বসন্ত বীর
শাকিব লোহানী
এক বিহানবেলার সকালে, পাশের মসজিদে নামাজ
পড়তে পা বাড়াতেই হঠাৎ বুকের কাছে ঠেকা খেলো
সাঁজোয়া যানের কর্কশ মুখ, ছিটকে পড়ে রাস্তায়,
কাঁতচোখে যানের তলদেশ, যেনো যুদ্ধে চলেছে
বিশাল খাঁজকাটা দানবীয় টায়ার; নিরাপত্তার লোকদল
কৃষ্ণচূড়ার ভাঙ্গা ডালে লুকিয়েছে জঙ্গী পোশাক আর
হিংস্র রূপ। ওরা কতক্ষণ ধরে এভাবে আমার রাস্তা ধরে
এগোয় জানি না, মনে হচ্ছে এর মালিক তারাই
মিছিলে ক্লান্ত সারা দেশ যখন ঘুমোয়।
তত্ত্বাবধানে রাজধানীর বিশাল যে আবাসিক
কলেজ আমার, দৌড়ে গিয়ে কাকে খবর দিই?
ছাত্রদের হোস্টেলে কড়া নেড়ে, নাকি শিক্ষকদের
ঘরে ঘরে বেল টিপে। আমার স্কুলে পড়া সন্তানেরা
নিজ শহরে না জানি কী করে!
হঠাৎ দেখি রাস্তার ওপারে, সেই দানবযান
এক হাতে থামিয়ে লিকলিকে এক তরুণী বীর,
স্লোগানে কাঁপিয়েছে সকালের প্রহর।
দৌড়ে আসছে চারদিক। সহস্র কিশোর যুবা,
বয়েসি লোক, অগোছালো কাপড়ে গৃহবধূ;
সোৎসাহে আওয়াজ তোলে, এ আমার মেয়ে
দেখি তারে ধরে কে, মারে কে?
আমি অবাক দাঁড়িয়ে, মাথার পেছনে উঁচু হয়ে ওঠা
ব্যথায় ডান হাত। দু’পায়ে বিপুল শক্তি, চকিতে
পুলক। দৌড়ে মাঝপথের উঁচু ডিভাইডার পেরিয়ে
ছুটি সেই তরুণীর দিকে। সে আমার মেয়ে,
কতকালের সন্তান। পেছনে ছুটেছে দেশ, বাঁধভাঙ্গা জোয়ার।
আজ এই বসন্ত বাতাসে মনপ্রাণ সঁপে খুঁজি সেই
বীর জায়াকে; পারি যদি তারে নিয়ে করি বসন্ত উৎসব।
রঙিন চশমা
খালেদ হোসাইন
আমি কখনো রঙিন চশমা পরিনি।
তুমি কি আমাকে বলবে
রঙিন চশমা কি কাউকে কাউকে অদৃশ্য করে দিতে পারে
তার পরিপ্রেক্ষিতসহ?
রাতজাগা পেঁচার আখ্যান, দূরত্ব-ঘোচানো সব
মোচড়ানো সংলাপ, কিছু আমোদ, কিছু আনন্দ
কিছু মানবিক দুঃখবোধ—
সমুদ্রে যাবার গল্প, পাহাড়ে একরোখা মাতলামি
হোটেলের আয়নায় প্রতিবিম্বিত আবৃত্তি
ফিরে আসা, প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যস্ততা, সব?
কৈশোরের দিনগুলি রাতগুলি
মা-বাবার অসুস্থতা
নৈঃসঙ্গ্যের যন্ত্রণা, উত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সব?
ধোঁয়া-ওঠা কফির মগ
অতিথি পাখির মতো চলে যেতে পারে
বরফের দেশে?
আমি কখনো রঙিন চশমা পরিনি।
রঙিন চশমায় কর্পূরের মতো উবে যায়
সব প্রতিশ্রুতি?
আগুন আখ্যান
আমিনুর রহমান সুলতান
আগুন কখনও
ছড়িয়ে ছিটিয়ে
দিতে নেই
বন জ্বলবে
মন পুড়বে
জ্বলবেই পুড়বেই
বনের আগুন
মনের আগুন
নেভানো সহজ নয়
রক্তের আগুন
জ্বালিয়ে ছড়িয়ে
দিতে হয়...
রক্তের ল্যাম্পপোস্ট
জ্বলে জ্বলুক না
রক্তে আলোর বড়ই
প্রয়োজন।
আয়নার সামনে দাঁড়িও না
শোয়াইব জিবরান
আয়নার সামনে দাঁড়িও না
আয়না দেখাতে পারে না কিছুই
সামান্য খোলস ছাড়া।
মানুষের সামনে দাঁড়াও
দেখতে পাবে তোমাকে।
ভালবাসা থাকলে তোমার প্রাণে
দেখতে পাবে মানুষের মাঝে
ঘৃণা থাকলে তোমার প্রাণে
দেখতে পাবে মানুষের মাঝে
মানুষ তোমাকে তাই দেখাবে
যা কিছু আছে তোমার মাঝে।
আয়নার সামনে দাঁড়িও না
আয়না দেখাবে না কিছুই
তোমার খাঁচাখানি ছাড়া।
মানুষই সত্যিকারের আয়না
মানুষের সামনে দাঁড়াও
দেখাবে সত্যিকারের তোমাকে।
জন্মদিন
আদিত্য নজরুল
নভেম্বরের দশ তারিখ
বুকে ভারী পাথরের মতো চেপে বসে আছে...
বারো মাসের যে কোনো মাস
ত্রিশ দিনের যে কোনো
একটি দিন না হয়ে
শুধু নভেম্বরের দশ তারিখ কেনো বুকে
দিয়েছে পাথর চাপা?
দোহারের সুরে
জীবন ধরিয়ে দিলো
ঐ দিন তুমি জন্মেছিলে...
আহা আমার জীবন যেনো
বেতের বুকশেলফের
বুকে থরে থরে সাজানো রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি!
প্রেম পরোয়ানায় আগাম জামিন
তানজীনা ফেরদৌস
হৃদয়ের বাইপাসে আজ বিচ্ছিরি বাতাস।
কয়েক বছরের সার্কাস ঠেলে মনে উঁকি দেয় প্রশ্নবোধক তর্জনী—
অসম্মানের অভিযোগ চৌকাঠ মাড়াতেই দুলতে থাকে অনুভূতির অ্যান্টেনা।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যে হারিয়ে গেছে তার মুখ থেকে মুখোশ তো খোলা হলো!
বোঝা হলো বসন্ত এলে কোন দেয়াল হয়ে যায় গিরগিটি!
আবার শীত এলে কোন গিরগিটি দেয়াল সেজে দাঁড়ায়!
এখন নদীতে কেউ ডুবসাঁতার দিলে আর ভয় হয় না।
শত বছরে কত নদী ধর্ষিত হলো ডুবসাঁতারে
কার দায়ে কত নদী অকালে মরে গেলো
সে উত্তর দেবে কি মহামান্য হাইকোর্ট?
ডুবসাঁতারের অপরাধে প্রেমিকের পরোয়ানা হয়েছে
কিন্তু ডিএলআর এ আছে—
“জলের গভীরে ডুবসাঁতার না শিখলে প্রেমিক হওয়া যায় না”।
তাই তো সে পেয়ে গেলো প্রেম পরোয়ানায় আগাম জামিন।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
বসন্ত বীর
শাকিব লোহানী
এক বিহানবেলার সকালে, পাশের মসজিদে নামাজ
পড়তে পা বাড়াতেই হঠাৎ বুকের কাছে ঠেকা খেলো
সাঁজোয়া যানের কর্কশ মুখ, ছিটকে পড়ে রাস্তায়,
কাঁতচোখে যানের তলদেশ, যেনো যুদ্ধে চলেছে
বিশাল খাঁজকাটা দানবীয় টায়ার; নিরাপত্তার লোকদল
কৃষ্ণচূড়ার ভাঙ্গা ডালে লুকিয়েছে জঙ্গী পোশাক আর
হিংস্র রূপ। ওরা কতক্ষণ ধরে এভাবে আমার রাস্তা ধরে
এগোয় জানি না, মনে হচ্ছে এর মালিক তারাই
মিছিলে ক্লান্ত সারা দেশ যখন ঘুমোয়।
তত্ত্বাবধানে রাজধানীর বিশাল যে আবাসিক
কলেজ আমার, দৌড়ে গিয়ে কাকে খবর দিই?
ছাত্রদের হোস্টেলে কড়া নেড়ে, নাকি শিক্ষকদের
ঘরে ঘরে বেল টিপে। আমার স্কুলে পড়া সন্তানেরা
নিজ শহরে না জানি কী করে!
হঠাৎ দেখি রাস্তার ওপারে, সেই দানবযান
এক হাতে থামিয়ে লিকলিকে এক তরুণী বীর,
স্লোগানে কাঁপিয়েছে সকালের প্রহর।
দৌড়ে আসছে চারদিক। সহস্র কিশোর যুবা,
বয়েসি লোক, অগোছালো কাপড়ে গৃহবধূ;
সোৎসাহে আওয়াজ তোলে, এ আমার মেয়ে
দেখি তারে ধরে কে, মারে কে?
আমি অবাক দাঁড়িয়ে, মাথার পেছনে উঁচু হয়ে ওঠা
ব্যথায় ডান হাত। দু’পায়ে বিপুল শক্তি, চকিতে
পুলক। দৌড়ে মাঝপথের উঁচু ডিভাইডার পেরিয়ে
ছুটি সেই তরুণীর দিকে। সে আমার মেয়ে,
কতকালের সন্তান। পেছনে ছুটেছে দেশ, বাঁধভাঙ্গা জোয়ার।
আজ এই বসন্ত বাতাসে মনপ্রাণ সঁপে খুঁজি সেই
বীর জায়াকে; পারি যদি তারে নিয়ে করি বসন্ত উৎসব।
রঙিন চশমা
খালেদ হোসাইন
আমি কখনো রঙিন চশমা পরিনি।
তুমি কি আমাকে বলবে
রঙিন চশমা কি কাউকে কাউকে অদৃশ্য করে দিতে পারে
তার পরিপ্রেক্ষিতসহ?
রাতজাগা পেঁচার আখ্যান, দূরত্ব-ঘোচানো সব
মোচড়ানো সংলাপ, কিছু আমোদ, কিছু আনন্দ
কিছু মানবিক দুঃখবোধ—
সমুদ্রে যাবার গল্প, পাহাড়ে একরোখা মাতলামি
হোটেলের আয়নায় প্রতিবিম্বিত আবৃত্তি
ফিরে আসা, প্রাত্যহিক জীবনের অভ্যস্ততা, সব?
কৈশোরের দিনগুলি রাতগুলি
মা-বাবার অসুস্থতা
নৈঃসঙ্গ্যের যন্ত্রণা, উত্থানের আকাঙ্ক্ষা, সব?
ধোঁয়া-ওঠা কফির মগ
অতিথি পাখির মতো চলে যেতে পারে
বরফের দেশে?
আমি কখনো রঙিন চশমা পরিনি।
রঙিন চশমায় কর্পূরের মতো উবে যায়
সব প্রতিশ্রুতি?
আগুন আখ্যান
আমিনুর রহমান সুলতান
আগুন কখনও
ছড়িয়ে ছিটিয়ে
দিতে নেই
বন জ্বলবে
মন পুড়বে
জ্বলবেই পুড়বেই
বনের আগুন
মনের আগুন
নেভানো সহজ নয়
রক্তের আগুন
জ্বালিয়ে ছড়িয়ে
দিতে হয়...
রক্তের ল্যাম্পপোস্ট
জ্বলে জ্বলুক না
রক্তে আলোর বড়ই
প্রয়োজন।
আয়নার সামনে দাঁড়িও না
শোয়াইব জিবরান
আয়নার সামনে দাঁড়িও না
আয়না দেখাতে পারে না কিছুই
সামান্য খোলস ছাড়া।
মানুষের সামনে দাঁড়াও
দেখতে পাবে তোমাকে।
ভালবাসা থাকলে তোমার প্রাণে
দেখতে পাবে মানুষের মাঝে
ঘৃণা থাকলে তোমার প্রাণে
দেখতে পাবে মানুষের মাঝে
মানুষ তোমাকে তাই দেখাবে
যা কিছু আছে তোমার মাঝে।
আয়নার সামনে দাঁড়িও না
আয়না দেখাবে না কিছুই
তোমার খাঁচাখানি ছাড়া।
মানুষই সত্যিকারের আয়না
মানুষের সামনে দাঁড়াও
দেখাবে সত্যিকারের তোমাকে।
জন্মদিন
আদিত্য নজরুল
নভেম্বরের দশ তারিখ
বুকে ভারী পাথরের মতো চেপে বসে আছে...
বারো মাসের যে কোনো মাস
ত্রিশ দিনের যে কোনো
একটি দিন না হয়ে
শুধু নভেম্বরের দশ তারিখ কেনো বুকে
দিয়েছে পাথর চাপা?
দোহারের সুরে
জীবন ধরিয়ে দিলো
ঐ দিন তুমি জন্মেছিলে...
আহা আমার জীবন যেনো
বেতের বুকশেলফের
বুকে থরে থরে সাজানো রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি!
প্রেম পরোয়ানায় আগাম জামিন
তানজীনা ফেরদৌস
হৃদয়ের বাইপাসে আজ বিচ্ছিরি বাতাস।
কয়েক বছরের সার্কাস ঠেলে মনে উঁকি দেয় প্রশ্নবোধক তর্জনী—
অসম্মানের অভিযোগ চৌকাঠ মাড়াতেই দুলতে থাকে অনুভূতির অ্যান্টেনা।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যে হারিয়ে গেছে তার মুখ থেকে মুখোশ তো খোলা হলো!
বোঝা হলো বসন্ত এলে কোন দেয়াল হয়ে যায় গিরগিটি!
আবার শীত এলে কোন গিরগিটি দেয়াল সেজে দাঁড়ায়!
এখন নদীতে কেউ ডুবসাঁতার দিলে আর ভয় হয় না।
শত বছরে কত নদী ধর্ষিত হলো ডুবসাঁতারে
কার দায়ে কত নদী অকালে মরে গেলো
সে উত্তর দেবে কি মহামান্য হাইকোর্ট?
ডুবসাঁতারের অপরাধে প্রেমিকের পরোয়ানা হয়েছে
কিন্তু ডিএলআর এ আছে—
“জলের গভীরে ডুবসাঁতার না শিখলে প্রেমিক হওয়া যায় না”।
তাই তো সে পেয়ে গেলো প্রেম পরোয়ানায় আগাম জামিন।

আপনার মতামত লিখুন