(পূর্ব প্রকাশের পর)
আবার আসলাম প্রিয় গ্রানাদায়, কারণ গতবার লোরকার স্মৃতি বিজড়িত কয়েকটি জায়গায় যাওয়া হয়নি।
রোদ ঝলমলে শীতের সকালে, ট্যাক্সি নিয়ে সবাই পৌঁছলাম হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে ভবনে। হুয়ার্তা অর্থ হলো বাগানবাড়ি। এটি সত্যিই ছিল এক বাগানবাড়ি— ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত এটি ছিল লোরকা পরিবারের গ্রীষ্ম-নিবাস। লোরকার পিতা ফেদেরিকো গার্সিয়া রদরিগাজ ২৭ মে ১৯২৫ সালে বাড়িটি কিনেছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম বিসেন্তে লোরকা রোমেরো, তাঁর নামে এ বাড়িটির নাম দেন হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে। কবি তাঁর লোরকা পদবি পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে, আর বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন ফেদেরিকো গার্সিয়া।
সে সময় বাগানবাড়িটি ছিল শহরের বাইরে গাছপালা ঘেরা সবুজ এলাকা ভেগায়। পরে শহর সম্প্রসারিত হলে এটি এসে পড়ে গ্রানাদা শহর এলাকায়। নগর সম্প্রসারণের সময় কর্তৃপক্ষ এ বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে। পরে জনগণের প্রতিবাদের মুখে জানুয়ারি ১৯৭৬-এ বাড়িটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এখানে এসে দেখি প্রধান ফটকে লেখা পার্কে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা— গ্রানাদার সবচেয়ে বড় পার্ক, ইউরোপের অন্যতম বড় গোলাপ বাগান। মনোরম সব গোলাপ ছাড়াও বাগানে শোভা পাচ্ছে লিলি, জেসমিন, জেরানিয়াম, পপলার, বার্চ, পাইন ও বিভিন্ন লতা। থোকা থোকা পাকা কমলা নিয়ে কমলা গাছ তো আছেই! লোরকা তাঁর বাসা থেকেই বিভিন্ন ফুলের গন্ধ পেতেন, যা নিয়ে বন্ধু হোর্হে গুইয়েনকে লিখেছিলেন: ‘এখানে এত বেশি জেসমিন ও লেডি অব দি নাইট ফুল আছে যে সূর্য ওঠার আগেই আমাদের মাথা ধরে যায়’।
পার্ক পেরিয়ে গেলাম হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে বাড়িটিতে, যা ঘিরে লোরকার অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে। বাড়িটির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে লোরকা দেখতেন— সিয়েরা নেভাদা, আলহাম্বরা, আলবাইসিন— যার কথা চিঠিতে বলেছেন এক বন্ধুকে: আমার ব্যালকনির সামনে গ্রানাদা, অনন্য সৌন্দর্যে দূরে প্রসারিত। এ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই কি লোরকা লিখেছিলেন:
মৃত্যু ঘনিয়ে এলে
ব্যালকনি সরিয়ে দেবেন।
দোহাই।
ছেলেটা কমলালেবু খাচ্ছে।
আমার বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়।
চাষী কাস্তে দিয়ে ফসল কাটছে।
আমার বারান্দা থেকে স্পষ্ট শোনা যায়।
মৃত্যু ঘনিয়ে এলে
ব্যালকনি সরিয়ে দেবেন।
দোহাই আপনার।৩
বাসার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে লোরকা যে দৃশ্য দেখেছেন তা দেখার ভাগ্য আমাদের হলো না। সময়ের ব্যবধানে সে ব্যালকনির দিকে অনেক সুউচ্চ ভবন নির্মিত হওয়ায় গ্রানাদার এ ল্যান্ডমার্কগুলি এখান থেকে আর দেখা যায় না। এ বাড়িতে বসে লোরকা রচনা করেছেন দু’টি ট্রাজিক নাটক— ১৯৩২ সালে বোদাস দে সাংগ্রে (রক্ত বিবাহ) এবং ১৯৩৪ সালে ইয়ের্মা।
লোরকার বোন ইসাবেল গার্সিয়া লোরকা ৬ এপ্রিল ১৯৮৫ তারিখে হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে বাড়িটি শহর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করেন, লক্ষ্য— লোরকা স্মৃতি যাদুঘর করা। ১০ মে ১৯৯৫ সালে উদ্বোধন করা হয় এ স্মৃতি যাদুঘর— কাসা মুসেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা: হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে।
টিকেট কেটে প্রবেশ করলাম হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে ভবনে। মিনিট পনের পরে পরবর্তী গাইডেড ট্যুর শুরু হবে। এক একটি গ্রুপে ১০ জন, ৪৫ মিনিট পর এক একটি ট্যুর। লেইলা সেলেজার— আমাদের চটপটে ট্যুর গাইড, এসে নিজের পরিচয় দিয়ে আমাদেরকে স্বাগত জানাল। বসার ঘর থেকে ট্যুর শুরু, এখানে পুরনো কিন্তু অভিজাত আসবাবপত্র। এরপর খাবার ঘর, রান্নাঘর— সবখানেই সেই বনেদি পরিবারের রুচির ছাপ। তারপর দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সেখানে প্রথম কক্ষটি বসার ঘর। এরপর লোরকার শোবার ঘর, সেখানে তার ব্যবহৃত খাট। পাশে লেখার ডেস্ক, এর ওপর এক পোস্টার লা বাররাকা। প্রজাতন্ত্রী সরকারের সহায়তায় ১৯৩২ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দল লা বাররাকা-কে নিয়ে লোরকা স্পেনের বিভিন্ন গ্রামে ২০০টি নাটক মঞ্চস্থ করেন। এ দলের উদ্দেশ্য নিয়ে লোরকা বলেন: আমরা নাটককে— লাইব্রেরি থেকে বের করে আনব, আর পণ্ডিতদের কাছ থেকে সরিয়ে নেব, আর প্রদর্শন করব গ্রামের মাঠে বিশুদ্ধ বাতাস ও সূর্যালোকে।
এর পরে পিয়ানো রুম। এখানে ঢুকতেই চোখে পড়ল জানালার পাশে সুন্দর এক পিয়ানো, এক কোণে একটি গ্রামোফোন, যাতে লোরকা বাজাতেন বিটোফেন ও বাখ-এর সিম্ফনি। আর দেয়ালে টাঙানো অনেকগুলি ছবি। তার মাঝে একটি চিত্র লোরকাকে দেয়া সালভাদোর দালির এক উপহার— তাঁর আঁকা এক পেইন্টিং। সালভাদোর দালির সাথে লোরকার ছিল গভীর বন্ধুত্ব, যার প্রতিধ্বনি করেছেন লোরকা: ‘দালির পেইন্টিং থাকবে আমার রুমে, আমার হৃদয়ের পাশে’।
মাদ্রিদ থেকে এই হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে ভবনে লোরকা ফিরে আসেন ১৪ জুলাই, ১৯৩৬, অবস্থান করতে থাকেন পারিবারের সাথে।
মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে লোরকা তাঁর এক করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন পাবলো নেরুদা-কে। লোরকা তাঁর নাট্য দল লা বাররাকা নিয়ে কাস্তিয়ার এক সুদুর গ্রামে নাট্য প্রদর্শনী করছিলেন। এক রাতে তাঁর ঘুম আসছিল না। খুব ভোরে তিনি একা হাঁটতে বের হলেন। লোরকা এসে পড়লেন এক পুরোনো পরিত্যক্ত ভবনের আঙ্গিনায়। তখন এক মেষ শাবক ভবন থেকে বেরিয়ে এসে সামনের মাঠে ঘাস খেতে থাকে। হঠাৎ করে পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে চার পাঁচটি বন্য শুয়োর। তারা ছিল হিংস্র, মুখ থেকে পড়ছিল লালা। চোখের পলকেই তারা ঝাপিয়ে পড়ে নিরিহ মেষ শাবকটির ওপর, আর তাদের পাথরের মতো শক্ত খুর , আর ধারালো দাঁত দিয়ে তারা শাবকটিকে ছিন্ন ভিন্ন করে খেয়ে ফেলে। এ নৃশংস দৃশ্য দেখে লোরকা ভীষণ ভয় পেয়ে যান, আর তার দলবল নিয়ে সে গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন। এ ঘটনা কি মাস দুয়েক পরের লোরকার নিজেরই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পূর্বাভাস? ৪
জুলাই ১৮, ১৯৩৬ সালে স্পেনে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যা সূচনা করে স্পেনীয় গৃহযুদ্ধের, জাতীয়তাবাদী দক্ষিণপন্থী ও প্রজাতন্ত্রীদের মধ্যে। লোরকা উদার মানবিক চিন্তার অনুসারী ছিলেন। সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না, তবে প্রজাতন্ত্রীদের প্রতি ছিল তাঁর সহানুভূতি। তাই দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়ারা কয়েকবার সার্চ করে তাঁদের বাসা, এ সময় তাঁকে লাঞ্ছনাও করে। এতে লোরকা নিরাপত্তার অভাব অনুভব করে আগস্টের ৯ তারিখে গ্রানাদায় তাঁর কবি বন্ধু লুই রোজালিস-এর পারিবারিক বাসায় চলে যান। লুই রোজালিস ও তাঁর ভাইদের সাথে দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়াদের সখ্য ছিল। রোজালিসদের বাসা তাই নিরাপদ মনে করেছিলেন লোরকা। এ ব্যাপারে লুই রোজালিসের বর্ণনা শুনি:
ফেদেরিকোর টেলিফোন পেয়ে আমি ওদের বাড়ি যাই এবং তাকে লাঞ্ছনা করার কথা শুনি। ফেদেরিকো যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে বাঁচাবার নানা সম্ভাবনার কথা ভাবা হয়। ওরা ওঁকে হত্যা করবে জানলে হয়তো অন্য ব্যবস্থা করা যেত। কিন্ত ফেদেরিকো রিপাবলিকান অঞ্চলে পালিয়ে যেতে রাজি না-হওয়ায় অবশেষে আমার বাড়িতে তাঁকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হল।৫
৯ আগস্ট, ১৯৩৬ সালের রাতে লোরকা চলে যান লুই রোজালিসদের বাসায়।
গ্রানাদা ফেরার পর আমরাও এখানেই উঠি। অবশ্য এ বাসা পরিবর্তিত হয়েছে এক হোটেলে, নাম রায়না ক্রিস্টিনা হোটেল, এর অবস্থান প্লাসা দ্য ত্রিনিদাদ-এর পাশেই। এটি লোরকার স্মৃতি বিজড়িত জানতে পেরে আমরা এ হোটেলেই বুক করি। ঢুকেই লবিতে দেখি কার্ড-বোর্ডে তৈরি লোরকার পুরো দৈর্ঘ্যরে অবয়ব, যেন লোরকা দাঁড়িয়ে আছেন, আমাদের স্মিত হেসে স্বাগত জানাচ্ছেন, সামনে তাঁর ব্যবহৃত টাইপ-রাইটার। ব্যবস্থাপক আন্দি অর্তেগার সাথে পরিচয় হলো। বললাম, লোরকার জন্যই আমরা এ হোটেলে এসেছি। শুনে আন্দি খুব খুুশি হলেন। বললেন, লোরকা এখানে আসেন ৯ আগস্ট, ১৯৩৬ এর রাতে, মাত্র ৭ দিন থাকতে পেরেছিলেন, ছিলেন দোতলার একটি কক্ষে। সে কক্ষটি কি দেখতে পারি, খুবই আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, কক্ষটি আর নাই, কারণ রোজালিসদের বাসা থেকে হোটেলে রূপান্তরের সময় সেটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। তবে লোরকার স্মৃতিজড়িত আরো অনেক কিছু আছে। নিয়ে গেলেন হোটেলের রেস্টুরেন্টে, নাম দেয়া হয়েছে এল রিনকন দে লোরকা রেস্তেুারেন্তে। আন্দি বললেন, লোরকা তাঁর জীবনের শেষ সময়ের অনেকটুকু কাটিয়েছেন এ রেস্টুরেন্টে। এর এক কোনায় লোরকার বড় ছবি। রেস্টুরেন্টের মেনুর ওপরে লোরকার ছবি, আর একটি সালাদের নাম এনসালাদা লোরকা। জানি না লোরকা এ সালাদ খেতেন কিনা, কেউ সঠিক বলতে পারল না। তবে লাঞ্চের সময় আমরা সবাই এ সালাদটি খেলাম, চমৎকার সালাদ— সেদ্ধ স্যামন মাছের সাথে মিশ্রিত আপেল, জলপাই, চিনাবাদাম ও পালং শাক। লাঞ্চের পর আন্দি বললেন, তোমরা লোরকার স্মৃতি দেখতে এই হোটেলে এসেছ। তোমাদের এখন লোরকার এক সুন্দর স্মৃতি দেখাতে পারি। এরপর আমাদের নিয়ে গেলেন কোনায় রাখা এক পিয়ানোর কাছে; বললেন, এই পিয়ানো লোরকা বাজাতেন তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলিতে। এখানে লোরকা যে স্বরলিপি ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে তুমি চাইলে পিয়ানো বাজাতে পার। বললাম, আমি তো পিয়ানো বাজাতে পারি না, কিন্তু আমার মেয়ে পারে। নাতাশাকে বলতেই সে বসে গেল পিয়ানোর সামনে, লোরকার পিয়ানোতে লোরকার সুরে সুর তুলল। আমরা সবাই তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলাম।
আন্দি এরপর লোরকার শেষ যাত্রার কিছু কাহিনি বলল।
‘আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ বিকেলে লোরকা যখন ভগ্নিপতির হত্যার খবর পান, তার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই রুইজ আলোনসো তার ১০০ জন সশ্রস্ত্র সৈন্যের একটা বাহিনি লুুই রোজালেসের বাড়িটাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে কিংবদন্তিতুল্য দস্যুকে পাকড়াও করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। সে সময় বাড়ির সব পুরুষ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকায় মিসেস রোজালেস লোরকাকে হানাদারদের হাতে সোপর্দ করার দাবি প্রত্যাখান করেন। কিন্তু রুইজ আলোনসো তাতেও দমে না গিয়ে মিসেস রোজালেসকে বলেন,‘এই লোকটি শুধু কলম দিয়েই আমাদের যে ক্ষতি করেছে , তা অস্ত্র দিয়েও করা সম্ভব নয়।’৫
আন্দি এরপর আমাদের যা বলল ও দেখাল, তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। রেস্টুরেন্টটির পাশে একটি করিডোর হোটেলের সামনের লবি থেকে পেছনের দরজা পর্যন্ত চলে গেছে। তার মাঝামাঝি টাঙানো লোরকার একটি ছবি। তার সামনে যেয়ে এক দরজা দেখিয়ে আন্দি বলল, লোরকাকে তাঁর কক্ষ থেকে ধরে এনে এই দরজা দিয়েই নিয়ে যায় তার ঘাতকরা। সেদিন ছিল ১৬ আগস্ট, ১৯৩৬। এরপর লোরকাকে আর কেউ দেখেনি।
গভীর এক বিষাদে আমাদের সবার মন ভরে গেল।
তথ্যসূত্র:
১. আমি গার্সিয়া লোরকা, কবি, অনুবাদ: এমদাদ রহমান
২. Recodo, অনুবাদ: গৌতম দত্ত
৩. Despedida, বিদায়, অনুবাদ: অমিতাভ দাশগুপ্ত
৪. পাবলো নেরুদার স্মৃতি-কথা: Memoirs by Pablo Neruda, Translated from the Spanish by Hardie St, Martin, Published by: Penguin Books
৫. ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জীবন ও হত্যারহস্য: তরুণ কুমার ঘটক, গ্রন্থ: লোরকার চিঠি-১, প্রকাশক: অনুষ্টুপ, কলকাতা।
৬. ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার শেষ দিনগুলো: অ্যারন শুলম্যান, লেখাটি ৫ মার্চ ২০১৯ সালে লিট হাব ডটকমে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ: রেহাল হোসেন।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আবার আসলাম প্রিয় গ্রানাদায়, কারণ গতবার লোরকার স্মৃতি বিজড়িত কয়েকটি জায়গায় যাওয়া হয়নি।
রোদ ঝলমলে শীতের সকালে, ট্যাক্সি নিয়ে সবাই পৌঁছলাম হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে ভবনে। হুয়ার্তা অর্থ হলো বাগানবাড়ি। এটি সত্যিই ছিল এক বাগানবাড়ি— ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত এটি ছিল লোরকা পরিবারের গ্রীষ্ম-নিবাস। লোরকার পিতা ফেদেরিকো গার্সিয়া রদরিগাজ ২৭ মে ১৯২৫ সালে বাড়িটি কিনেছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম বিসেন্তে লোরকা রোমেরো, তাঁর নামে এ বাড়িটির নাম দেন হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে। কবি তাঁর লোরকা পদবি পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে, আর বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন ফেদেরিকো গার্সিয়া।
সে সময় বাগানবাড়িটি ছিল শহরের বাইরে গাছপালা ঘেরা সবুজ এলাকা ভেগায়। পরে শহর সম্প্রসারিত হলে এটি এসে পড়ে গ্রানাদা শহর এলাকায়। নগর সম্প্রসারণের সময় কর্তৃপক্ষ এ বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে। পরে জনগণের প্রতিবাদের মুখে জানুয়ারি ১৯৭৬-এ বাড়িটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এখানে এসে দেখি প্রধান ফটকে লেখা পার্কে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা— গ্রানাদার সবচেয়ে বড় পার্ক, ইউরোপের অন্যতম বড় গোলাপ বাগান। মনোরম সব গোলাপ ছাড়াও বাগানে শোভা পাচ্ছে লিলি, জেসমিন, জেরানিয়াম, পপলার, বার্চ, পাইন ও বিভিন্ন লতা। থোকা থোকা পাকা কমলা নিয়ে কমলা গাছ তো আছেই! লোরকা তাঁর বাসা থেকেই বিভিন্ন ফুলের গন্ধ পেতেন, যা নিয়ে বন্ধু হোর্হে গুইয়েনকে লিখেছিলেন: ‘এখানে এত বেশি জেসমিন ও লেডি অব দি নাইট ফুল আছে যে সূর্য ওঠার আগেই আমাদের মাথা ধরে যায়’।
পার্ক পেরিয়ে গেলাম হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে বাড়িটিতে, যা ঘিরে লোরকার অনেক সুন্দর স্মৃতি আছে। বাড়িটির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে লোরকা দেখতেন— সিয়েরা নেভাদা, আলহাম্বরা, আলবাইসিন— যার কথা চিঠিতে বলেছেন এক বন্ধুকে: আমার ব্যালকনির সামনে গ্রানাদা, অনন্য সৌন্দর্যে দূরে প্রসারিত। এ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই কি লোরকা লিখেছিলেন:
মৃত্যু ঘনিয়ে এলে
ব্যালকনি সরিয়ে দেবেন।
দোহাই।
ছেলেটা কমলালেবু খাচ্ছে।
আমার বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়।
চাষী কাস্তে দিয়ে ফসল কাটছে।
আমার বারান্দা থেকে স্পষ্ট শোনা যায়।
মৃত্যু ঘনিয়ে এলে
ব্যালকনি সরিয়ে দেবেন।
দোহাই আপনার।৩
বাসার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে লোরকা যে দৃশ্য দেখেছেন তা দেখার ভাগ্য আমাদের হলো না। সময়ের ব্যবধানে সে ব্যালকনির দিকে অনেক সুউচ্চ ভবন নির্মিত হওয়ায় গ্রানাদার এ ল্যান্ডমার্কগুলি এখান থেকে আর দেখা যায় না। এ বাড়িতে বসে লোরকা রচনা করেছেন দু’টি ট্রাজিক নাটক— ১৯৩২ সালে বোদাস দে সাংগ্রে (রক্ত বিবাহ) এবং ১৯৩৪ সালে ইয়ের্মা।
লোরকার বোন ইসাবেল গার্সিয়া লোরকা ৬ এপ্রিল ১৯৮৫ তারিখে হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে বাড়িটি শহর কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করেন, লক্ষ্য— লোরকা স্মৃতি যাদুঘর করা। ১০ মে ১৯৯৫ সালে উদ্বোধন করা হয় এ স্মৃতি যাদুঘর— কাসা মুসেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা: হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে।
টিকেট কেটে প্রবেশ করলাম হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে ভবনে। মিনিট পনের পরে পরবর্তী গাইডেড ট্যুর শুরু হবে। এক একটি গ্রুপে ১০ জন, ৪৫ মিনিট পর এক একটি ট্যুর। লেইলা সেলেজার— আমাদের চটপটে ট্যুর গাইড, এসে নিজের পরিচয় দিয়ে আমাদেরকে স্বাগত জানাল। বসার ঘর থেকে ট্যুর শুরু, এখানে পুরনো কিন্তু অভিজাত আসবাবপত্র। এরপর খাবার ঘর, রান্নাঘর— সবখানেই সেই বনেদি পরিবারের রুচির ছাপ। তারপর দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। সেখানে প্রথম কক্ষটি বসার ঘর। এরপর লোরকার শোবার ঘর, সেখানে তার ব্যবহৃত খাট। পাশে লেখার ডেস্ক, এর ওপর এক পোস্টার লা বাররাকা। প্রজাতন্ত্রী সরকারের সহায়তায় ১৯৩২ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার দল লা বাররাকা-কে নিয়ে লোরকা স্পেনের বিভিন্ন গ্রামে ২০০টি নাটক মঞ্চস্থ করেন। এ দলের উদ্দেশ্য নিয়ে লোরকা বলেন: আমরা নাটককে— লাইব্রেরি থেকে বের করে আনব, আর পণ্ডিতদের কাছ থেকে সরিয়ে নেব, আর প্রদর্শন করব গ্রামের মাঠে বিশুদ্ধ বাতাস ও সূর্যালোকে।
এর পরে পিয়ানো রুম। এখানে ঢুকতেই চোখে পড়ল জানালার পাশে সুন্দর এক পিয়ানো, এক কোণে একটি গ্রামোফোন, যাতে লোরকা বাজাতেন বিটোফেন ও বাখ-এর সিম্ফনি। আর দেয়ালে টাঙানো অনেকগুলি ছবি। তার মাঝে একটি চিত্র লোরকাকে দেয়া সালভাদোর দালির এক উপহার— তাঁর আঁকা এক পেইন্টিং। সালভাদোর দালির সাথে লোরকার ছিল গভীর বন্ধুত্ব, যার প্রতিধ্বনি করেছেন লোরকা: ‘দালির পেইন্টিং থাকবে আমার রুমে, আমার হৃদয়ের পাশে’।
মাদ্রিদ থেকে এই হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে ভবনে লোরকা ফিরে আসেন ১৪ জুলাই, ১৯৩৬, অবস্থান করতে থাকেন পারিবারের সাথে।
মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে লোরকা তাঁর এক করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন পাবলো নেরুদা-কে। লোরকা তাঁর নাট্য দল লা বাররাকা নিয়ে কাস্তিয়ার এক সুদুর গ্রামে নাট্য প্রদর্শনী করছিলেন। এক রাতে তাঁর ঘুম আসছিল না। খুব ভোরে তিনি একা হাঁটতে বের হলেন। লোরকা এসে পড়লেন এক পুরোনো পরিত্যক্ত ভবনের আঙ্গিনায়। তখন এক মেষ শাবক ভবন থেকে বেরিয়ে এসে সামনের মাঠে ঘাস খেতে থাকে। হঠাৎ করে পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে চার পাঁচটি বন্য শুয়োর। তারা ছিল হিংস্র, মুখ থেকে পড়ছিল লালা। চোখের পলকেই তারা ঝাপিয়ে পড়ে নিরিহ মেষ শাবকটির ওপর, আর তাদের পাথরের মতো শক্ত খুর , আর ধারালো দাঁত দিয়ে তারা শাবকটিকে ছিন্ন ভিন্ন করে খেয়ে ফেলে। এ নৃশংস দৃশ্য দেখে লোরকা ভীষণ ভয় পেয়ে যান, আর তার দলবল নিয়ে সে গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন। এ ঘটনা কি মাস দুয়েক পরের লোরকার নিজেরই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পূর্বাভাস? ৪
জুলাই ১৮, ১৯৩৬ সালে স্পেনে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যা সূচনা করে স্পেনীয় গৃহযুদ্ধের, জাতীয়তাবাদী দক্ষিণপন্থী ও প্রজাতন্ত্রীদের মধ্যে। লোরকা উদার মানবিক চিন্তার অনুসারী ছিলেন। সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না, তবে প্রজাতন্ত্রীদের প্রতি ছিল তাঁর সহানুভূতি। তাই দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়ারা কয়েকবার সার্চ করে তাঁদের বাসা, এ সময় তাঁকে লাঞ্ছনাও করে। এতে লোরকা নিরাপত্তার অভাব অনুভব করে আগস্টের ৯ তারিখে গ্রানাদায় তাঁর কবি বন্ধু লুই রোজালিস-এর পারিবারিক বাসায় চলে যান। লুই রোজালিস ও তাঁর ভাইদের সাথে দক্ষিণপন্থী মিলিশিয়াদের সখ্য ছিল। রোজালিসদের বাসা তাই নিরাপদ মনে করেছিলেন লোরকা। এ ব্যাপারে লুই রোজালিসের বর্ণনা শুনি:
ফেদেরিকোর টেলিফোন পেয়ে আমি ওদের বাড়ি যাই এবং তাকে লাঞ্ছনা করার কথা শুনি। ফেদেরিকো যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে বাঁচাবার নানা সম্ভাবনার কথা ভাবা হয়। ওরা ওঁকে হত্যা করবে জানলে হয়তো অন্য ব্যবস্থা করা যেত। কিন্ত ফেদেরিকো রিপাবলিকান অঞ্চলে পালিয়ে যেতে রাজি না-হওয়ায় অবশেষে আমার বাড়িতে তাঁকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হল।৫
৯ আগস্ট, ১৯৩৬ সালের রাতে লোরকা চলে যান লুই রোজালিসদের বাসায়।
গ্রানাদা ফেরার পর আমরাও এখানেই উঠি। অবশ্য এ বাসা পরিবর্তিত হয়েছে এক হোটেলে, নাম রায়না ক্রিস্টিনা হোটেল, এর অবস্থান প্লাসা দ্য ত্রিনিদাদ-এর পাশেই। এটি লোরকার স্মৃতি বিজড়িত জানতে পেরে আমরা এ হোটেলেই বুক করি। ঢুকেই লবিতে দেখি কার্ড-বোর্ডে তৈরি লোরকার পুরো দৈর্ঘ্যরে অবয়ব, যেন লোরকা দাঁড়িয়ে আছেন, আমাদের স্মিত হেসে স্বাগত জানাচ্ছেন, সামনে তাঁর ব্যবহৃত টাইপ-রাইটার। ব্যবস্থাপক আন্দি অর্তেগার সাথে পরিচয় হলো। বললাম, লোরকার জন্যই আমরা এ হোটেলে এসেছি। শুনে আন্দি খুব খুুশি হলেন। বললেন, লোরকা এখানে আসেন ৯ আগস্ট, ১৯৩৬ এর রাতে, মাত্র ৭ দিন থাকতে পেরেছিলেন, ছিলেন দোতলার একটি কক্ষে। সে কক্ষটি কি দেখতে পারি, খুবই আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, কক্ষটি আর নাই, কারণ রোজালিসদের বাসা থেকে হোটেলে রূপান্তরের সময় সেটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। তবে লোরকার স্মৃতিজড়িত আরো অনেক কিছু আছে। নিয়ে গেলেন হোটেলের রেস্টুরেন্টে, নাম দেয়া হয়েছে এল রিনকন দে লোরকা রেস্তেুারেন্তে। আন্দি বললেন, লোরকা তাঁর জীবনের শেষ সময়ের অনেকটুকু কাটিয়েছেন এ রেস্টুরেন্টে। এর এক কোনায় লোরকার বড় ছবি। রেস্টুরেন্টের মেনুর ওপরে লোরকার ছবি, আর একটি সালাদের নাম এনসালাদা লোরকা। জানি না লোরকা এ সালাদ খেতেন কিনা, কেউ সঠিক বলতে পারল না। তবে লাঞ্চের সময় আমরা সবাই এ সালাদটি খেলাম, চমৎকার সালাদ— সেদ্ধ স্যামন মাছের সাথে মিশ্রিত আপেল, জলপাই, চিনাবাদাম ও পালং শাক। লাঞ্চের পর আন্দি বললেন, তোমরা লোরকার স্মৃতি দেখতে এই হোটেলে এসেছ। তোমাদের এখন লোরকার এক সুন্দর স্মৃতি দেখাতে পারি। এরপর আমাদের নিয়ে গেলেন কোনায় রাখা এক পিয়ানোর কাছে; বললেন, এই পিয়ানো লোরকা বাজাতেন তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলিতে। এখানে লোরকা যে স্বরলিপি ব্যবহার করেছেন তা নিয়ে তুমি চাইলে পিয়ানো বাজাতে পার। বললাম, আমি তো পিয়ানো বাজাতে পারি না, কিন্তু আমার মেয়ে পারে। নাতাশাকে বলতেই সে বসে গেল পিয়ানোর সামনে, লোরকার পিয়ানোতে লোরকার সুরে সুর তুলল। আমরা সবাই তন্ময় হয়ে শুনতে লাগলাম।
আন্দি এরপর লোরকার শেষ যাত্রার কিছু কাহিনি বলল।
‘আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ বিকেলে লোরকা যখন ভগ্নিপতির হত্যার খবর পান, তার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই রুইজ আলোনসো তার ১০০ জন সশ্রস্ত্র সৈন্যের একটা বাহিনি লুুই রোজালেসের বাড়িটাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে কিংবদন্তিতুল্য দস্যুকে পাকড়াও করার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। সে সময় বাড়ির সব পুরুষ যুদ্ধক্ষেত্রে থাকায় মিসেস রোজালেস লোরকাকে হানাদারদের হাতে সোপর্দ করার দাবি প্রত্যাখান করেন। কিন্তু রুইজ আলোনসো তাতেও দমে না গিয়ে মিসেস রোজালেসকে বলেন,‘এই লোকটি শুধু কলম দিয়েই আমাদের যে ক্ষতি করেছে , তা অস্ত্র দিয়েও করা সম্ভব নয়।’৫
আন্দি এরপর আমাদের যা বলল ও দেখাল, তার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। রেস্টুরেন্টটির পাশে একটি করিডোর হোটেলের সামনের লবি থেকে পেছনের দরজা পর্যন্ত চলে গেছে। তার মাঝামাঝি টাঙানো লোরকার একটি ছবি। তার সামনে যেয়ে এক দরজা দেখিয়ে আন্দি বলল, লোরকাকে তাঁর কক্ষ থেকে ধরে এনে এই দরজা দিয়েই নিয়ে যায় তার ঘাতকরা। সেদিন ছিল ১৬ আগস্ট, ১৯৩৬। এরপর লোরকাকে আর কেউ দেখেনি।
গভীর এক বিষাদে আমাদের সবার মন ভরে গেল।
তথ্যসূত্র:
১. আমি গার্সিয়া লোরকা, কবি, অনুবাদ: এমদাদ রহমান
২. Recodo, অনুবাদ: গৌতম দত্ত
৩. Despedida, বিদায়, অনুবাদ: অমিতাভ দাশগুপ্ত
৪. পাবলো নেরুদার স্মৃতি-কথা: Memoirs by Pablo Neruda, Translated from the Spanish by Hardie St, Martin, Published by: Penguin Books
৫. ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জীবন ও হত্যারহস্য: তরুণ কুমার ঘটক, গ্রন্থ: লোরকার চিঠি-১, প্রকাশক: অনুষ্টুপ, কলকাতা।
৬. ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার শেষ দিনগুলো: অ্যারন শুলম্যান, লেখাটি ৫ মার্চ ২০১৯ সালে লিট হাব ডটকমে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ: রেহাল হোসেন।

আপনার মতামত লিখুন