[সুধা মূর্তির জন্ম কর্ণাটকে, ১৯৫০ সালে, কন্নড়-ভাষী পরিবারে। শিক্ষক, লেখক এবং সমাজসেবী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। কন্নড় এবং ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করেন। উপন্যাস, শিক্ষা-বিষয়ক গবেষণাগ্রন্থের পাশাপাশি তিনি ভ্রমণকাহিনীও লিখে থাকেন। জীবনে দেখা সত্য ঘটনার অবলম্বনে তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। ‘বৃদ্ধ মানুষটি এবং তার ঈশ্বর’ গল্পটিও তার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা।]
কয়েক বছর আগের কথা। তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর জেলায় আমি ভ্রমণ করছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে বৃষ্টি হচ্ছিল প্রচণ্ড। রাস্তায় পানি উঠে গেছে। আমার ড্রাইভার রাস্তার একপাশে গাড়ি থামাতে বাধ্য হলো। ড্রাইভার বলল, ‘এই বৃষ্টির মধ্যে আর সামনে যাওয়ার অবস্থা নাই। গাড়িতে বসে না থেকে আশেপাশে কোথাও আশ্রয় খুঁজবেন নাকি?’
এই অচেনা জায়গায় আটকে পড়ে আমার কিছুটা ভয়ই লাগছিল। ছাতাটা হাতে নিয়ে আমি ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে নেমে গেলাম। ছোট্ট গ্রামটার দিকে হাঁটতে লাগলাম। এই মুহূর্তে গ্রামটার নাম মনে করতে পারছি না। বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটা এক কঠিন পরীক্ষাই বটে। দূর থেকে কেবল একটা মন্দিরের ছায়া দেখতে পেলাম। মনে হলো এখানে ঠাঁই নেয়াই ভালো। আমি ওই দিকেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। এর মধ্যে এমন বর্ষণ আর বাতাস শুরু হলো যে আমার ছাতাটি হাত থেকে উড়ে গেল। আমি একদম ভিজে গেলাম। কাকভেজা হয়ে আমি মন্দিরে গিয়ে উঠলাম। মন্দিরে ঢোকামাত্রই এক বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করেই ডাকছেন। যদিও আমি তামিল জানি না, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের উদ্বেগটা বুঝতে পারছিলাম। আমার দীর্ঘ ভ্রমণজীবনে এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, যে যে-ভাষাতেই কথা বলুক না কেন, হৃদয় থেকে উৎসারিত কথা ঠিকই বোঝা যায়।
অন্ধকারে মন্দিরের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ বসে আছেন। বয়স হবে তার আশির মতো। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তারই মতো বৃদ্ধা এক মহিলা। পরনে তার ঐতিহ্যবাহী নয় গজ লম্বা সুতি কাপড়। মহিলাটি পুরুষটিকে কী যেন বললেন, তারপর ছেঁড়া কিন্তু পরিষ্কার একটা তোয়ালে নিয়ে আমার কাছে এগিয়ে এলেন। মুখমাথা মুছে একটু ধাতস্ত হওয়ার পর খেয়াল করলাম বৃদ্ধ মানুষটি অন্ধ। অবস্থা দেখেই বোঝা যায় তারা বেশ ভালোই গরিব। এটা শিবমন্দির। এতই সাদামাটা যে সামান্যতম সাজসজ্জার চিহ্ন নেই কোথাও। শিবলিঙ্গটিও নগ্ন। একটামাত্র বেলপাতা দেয়া উপরে। একমাত্র আলোর উৎস হচ্ছে একটামাত্র তেলের কুপি। তার কাঁপা কাঁপা আলোর মধ্যে কেমন একটা প্রশান্তির অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে ঈশ্বরের অনেক বেশি নৈকট্য অনুভব করলাম।
ভাঙা ভাঙা তামিল ভাষায় আমি বৃদ্ধলোকটিকে বললাম সন্ধ্যাকালীন মঙ্গলারতি পালন করার জন্য। গভীর ভালোবাসা আর নিষ্ঠার সাথে তিনি তা সম্পন্ন করলেন। তার আরতি শেষ হওয়ার পর আমি তার হাতে একশ রুপির একটা নোট গুঁজে দিতে চাইলাম দক্ষিণাস্বরূপ।
নোটটা ভালো করে স্পর্শ করেই তিনি হাত সরিয়ে ফেললেন। কেমন যেন সংকোচ বোধ করছেন তিনি। খুবই বিনয়ের সাথে বললেন, ‘আম্মা, আমি বুঝতে পারছি এটা দশ রুপির নোট না। আরতির পর আমরা যা পাই, তার মধ্যে দশ রুপিই সর্বোচ্চ। তুমি যে-ই হও, মন্দিরে তোমার ভক্তিটাই বড় কথা, অর্থকড়ি না। আমাদের পূর্বপুরুষরাও বলেছেন, একজন ভক্তের উচিত তার সামর্থ্য অনুযায়ী দেয়া। আমার কাছে তুমি এক শিবের ভক্ত, এখানে অন্য যারা আসে তাদের মতোই। দয়া করে তোমার টাকাটা ফেরত নিয়ে যাও।’
আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অনুনয় করার চেষ্টা করলাম যেন তিনি লোকটিকে বুঝিয়ে টাকাটা নিতে বলেন। কিন্তু তিনিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক পরিবারেই তো এমন হয় স্বামী না বুঝলেও স্ত্রী তাকে বুঝিয়ে অনেক কিছু নিতে বাধ্য করেন। কিন্তু এখানে তার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। তার অনড় ভঙি স্বামীর মতামতকেই সমর্থন করছিল। আমিও তাদের সাথে বসে রইলাম চুপচাপ। বাইরে বাতাস আর বৃষ্টির ঝাঁপটা। জীবন নিয়ে এই-সেই আলাপ করতে লাগলাম। তাদের কথা জানতে চাইলাম। জানতে চাইলাম কেমন কাটছে মন্দিরে তাদের জীবন, তাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ আছে কি না।
সব কথা শুনে আমি বললাম, ‘আপনাদের দুজনেরই অনেক বয়স হয়ে গেছে। সন্তানসন্ততিও নেই আপনাদের দেখাশোনা করার। বয়সকালে বাজার সদাইয়ের চেয়ে বেশি লাগে ওষুধপত্র। আর এই গ্রামটা তো শহর থেকে অনেক দূরে। আমি কি আপনাদের একটা পরামর্শ দিতে পারি?’
সে সময় আমরা একটা বয়স্ক পেনশন ভাতা প্রকল্প চালু করেছিলাম। তাদের জরাজীর্ণ, কিন্তু পরিষ্কার পোশাক দেখে আমার মনে হলো তারা এর উপযুক্ত প্রার্থী।
এবার মহিলাটি বললেন, ‘বলো, বাছা।’
‘আমি আপনাদের কিছু টাকা পাঠাব। এটা কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বা পোস্ট অফিসে রাখবেন। এতে যে সুদ পাবেন তা দিয়ে আপনাদের মাসিক খরচ মিটে যাবে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে আসল টাকাটাও ব্যবহার করতে পারবেন।’
বৃদ্ধ মানুষটি আমার কথা শুনে হেসে উঠলেন। তার মুখটি প্রদীপের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘কথা শুনে মনে হয় তোমার বয়স এখনো খুব কম। এখনো তুমি অনেক বোকা। এই বয়সে আমাদের টাকার আর কী দরকার? ভগবান শিব বৈদ্যনাথ নামেও পরিচিত। তিনিই মহাবৈদ্য, মহান চিকিৎসক। যে গ্রামটাতে আমরা থাকি এখানে বহু রকমের মানুষ আছে। আমি পূজা-অর্চনা করি, এর বিনিময়ে তারা আমাকে খাওয়াখাদ্য দেয়। আমাদের দুজনের কেউ অসুস্থ হলে স্থানীয় ডাক্তার বিনাপয়সায় আমাদের ওষুধপত্র দেয়। আমাদের চাহিদা খুব কম। কেন অপরিচিত কারো কাছ থেকে আমরা টাকা নেব? আমরা যদি তোমার কাছ থেকে টাকা নেই, যেমনটা তুমি বললে, এ কথা কেউ জানতে পারলে আমাদের জ্বালাতে আসবে। কেন এই হয়রানি নেব অযথা? বুঝতে পারছি তুমি বড় ভালো, দয়ার শরীর তোমার, দুজন বৃদ্ধ মানুষকে সাহায্য করতে চাও। কিন্তু আমরা এতেই ভালো আছি। যেভাবে আছি এভাবেই আমাদের থাকতে দাও। এর বেশি আর কিছু চাই না।’
ঠিক সেই মুহূর্তে বিদ্যুৎ এল। উজ্জ্বল আলোয় মন্দিরটি হেসে উঠল। প্রথমবারের মতো বুড়োবুড়ি দুজনকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তাদের চোখেমুখে শান্তি আর সুখের প্রলেপ। জীবনে এই প্রথম এমন দুজন মানুষ দেখলাম প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও যারা সাহায্য নিতে চাইলেন না। তিনি যা বললেন তার সব কথার সাথে যে আমি একমত হয়েছি তা না, কিন্তু এটা পরিষ্কার যে তার সন্তুষ্টিই তাকে শান্তি এনে দিয়েছে। এ-ধরনের মনোভাব থাকলে তুমি হয়তো সামনের দিকে বেশি অগ্রসর হতে পারবে না, কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এটাই হয়তো দরকার। সমস্যা আর উদ্বেগে ভরা এই দুনিয়ায়, ভারতের এক অখ্যাত কোণে থাকা এই বৃদ্ধ দম্পতির কাছে হয়তো অনেক কিছু শেখার আছে।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
[সুধা মূর্তির জন্ম কর্ণাটকে, ১৯৫০ সালে, কন্নড়-ভাষী পরিবারে। শিক্ষক, লেখক এবং সমাজসেবী হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। ২০২৪ সালে তিনি রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। কন্নড় এবং ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করেন। উপন্যাস, শিক্ষা-বিষয়ক গবেষণাগ্রন্থের পাশাপাশি তিনি ভ্রমণকাহিনীও লিখে থাকেন। জীবনে দেখা সত্য ঘটনার অবলম্বনে তিনি বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। ‘বৃদ্ধ মানুষটি এবং তার ঈশ্বর’ গল্পটিও তার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা।]
কয়েক বছর আগের কথা। তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর জেলায় আমি ভ্রমণ করছিলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের কারণে বৃষ্টি হচ্ছিল প্রচণ্ড। রাস্তায় পানি উঠে গেছে। আমার ড্রাইভার রাস্তার একপাশে গাড়ি থামাতে বাধ্য হলো। ড্রাইভার বলল, ‘এই বৃষ্টির মধ্যে আর সামনে যাওয়ার অবস্থা নাই। গাড়িতে বসে না থেকে আশেপাশে কোথাও আশ্রয় খুঁজবেন নাকি?’
এই অচেনা জায়গায় আটকে পড়ে আমার কিছুটা ভয়ই লাগছিল। ছাতাটা হাতে নিয়ে আমি ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে নেমে গেলাম। ছোট্ট গ্রামটার দিকে হাঁটতে লাগলাম। এই মুহূর্তে গ্রামটার নাম মনে করতে পারছি না। বিদ্যুৎ নেই। অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটা এক কঠিন পরীক্ষাই বটে। দূর থেকে কেবল একটা মন্দিরের ছায়া দেখতে পেলাম। মনে হলো এখানে ঠাঁই নেয়াই ভালো। আমি ওই দিকেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। এর মধ্যে এমন বর্ষণ আর বাতাস শুরু হলো যে আমার ছাতাটি হাত থেকে উড়ে গেল। আমি একদম ভিজে গেলাম। কাকভেজা হয়ে আমি মন্দিরে গিয়ে উঠলাম। মন্দিরে ঢোকামাত্রই এক বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করেই ডাকছেন। যদিও আমি তামিল জানি না, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরের উদ্বেগটা বুঝতে পারছিলাম। আমার দীর্ঘ ভ্রমণজীবনে এই অভিজ্ঞতা হয়েছে, যে যে-ভাষাতেই কথা বলুক না কেন, হৃদয় থেকে উৎসারিত কথা ঠিকই বোঝা যায়।
অন্ধকারে মন্দিরের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ বসে আছেন। বয়স হবে তার আশির মতো। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তারই মতো বৃদ্ধা এক মহিলা। পরনে তার ঐতিহ্যবাহী নয় গজ লম্বা সুতি কাপড়। মহিলাটি পুরুষটিকে কী যেন বললেন, তারপর ছেঁড়া কিন্তু পরিষ্কার একটা তোয়ালে নিয়ে আমার কাছে এগিয়ে এলেন। মুখমাথা মুছে একটু ধাতস্ত হওয়ার পর খেয়াল করলাম বৃদ্ধ মানুষটি অন্ধ। অবস্থা দেখেই বোঝা যায় তারা বেশ ভালোই গরিব। এটা শিবমন্দির। এতই সাদামাটা যে সামান্যতম সাজসজ্জার চিহ্ন নেই কোথাও। শিবলিঙ্গটিও নগ্ন। একটামাত্র বেলপাতা দেয়া উপরে। একমাত্র আলোর উৎস হচ্ছে একটামাত্র তেলের কুপি। তার কাঁপা কাঁপা আলোর মধ্যে কেমন একটা প্রশান্তির অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে ঈশ্বরের অনেক বেশি নৈকট্য অনুভব করলাম।
ভাঙা ভাঙা তামিল ভাষায় আমি বৃদ্ধলোকটিকে বললাম সন্ধ্যাকালীন মঙ্গলারতি পালন করার জন্য। গভীর ভালোবাসা আর নিষ্ঠার সাথে তিনি তা সম্পন্ন করলেন। তার আরতি শেষ হওয়ার পর আমি তার হাতে একশ রুপির একটা নোট গুঁজে দিতে চাইলাম দক্ষিণাস্বরূপ।
নোটটা ভালো করে স্পর্শ করেই তিনি হাত সরিয়ে ফেললেন। কেমন যেন সংকোচ বোধ করছেন তিনি। খুবই বিনয়ের সাথে বললেন, ‘আম্মা, আমি বুঝতে পারছি এটা দশ রুপির নোট না। আরতির পর আমরা যা পাই, তার মধ্যে দশ রুপিই সর্বোচ্চ। তুমি যে-ই হও, মন্দিরে তোমার ভক্তিটাই বড় কথা, অর্থকড়ি না। আমাদের পূর্বপুরুষরাও বলেছেন, একজন ভক্তের উচিত তার সামর্থ্য অনুযায়ী দেয়া। আমার কাছে তুমি এক শিবের ভক্ত, এখানে অন্য যারা আসে তাদের মতোই। দয়া করে তোমার টাকাটা ফেরত নিয়ে যাও।’
আমি কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। লোকটার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অনুনয় করার চেষ্টা করলাম যেন তিনি লোকটিকে বুঝিয়ে টাকাটা নিতে বলেন। কিন্তু তিনিও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক পরিবারেই তো এমন হয় স্বামী না বুঝলেও স্ত্রী তাকে বুঝিয়ে অনেক কিছু নিতে বাধ্য করেন। কিন্তু এখানে তার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। তার অনড় ভঙি স্বামীর মতামতকেই সমর্থন করছিল। আমিও তাদের সাথে বসে রইলাম চুপচাপ। বাইরে বাতাস আর বৃষ্টির ঝাঁপটা। জীবন নিয়ে এই-সেই আলাপ করতে লাগলাম। তাদের কথা জানতে চাইলাম। জানতে চাইলাম কেমন কাটছে মন্দিরে তাদের জীবন, তাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ আছে কি না।
সব কথা শুনে আমি বললাম, ‘আপনাদের দুজনেরই অনেক বয়স হয়ে গেছে। সন্তানসন্ততিও নেই আপনাদের দেখাশোনা করার। বয়সকালে বাজার সদাইয়ের চেয়ে বেশি লাগে ওষুধপত্র। আর এই গ্রামটা তো শহর থেকে অনেক দূরে। আমি কি আপনাদের একটা পরামর্শ দিতে পারি?’
সে সময় আমরা একটা বয়স্ক পেনশন ভাতা প্রকল্প চালু করেছিলাম। তাদের জরাজীর্ণ, কিন্তু পরিষ্কার পোশাক দেখে আমার মনে হলো তারা এর উপযুক্ত প্রার্থী।
এবার মহিলাটি বললেন, ‘বলো, বাছা।’
‘আমি আপনাদের কিছু টাকা পাঠাব। এটা কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বা পোস্ট অফিসে রাখবেন। এতে যে সুদ পাবেন তা দিয়ে আপনাদের মাসিক খরচ মিটে যাবে। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে আসল টাকাটাও ব্যবহার করতে পারবেন।’
বৃদ্ধ মানুষটি আমার কথা শুনে হেসে উঠলেন। তার মুখটি প্রদীপের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
‘কথা শুনে মনে হয় তোমার বয়স এখনো খুব কম। এখনো তুমি অনেক বোকা। এই বয়সে আমাদের টাকার আর কী দরকার? ভগবান শিব বৈদ্যনাথ নামেও পরিচিত। তিনিই মহাবৈদ্য, মহান চিকিৎসক। যে গ্রামটাতে আমরা থাকি এখানে বহু রকমের মানুষ আছে। আমি পূজা-অর্চনা করি, এর বিনিময়ে তারা আমাকে খাওয়াখাদ্য দেয়। আমাদের দুজনের কেউ অসুস্থ হলে স্থানীয় ডাক্তার বিনাপয়সায় আমাদের ওষুধপত্র দেয়। আমাদের চাহিদা খুব কম। কেন অপরিচিত কারো কাছ থেকে আমরা টাকা নেব? আমরা যদি তোমার কাছ থেকে টাকা নেই, যেমনটা তুমি বললে, এ কথা কেউ জানতে পারলে আমাদের জ্বালাতে আসবে। কেন এই হয়রানি নেব অযথা? বুঝতে পারছি তুমি বড় ভালো, দয়ার শরীর তোমার, দুজন বৃদ্ধ মানুষকে সাহায্য করতে চাও। কিন্তু আমরা এতেই ভালো আছি। যেভাবে আছি এভাবেই আমাদের থাকতে দাও। এর বেশি আর কিছু চাই না।’
ঠিক সেই মুহূর্তে বিদ্যুৎ এল। উজ্জ্বল আলোয় মন্দিরটি হেসে উঠল। প্রথমবারের মতো বুড়োবুড়ি দুজনকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তাদের চোখেমুখে শান্তি আর সুখের প্রলেপ। জীবনে এই প্রথম এমন দুজন মানুষ দেখলাম প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও যারা সাহায্য নিতে চাইলেন না। তিনি যা বললেন তার সব কথার সাথে যে আমি একমত হয়েছি তা না, কিন্তু এটা পরিষ্কার যে তার সন্তুষ্টিই তাকে শান্তি এনে দিয়েছে। এ-ধরনের মনোভাব থাকলে তুমি হয়তো সামনের দিকে বেশি অগ্রসর হতে পারবে না, কিন্তু জীবনের একটা পর্যায়ে এটাই হয়তো দরকার। সমস্যা আর উদ্বেগে ভরা এই দুনিয়ায়, ভারতের এক অখ্যাত কোণে থাকা এই বৃদ্ধ দম্পতির কাছে হয়তো অনেক কিছু শেখার আছে।

আপনার মতামত লিখুন