয়া আলনসোতে রয়েছে লোরকার স্মরণে এক প্লাক। বিখ্যাত এক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—সেনথ্রো কুলথুরাল দুলছে মারিয়া লয়নাস-এর প্রধান হলঘরটি লোরকার নামে—সেনথ্রো ফেদিরিকো গার্সিয়া লোরকা। এই কেন্দ্রে লোরকা প্রায়ই আসতেন, এর স্মরণে আঙিনায় রাখা আছে লোরকার এক আবক্ষ মূর্তি। কিউবায় একমাত্র কবিতা লিখেছেন লোরকা ‘আমি সান্তিয়াগো যাবো’— এটি কিউবার এক বিশেষ সঙ্গীত সন-এর ভাব ও ছন্দ নিয়ে রচিত।

১৯৩৩ সালের ২৯ শে জুলাই বোদাস দে সাংগ্রে-এর প্রিমিয়ার হয় বুয়েনেস আইরেস এর নাট্যশালা তেয়াত্রো মাইপোতে, যা দর্শকদের মাঝে বিপুল সাড়া ফেলে। এতে উৎসাহিত হয়ে এর প্রযোজক লোরকাকে আমন্ত্রণ জানান আর্জেন্টিনা সফরে, যাতে তিনি নিজেই দিতে পারেন নাটকটির নির্দেশনা। আর সেই সাথে অংশ নিতে পারেন কয়েকটি বক্তৃতামালায়। ১৩ অক্টোবর, ১৯৩৩ সালে লোরকা বুয়েনোস আইরেস পৌঁছেন। পরিকল্পনা ছিল তিনি এ শহরে ৩ সপ্তাহ থাকবেন। কিন্তু এখানকার অভ্যর্থনা ও আন্তরিকতা লোরকাকে বুয়েনোস আইরেসে ধরে রাখে ৬ মাস।

লোরকার স্মৃতির খোঁজে বুয়েনোস আইরেস চলে যাই, দেখি তাঁর অনেক স্মৃতি। বিখ্যাত ক্যাফেথরথনিতে লোরকা প্রায়ই যেতেন, কারণ এটি ছিল শিল্পী-সাহিত্যিকদের এক মিলনস্থল। এখানে প্রধান হলে শোভা পাচ্ছে লোরকার ছবি ও সাথে এক প্লাক। বুয়েনোস আইরেস-এর এক বড় ও সুন্দর পার্ক এল পার্কে থ্রেস দে ফেবরেরো, এর অংশ কবিদের বাগান হার্দিন দে লস পয়েতাস-এ বিশ্বের ২১ জন শিল্পী-সাহিত্যিকের সাথে দেখলাম লোরকার আবক্ষ মূর্তি। সাথে ছিল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। বুয়েনোস আইরেসে রয়েছে এ দু’কবির আরো অনেক স্মৃতি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শহরের বাইরে সান ইসিদ্রোর ভিলা ওকাম্পো-তে আরো অনেকের সাথে প্রিয় এ দুজনের স্মৃতি।

স. সা: লোরকার প্রতি আপনার কীভাবে আগ্রহ তৈরি হলো? লোরকার কবিতা/নাটক পড়ে নাকি তার ঘটনাবহুল জীবন কাহিনি জেনে?

চৌ. সা. মা: সত্যি বলতে গেলে লোরকার কবিতা পড়ে, একই সাথে তাঁর জীবন কাহিনি জেনে তাঁর প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। যতই লোরকার কবিতা পড়ি, যতই তাঁর জীবনের কাহিনি জানি, ততই এ আগ্রহ ও অনুরাগ গভীরতর হতে থাকে।

স. সা: আপনি তো লোরকা সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন, এখন লোরকার দেশ ঘুরে এসে আপনার কি লোরকা সম্পর্কে ধারণায় কোনো পরিবর্তন এসেছে?

চৌ. সা. মা: বই পড়ে আগে যা জানতাম তার চেয়ে অনেক বেশি সৃষ্টিশীল ও ভুবন-বিস্তৃত ছিলেন লোরকা। এ রকম প্রতিভা সহস্র বছরে দু’একজন আসে। মাত্র ৩৮ বছরের জীবনে তাঁর এত সৃষ্টি-সম্ভার, উনি দীর্ঘ আয়ু পেলে কি বিশাল হয়ে উঠত তাঁর সৃষ্টি-সম্পদ। মানব জাতির কি দুর্ভাগ্য, অকালে ঘাতকের হাতে প্রাণ হারাতে হলো এ প্রতিভার, আমরা তাঁর আরো সৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হলাম।

স. সা: লোরকা যেখানে যেখানে ঘুরেছেন, আপনি সেসব জায়গা যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। লোরকা আসলে কেন এসব জায়গায় ঘুরেছেন বলে আপনার মনে হয়? এসব জায়গায় ঘুরে আপনারই-বা কেমন অভিজ্ঞতা হলো?

চৌ. সা. মা: জীবন ও জগতকে দেখা তো একজন কবির বড় লক্ষ্য। এ ছিল লোরকার মৌলিক তাড়না। জীবনকে তিনি প্রাণোচ্ছ্বাসে উদযাপন করেছেন দিগি¦দিক ঘুরে। এরপর আসে নাট্য নির্দেশনা, বক্তৃতা প্রদান ও অন্যান্য আমন্ত্রণ— যা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে নিউ ইয়র্ক, হাবানা ও বুয়েনোস আইরেসে ভ্রমণে যেতে। নতুন স্থান, নতুন মানুষ, নতুন অভিজ্ঞতা— লোরকাকে সব সময় হাতছানি দিয়ে ডাকত। 

স. সা: ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার অকৃত্রিম ভক্ত বলেই আপনি এই বইটি লিখেছেন। লোরকাকে নিয়ে কি আপনার আর কোনো কাজ করার ইচ্ছা আছে? যদি করেন, তাহলে তার কোন দিকটি নিয়ে কাজ করবেন?  

চৌ. সা. মা: লোরকার সৃষ্টি সম্পদ নিয়ে কিছু লেখাপড়ার ইচ্ছে আছে। এরপর কোনো একদিন লোরকার এক সাহিত্য-জীবনী লিখব বলে আশা করছি। 

স. সা: ‘লোরকার দেশে’ বইটি পড়ে দিনশেষে একজন কবি বা লেখক তার অভিজ্ঞতায় কোন অজানা দিকগুলো সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন বলে আপনার বিশ্বাস।

চৌ. সা. মা: লোরকার কার্যক্রমের বিরাট বিস্তৃতি নিয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এ জায়গাগুলি দেখে তাঁর কর্মবহুল ও সৃষ্টিমুখর জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় জানতে পারলাম। অনেকের জানা নাও থাকতে পারে একটি মজার তথ্য। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্পেন সফরের প্রস্তুতিতে জড়িত ছিলেন লোরকা। পরে অবশ্য দুজনের সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা সে ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

স. সা: বইটি সম্পর্কে আপনি কি পাঠককে আর কিছু ধারণা দিতে চান, যে বিষয়ে আপনার কাছে কিছু জানতে চাওয়া হয়নি?

চৌ. সা. মা: এ বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক এর সাথে অনেক ছবি সংযোজন করা হয়েছে। ছবিগুলি প্রতিটি এলাকার প্রতিনিধিত্বমূলক। সাথে রয়েছে লোরকার স্মৃতি-সম্বলিত বহু ছবি যা লোরকাকে আরো বুঝতে সহায়তা করবে বলে আমার বিশ্বাস। আর তথ্য-সূত্রে অনেক তথ্য দেয়া আছে যা অনেক কিছুর ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করবে। 



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত