সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু খেলা চলছে

হরমুজকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক লড়াই


দীপক মুখার্জি, কলকাতা থেকে
দীপক মুখার্জি, কলকাতা থেকে
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৩ পিএম

হরমুজকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক লড়াই

যুদ্ধবিরতির সামনে বাকি আরও ১১দিন; কিন্তু প্রশ্ন একটাই, এই নীরবতা কি ঝড়ের আগের বিরতি, নাকি সত্যিই শান্তির শুরু?

পশ্চিম এশিয়ায় আপাতত গুলি থেমেছে, কিন্তু সংঘাত নয়। ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস শোনা গেলেও, এর আড়ালে চলছে আরও বড় কূটনৈতিক লড়াই।

আর এই সূক্ষ্ম কৌশলই ইরানকে সরাসরি পিছু না হটে, শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটার সুযোগ দি‌য়ে‌ছে।

এই পুরো সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। এই রুট বন্ধ থাকলে শুধু বিশ্ব অর্থনীতিই নয়, ইরানও আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক সংঘাতে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, অবকাঠামোর উপর চাপ এবং নিষেধাজ্ঞাজনিত সমস্যার কারণে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থার উপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছিল।

ঠিক এই জায়গাতেই ইরানের কৌশল বদল। যুদ্ধবিরতি তাদের জন্য পিছু হটা নয়, বরং সময় নেওয়া, একটি ‘repositioning’। এই বিরতির মধ্যে তারা একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ কমাবে, অন্যদিকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করবে। তেহরান ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তাদের দেওয়া শর্ত মানা না হলে সংঘাত আবার শুরু হতে পারে অর্থাৎ এই শান্তি সম্পূর্ণ অস্থায়ী।

এর পাশাপাশি, পর্দার আড়ালে চলেছে জটিল কূটনীতি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং চীনের নীরব প্রভাব এই সমঝোতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠক এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে নতুন দিশা দিতে পারে, যদিও এর ফলাফল এখনো অনিশ্চিত।

তবে বাস্তবতা হলো, মাটিতে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি থামেনি। বাহরাইন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, লেবানন থেকে গাজা; বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন হামলা, ড্রোন তৎপরতা এবং সামরিক উপস্থিতি প্রমাণ করে দিচ্ছে যে সংঘাতের কাঠামো অটুট রয়েছে।

ইজরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হিজবুল্লার বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চলবে, যা এই যুদ্ধবিরতির সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। নয়াদিল্লি যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে কূটনীতির উপর জোর দিলেও, একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে অবাধ নৌ-চলাচল বজায় রাখার বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এই রুটের উপর নির্ভরশীল হওয়ায়, দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট, শান্তি প্রয়োজন, কিন্তু স্বার্থের প্রশ্নে কোনও আপোস নয়।

সব মিলিয়ে, এই ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি আসলে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। উপরিভাগে শান্তি, কিন্তু অন্তরে প্রস্তুতি। আমেরিকা চাপ সৃষ্টি করে কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চাইছে, আর ইরান সময় নিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। দুই পক্ষই নিজেদের সাফল্য দাবি করলেও, প্রকৃত সত্য হলো, এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি, বরং অন্য রূপে চলতে শুরু করেছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬


হরমুজকে ঘিরে নতুন কূটনৈতিক লড়াই

প্রকাশের তারিখ : ১০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

যুদ্ধবিরতির সামনে বাকি আরও ১১দিন; কিন্তু প্রশ্ন একটাই, এই নীরবতা কি ঝড়ের আগের বিরতি, নাকি সত্যিই শান্তির শুরু?

পশ্চিম এশিয়ায় আপাতত গুলি থেমেছে, কিন্তু সংঘাত নয়। ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস শোনা গেলেও, এর আড়ালে চলছে আরও বড় কূটনৈতিক লড়াই।

আর এই সূক্ষ্ম কৌশলই ইরানকে সরাসরি পিছু না হটে, শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটার সুযোগ দি‌য়ে‌ছে।

এই পুরো সমীকরণের কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে যায়। এই রুট বন্ধ থাকলে শুধু বিশ্ব অর্থনীতিই নয়, ইরানও আন্তর্জাতিক চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক সংঘাতে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, অবকাঠামোর উপর চাপ এবং নিষেধাজ্ঞাজনিত সমস্যার কারণে ইরানের অর্থনৈতিক অবস্থার উপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছিল।

ঠিক এই জায়গাতেই ইরানের কৌশল বদল। যুদ্ধবিরতি তাদের জন্য পিছু হটা নয়, বরং সময় নেওয়া, একটি ‘repositioning’। এই বিরতির মধ্যে তারা একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ কমাবে, অন্যদিকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করবে। তেহরান ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তাদের দেওয়া শর্ত মানা না হলে সংঘাত আবার শুরু হতে পারে অর্থাৎ এই শান্তি সম্পূর্ণ অস্থায়ী।

এর পাশাপাশি, পর্দার আড়ালে চলেছে জটিল কূটনীতি। পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং চীনের নীরব প্রভাব এই সমঝোতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইসলামাবাদে সম্ভাব্য বৈঠক এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে নতুন দিশা দিতে পারে, যদিও এর ফলাফল এখনো অনিশ্চিত।

তবে বাস্তবতা হলো, মাটিতে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি থামেনি। বাহরাইন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, লেবানন থেকে গাজা; বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্ন হামলা, ড্রোন তৎপরতা এবং সামরিক উপস্থিতি প্রমাণ করে দিচ্ছে যে সংঘাতের কাঠামো অটুট রয়েছে।

ইজরায়েল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হিজবুল্লার বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চলবে, যা এই যুদ্ধবিরতির সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। নয়াদিল্লি যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে কূটনীতির উপর জোর দিলেও, একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে অবাধ নৌ-চলাচল বজায় রাখার বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এই রুটের উপর নির্ভরশীল হওয়ায়, দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট, শান্তি প্রয়োজন, কিন্তু স্বার্থের প্রশ্নে কোনও আপোস নয়।

সব মিলিয়ে, এই ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতি আসলে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করেছে। উপরিভাগে শান্তি, কিন্তু অন্তরে প্রস্তুতি। আমেরিকা চাপ সৃষ্টি করে কূটনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চাইছে, আর ইরান সময় নিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। দুই পক্ষই নিজেদের সাফল্য দাবি করলেও, প্রকৃত সত্য হলো, এই লড়াই এখনো শেষ হয়নি, বরং অন্য রূপে চলতে শুরু করেছে।


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত