গত কয়েকদিন ধরে জাপানের বিখ্যাত কবি শুনতারো তানিকাওয়ার লেখা ২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘আমি’ (Watashi) নামের কবিতার বই পড়ছিলাম। বইটি পড়তে পড়তে মনে হলো নিজেকে নিয়ে তিনি বিস্তর এক কবিতার বই প্রকাশ করে ফেলেছেন। আমি যখন কবিতা লেখা শুরু করি শূন্য দশকের গোড়ার দিকে তখন একটা কথা প্রায়ই শুনতাম কবিতা থেকে ‘আমি’কে যতদূর সম্ভব দূরে রাখতে হবে। ‘আমি’-কেন্দ্রিক কবিতার ইন্দ্রজাল থেকে কবিকে বের হয়ে এসে সার্বজনীন হয়ে উঠতে হবে। কথাটি এখনো প্রায়ই শুনি। বিশেষ করে নতুন কবিদের কবিতায় আমিত্বের আধিক্য থাকে বলে অনেকেই এ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোনো কোনো কবি আবার কিছুটা বাঁকা চোখে বা তাচ্ছিল্যের সাথেও দেখেন। তারা অনেকেই মনে করেন ‘আমি’র মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কবিতাকে আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে নিয়ে যায়— যা কবির আত্মমগ্নতা বা আত্মপ্রেমের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। যদি ‘আমি’র ব্যবহার কেবল কবির ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং তা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে না মেলে, তবে কবিতাটি সংকীর্ণ বা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে— যা কবিতার শিল্পগুণ নষ্ট করে অহমিকা বা ইগো-র বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মনে হতে পারে।
প্রশ্ন আসতে পারে— আমিত্বে আটকে পড়ে গেলে কবিতা সব মানুষের হয়ে উঠবে কীভাবে? কবি কি নিজের জন্য কবিতা লেখেন নাকি অন্যদের জন্য? কিংবা কবিতা কি আসলেই সব মানুষের হয়ে ওঠা জরুরি? কবি আর অন্য মানুষের মধ্যে বিভেদরেখা টেনে দিয়ে কে এঁকে দিল কবিতার এই বিমুখ মানচিত্র? এই আমিটা আসলে কে? আমি বলে আদৌ কি কিছু আছে? আসলে ঘুরেফিরে অনেক প্রশ্ন আসতে পারে। আমাদের চারপাশ থেকে যেমন আমাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, তেমনি কোনো সীমাবদ্ধ দেয়ালের মাঝে আমিও আটকে থাকতে পারি না। বাতাস কতটা ভারী হলে দীর্ঘশ্বাস হয়ে যায় কিংবা দীর্ঘশ্বাস কতটা হালকা হলে তাকে আমরা বাতাস বলতে পারি তা কেউই জানি না। অপার শূন্যতার মাঝেও সহস্র মানুষের ভ্রমণকথা কিংবা মুখরিত ভ্রমণেও শূন্যতার কতখানি কিচিরমিচির থাকে তা আমরা কেউই বলতে পারি না। এইসব অন্ধকার কিংবা আলোর গভীরে অস্তিত্বের সংলাপ জানিয়ে দেয় পরম অনস্তিত্বের কথোপকথন। সুতরাং নিজেকে আড়াল করে আমি কার কথা লিখবো কবিতায়?
শুধু কবিতায় নয়, এই জগত সংসারের সকল ক্ষেত্রে নিজেকে জানা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কবি তো নিজের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। তার নিজেকে আগে চিনতে হয়। নিজের মন ও শরীরকে বুঝতে হয়। মন ও শরীরের ভাষা ও অক্ষর তাকে পাঠ করে নিতে হয় সবার আগে। মন ও শরীরের কি আসলেই কোনো ভাষা থাকে? কোনো স্বদেশ? স্বাধীনতা কিংবা পরাধীনতা? নিজের চোখ, কান, মুখ, হাত, পা বশে আনতে হয় নাকি সবুজ শস্যের মতো বাতাসে দোল খেতে খেতে সময়ের পরিক্রমায় আপনপথে হেঁটে যেতে হয়। এসব কিছুই অমীমাংসিত থেকে যায় শেষ অবধি তার কবিতার মতোই। তবু কবিকে উন্মোচন করতে হয়— চিনতে হয় নিজের সত্তা ও জাগরণ। কবিতায় যে আমি আমি স্বরে গুঞ্জরিত হয় শব্দের চরাচর তা কবিকে করে তোলে একজন সাধারণ মানুষ থেকে নিরাকার সত্তার বিমণ্ডিত বিস্তার।
কবি তাই নিজের দিকে হেঁটে চলেন, নিজের পায়ের আওয়াজ শোনেন। নিজের চারপাশ দেখেন— চারপাশের যা কিছু তাকে ঘিরে থাকে তাই তিনি কবিতায় লেখেন।
সযত্ন পরিচর্যায় সেটা কতটা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠল তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। তবে নিজেকে না জানলে— না বুঝলে অন্যকে কীভাবে বুঝবে? এই জগতটাও আমাদের একান্ত নিজের। প্রত্যেকের পৃথিবী আলাদা। একই সংসারে প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা জগত থাকে, আকাশ থাকে— সেই আকাশে একেকজনের একেক সময় গ্রীষ্ম-বসন্ত আসে, চাঁদ ওঠে। তবু কোনো একটা জায়গায়, একটা বিন্দুতে সব জগত এসে কখনো কখনো মিলিত হয়। হতে পারে সেটা আনন্দ কিংবা বেদনায়, পরিপূর্ণতায় কিংবা নৈঃশব্দ্যে, একান্ত শূন্যতায়। কবি যদি বলে বসেন আমার ব্যক্তিগত আনন্দ বেদনার ভার আমি কেন সবাইকে বইতে দেব কিংবা অন্যরা কেন আমার বেদনার ভার বইতে যাবেন? ব্যক্তিগত জীবনের এরকম একটি বাউন্ডারি ওয়াল কি কবি এঁকে রাখতে পারবেন তার কবিতায়? তাই এমন কিছু অনুভূতি থাকে যা কারো ব্যক্তিগত নয়। কালে কালে যা সকল মানুষের, সকল জীবের এমনকি প্রকৃতিরও। তাই কবিতায় ‘আমিত্ব’ কোনো স্থির বিন্দু নয়। এটি একটি প্রবহমান পাটাতন। কবিরা প্রথমে নিজেকে চেনেন, নিজের সীমাবদ্ধতাকে অনুভব করেন এবং শেষ পর্যন্ত শব্দের সেতু দিয়ে সেই ক্ষুদ্র অহংকে পার হয়ে যান। কবিতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া মানে আত্মবিস্মৃতি নয়, বরং নিজেকে বৃহত্তর জগতের অংশ হিসেবে পুনরায় আবিষ্কার করা।
নিজেকে ছাড়িয়ে অনন্তে বিস্তারের এই পথে কবি আপনাআপনি ছুটে চলেন। কখনো চেতনে আবার কখন অবচেতনে, শব্দের ঘুমের ঘোরে, অনুচ্চারিত বোধের শাণিত সংঘাতে। তাই কবি সব কথা বলতে পারেন না। কবি যেটুকু বলতে পারেন না, যেটুকু ছুঁতে পারেন না সেটুকুই উৎকৃষ্ট কবিতা। যা কিছু তিনি দেখেন, অভিজ্ঞতায় নেন কিংবা যতটুকু কল্পনায় আনতে পারেন তার বাইরেও কবিতার বিচরণ। তাই কবিকে ছেড়ে কবিতা অনেক দূরে চলে যায়, দৃশ্যের বাইরে। কবিতা ব্যক্তিগত থেকে সার্বজনীন হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়া একান্ত স্বজাত, চিরকালীন ও আবহমান।
বাংলা কবিতার দীর্ঘ সহস্রাব্দের ইতিহাসে ‘আমি’ কোনো স্থির বা একরৈখিক সত্তা নয়; বরং তা এক বিবর্তনশীল লেখচিত্র। চর্যাপদের সেই নিভৃত সাধকের গুহ্য সাধনা থেকে শুরু করে আজকের উত্তর-আধুনিক কবির ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা— প্রতিটি বাঁকেই ‘আমি’ কখনো ক্ষুদ্র অহংয়ের কারারুদ্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়েছে, আবার কখনো সেই শিকল ছিঁড়ে মিশে গেছে বিশ্বচরাচরের অনন্ত প্রবাহে। নিজেকে চেনা এবং শেষমেশ সেই নিজেকেই ছাড়িয়ে যাওয়া— এই দুই বিপরীতমুখী টানের মিলনই হলো কবিতা।
বাংলা কবিতার আদি পর্বে ‘আমিত্ব’ ছিল মূলত পরমাত্মার সঙ্গে লীন হওয়ার এক মাধ্যম। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কিংবা বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধার যে ‘আমি’, তা আসলে কৃষ্ণের মধ্যে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার এক আর্তি। “আমারি বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া”— এই যন্ত্রণার গভীরে যে ‘আমি’ লুকিয়ে আছে, তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চেয়ে বেশি আত্মনিবেদনের। মধ্যযুগের সুফী ও মরমী সাধকরাও মনে করতেন, নিজে না বিলীন হওয়া পর্যন্ত সেই পরম সত্যের দেখা পাওয়া অসম্ভব। ফলে, সেই সময়ের কবিতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া মানেই ছিল অহংবোধকে বিসর্জন দিয়ে ‘শূন্য’ হওয়া। বাংলা কবিতায় আধুনিকতার প্রকৃত সূর্যোদয় ঘটে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে। তিনিই প্রথম বাংলা কবিতায় ‘ব্যক্তি-আমি’কে এক স্বতন্ত্র মহিমা দিলেন। তাঁর ‘আত্ম-বিলাপ’-এ আমরা দেখি এক যন্ত্রণাবিদ্ধ আধুনিক মানুষকে, যে নিজের কৃতকর্মের দায়ভার বহন করছে। কিন্তু এই ‘আমি’র সীমানাকে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্র-কাব্যে ‘আমি’ কেবল রক্ত-মাংসের একক সত্তা নয়, তা এক অনন্ত চেতনার অংশ। তিনি যখন বলেন— “আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ,/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে—/ আমি চোখ মেললুম আকাশে,/ জ্বলে উঠল আলো পুবে পশ্চিমে।” তখন সেই ‘আমি’ আর ব্যক্তিগত তুচ্ছতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। রবীন্দ্রনাথ শিখিয়েছিলেন, নিজেকে অতিক্রম করার পথটি আত্মবিস্মৃতি নয়, বরং নিজেকে সমস্ত সৃষ্টির মাঝে প্রসারিত করা। তাঁর কাছে ‘আমি’ হলো সেই বাতায়ন, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতি ও ঈশ্বর একে অপরের সঙ্গে কথা বলে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কাজী নজরুল ইসলাম ‘আমি’কে দিলেন এক প্রলয়ংকরী ও সামষ্টিক রূপ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তাঁর আমিত্ব কোনো আত্মকেন্দ্রিক বিলাসিতা নয়, বরং তা শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্রোধের কণ্ঠস্বর। নজরুল যখন বলেন, “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ,” তখন সেই ‘আমি’ ক্ষুদ্র অহংবোধকে ছাপিয়ে এক অপরাজেয় মানবিক সত্তায় রূপান্তরিত হয়। এখানে নিজেকে অতিক্রম করা মানেই হলো ভীরুতা ও জড়তাকে জয় করে এক বীরোচিত ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়া। এর ঠিক বিপরীতে জীবনানন্দ দাশের ‘আমি’ অত্যন্ত নির্জন, বিষণ্ন এবং অস্তিত্ব সংকটে বিদ্ধ। তাঁর কবিতায় আত্মসত্তা বারবার প্রকৃতি, ইতিহাস এবং মৃত্যুর ধূসরতায় বিলীন হতে চায়। জীবনানন্দ নিজেকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন নক্ষত্রের আলোয় কিংবা ঘাসের ঘ্রাণে মিশে গিয়ে। তাঁর কাছে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া মানে এক ধরনের ‘প্রস্তরপ্রতিম’ নৈঃশব্দ্যে পৌঁছে যাওয়া, যেখানে সময়ের সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিরা ‘আমিত্ব’কে আরও ব্যবচ্ছেদ করলেন। বিনয় মজুমদার কিংবা জীবনানন্দ-পরবর্তী কবিদের কবিতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক। তাঁরা সমাজ বা সংসারের প্রথাগত ‘আমি’কে ভেঙে চুরমার করে এক নতুন, নগ্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে চেয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নিখিলেশ’ কিংবা ‘নীরা’ আসলে কবির সেই সত্তা, যা রক্ত-মাংসের মানুষের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আশি ও নব্বই দশকের বাংলা কবিতা এক অস্থির ও বাঁকবদলের সময়কে ধারণ করে আছে। এই সময়ের কবিরা সত্তরের রাজনৈতিক উম্মাদনা থেকে সরে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং নাগরিক অভিজ্ঞতার এক নতুন বয়ান তৈরি করেছিলেন। তাঁদের কবিতায় ‘আমি’ কেবল নিজের সুখ-দুঃখের কথা বলেনি, বরং সেই ‘আমি’র দহন ও নির্জনতাকে ছাপিয়ে এক বৃহত্তর মানবিক, দার্শনিক ও সংগ্রামী সত্যের দিকে উত্তরণ ঘটেছে। একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে কবিতায় ‘আমিত্ব’ ধারণাটি আরও জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘সেলফি-সংস্কৃতি’ যেখানে নিজেকে প্রদর্শনের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে, অন্যদিকে তীব্র একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা। আজকের তরুণ কবির কাছে যেন ‘আমি’ এক বিদীর্ণ আয়না। তার কবিতায় ব্যক্তিসত্তা কেবল আত্মরতি নয়, বরং তা নাগরিক যান্ত্রিকতা ও ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক অলিখিত ইশতেহার।
কবিতার এই ‘আমি’ কোনো অহমিকা নয়, বরং এক মহাজাগতিক সেতুবন্ধন। তরুণ কবিরা আজ শব্দকে স্রেফ অলংকার হিসেবে নয়, বরং আত্মখননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই নিরন্তর প্রচেষ্টাই কবিকে শেখায় কীভাবে আমিত্ব থেকে ধীরে ধীরে লীন হতে হয়। এই আত্ম-আবিষ্কারই হলো কবিতার আসল গন্তব্য— যেখানে কবি আড়াল হয়ে যায় আর জন্ম নেয় এক অবিনাশী কবিতার। তাই নিঃসন্দেহে বাংলা কবিতায় আমিত্বকে আত্মোপলব্ধি, প্রেম, বিরহ ও অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের এক সার্বজনীন অপরূপ অন্বেষণ বলতে পারি। এই অমিমাংসিত অন্বেষণই বাংলা কবিতাকে কাল থেকে কালান্তরে পৌঁছে দেবে বলে মনে করি।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬
গত কয়েকদিন ধরে জাপানের বিখ্যাত কবি শুনতারো তানিকাওয়ার লেখা ২০০৭ সালে প্রকাশিত ‘আমি’ (Watashi) নামের কবিতার বই পড়ছিলাম। বইটি পড়তে পড়তে মনে হলো নিজেকে নিয়ে তিনি বিস্তর এক কবিতার বই প্রকাশ করে ফেলেছেন। আমি যখন কবিতা লেখা শুরু করি শূন্য দশকের গোড়ার দিকে তখন একটা কথা প্রায়ই শুনতাম কবিতা থেকে ‘আমি’কে যতদূর সম্ভব দূরে রাখতে হবে। ‘আমি’-কেন্দ্রিক কবিতার ইন্দ্রজাল থেকে কবিকে বের হয়ে এসে সার্বজনীন হয়ে উঠতে হবে। কথাটি এখনো প্রায়ই শুনি। বিশেষ করে নতুন কবিদের কবিতায় আমিত্বের আধিক্য থাকে বলে অনেকেই এ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কোনো কোনো কবি আবার কিছুটা বাঁকা চোখে বা তাচ্ছিল্যের সাথেও দেখেন। তারা অনেকেই মনে করেন ‘আমি’র মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কবিতাকে আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে নিয়ে যায়— যা কবির আত্মমগ্নতা বা আত্মপ্রেমের পর্যায়ে চলে যেতে পারে। যদি ‘আমি’র ব্যবহার কেবল কবির ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং তা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সাথে না মেলে, তবে কবিতাটি সংকীর্ণ বা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে— যা কবিতার শিল্পগুণ নষ্ট করে অহমিকা বা ইগো-র বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মনে হতে পারে।
প্রশ্ন আসতে পারে— আমিত্বে আটকে পড়ে গেলে কবিতা সব মানুষের হয়ে উঠবে কীভাবে? কবি কি নিজের জন্য কবিতা লেখেন নাকি অন্যদের জন্য? কিংবা কবিতা কি আসলেই সব মানুষের হয়ে ওঠা জরুরি? কবি আর অন্য মানুষের মধ্যে বিভেদরেখা টেনে দিয়ে কে এঁকে দিল কবিতার এই বিমুখ মানচিত্র? এই আমিটা আসলে কে? আমি বলে আদৌ কি কিছু আছে? আসলে ঘুরেফিরে অনেক প্রশ্ন আসতে পারে। আমাদের চারপাশ থেকে যেমন আমাকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না, তেমনি কোনো সীমাবদ্ধ দেয়ালের মাঝে আমিও আটকে থাকতে পারি না। বাতাস কতটা ভারী হলে দীর্ঘশ্বাস হয়ে যায় কিংবা দীর্ঘশ্বাস কতটা হালকা হলে তাকে আমরা বাতাস বলতে পারি তা কেউই জানি না। অপার শূন্যতার মাঝেও সহস্র মানুষের ভ্রমণকথা কিংবা মুখরিত ভ্রমণেও শূন্যতার কতখানি কিচিরমিচির থাকে তা আমরা কেউই বলতে পারি না। এইসব অন্ধকার কিংবা আলোর গভীরে অস্তিত্বের সংলাপ জানিয়ে দেয় পরম অনস্তিত্বের কথোপকথন। সুতরাং নিজেকে আড়াল করে আমি কার কথা লিখবো কবিতায়?
শুধু কবিতায় নয়, এই জগত সংসারের সকল ক্ষেত্রে নিজেকে জানা সবচেয়ে বেশি জরুরি। কবি তো নিজের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। তার নিজেকে আগে চিনতে হয়। নিজের মন ও শরীরকে বুঝতে হয়। মন ও শরীরের ভাষা ও অক্ষর তাকে পাঠ করে নিতে হয় সবার আগে। মন ও শরীরের কি আসলেই কোনো ভাষা থাকে? কোনো স্বদেশ? স্বাধীনতা কিংবা পরাধীনতা? নিজের চোখ, কান, মুখ, হাত, পা বশে আনতে হয় নাকি সবুজ শস্যের মতো বাতাসে দোল খেতে খেতে সময়ের পরিক্রমায় আপনপথে হেঁটে যেতে হয়। এসব কিছুই অমীমাংসিত থেকে যায় শেষ অবধি তার কবিতার মতোই। তবু কবিকে উন্মোচন করতে হয়— চিনতে হয় নিজের সত্তা ও জাগরণ। কবিতায় যে আমি আমি স্বরে গুঞ্জরিত হয় শব্দের চরাচর তা কবিকে করে তোলে একজন সাধারণ মানুষ থেকে নিরাকার সত্তার বিমণ্ডিত বিস্তার।
কবি তাই নিজের দিকে হেঁটে চলেন, নিজের পায়ের আওয়াজ শোনেন। নিজের চারপাশ দেখেন— চারপাশের যা কিছু তাকে ঘিরে থাকে তাই তিনি কবিতায় লেখেন।
সযত্ন পরিচর্যায় সেটা কতটা নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠল তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। তবে নিজেকে না জানলে— না বুঝলে অন্যকে কীভাবে বুঝবে? এই জগতটাও আমাদের একান্ত নিজের। প্রত্যেকের পৃথিবী আলাদা। একই সংসারে প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা জগত থাকে, আকাশ থাকে— সেই আকাশে একেকজনের একেক সময় গ্রীষ্ম-বসন্ত আসে, চাঁদ ওঠে। তবু কোনো একটা জায়গায়, একটা বিন্দুতে সব জগত এসে কখনো কখনো মিলিত হয়। হতে পারে সেটা আনন্দ কিংবা বেদনায়, পরিপূর্ণতায় কিংবা নৈঃশব্দ্যে, একান্ত শূন্যতায়। কবি যদি বলে বসেন আমার ব্যক্তিগত আনন্দ বেদনার ভার আমি কেন সবাইকে বইতে দেব কিংবা অন্যরা কেন আমার বেদনার ভার বইতে যাবেন? ব্যক্তিগত জীবনের এরকম একটি বাউন্ডারি ওয়াল কি কবি এঁকে রাখতে পারবেন তার কবিতায়? তাই এমন কিছু অনুভূতি থাকে যা কারো ব্যক্তিগত নয়। কালে কালে যা সকল মানুষের, সকল জীবের এমনকি প্রকৃতিরও। তাই কবিতায় ‘আমিত্ব’ কোনো স্থির বিন্দু নয়। এটি একটি প্রবহমান পাটাতন। কবিরা প্রথমে নিজেকে চেনেন, নিজের সীমাবদ্ধতাকে অনুভব করেন এবং শেষ পর্যন্ত শব্দের সেতু দিয়ে সেই ক্ষুদ্র অহংকে পার হয়ে যান। কবিতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া মানে আত্মবিস্মৃতি নয়, বরং নিজেকে বৃহত্তর জগতের অংশ হিসেবে পুনরায় আবিষ্কার করা।
নিজেকে ছাড়িয়ে অনন্তে বিস্তারের এই পথে কবি আপনাআপনি ছুটে চলেন। কখনো চেতনে আবার কখন অবচেতনে, শব্দের ঘুমের ঘোরে, অনুচ্চারিত বোধের শাণিত সংঘাতে। তাই কবি সব কথা বলতে পারেন না। কবি যেটুকু বলতে পারেন না, যেটুকু ছুঁতে পারেন না সেটুকুই উৎকৃষ্ট কবিতা। যা কিছু তিনি দেখেন, অভিজ্ঞতায় নেন কিংবা যতটুকু কল্পনায় আনতে পারেন তার বাইরেও কবিতার বিচরণ। তাই কবিকে ছেড়ে কবিতা অনেক দূরে চলে যায়, দৃশ্যের বাইরে। কবিতা ব্যক্তিগত থেকে সার্বজনীন হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়া একান্ত স্বজাত, চিরকালীন ও আবহমান।
বাংলা কবিতার দীর্ঘ সহস্রাব্দের ইতিহাসে ‘আমি’ কোনো স্থির বা একরৈখিক সত্তা নয়; বরং তা এক বিবর্তনশীল লেখচিত্র। চর্যাপদের সেই নিভৃত সাধকের গুহ্য সাধনা থেকে শুরু করে আজকের উত্তর-আধুনিক কবির ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা— প্রতিটি বাঁকেই ‘আমি’ কখনো ক্ষুদ্র অহংয়ের কারারুদ্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি হয়েছে, আবার কখনো সেই শিকল ছিঁড়ে মিশে গেছে বিশ্বচরাচরের অনন্ত প্রবাহে। নিজেকে চেনা এবং শেষমেশ সেই নিজেকেই ছাড়িয়ে যাওয়া— এই দুই বিপরীতমুখী টানের মিলনই হলো কবিতা।
বাংলা কবিতার আদি পর্বে ‘আমিত্ব’ ছিল মূলত পরমাত্মার সঙ্গে লীন হওয়ার এক মাধ্যম। বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কিংবা বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধার যে ‘আমি’, তা আসলে কৃষ্ণের মধ্যে নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার এক আর্তি। “আমারি বঁধুয়া আন বাড়ি যায় আমারি আঙিনা দিয়া”— এই যন্ত্রণার গভীরে যে ‘আমি’ লুকিয়ে আছে, তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের চেয়ে বেশি আত্মনিবেদনের। মধ্যযুগের সুফী ও মরমী সাধকরাও মনে করতেন, নিজে না বিলীন হওয়া পর্যন্ত সেই পরম সত্যের দেখা পাওয়া অসম্ভব। ফলে, সেই সময়ের কবিতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া মানেই ছিল অহংবোধকে বিসর্জন দিয়ে ‘শূন্য’ হওয়া। বাংলা কবিতায় আধুনিকতার প্রকৃত সূর্যোদয় ঘটে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাত ধরে। তিনিই প্রথম বাংলা কবিতায় ‘ব্যক্তি-আমি’কে এক স্বতন্ত্র মহিমা দিলেন। তাঁর ‘আত্ম-বিলাপ’-এ আমরা দেখি এক যন্ত্রণাবিদ্ধ আধুনিক মানুষকে, যে নিজের কৃতকর্মের দায়ভার বহন করছে। কিন্তু এই ‘আমি’র সীমানাকে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্র-কাব্যে ‘আমি’ কেবল রক্ত-মাংসের একক সত্তা নয়, তা এক অনন্ত চেতনার অংশ। তিনি যখন বলেন— “আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ,/ চুনি উঠল রাঙা হয়ে—/ আমি চোখ মেললুম আকাশে,/ জ্বলে উঠল আলো পুবে পশ্চিমে।” তখন সেই ‘আমি’ আর ব্যক্তিগত তুচ্ছতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। রবীন্দ্রনাথ শিখিয়েছিলেন, নিজেকে অতিক্রম করার পথটি আত্মবিস্মৃতি নয়, বরং নিজেকে সমস্ত সৃষ্টির মাঝে প্রসারিত করা। তাঁর কাছে ‘আমি’ হলো সেই বাতায়ন, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতি ও ঈশ্বর একে অপরের সঙ্গে কথা বলে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কাজী নজরুল ইসলাম ‘আমি’কে দিলেন এক প্রলয়ংকরী ও সামষ্টিক রূপ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তাঁর আমিত্ব কোনো আত্মকেন্দ্রিক বিলাসিতা নয়, বরং তা শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্রোধের কণ্ঠস্বর। নজরুল যখন বলেন, “আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ,” তখন সেই ‘আমি’ ক্ষুদ্র অহংবোধকে ছাপিয়ে এক অপরাজেয় মানবিক সত্তায় রূপান্তরিত হয়। এখানে নিজেকে অতিক্রম করা মানেই হলো ভীরুতা ও জড়তাকে জয় করে এক বীরোচিত ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হওয়া। এর ঠিক বিপরীতে জীবনানন্দ দাশের ‘আমি’ অত্যন্ত নির্জন, বিষণ্ন এবং অস্তিত্ব সংকটে বিদ্ধ। তাঁর কবিতায় আত্মসত্তা বারবার প্রকৃতি, ইতিহাস এবং মৃত্যুর ধূসরতায় বিলীন হতে চায়। জীবনানন্দ নিজেকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন নক্ষত্রের আলোয় কিংবা ঘাসের ঘ্রাণে মিশে গিয়ে। তাঁর কাছে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া মানে এক ধরনের ‘প্রস্তরপ্রতিম’ নৈঃশব্দ্যে পৌঁছে যাওয়া, যেখানে সময়ের সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিরা ‘আমিত্ব’কে আরও ব্যবচ্ছেদ করলেন। বিনয় মজুমদার কিংবা জীবনানন্দ-পরবর্তী কবিদের কবিতায় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক। তাঁরা সমাজ বা সংসারের প্রথাগত ‘আমি’কে ভেঙে চুরমার করে এক নতুন, নগ্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে চেয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নিখিলেশ’ কিংবা ‘নীরা’ আসলে কবির সেই সত্তা, যা রক্ত-মাংসের মানুষের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আশি ও নব্বই দশকের বাংলা কবিতা এক অস্থির ও বাঁকবদলের সময়কে ধারণ করে আছে। এই সময়ের কবিরা সত্তরের রাজনৈতিক উম্মাদনা থেকে সরে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং নাগরিক অভিজ্ঞতার এক নতুন বয়ান তৈরি করেছিলেন। তাঁদের কবিতায় ‘আমি’ কেবল নিজের সুখ-দুঃখের কথা বলেনি, বরং সেই ‘আমি’র দহন ও নির্জনতাকে ছাপিয়ে এক বৃহত্তর মানবিক, দার্শনিক ও সংগ্রামী সত্যের দিকে উত্তরণ ঘটেছে। একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান প্রেক্ষাপটে কবিতায় ‘আমিত্ব’ ধারণাটি আরও জটিল ও বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। একদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘সেলফি-সংস্কৃতি’ যেখানে নিজেকে প্রদর্শনের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলে, অন্যদিকে তীব্র একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা। আজকের তরুণ কবির কাছে যেন ‘আমি’ এক বিদীর্ণ আয়না। তার কবিতায় ব্যক্তিসত্তা কেবল আত্মরতি নয়, বরং তা নাগরিক যান্ত্রিকতা ও ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক অলিখিত ইশতেহার।
কবিতার এই ‘আমি’ কোনো অহমিকা নয়, বরং এক মহাজাগতিক সেতুবন্ধন। তরুণ কবিরা আজ শব্দকে স্রেফ অলংকার হিসেবে নয়, বরং আত্মখননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার এই নিরন্তর প্রচেষ্টাই কবিকে শেখায় কীভাবে আমিত্ব থেকে ধীরে ধীরে লীন হতে হয়। এই আত্ম-আবিষ্কারই হলো কবিতার আসল গন্তব্য— যেখানে কবি আড়াল হয়ে যায় আর জন্ম নেয় এক অবিনাশী কবিতার। তাই নিঃসন্দেহে বাংলা কবিতায় আমিত্বকে আত্মোপলব্ধি, প্রেম, বিরহ ও অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের এক সার্বজনীন অপরূপ অন্বেষণ বলতে পারি। এই অমিমাংসিত অন্বেষণই বাংলা কবিতাকে কাল থেকে কালান্তরে পৌঁছে দেবে বলে মনে করি।

আপনার মতামত লিখুন