সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ‘যুগান্তকারী উদ্ভাবন’

এসির পানিই এখন পানের উপযোগী


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ পিএম

এসির পানিই এখন পানের উপযোগী

  • পানির সংকট মেটাতে নতুন দিগন্ত
  • এসির পানি জমিয়ে ফিল্টার করে পান ও ব্যবহার করা হচ্ছে
  • জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনে বছরে সাশ্রয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কাকরাইল। সেখানে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনের চিত্রটা এখন আর আগের মতো নেই। ভবনের এসি থেকে অঝোরে ঝরে পড়া যে পানি আগে দেয়াল নষ্ট করতো কিংবা রাস্তায় জমে ভোগান্তি বাড়াতো, সেই পানিই এখন হয়ে উঠেছে অমূল্য সম্পদ।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একদল মেধাবী প্রকৌশলীর হাত ধরে উদ্ভাবিত হয়েছে এসির পানি পরিশোধন করে তা পানযোগ্য ব্যবহার উপযোগী করার এক বিস্ময়কর প্রযুক্তি। এই উদ্ভাবনের ফলে বিশাল এই ভবনের পানির চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশই এখন পূরণ হচ্ছে এসির ফেলে দেওয়া পানি দিয়ে।

গবেষণা থেকে সফলতা: ২০২৪ থেকে ২০২৫ এর যাত্রা

এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী গবেষক . সুশান্ত রায় এবং প্রকৌশলী গোলাম রাব্বীসহ তাদের একটি দক্ষ দল। বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তারা শুনিয়েছেন এই অসাধ্য সাধনের গল্প।

. সুশান্ত রায় জানান, ২০২৪ সালে তারা প্রথম এই পরিকল্পনা হাতে নেন। দীর্ঘ এক বছরের কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পর ২০২৫ সালে এসে তারা পূর্ণাঙ্গ সফলতা পান।

তিনি বলেন, "আমাদের এই ভবনের বিভিন্ন তলায় ২৫০টিরও বেশি এসি রয়েছে। আগে এই এসির পানি পাইপ দিয়ে বালতিতে জমা হতো কিংবা যত্রতত্র পড়ে ভবনের দেয়াল নিচের রাস্তা নষ্ট করতো। এই সমস্যা থেকেই আমরা চিন্তা করি, এই পানিকে কি কোনোভাবে কাজে লাগানো যায়? সেই ভাবনা থেকেই ২০২৪ সালে আমাদের এই স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়।"

কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?

গবেষক দল জানান, ১০ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের ২৫০টিরও বেশি এসির পানি পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে একটি বিশেষ ট্যাংকে জমা করা হয়। সেখান থেকে অত্যাধুনিক ফিল্টারিং প্রযুক্তিগত শোধনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য মাটির নিচে রিজার্ভ ট্যাংকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

প্রকৌশলী গোলাম রাব্বী এই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, "আমরা দেখেছি একটি আড়াই টনের এসি থেকে প্রতি ৪০ মিনিটে প্রায় দেড় লিটার এবং এক টনের এসি থেকে এক লিটার পানি জমা হয়। একটি অফিস যদি দিনে ঘণ্টা চলে এবং তার মধ্যে ঘণ্টা এসি চালু থাকে, তবে আমাদের এই ২৫০টি এসি থেকে বছরে প্রায় লাখ ৪৪ হাজার ৬০০ লিটার পানি পাওয়া সম্ভব। এর ফলে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার পানির খরচ সাশ্রয় হবে।"

বিশুদ্ধতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডকেও হার মানিয়েছে

এসির এই পানি কতটা নিরাপদ? এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষকরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, এই পানি সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়ামুক্ত এবং পানের জন্য একদম নিরাপদ। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরে . সুশান্ত রায় সংবাদকে বলেন, "আমরা এই পানি পরীক্ষা করে দেখেছি এর গুণগত মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন পুরোপুরি অনুসরণ করে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা .০৫ থাকলে চলে, সেখানে এই পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ মাত্র .০০১। এছাড়া এতে ক্লোরাইডের পরিমাণ পাওয়া গেছে মাত্র ১০ মিলিগ্রাম।"

তিনি আরও যোগ করেন, "যদিও এসির পানিতে কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি, তবুও অধিক সতর্কতার জন্য আমরা এটি ফিল্টারিং সিস্টেমের মাধ্যমে পরিশোধন করছি। বর্তমানে ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রায় ৫’শ মানুষ এবং পথচারীরাও এই পানি পান করছেন। এছাড়া এটি টয়লেট, বাগান গাড়ি ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে।"

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জয়জয়কার

বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যে বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়েছে। ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে আয়োজিত আন্তর্জাতিক পানি সংস্থার কংগ্রেসে এই গবেষণার ফলাফল কৌশল সফলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। . সুশান্ত রায় তার দল এখন এই সাফল্যকে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে এই উদ্ভাবন

প্রকৌশলী গোলাম রাব্বী মনে করেন, এই মডেলটি সারা দেশের সরকারি বেসরকারি বহুতল ভবনে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের পানির সংকট অনেকাংশেই দূর হবে।

তিনি বলেন, "আমরা তিনজন প্রকৌশলী মিলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছি। এখন আমাদের লক্ষ্য কীভাবে এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা যায়। ভবিষ্যতে এটি পানির একটি প্রধান বিকল্প উৎস হিসেবে কাজ করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।"

মাত্র লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি প্রমাণ করে দিলো, উদ্ভাবনী শক্তি সদিচ্ছা থাকলে বর্জ্য থেকেও মহামূল্যবান সম্পদ তৈরি করা সম্ভব। রাজধানীর অন্যান্য ভবনেও যদি এই প্রযুক্তি অনুসরণ করা হয়, তবে তা দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬


এসির পানিই এখন পানের উপযোগী

প্রকাশের তারিখ : ০৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

  • পানির সংকট মেটাতে নতুন দিগন্ত
  • এসির পানি জমিয়ে ফিল্টার করে পান ও ব্যবহার করা হচ্ছে
  • জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনে বছরে সাশ্রয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা

রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কাকরাইল। সেখানে অবস্থিত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ভবনের চিত্রটা এখন আর আগের মতো নেই। ভবনের এসি থেকে অঝোরে ঝরে পড়া যে পানি আগে দেয়াল নষ্ট করতো কিংবা রাস্তায় জমে ভোগান্তি বাড়াতো, সেই পানিই এখন হয়ে উঠেছে অমূল্য সম্পদ।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একদল মেধাবী প্রকৌশলীর হাত ধরে উদ্ভাবিত হয়েছে এসির পানি পরিশোধন করে তা পানযোগ্য ব্যবহার উপযোগী করার এক বিস্ময়কর প্রযুক্তি। এই উদ্ভাবনের ফলে বিশাল এই ভবনের পানির চাহিদার প্রায় ৬৭ শতাংশই এখন পূরণ হচ্ছে এসির ফেলে দেওয়া পানি দিয়ে।

গবেষণা থেকে সফলতা: ২০২৪ থেকে ২০২৫ এর যাত্রা

এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী গবেষক . সুশান্ত রায় এবং প্রকৌশলী গোলাম রাব্বীসহ তাদের একটি দক্ষ দল। বৃহস্পতিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তারা শুনিয়েছেন এই অসাধ্য সাধনের গল্প।

. সুশান্ত রায় জানান, ২০২৪ সালে তারা প্রথম এই পরিকল্পনা হাতে নেন। দীর্ঘ এক বছরের কঠোর পরিশ্রম, গবেষণা ল্যাবরেটরি পরীক্ষার পর ২০২৫ সালে এসে তারা পূর্ণাঙ্গ সফলতা পান।

তিনি বলেন, "আমাদের এই ভবনের বিভিন্ন তলায় ২৫০টিরও বেশি এসি রয়েছে। আগে এই এসির পানি পাইপ দিয়ে বালতিতে জমা হতো কিংবা যত্রতত্র পড়ে ভবনের দেয়াল নিচের রাস্তা নষ্ট করতো। এই সমস্যা থেকেই আমরা চিন্তা করি, এই পানিকে কি কোনোভাবে কাজে লাগানো যায়? সেই ভাবনা থেকেই ২০২৪ সালে আমাদের এই স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয়।"

কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?

গবেষক দল জানান, ১০ তলা বিশিষ্ট এই ভবনের ২৫০টিরও বেশি এসির পানি পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে একটি বিশেষ ট্যাংকে জমা করা হয়। সেখান থেকে অত্যাধুনিক ফিল্টারিং প্রযুক্তিগত শোধনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণের জন্য মাটির নিচে রিজার্ভ ট্যাংকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

প্রকৌশলী গোলাম রাব্বী এই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, "আমরা দেখেছি একটি আড়াই টনের এসি থেকে প্রতি ৪০ মিনিটে প্রায় দেড় লিটার এবং এক টনের এসি থেকে এক লিটার পানি জমা হয়। একটি অফিস যদি দিনে ঘণ্টা চলে এবং তার মধ্যে ঘণ্টা এসি চালু থাকে, তবে আমাদের এই ২৫০টি এসি থেকে বছরে প্রায় লাখ ৪৪ হাজার ৬০০ লিটার পানি পাওয়া সম্ভব। এর ফলে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার পানির খরচ সাশ্রয় হবে।"

বিশুদ্ধতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডকেও হার মানিয়েছে

এসির এই পানি কতটা নিরাপদ? এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষকরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, এই পানি সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়ামুক্ত এবং পানের জন্য একদম নিরাপদ। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরে . সুশান্ত রায় সংবাদকে বলেন, "আমরা এই পানি পরীক্ষা করে দেখেছি এর গুণগত মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন পুরোপুরি অনুসরণ করে। যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা .০৫ থাকলে চলে, সেখানে এই পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ মাত্র .০০১। এছাড়া এতে ক্লোরাইডের পরিমাণ পাওয়া গেছে মাত্র ১০ মিলিগ্রাম।"

তিনি আরও যোগ করেন, "যদিও এসির পানিতে কোনো জীবাণু পাওয়া যায়নি, তবুও অধিক সতর্কতার জন্য আমরা এটি ফিল্টারিং সিস্টেমের মাধ্যমে পরিশোধন করছি। বর্তমানে ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রায় ৫’শ মানুষ এবং পথচারীরাও এই পানি পান করছেন। এছাড়া এটি টয়লেট, বাগান গাড়ি ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে।"

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জয়জয়কার

বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের এই উদ্ভাবন ইতোমধ্যে বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত হয়েছে। ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে আয়োজিত আন্তর্জাতিক পানি সংস্থার কংগ্রেসে এই গবেষণার ফলাফল কৌশল সফলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। . সুশান্ত রায় তার দল এখন এই সাফল্যকে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ভবিষ্যতের পথ দেখাচ্ছে এই উদ্ভাবন

প্রকৌশলী গোলাম রাব্বী মনে করেন, এই মডেলটি সারা দেশের সরকারি বেসরকারি বহুতল ভবনে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের পানির সংকট অনেকাংশেই দূর হবে।

তিনি বলেন, "আমরা তিনজন প্রকৌশলী মিলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছি। এখন আমাদের লক্ষ্য কীভাবে এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা যায়। ভবিষ্যতে এটি পানির একটি প্রধান বিকল্প উৎস হিসেবে কাজ করবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।"

মাত্র লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি প্রমাণ করে দিলো, উদ্ভাবনী শক্তি সদিচ্ছা থাকলে বর্জ্য থেকেও মহামূল্যবান সম্পদ তৈরি করা সম্ভব। রাজধানীর অন্যান্য ভবনেও যদি এই প্রযুক্তি অনুসরণ করা হয়, তবে তা দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত