সংবাদ
পদ্মা ব্যারেজ ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন আশা, তবে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

পদ্মা ব্যারেজ ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন আশা, তবে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা-নির্ভর এলাকার মানুষ নদী শুকিয়ে যাওয়া, কৃষিকাজে পানির অভাব এবং উর্বর জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো চরম সংকটের সম্মুখীন হচ্ছেন।তবে সম্প্রতি একনেক (ইসিএনইসি) অনুমোদিত ৩৩,৪৭৪ কোটি টাকার ‘পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারেজ প্রকল্প’ এই অঞ্চলের বাসিন্দা, কৃষক এবং পানি ব্যবস্থাপকদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আগামী সাত বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এই মেগা প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ইকো সিস্টেম পুনরুদ্ধার।রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের চরঝিকড়ী গ্রামের কাছে প্রস্তাবিত এই ব্যারেজটি নির্মাণের কথা চলছে। স্থানীয় কৃষকদের জন্য নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতিই এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও জমির মালিক আইয়ুব কাজী সংবাদকে বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির চেয়ে নদীর পানি ব্যবহার করা চাষাবাদের জন্য অনেক বেশি উপকারী।তার মতে, স্থানীয় ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রচুর আয়রন থাকায় তা কৃষিকাজের জন্য ততটা ভালো নয়। জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ডিজেল চালিত সেচ পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, যার ফলে কৃষকদের কাছে বিকল্প পানির উৎস ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।সংবাদ প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় বাসিন্দারা পদ্মা ব্যারেজ নিয়ে উৎসাহ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, এই ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে শুধু পানি সমস্যার সমাধান ও কৃষি কাজের উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই অঞ্চলের জীবনমানেও উন্নয়নের পরিবর্তন ঘটবে। স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা করছেন তারা।তাবে তারা আশঙ্কা করে বলেছেন, ব্যারেজ করতে গিয়ে তারা যতটা ক্ষতিগ্রস্থ হবেন  সে বিষয়ে সরকার যেনো দৃষ্টি রাখেন। আর সেই দৃষ্টি যেনো কোনো একটি বিশেষ গোষ্টির দিকে না হয়।বিশেষজ্ঞদের মতে, মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ নেই।  অবসরপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আক্তার হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে খুলনা অঞ্চলের কিছু অংশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে। উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন সংগঠন জানিয়েছে, টিউবওয়েল থেকে লবণাক্ত পানি বের হওয়ার কারণে সেখানে নিরাপদ পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনেও এই প্রভাব মারাত্মক রূপ নিয়েছে।পরিবেশবাদীদের মতে, লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সেখানে সুন্দরী গাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডাব্লিওডিবি) কর্মকর্তারা আশা করছেন, শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রেখে প্রধান শাখা নদীগুলোতে প্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ব্যারেজ বর্তমান পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবে।কুষ্টিয়ায় বিডব্লিউডিবি’র নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান জানান, গড়াই, মধুমতী এবং হিষনার মতো গঙ্গার শাখা নদীগুলোতে পানির স্তর বজায় রাখতে এই প্রকল্প সাহায্য করবে। নদীতে পানির স্তর ১০ মিটারের কাছাকাছি রাখা সম্ভব হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) এর আওতা ৫৫,০০০ হেক্টর থেকে বেড়ে ৯৫,০০০ হেক্টরে উন্নীত করা সম্ভব হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ধারণা, উন্নত সেচ ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মৎস্য সম্পদের উন্নয়নের মাধ্যমে ১৯টি জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ এর সুফল ভোগ করবে। এই অঞ্চলের সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা জিকে (গঙ্গা-কপোতাক্ষ) সেচ প্রকল্পের পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের।তিনি সংবাদকে বলেন, বর্তমানে পাম্পগুলো চালু রাখতে সর্বনিম্ন ৩.৯ মিটার পানির স্তর প্রয়োজন হয়। পানির স্তর এর নিচে নামলে আমাদের পাম্প বন্ধ রাখতে হয়। ফলে সেচ কার্যক্রম ব্যহত হয়, কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্থ হন। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পর শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলেও পাম্প সচল রাখা সম্ভব হবে।ব্যাপক উৎসাহের মাঝেও পানি বিশেষজ্ঞরা এই ব্যারেজটিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত সমাধান হিসেবে দেখতে নারাজ। বড় ব্যারেজ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা, পলি চলাচল এবং পরিবেশগত প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।প্রকৌশলী আক্তার হোসেনের মতে, কম্পিউটার মডেল এবং ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে এর নেতিবাচক প্রভাবগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা যায়।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য জসিম উদ্দিন আহমদ গঙ্গার পলির সঙ্গে বয়ে আসা ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই দূষণকারী পদার্থ মানুষ ও নদীর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে আশঙ্কা করছেন।বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এই পানি অবকাঠামো প্রকল্পটিকে ঘিরে স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা অনেক বেশি । দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে পদ্মা ব্যারেজ শুধুমাত্র একটি স্থাপনা নয়, বরং এটি পানি নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার, কৃষি বাঁচানো এবং জীবনযাত্রা রক্ষার একটি বড় সুযোগ ।তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের চূড়ান্ত সাফল্য শুধু এর প্রকৌশলগত উৎকর্ষের ওপরই নির্ভর করবে না, বরং পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো আগে থেকে অনুধাবন করে তা কতটা সফলভাবে মোকাবেলা করা হয়, তার ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভর করবে।
১ ঘন্টা আগে

বিশ্বকাপ সময়সূচি: দেখতে ক্লিক করুন

মতামতমতামত

পলিটিক্যাল সিগন্যাল গেমে নতুন মাস্টারস্ট্রোক!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনার ঝড় উঠেছে—তৃণমূলের অন্দরের অস্থিরতার মাঝেই সামনে আসছে বড় সমীকরণের ইঙ্গিত। মমতা ব্যানার্জী কি সত্যিই কংগ্রেসের পথে হাঁটছেন, নাকি এটি কেবল কৌশলগত চাপের রাজনীতি? দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। এর মাঝেই তৃণমূলের ভেতরের বিদ্রোহ, দলত্যাগ এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে করেছে আরও জটিল। তাহলে কি সবটাই বড় কোনো রাজনৈতিক চাল—নাকি সত্যিই বদলে যাচ্ছে বাংলার রাজনীতির সমীকরণ?এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে উঠছে—এটি নিছক কোনো ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরং সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। বিদ্রোহ দমন, ক্ষমতার সমীকরণে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় স্তরে প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্যেই কি এই পদক্ষেপ? এই প্রশ্নগুলিকেই ঘিরে এখন তীব্র হচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও জল্পনা।পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দর্শনীয় ফলাফলের পর একের পর এক নির্বাচিত বিধায়ক ও সাংসদদের আচরণ এখন প্রশ্নের মুখে। যাঁরা একসময় দলের প্রতীক ও নেত্রীর মুখে ভর করে জয়লাভ করেছিলেন, তাঁরাই কি আজ সুবিধাবাদী রাজনীতির পথে হাঁটছেন? অভিযোগ উঠছে, ‘লোটাস স্পর্শের’ প্রলোভনে ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছেন অনেকেই—ফলে যাদের কাঁধে ভর করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেই নেত্রীকেই আজ বিপদের মুখে একা ফেলে দেওয়ার ছবি সামনে আসছে।এই সমস্ত জনপ্রতিনিধিরা যে শুধু দলের প্রতীকে জেতেননি, বরং নেত্রীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনসমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছেন—তা রাজনৈতিক মহলে স্বীকৃত। অথচ দলের দুর্দিনে, ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর আভাস পেতেই তাদের একাংশের আচরণে পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি করছে। এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কথায়, “এটা আদর্শের লড়াই নয়, এটা এখন সম্পূর্ণ ক্ষমতার অঙ্ক।”আরেকজন পর্যবেক্ষকের মতে, “নেত্রীর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে জেতা, তারপর সুবিধামতো অবস্থান বদলানো—বাংলার রাজনীতিতে নতুন নয়, কিন্তু এবার তা অনেক বেশি স্পষ্ট।”এই পটভূমিতেই তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর মমতা ব্যানার্জীর কংগ্রেসে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে জল্পনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস–এর জন্মই হয়েছিল কংগ্রেসের বিকল্প শক্তি হিসেবে, ফলে সেই দলের নেত্রীরই আবার কংগ্রেসের ছত্রছায়ায় যাওয়ার সম্ভাবনা নিছক দলবদল নয়—বরং এক গভীর রাজনৈতিক সংকেত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের পর যে বার্তা সামনে এসেছে—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব এবং অভিষেক ব্যানার্জী–কে সাধারণ সম্পাদক করার সম্ভাবনা—তা অনেকের মতে সরাসরি যোগদানের ইঙ্গিত নয়, বরং অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সাজানো একটি কৌশল। এই ধরনের বার্তা ইচ্ছাকৃতভাবেই বাইরে আসতে পারে, যাতে তৃণমূলের ভেতরে তৈরি হওয়া বিদ্রোহী মানসিকতায় ধাক্কা দেওয়া যায়।কারণ, যখন দলের একাংশ আলাদা ব্লক তৈরির কথা ভাবছে, তখন নেতৃত্ব যদি ইঙ্গিত দেয় যে জাতীয় স্তরে তাদের সামনে আরও বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম খোলা রয়েছে, তখন বিদ্রোহীদের হিসাব বদলে যায়। এতে তারা বুঝতে বাধ্য হয় যে নেতৃত্ব এখনও জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী, ফলে আলাদা হয়ে গেলে তাদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। অর্থাৎ, এই প্রস্তাবকে ব্যবহার করা হতে পারে একধরনের ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ হিসেবে, যাতে দলের ভিতরের ভাঙন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।একইসঙ্গে কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও এই প্রস্তাবের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী ঐক্যকে শক্তিশালী করতে গেলে মমতা ব্যানার্জীর মতো আঞ্চলিক শক্তিকে পাশে টানা গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজ্য কংগ্রেসের ভেতরে দ্বিধা রয়েছে, যা প্রতিফলিত হয়েছে রাজ্য কংগ্রেস প্রধান শুভঙ্কর সরকার–এর মন্তব্যে—যেখানে আদর্শ ও বাস্তব রাজনীতির টানাপোড়েন স্পষ্ট।অন্যদিকে বিজেপি এই পরিস্থিতিকে বিরোধীদের অস্থিরতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নিচ্ছে। বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার–এর কটাক্ষ সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক ন্যারেটিভের অংশ, যেখানে বিরোধীদের বিভক্ত ও অনিশ্চিত হিসেবে দেখানো হচ্ছে।সব মিলিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কংগ্রেসে ফেরার জল্পনা আপাতত বাস্তব পদক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি একটি কৌশলগত ‘সিগন্যাল গেম’। এই খেলায় তৃণমূল নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সামলাতে চাইছে, কংগ্রেস জাতীয় স্তরে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে চাইছে, আর বিজেপি সেই বিভ্রান্তিকেই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে ঘটনাটি যতটা না দলবদল, তার চেয়ে অনেক বেশি হিসেবি চাপের রাজনীতি—যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজেদের সুবিধামতো চাল চালছে।এই জল্পনার চূড়ান্ত পরিণতি যা-ই হোক না কেন, আপাতত এটিকে একটি ‘পলিটিক্যাল সিগন্যাল গেম’ হিসেবেই দেখা বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক কারবারিদের একাংশ l

বাজেট ও বাজার: জনগণের কাঁধে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা

বাজেটের আগে বাজার, বাজারের আগে আতঙ্ক। দিন যায় কথা থাকে গানের মতো প্রতিবছরই বাজেট আসে বাজেট যায়। প্রতিবছরই এপ্রিল-মে মাসে শুরু হয় বাজেটা প্রণয়নের তুমুল তোড়জোর। অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘাম ছুটে যায় বাজেট তৈরি করতে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দ্বি-পক্ষীয়, ত্রি-পক্ষীয়, বহুপক্ষীয় সভা। সেখানে নানা ধরনের আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর দর কষাকষির পর পূর্বের বছরের তুলনায় শতকরা পাঁচ বা দশভাগ বরাদ্দ বাড়িয়ে যা তৈরি করা হয় তারই নাম বাজেট। প্রতিবছর জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবারে বাংলাদেশের সংসদে বাজেট উপস্থাপনের একটা রীতি রয়েছে। তবে এর যে হেরফের হয় না এমন নয়। অর্থমন্ত্রী তার ব্রিফকেসে করে বাজেটের সকল কাগজপত্র নিয়ে সংসদে হাজির হন। সেই ব্রিফকেসে থাকে অনেক ডকুমেন্ট যাদেরকে বলা হয় বাজেট ডকুমেন্ট। সেই ডকুমেন্টটা চটের ব্যাগে করে আগেই সংসদ সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়। সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী যে বইটি রিডিং পড়েন তার নাম বাজেট বক্তৃতা। সে কয়েক ঘণ্টার ইতিহাস। বাজেট বক্তৃতা করতে করতে মন্ত্রীকে কয়েকবার পানি পান করতে হয়। সংসদসদস্যগণের অনেকই বক্তৃতা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে হাই তুলতে থাকেন, যাদের বয়স একটু বেশি তারা ঘুমিয়ে পড়েন। তারপর মাসব্যাপী সেই বাজেটের ওপর সংসদে আলোচনা হয়, পাশ হয় বাজেট। বিরোধীদলের সদস্যরা বাজেটকে গণবিরোধী বলে তুলোধূনা করেন আর সরকারি দলের লোকজন বলেন ইতোপূর্বে এ ধরণের জনবান্ধব বাজেট জাতীয় সংসদে আর উপস্থাপিত হয়নি। মাঝেমধ্যে বাজেট রেখে অন্যবিষয় নিয়েও তুমুল বকাবকি হয়ে থাকে। টকশোওয়লাদের কাছে বাজেট এক আনন্দ উৎসব। টেলিভিশনে তাদের কদর বেড়ে যায়। তাদের আলোচনা-সমালোচনায় দর্শকদের কান ঝালাপালা হয়ে উঠে। দীর্ঘ ষোলো বছর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে কাজ করার সুবাধে এমনটিই দেখেছি। যা বলছিলাম, গানের সেই কথার মতোই বাজেটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে যায় কিংবা আরও বাড়ে। সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট কিছু দুর্বোধ্য সংখ্যা, কর বাড়ানোর এক মোক্ষম হাতিয়ার আর জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাবার আতঙ্ক। আর তাদের আশঙ্কা সত্য করে দিয়ে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় আমাদের চোখের সামনেই। অধিকাংশ ক্ষেত্র এটি ঘটে বাজেট প্রণয়ের বেশ আগেই। ধান্দাবাজ ব্যবসায়ীরা তক্ষে তক্ষে থাকে যে কোনো অছিলায় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দিতে। বাজেটের আগে একবার বাড়ায়, আর বাজেটের পরে আর একবার। অর্থাৎ বাজেটের অছিলায় আমাদের দেশে দুইদফা জিনিস-পত্রের দাম বাড়ানো হয়ে থাকে। বাজেটের আগে ব্যবসায়ী এবং মজুতদারা বাজারে একটা অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে। কৃত্রিমভাবে জিনিসপত্রের সরবারাহ বাজারে কমিয়ে ফেল। বাজারে জিনিসপত্রের স্বাভাবিক সরবরাহ না থাকলে খোলাবাজার নীতির নিয়ম অনুযায়ী জিনিসত্রের দাম বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক এবং হচ্ছেও তাই। তারা গুজব ছড়ায় বিভিন্ন পণ্যের আমদানি শুল্ক বেড়ে যাবে, নতুন কর আরোপ করা হবে, আর আমদানি শুল্ক ও কর বেড়ে গেলে বেড়ে গেলে দাম বেড়ে যাবে। হয়তো দেখা গেল খুব কমসংখ্যক পণ্যের উপর বাজেটে আমদআনি শুল্ক বাড়ানো হয়েছ, কিন্তু দাম বেড়ে গেলো প্রায় সকল আমদানিকৃত পণ্যের। আমদানি শুল্ক তখন ও কিন্তু বাড়ানো হয়নি, শুধু বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছ। এর জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন। গ্রাম অঞ্চলে একটা কথা আছে- আঁধার ঘরে সাপ, পুরো ঘরে সাপ। ঘর অন্ধকার থাকলে ঘরের যেকোনো জায়গাই সাপ থাকার সম্ভাবানা থাকে। তাই বলে ঘরের সবজায়গায় সাপ থাকে না। সবজায়গায় না থাকলেও আপনি কিন্তু ঘরের মেঝের কোথাও পা ফেলতে সাহস করবেন না। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নে প্রচণ্ড রকমের লুকোচুরি করা হয়। বাজেট প্রণয়ন কওে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। বাজেট প্রণয়নের একমাস আগ থেকই সেখানে সাংবাদিক, সাধারণ জনগণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে ফ্লোরে বাজেট তৈরি করা হয় সেই ফ্লোরের কলাপসিবল গেইটে তালা মেরে রাখা হতো। গেইটে সশস্ত্র প্রহরী। এক যুদ্ধংদেহী অবস্থা। সাংবাদিকগণ ঘুর ঘুর করছেন বাজেটের তথ্য সংগ্রহের জন্য। নানা কায়দায় তারা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যান। অনির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে তারা ‘নির্ভরযোগ্য’ তথ্যে পত্রিকার পাতা ভরে ফেলেন। সেখানে সত্যের সঙ্গে আধা-সত্যেও কিংবা মিথ্যার একটা মিশেল থাকে। তাদের পত্রিকার শিরোনাম থেকে আপনার মনে হতেই পারে আসন্ন বাজেটে বাজারে আগুন লাগানোর সকল আয়োজন রাখা হয়েছে যে আগুনে আপনার সাজানো সংসার পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে। বাজেটের সঙ্গে অনেক পণ্যের হয়তো কোনো সরাসরি সমপৃক্তাই নেই, তবুও দাম বাড়ছে। আপনিও তেল, ডাল, গুড়া দুধের পিছনে ছুটে সেগুলোর দাম বাড়াতে যে একটা ভূমিকা রাখছেন সেটি হয়তো বুঝতে পারছেন না। বাজেট তৈরিতে এই গোপনীয়তা কেনো? তার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে। এটি কি একটা ট্যাবু যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে? পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও কি বাজেট তৈরিতে এতো গোপনীয়তা পালন করা হয়? হয়তো হয়, হয়তো না। গোপনীয় জিনিসের প্রতি মানুষের আগ্রহ চিরন্তন। যেকোনো গোপনীয় জিনিস নিয়ে মানুষ কল্পনার জাল বুনে, নানা রকমের অনুমান আন্দাজ তৈরি করে। সেই অনুমান, আন্দাজ সেই রহস্যময়তা ফ্যাক্ট বা সত্য তথ্য বিকৃতি ঘটায়। বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেট প্রণয়নে গোপনীয়তার যে রীতি প্রচলিত আছে তার যুক্তিসংগতভাবে গোপনীয়তার খোলস থেকে বের করে আনা যায় কিনা তা অর্থ মন্ত্রণালয় ভেবে দেখতে পারে। এবার আসুন বাজেট তৈরির পরের কাহিনীতে। বাজেট তো পাস হলো। কিছু কিছু পণ্যেও উপর সত্যি সত্যিই আমদানি শুল্ক বাড়ানে হলো, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয় তো নতুন ট্যাক্স আরোপ করা হলো কিংবা বাড়ানো হলো। এবার শুরু হলো পণ্যের দাম বাড়ানোর নতুন ঢেউ। ব্যবসায়ীদের দাবি তাদের এখন আর করার কিছু নেই। সরকার শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছে, ট্যাক্স বাড়িয়ে দিয়েছ তাদের করার কী আছে?সত্যিই তাদের করার কিছু নেই? সরকার হয়তো শুল্ক বাড়িয়েছ শতকরা একভাগ, তারা সেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিল শতকরা দশভাগ। সরকার হয়তো দশটা পণ্যের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়েছে তারা বাড়িয়ে দিলেন একশ একটা পণ্যের দাম। আপনি বাজারে গিয়েছেন মাছ কিনবেন, তিতাস নদীর সেই মাছে যেটি আপনি দুই দিন আগে কিনেছেন তিনশ টাকা কেজি দরে আজেকে আপনাকে কিনতে হচ্ছে চারশ টাকা কেজি। মাছ তো আর আমদানি হয়ে আসেনি তবু তার দাম বেড়েছ। দোকানিকে জিজ্ঞেস করলে তার নিরীহ জবাব- বাজেটে দাম বেড়েছে। একই ক্রিছা মুরগিওয়ালার ক্ষেত্রেও। দেশি মুরগি খাওয়া আপনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছন ট্যাকের জোর নেই বলে এবার ব্রয়লারটাও ছাড়তে হবে। ছাড়তে ছাড়তে একসময় দেখা যাবে আপনাকে সবকিছুই ছাড়তে হচ্ছে। ছাড় দেয়ার আর কিছুই নেই। তখন আর কী করবেন! কী আর করবেন- যা করার বাজেটই করবে। মাছের দাম কিংবা মুরগির দাম বেড়ে গিয়েছে কেনো এমন প্রশ্নের জবাবে দোকানি আপনাকে যে জবাব দেবে তা শুনে হয় তো আপনি লা-জবাব। নন্দঘোষের মত সব দোষ বাজেটের। আপনি একজন সীমিত আয়ের মানুষ, ছোটো একটা চাকরি করেন, আপনার উপরি আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই কিংবা আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারি প্রতিবছরের বাজেট আপনার জীবনীশক্তিকে খেয়ে দিচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে আপনি লাগাম পড়াতে না পেরে আপনার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন, প্রোটিন আর পুষ্টিকর খাদ্য বাদ দিয়ে আপনি ঝুঁকছেন গাদা গাদা কার্বহাইড্রেটের দিকে। অকালেই আপনি বুড়িয়ে যাচ্ছেন কিংবা রোগো শোকো পতিত হচ্ছেন। কিন্তু এর জন্য দায়ী কারা? শুধু ব্যবসায়ীরা?ব্যবসায়ীরাতো বটেই। তবে পুরোপুরি নয়। এদেশে ব্যবসার সঙ্গে নীতি-নৈতিকতার মেলবন্দন তেমন ঘটেনি। আগেও ছিলো না। বাইন্যা (স্বর্ণকার) নিজ মায়ের স্বর্ণ চুরি করত এধরণের কাহিনী, প্রবাদ আমাদের পুরনো সাহিত্যে আছে। সুতারাং তাদের কাছ থেকে আপনি সহজে নিস্তার পেয়ে যাবেন এমনটা আশা করা বাতুলতা মাত্র। এক্ষেত্রে সরকারের একটা ভূমিকা আছে। বাজার নজরদারী করে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বাজার নজরদারীতে সরকার কতটুকু দক্ষতার পরিচয় দিতে পেরেছে, সরকারের সক্ষমতা কতটুকু? সিন্ডকেটের বিরুদ্ধে সরকার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। মাঝে মধ্যেই মনে হয় সরকার দেশ চালায় না, দেশ চালায় বিভিন্ন সিন্ডিকেট। যিনি রানীতি করেন তিনিই আবার ব্যবসায়ী, তিনিই আবার ঠিকাদার। এ অবস্থায় কে কারে সামলাবে? এ যেনো সার্টের চেয়ে গেঞ্জি বড় অর্থাৎ সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট বড়। রাশান একটা জোক মনে পড়ে গেলো। সেকালে রাশান শাশুড়িদের খুব বদনাম ছিল। তাদের দাপটে বেচারি স্বামী সবসময় কেঁচু হয়ে থাকত। শুধু জামাই-ই (নিজের ও মেয়ের) না, জামাইকুলের চৌদ্দগুষ্টি ভয়ে ইচামাছ হয়ে থাকত। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলছে- ধর, তোর শ্বাশুড়ি এক গহীন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। এমনসময় একটা বাঘ হালুম করে তার সামনে এসে পড়লো। বলো তো বাঘটি তোর শ্বাশুড়িকে কী করবে?দ্বিতীয় বন্ধুর উত্তর- বাঘে আমার শ্বাশুড়িকে কী করবে? যা কিছু করার আমার শ্বাশুড়িই তো বাঘকে করবে। বেচারি বাঘ। দ্রব্যমূল্য বাড়বে, আপনার আমার কী করার আছে। সেই রাশান শ্বাশুড়ির মতো বাজেটই কিংবা ব্যবসায়ীরাই কি যা কিছু করার করবে?[লেখক: সাবেক অতিরিক্ত সচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়]

আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার

‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’— এই স্লোগান দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সব মানুষের স্বার্থকে সামনে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। দেশের স্বার্থই সর্বাগ্রে অগ্রগণ্য। জাতীয় নির্বাচনকালে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)-এর এই স্লোগান বিজয়ের নীরব হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। আদিবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষ এ স্লোগানে উজ্জীবিত হয়েছিল। বৃহত্তর রাজনৈতিক দলটির নির্বাচনী ইশতেহারও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিএনপি তাদের ইশতেহারে উল্লেখ করেছে, ‘এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা। বিএনপি প্রতিশোধ নয়, ন্যায় ও মানবিকতার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। ক্ষমতা নয়, জনগণের অধিকারই আমাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। লুটপাট নয়, উৎপাদন; ভয় নয়, অধিকার; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা— এই নীতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।’ জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে অন্যান্য নাগরিকদের মতো প্রান্তিক আদিবাসীরাও আশ্বস্ত হয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন, ভোট দিয়েছেন এবং ভোটের প্রতিফলনস্বরূপ বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরে নানা অজুহাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হামলা এবং উচ্ছেদের মতো পরিস্থিতির শিকার হয়ে আসছে। সহজ-সরল এই জনগোষ্ঠী দিন দিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে এবং বেঁচে থাকার আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। বারবার বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের ফলে ভাসমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান হারে গ্রাম থেকে শহরমুখী হওয়ার কারণে নিজেদের শেকড়, পরিচয় এবং ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে হস্তান্তরিত হচ্ছে না। ফলে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তার স্বাতন্ত্র্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য বিষয়গুলোতেও অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসীদের প্রতি ন্যায়সংগত আচরণের পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক মনোভাব দেখা যায়। এর ফলে তারা উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজেদের অবদান সীমিত করে ফেলতে বাধ্য হয়। দুর্বল, প্রান্তিক, অন্ত্যজ ও সংখ্যালঘু আদিবাসীদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, ন্যায্যতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ব্যাহত হলে বাংলাদেশ কখনোই প্রকৃত অর্থে ‘সবার বাংলাদেশ’ হয়ে উঠবে না। আদিবাসী নারীরা মাঠে-ময়দানে পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে থাকেন। নারী-পুরুষের এই অংশীদারিত্ব আদিবাসী সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, নির্যাতন, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আদিবাসী নারীরা রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। একসময় তারা মূলত সমাজের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকতেন। কয়েক দশক আগেও অধিকাংশ নারী ঘরকন্নার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু বর্তমানে নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে তারা প্রকাশ্যে প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছেন। এটি আদিবাসী সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, কোনো জনগোষ্ঠীর নারীরা যখন ধারাবাহিকভাবে লাঞ্ছনা, শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হন, তখন তা সেই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়ায়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আদিবাসীদের ওপর যে মাত্রায় সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, তা কোনো সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। বর্তমান সরকারের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির বিষয়ে আদিবাসীদের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েছে। এখন প্রয়োজন কথার সঙ্গে কাজের মিল। কারণ, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’— এই স্লোগানটি তাদেরও আশা ও প্রত্যাশার প্রতীক। বাংলাদেশে প্রায় শতাধিক জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। কারও মাতৃভাষা এখনও জীবিত রয়েছে, আবার কারও ভাষা বিলুপ্তির পথে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বাংলা ভাষাসহ প্রায় ৪১টি মাতৃভাষায় দেশের মানুষ যোগাযোগ করে থাকে। যেসব মাতৃভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কোল, কোডা, কড়া, ভুনজার, মুসহর, কোচ, রেমিংটচা, লালেং, শৌরা, কন্দ ও খাড়িয়াসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা উল্লেখযোগ্য। এসব জনগোষ্ঠী স্মরণাতীতকাল থেকে বাংলার ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে। দেশের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করতে আদিবাসীদের প্রতি সরকারের বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। সংখ্যালঘু আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব দায়সারাভাবে পালন করা চলবে না। কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নাগরিক অধিকার ও সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের আলোকে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর জন্য সরকারকে আরও যত্নশীল হতে হবে। বাংলাদেশ ও আদিবাসীদের সম্পর্ক মূলত এ দেশের বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিক সৌন্দর্যের প্রতীক। সমতল ও পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনধারার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। তারা বাংলাদেশের কোনো বিচ্ছিন্ন অংশ নন; বরং এ দেশের অমূল্য সম্পদ। মা, মাটি ও মাতৃভূমির জন্য আদিবাসীদের অবদান অবিস্মরণীয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধ— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার, ভূমির অধিকার এবং বিপন্ন মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণ করা রাষ্ট্র ও নাগরিক— উভয়েরই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। [লেখক: কলামিস্ট]

প্রবীণদের নিঃসঙ্গ মৃত্যু: সমাজের আয়নায় দেখা বাস্তবতা

একটি নগর ফ্ল্যাটে কয়েক দিন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। প্রতিবেশীদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যে দৃশ্য দেখল, তা কেবল একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের জন্য লজ্জার। ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ পড়ে আছে ঘরের এক কোণে—নিঃসঙ্গ, পরিত্যক্ত ও অনাদরে। একই ছাদের নিচে থেকেও তার মৃত্যু এক-দুই দিন কারও নজরে পড়েনি। এই একটি ঘটনাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে—আমরা আসলে কেমন সমাজে বাস করছি?একটি সমাজ কতটা মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও সভ্য সেটা কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো বা উন্নয়নের সূচক দিয়ে বিচার করা যায় না। বরং সেই সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের—বিশেষত প্রবীণ ও শিশুদের—কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা দিতে পারে, সেটিই তার প্রকৃত মানবিকতার মাপকাঠি। এই পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ হচ্ছি, তা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বাংলাদেশ দ্রুত বার্ধক্যমুখী সমাজে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী দেশে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-দশমাংশ প্রবীণ, এবং আগামী দুই দশকে এই হার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রবীণদের সুরক্ষা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের প্রশ্নটি আর কেবল পারিবারিক বিষয় নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জননীতি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ একসময় পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। যৌথতা, সহমর্মিতা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ছিল এর প্রধান শক্তি। যৌথ পরিবার কেবল সহাবস্থানের একটি কাঠামো ছিল না; এটি ছিল অনুভূতি, দায়িত্ব ও আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। প্রবীণরা ছিলেন সেই কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা শুধু পরিবারের সদস্য ছিলেন না; ছিলেন অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, মূল্যবোধের ধারক এবং পরিবারের আবেগিক কেন্দ্রবিন্দু। তাদের উপস্থিতি পরিবারকে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি ধারাবাহিক সংযোগ প্রদান করতো। কিন্তু সময় বদলেছে। দ্রুত নগরায়ন, জীবিকার প্রয়োজনে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্েযর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব সেই পারিবারিক কাঠামোকে গভীরভাবে পরিবর্তন করেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবারে রূপান্তরিত হয়েছে; কমেছে পারস্পরিক নির্ভরতা ও দায়বোধ। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে প্রবীণদের। যারা একসময় পরিবারের কেন্দ্র ছিলেন, তারা আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রান্তিক, উপেক্ষিত, এমনকি অপ্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই রূপান্তরের একটি নির্মম প্রতীক। আরও বেদনাদায়ক হলো, ওই নারীর সন্তানরা সমাজের তথাকথিত সফল মানুষ— কেউ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তবুও জীবনের শেষ সময় তাকে এমন নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এটি কেবল একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সময়ের নৈতিক সংকটের প্রতিফলন। এই ঘটনা একটি প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা প্রায়ই মনে করি, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা বার্ধক্যে পিতা-মাতার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। বাস্তবতা বলছে, তা সবসময় সত্য নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষকে দক্ষ করে, প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে এবং পেশাগত সাফল্য এনে দিতে পারে; কিন্তু সেই শিক্ষা যদি সহমর্মিতা, নৈতিকতা ও মানবিক দায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে তা অসম্পূর্ণ মানুষ তৈরি করে। তখন আমরা সফল হই, কিন্তু সংবেদনশীল হই না; প্রতিষ্ঠিত হই, কিন্তু দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলি। এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো সামাজিক পুঁজির ক্ষয়। সমাজবিজ্ঞানীরা পারস্পরিক আস্থা, সম্পর্ক ও সহযোগিতার নেটওয়ার্ককে সামাজিক পুঁজি বলে অভিহিত করেন। শহুরে জীবনে এই সামাজিক পুঁজি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। পাশের ফ্ল্যাটে কে আছে, কেমন আছে, কোনো সমস্যায় আছে কি না—এসব জানার প্রয়োজনীয়তাও আমরা অনেক সময় অনুভব করি না। ফলে একজন মানুষ দিনের পর দিন নিঃসঙ্গ থাকলেও তা অদৃশ্য থেকে যায়। এমনকি মৃত্যুর পর দুর্গন্ধ ছড়ানো পর্যন্ত সমাজ তা জানতে পারে না। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক অসুখের লক্ষণ। বাংলাদেশে প্রবীণদের সুরক্ষার জন্য ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ রয়েছে। আইনটি সন্তানদের ওপর পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, যোগাযোগ এবং যত্নের দায়িত্ব আরোপ করেছে। কাগজে-কলমে এটি একটি প্রগতিশীল উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে এর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। প্রথমত, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগ ছাড়া আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় না। দ্বিতীয়ত, সামাজিক বাস্তবতায় প্রবীণরা নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে অনিচ্ছুক। তৃতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অনেকের জন্য এই পথকে প্রায় অকার্যকর করে তোলে। চতুর্থত, অবহেলাজনিত মৃত্যুর মতো বিষয় প্রমাণ করাও সহজ নয়। ফলে বহু ঘটনা নীরবে চাপা পড়ে যায়। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—শুধু একটি ভালো আইন কি যথেষ্ট? অভিজ্ঞতা বলছে, নয়। আইন প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কার্যকর প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। আইনের সঙ্গে যদি সহজ প্রতিকারব্যবস্থা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা যুক্ত না হয়, তবে আইন অনেক সময় কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। তাই সমস্যার সমাধান কেবল আইন কঠোর করা নয়; বরং আইনকে কার্যকর করার পাশাপাশি একটি সমšি^ত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তৃতীয় পক্ষের অভিযোগের সুযোগ সৃষ্টি, ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে প্রবীণদের জন্য আরও কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি নিশ্চিত করতে হবে। তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আইন বা প্রশাসনের নয়; এটি মূল্যবোধের প্রশ্ন। পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই মানুষ হয়ে ওঠার বীজ রোপিত হয়। যদি একটি প্রজন্ম এই শিক্ষা না পায় যে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন কোনো দয়া নয়, কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং স্বাভাবিক মানবিক কর্তব্য—তবে আইনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের ঘটনা আমাদের জন্য কেবল সংবাদ নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। আমরা যদি এখনই পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তিকে পুনর্গঠন করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে প্রবীণদের নিঃসঙ্গতা ও অবহেলা আরও গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। প্রবীণদের প্রতি আমাদের আচরণই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্ম কী শিখবে। আজ আমরা যদি আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের একা ফেলে যাই, কাল সেই একাকীত্বই আমাদের প্রতীক্ষা করবে। তাই এই সংকট কেবল অন্য কারও নয়; এটি আমাদের সবার ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যদি সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নেয়, আইনকে কার্যকর করে, সামাজিক সচেতনতা বাড়ায় এবং মানবিক মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে, তবে এই অমানবিকতা রোধ করা সম্ভব। অন্যথায় নিঃসঙ্গতা ও অবহেলায় ভরা বার্ধক্য আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হবে, যা কোনো উন্নয়নের সূচক দিয়ে আড়াল করা যাবে না। সময়ের আগে যদি আমরা সতর্ক না হই, তবে একদিন হয়তো আমাদের শহরগুলো নীরব, বন্ধ দরজা আর নিঃসঙ্গ মৃত্যুর খবরেই ভরে যাবে। উন্নয়নের আলো তখনও জ্বলবে, কিন্তু তার ছায়ায় লুকিয়ে থাকবে মানবিকতার গভীর অন্ধকার। [লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক ]

রাত্রির অদৃশ্য আদালত ও এক ক্লান্ত আত্মার জবানবন্দি

সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য অনেক আশ্চর্য জিনিস সৃষ্টি করেছেন— আকাশ, সমুদ্র, প্রেম, স্মৃতি, বিস্মৃতি এবং অবশ্যই ঘুম। তবে মানুষের দুর্ভাগ্য হলো, সে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনে করে, সেটাই সবচেয়ে বেশি হারিয়ে ফেলে। যেমন সুখের দিনে ঘুম আসে, আর দুঃসময়ে আসে দর্শন। যে রাতে মানুষের গভীর নিদ্রায় থাকার কথা, সেই রাতেই হঠাৎ সে হয়ে ওঠে সক্রেটিস, নীৎশে কিংবা নাম না-জানা কোনো গৃহপালিত দার্শনিক। রাতেরও একটি আলাদা রাষ্ট্র আছে। দিনের পৃথিবীতে তার কোনো মন্ত্রণালয় নেই, কোনো সংসদ নেই, কোনো প্রশাসনিক কাঠামোও নেই। কিন্তু গভীর নিশীথে সে নিঃশব্দে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তখন পৃথিবীর সকল কোলাহল পদত্যাগ করে, যুক্তি অবসরে যায়, আর মানুষের কল্পনা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে। সেই রাষ্ট্রে আইন খুবই অদ্ভুত। সেখানে একটি সন্দেহ হাজারটি সত্যের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, একটি অপবাদ হাজারটি অর্জনের চেয়ে বেশি দীর্ঘজীবী, আর একটি ভুল বোঝাবুঝি কখনো কখনো পুরো জীবনকেই জিম্মি করে রাখতে পারে। আমি আজকাল প্রায়ই সেই রাষ্ট্রের একজন অনিচ্ছুক নাগরিক হয়ে যাই। চোখ বন্ধ করি ঘুমের আশায়, কিন্তু ঘুম যেন আধুনিক আমলার মতো—অত্যন্ত প্রয়োজনের সময় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং চোখ বন্ধ করলেই খুলে যায় এক অদৃশ্য আদালত। সেখানে বিচার চলছে, অভিযোগপত্র পড়া হচ্ছে, সাক্ষী হাজির হচ্ছে, রায় লেখা হচ্ছে। শুধু মজার বিষয় হলো—আমি ছাড়া আর কেউ বাস্তবে উপস্থিত নেই। বিচারক আমার কল্পনা, উকিল আমার ভয়, সাক্ষী আমার স্মৃতি এবং অভিযুক্তও আমি নিজেই। এই আদালতে সত্যের অবস্থা অনেকটা সেই ভদ্র মানুষের মতো, যে সভায় উপস্থিত থাকলেও কথা বলার সুযোগ পায় না। অন্যদিকে মিথ্যা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। সে বুক ফুলিয়ে হাঁটে, গলা খাঁকারি দিয়ে বক্তব্য দেয় এবং এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করে যেন মহাবিশ্বের যাবতীয় সত্যের একমাত্র লাইসেন্স তার কাছেই সংরক্ষিত। রাত্রির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আদালতের কার্যক্রমও জমে ওঠে। মনে হয়, অসংখ্য অদৃশ্য মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে। কেউ অভিযোগ করছে, কেউ ব্যাখ্যা চাইছে, কেউ আবার এমন সব অপরাধের দায় চাপাচ্ছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমিই অবগত নই। আমি দৌড়াতে থাকি। আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ বাস্তব শত্রুর চেয়ে কল্পিত শত্রুর কাছ থেকেই বেশি পালায়। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। বাইরে পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, অথচ ভেতরে যেন মহাযুদ্ধ চলছে। জানালার ওপারে নীরবতা, কিন্তু মনের ভেতর অবিরাম শোরগোল। তখন উপলব্ধি হয়—মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কখনো অন্য মানুষের সঙ্গে নয়; নিজের ভেতরের অদৃশ্য প্রতিপক্ষের সঙ্গেই। বর্তমান সময়ে এই অভিজ্ঞতা আরও তীব্র। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সত্য ধীরে হাঁটে আর গুজব আলোর গতিতে ছুটে চলে। সামাজিক যোগাযোগের বিস্তৃত জগতে একটি মিথ্যা মুহূর্তেই হাজার মানুষের দরজায় পৌঁছে যায়, অথচ সত্য তখনও জুতোর ফিতা বাঁধতে ব্যস্ত থাকে। ফলে অপবাদ এখন আর কেবল শব্দ নয়; এটি এক সামাজিক প্রযুক্তি, এক মানসিক অস্ত্র, যা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে। কিন্তু দার্শনিক সত্যটি হলো—মানুষকে যতটা না অন্যেরা বিচার করে, তার চেয়ে অনেক বেশি বিচার করে সে নিজেই। অন্যের অভিযোগ কয়েকদিন স্থায়ী হতে পারে, কিন্তু নিজের মনে গড়ে ওঠা আদালত বছরের পর বছর চলতে পারে। সেই আদালতে আপিলের সুযোগ নেই, জামিনের ব্যবস্থাও নেই। এই অবস্থায় ঘুম আর কেবল শারীরিক প্রয়োজন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক গভীর অস্তিত্ববাদী মুক্তি। তখন নিদ্রা মানে শরীরের বিশ্রাম নয়, বরং চিন্তার অবসান। এমন একটি আশ্রয়, যেখানে কোনো ব্যাখ্যা দিতে হয় না, কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হয় না, কোনো অভিযোগের জবাব লিখতে হয় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটি বিষয় বুঝতে শেখে—পৃথিবীর সব মানুষের কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। কেউ আপনাকে ভুল বুঝবেই, কেউ আপনাকে অপছন্দ করবেই, কেউ আপনার নীরবতার মধ্যেও ষড়যন্ত্র আবিষ্কার করবেই। এ যেন মানবসভ্যতার এক প্রাচীন বিনোদন। তাই হয়তো প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো প্রতিটি যুদ্ধে অংশ না নেয়া। প্রতিটি পাথরের জবাবে আরেকটি পাথর ছুড়ে না মারা। কারণ সব যুদ্ধ জয় করা যায় না, আবার সব যুদ্ধ জয় করাও প্রয়োজন হয় না। রাত যত গভীর হয়, এই উপলব্ধিও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয়, শান্তি আসলে কোনো বাহ্যিক অর্জন নয়। শান্তি হলো নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেয়ার শিল্প, নিজের সত্যকে ধারণ করার সাহস এবং পৃথিবীর সমস্ত ভুল ব্যাখ্যার মধ্যেও নিজের ভেতরের আলোটুকু অক্ষুণ্নœ রাখার ক্ষমতা। ধীরে ধীরে রাত ফুরোয়। অদৃশ্য আদালতের বিচারক ক্লান্ত হন, অভিযোগকারীরা নীরব হয়ে যায়, ছায়াগুলোও সরে দাঁড়ায়। তখন মনে হয়, নিদ্রা আসলে ঘুমের অন্য নাম নয়; সে এক প্রকার ক্ষমা। নিজের প্রতি ক্ষমা, মানুষের প্রতি ক্ষমা, সময়ের প্রতি ক্ষমা। আর সেই ক্ষমার ভেতরেই মানুষ খুঁজে পায় তার সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়। একটি এমন ঘুম, যেখানে কোনো অপবাদ নেই, কোনো তাড়া নেই, কোনো অদৃশ্য বিচারসভা নেই। আছে শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার গভীরে, সমস্ত ক্লান্তি অতিক্রম করে, মানুষ আবার নতুন ভোরের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা এখানেই—সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়, বরং কিছু প্রশ্নকে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে যেতে দেয়ার মধ্যে। [লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]

যোগাযোগ অবকাঠামোর নতুন ভূ-রাজনীতি

সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে একটি চিরন্তন সত্য আছে: যে পথ নিয়ন্ত্রণ করে, সে-ই শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। রোমান সাম্রাজ্য তার সড়কপথের মাধ্যমে ক্ষমতা বিস্তার করেছিল। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সমুদ্রপথ ও সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। জিব্রাল্টার, সুয়েজ কিংবা সিঙ্গাপুর কেবল মানচিত্রের কিছু বিন্দু ছিল না; এগুলো ছিল বৈশ্বিক শক্তির নিয়ন্ত্রক। একবিংশ শতাব্দীতে সেই বাস্তবতা বদলেছে, কিন্তু মূল নীতিটি বদলায়নি। যুদ্ধজাহাজের জায়গা নিয়েছে সাবমেরিন কেবল, সামরিক ঘাঁটির জায়গা নিয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর, আর সাম্রাজ্যের নতুন সীমানা তৈরি হচ্ছে ডেটা করিডোর ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। আজকের পৃথিবীতে যোগাযোগ ও সংযোগ অবকাঠামো কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবকাঠামো নয়; এটি ক্রমশ এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই বাস্তবতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির প্রবাহ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই চলাচল করে। ফলে এখানে প্রতিযোগিতা আর কেবল ভূখণ্ড নিয়ে নয়; বরং অবকাঠামো, তথ্যপ্রবাহ এবং সংযোগ ব্যবস্থার নেটওয়ার্ক নিয়ে। বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা বিমানবাহী রণতরীর কথা প্রায়ই আসে। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবেন যে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো আসলে সমুদ্রের হাজার মিটার নিচে শুয়ে আছে। বর্তমানে পৃথিবীর আন্তর্জাতিক ডেটা আদান-প্রদানের প্রায় ৯৫ শতাংশই এই সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। প্রতিদিন ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন, কূটনৈতিক বার্তা, সামরিক যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট সেবা এই ক্যাবলগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আমরা যখন মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পাঠাই বা অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর করি, তখন সেই তথ্যের বড় অংশই সমুদ্রতলের এই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক দিয়ে ভ্রমণ করে। এই কারণেই সাবমেরিন ক্যাবলগুলো এখন কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর একাধিক ঘটনা এই ঝুঁকিকে সামনে এনেছে। গত ২০২২ সালে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে উত্তর ইউরোপে যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে। ২০২৪ সালে লোহিত সাগরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ইন্টারনেট প্রবাহে উল্লেখযোগ্য সমস্যা দেখা দেয়। এসব ঘটনা দেখিয়েছে যে আধুনিক বিশ্ব কতটা ভঙ্গুর এক অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে রাষ্ট্র এই সংযোগ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত থাকে, সে কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধাই পায় না; বরং কৌশলগত সুবিধাও অর্জন করে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এই ক্ষেত্রটিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রাষ্ট্র-সমর্থিত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে বেইজিং শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করছে না; বরং ভবিষ্যতের তথ্যপ্রবাহের মানচিত্র গঠনেও ভূমিকা রাখছে। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে বন্দর ছিল শক্তির প্রতীক। ভেনিসের উত্থান, ব্রিটেনের সামুদ্রিক আধিপত্য কিংবা আমেরিকার বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রভাব—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল সমুদ্রপথ। আজও সেই বাস্তবতা অপরিবর্তিত। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে সাধারণত উন্নয়ন ও অবকাঠামো কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও গভীর। হাম্বানটোটা, গোয়াদর, জিবুতি কিংবা পিরিয়াস—এসব বন্দর কেবল বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়; এগুলো একটি বিস্তৃত কৌশলগত নেটওয়ার্কের অংশ। সমালোচকেরা একে কখনো কখনো ‘ঋণ কূটনীতি’ বলে অভিহিত করেন। যদিও বিষয়টি বাস্তবে আরও জটিল। অনেক উন্নয়নশীল দেশ উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন চেয়েছে, আর চীন সেই সুযোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এর ফলে যে নির্ভরশীলতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের ঘটনা এই বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ঋণ পরিশোধে সমস্যার কারণে দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বন্দরের পরিচালনা চীনা প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠে—অবকাঠামো বিনিয়োগ কোথায় শেষ হয় এবং কৌশলগত প্রভাব কোথায় শুরু হয়?ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মালাক্কা প্রণালী এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের প্রায় ৪০% সামুদ্রিক বাণিজ্য এই সংকীর্ণ জলপথ অতিক্রম করে। চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই বেইজিং বিকল্প বন্দর, স্থলপথ এবং নতুন করিডোর তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে ভারতও নিজস্ব কৌশলগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ইরানের চাবাহার বন্দর, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে সামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো উন্নয়ন, মালদ্বীপ ও ওমানে অংশীদারিত্ব—সবই একই উদ্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। এটি মূলত যোগাযোগ পথগুলোর ওপর প্রভাব বজায় রাখার প্রতিযোগিতা। এক সময় ভৌগলিক সীমানা ছিল রাষ্ট্রশক্তির প্রধান পরিমাপক। পরে শিল্পায়ন ও অর্থনীতি সেই ধারণাকে বিস্তৃত করে। এখন ডিজিটাল অবকাঠামো সার্বভৌমত্বের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্লাউড সার্ভার, ফাইভ জি নেটওয়ার্ক এবং ডেটা সেন্টারগুলো আধুনিক রাষ্ট্রের স্নায়ুতন্ত্রের মতো কাজ করে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বিমান চলাচল, জাহাজ পরিচালনা, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, এমনকি বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত অসংখ্য কার্যক্রম এগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ এই বাস্তবতাকে নাটকীয়ভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এর মাধ্যমে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়—ডিজিটাল অবকাঠামো এখন আর কেবল বাণিজ্যিক সম্পদ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। চীন তাই নিজস্ব বৃহৎ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও বিকল্প অবকাঠামো জোট গড়ার চেষ্টা করছে। উভয় পক্ষই বুঝেছে যে ভবিষ্যতের শক্তি কেবল স্থল, নৌ ও আকাশে নয়; বরং মহাকাশ এবং সাইবার জগতেও নির্ধারিত হবে। ডেটা আজকের যুগের নতুন খনিজ তেল—এই কথাটি প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডেটার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অবকাঠামো, যার মাধ্যমে ডেটা প্রবাহিত হয়। কারণ তথ্যের পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তথ্যকেও প্রভাবিত করা যায়। অনেকেই মনে করেন ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন কিংবা হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ। বাস্তবে এসব প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আরও গভীরে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চলছে— সংযোগব্যবস্থা ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। কার তত্ত্বাবধানে বন্দর থাকবে, ক্যাবল থাকবে, স্যাটেলাইট থাকবে এবং ডেটা সেন্টার থাকবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আগামী দশকের ভূ-রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণ করবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল সেই প্রতিযোগিতার প্রধান মঞ্চ। এখানকার সমুদ্রপথ, বন্দর, ক্যাবল এবং ডিজিটাল করিডোর শুধু বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি। সবচেয়ে বড় ভুল হবে অবকাঠামোকে নিরপেক্ষ বলে ধরে নেওয়া। ইতিহাস দেখায়, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একসময় রাজনৈতিক ও কৌশলগত অর্থ অর্জন করে। নির্ভরশীলতার জন্য নির্মিত সংযোগব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত তা আর থাকে না; বরং নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই কারণেই সার্বভৌমত্বের ধারণা বদলে যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এখন শুধু তার মানচিত্রে আঁকা সীমান্ত দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং নির্ধারিত হয় সে কতটা স্বাধীনভাবে তার বাণিজ্য, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার মাধ্যমে। যে রাষ্ট্রগুলো এই বাস্তবতা দ্রুত উপলব্ধি করবে, তারাই ভবিষ্যতের নিয়ম নির্ধারণ করবে। আর যারা করবে না, তারা হয়তো একদিন আবিষ্কার করবে যে তাদের ভূখণ্ড অক্ষত আছে, পতাকা উড়ছে, কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনেক আগেই অন্য কারও নির্মিত নেটওয়ার্কের মধ্যে বন্দী হয়ে গেছে। [লেখক: প্রাবন্ধিক]

বাজেট ও জনআকাঙ্ক্ষা

আসন্ন বাজেটে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে এবং ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করার কথা বিবেচনা করছে। বয়স্ক, বিধবা, নির্যাতিত স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা সহ বিভিন্ন ধরনের ভাতা বাড়ানোর বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। পূর্বে ৬ মিলিয়ন প্রবীণ নাগরিক মাসে ৬শ’ টাকা করে ভাতা পান, এবং ২.৭৭৫ মিলিয়ন বিধবা ও নির্যাতিত নারী ৫৫০ টাকা পান। প্রায় ৩.২৩৪ মিলিয়ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মাসে ৮৫০ টাকা ভাতা পান। পূর্ববর্তী সরকার হিজড়া (তৃতীয় লিঙ্গ), বেদে (নদী যাযাবর), চা শ্রমিক এবং অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভাতা প্রদান করেছিল— এগুলোও বিবেচনায় নেয়া হতে পারে। এছাড়াও অতি দরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভিজিডি কর্মসূচি এবং জাতীয় সেবা কর্মসূচির বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জমা দেয়া প্রস্তাবের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে ভুল তথ্য ও পরিসংখ্যানগত অসামঞ্জস্যের কারণে অনেক সময় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না এবং নির্ধারিত লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হয়। পণ্যের মূল্য, জাতীয় বাজেট এবং জীবনযাত্রার মান গভীরভাবে পরস্পর সম্পর্কিত। একটি পরিবারের ˆদনন্দিন জীবন পরিচালনার সক্ষমতা তার আয়, মৌলিক চাহিদা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর নির্ভর করে। যখন দাম সহনীয় থাকে, জীবন পরিচালনা সহজ হয়। কিন্তু যখন খরচ মানুষের আর্থিক সক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন দরিদ্র ও অতি দরিদ্র পরিবারগুলো ক্ষুধা, অস্থিরতা ও সংকটে পড়ে। নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনকে ব্যাহত করে, যা প্রায়ই মজুদদার ও মুনাফালোভীদের দ্বারা আরও খারাপ হয়, যারা লাভের জন্য বাজার অস্থিতিশীল করে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন যা কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণকে বাস্তবসম্মত বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করে। এই সমš^য় ছাড়া সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতি ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আসন্ন বাজেট বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করে তুলেছে। জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র সামাজিক ব্যবসার সহায়তা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নতুবা জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়বে এবং টিকে থাকা কঠিন হবে। বাজেট, এর কাঠামো ও প্রণয়ন যাই হোক না কেন, জনকল্যাণকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত। যেসব প্রকল্প অধিকাংশ মানুষের উপকারে আসে না, সেগুলোর ব্যয় এড়ানো উচিত। শুধুমাত্র জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হবে। এছাড়াও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সর্বোপরি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কর্তৃপক্ষ যদি বাজার সঠিকভাবে পরিচালনা করে, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফালোভী মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তাদের উৎসাহ নিরুৎসাহিত করা উচিত। দাম বেড়ে গেলে ভোক্তাদেরও খরচ কমাতে হবে। উৎপাদন, আমদানি এবং সরবরাহে সমš^য় নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যবৃদ্ধি নতুন কিছু নয়, তবে এর প্রভাব জনজীবনে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। অসাধু ব্যবসায়ী, কালোবাজারি এবং মুনাফালোভীরা এর জন্য দায়ী। তাই সরকারকে সারাবছর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। বাজারে সতর্কতা এবং জনসচেতনতা থাকতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট চালু রাখতে হবে। এখনও অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতি অপব্যবহার ও অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়েছে। রাজনীতিবিদরা প্রায়ই জনগণের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেন। তারা প্রায়ই ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ভয় দেখান। এই দেশে প্রয়োজনীয় পণ্যের ওপরও রাজনীতি করা হয়। বাংলাদেশকে কেন শুধু একটি দেশ যেমন ভারত থেকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হবে? অন্য দেশও আছে। কেন সেখান থেকে কেনা যাবে না? এটি একটি সরকারি মনিটরিং সেল এবং মোবাইল প্রশাসনিক বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। একটি জাতীয় বাজেটের মধ্যে একটি দর্শন থাকে এবং বাংলাদেশে আয়, সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্যের প্রেক্ষাপট থাকে। বাজেটকে একটি কৌশলগত ‘বৃদ্ধিসহ সমতা’ (নীতির মাধ্যমে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের পর থেকে একটি শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামোর প্রয়োজন আগের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে। উচ্চ রাজস্ব আহরণ এবং যুক্তিসঙ্গত উচ্চ ব্যয় এমন লক্ষ্য যা একটি দুর্বল ব্যবস্থার মধ্যে অর্জন করা কঠিন, যা এসব বাস্তবায়ন ও বাধা মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়। পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার জন্য বাজেট প্রণয়নের সময় নীতিনির্ধারকদের কর ব্যবস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার উপেক্ষা করা উচিত নয়। মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হতে হবে। ব্যয় দিক থেকে, সরকারি ব্যয়ের বৃদ্ধি অবশ্যই মুদ্রাস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নিতে হবে। তাই বাজেট ঘাটতি পূর্ববর্তী বাজেটের তুলনায় কিছুটা কম রাখতে হবে, যা এউচ-এর ৬.২ শতাংশ নির্ধারিত ছিল। যখনই বাজেট নিয়ে আলোচনা হয়, প্রথম বিষয়টি যা সবার মনে আসে তা হলো কর। বাজেট হলো বিভিন্ন উপায়ে সম্পদ আহরণের বিষয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের আয়ের ওপর কর। এই সম্পদ পরে মূলত উন্নয়ন, নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা প্রদান এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জন্য ব্যবহৃত হয়। সরকার সাধারণত নাগরিকদের কাছ থেকেই সম্পদ সংগ্রহ করে— তা কর, ব্যাংক ঋণ বা জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে হয়ে থাকে। কখনও কখনও তারা বিদেশ থেকেও সহায়তা পায়। তারা আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও ঋণ গ্রহণ করে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে করের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এর কার্যকর সংগ্রহ ও ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা পুনরায় উল্লেখ করছি যে পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমরা আবারও ˆনতিক মূল্যবোধ যেকোনো মূল্যে বজায় রাখার অঙ্গীকার করছি। হিসাববিজ্ঞান একটি দেশের আর্থিক কার্যক্রমের স্পষ্ট চিত্র প্রদান করে এবং কর্পোরেট সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। হিসাববিজ্ঞান ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, সিকিউরিটি, ডিলার এবং অন্যান্যদের জন্য অপরিহার্য যারা এগুলোর প্রয়োজন অনুভব করে। দেশের বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হিসাবরক্ষকদের দায়িত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশের আর্থিক খাতে ওঈঅই-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যথার্থভাবেই, এই প্রতিষ্ঠানটি সচেতনতা সৃষ্টি, ধারণা ও চিন্তা উৎপাদন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে, শুধু নিজেদের ক্ষেত্রেই নয় বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। আমরা বিশ্বাস করি আমরা সংশ্লিষ্ট সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। বাজেট মূলত বার্ষিক আয় ও ব্যয়ের একটি বিবৃতি ছাড়া কিছুই নয়। বাজেট প্রণয়ন তেমন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু এর বাস্তবায়ন একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। প্রতি বছর আমরা বাজেট নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য দেখতে পাই। যেমন: বাজেট কি গরিবদের জন্য, বাজেট কি ধনীদের জন্য এবং বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো কী? বাজেট কীভাবে শ্রেণীবিন্যাস করা হবে ইত্যাদি। এসব সমালোচনা ও আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত একটি আদর্শ বাজেট রাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপিত হয় যার মাধ্যমে সব রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে বাজেট দেশের সব মানুষের কথা বলে। বিশেষ করে বাজেটকে দারিদ্র্য বিমোচনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরের বাজেটগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে। সর্বোপরি বাজেটকে স্বচ্ছ, ভালোভাবে তদারকি ও পর্যবেক্ষণযোগ্য করতে হবে। এবারের বাজেটে উল্লেখযোগ্য দিক বাজেটের আর্থিক সংস্থানের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক খাত থেকে আনা হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাংক গুলির সক্ষমতা কতটুকু তা আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। বিগত সরকারের আমলে অধিকাংশ ব্যাংক বেসামাল অবস্থায় পড়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। ব্যাংকের শৃঙ্খলা না ফেরাতে পারলে ব্যাংক উপর্যপুরি চাপের মুখোমুখি হবে। এছাড়া ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ব মন্দা অর্থনীতির প্রভাব বাংলাদেশের উপর পতিত হবে। এমনকি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আমাদের অর্থব্যবস্থা প্রভাবিত করতে পারে। যা প্রকারান্তরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রাপ্তি আমাদের উন্নয়ন বাজেটে ইতিবাচকতা বা নেতিবাচকতার টানাপোড়েন সৃষ্টি হতে পারে। বাজেট এবং বাজার পরিস্থিতির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ছাড়া সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আশা করা যায় নতুন বাজেট মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। ২০২৬-২৭ বাজেট কি মুদ্রাস্ফীতির কারণে জনগণের ভোগান্তি কমাবে নাকি বাড়াবে? মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থে কতটা গুরুত্ব দেয়া হবে? বাজেটে দারিদ্র্য বিমোচন নাকি অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে? কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে কী গুরুত্ব দেয়া হবে? এসব প্রশ্ন প্রতি বছর মানুষ করে থাকে। সামগ্রিকভাবে বাজেটকে জনমুখী হওয়া উচিত। তাই বাজেট প্রণয়নের চেয়ে এর বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আসুন, জাতীয় উন্নয়নের চেতনা নিয়ে বাজেট বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে চলি। জনগণ আশা করছে, ২০২৬-২৭ বাজেট দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুদ্র ব্যবসা সম্প্রসারণ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান-বান্ধব পরিবেশ গঠনের প্রতিশ্রুতি পূরণ, জন আকাঙ্খা ও চাহিদার প্রতিফলন ঘটাবে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

“ক্ষমতার ‘ক্রিম’ খেয়ে এখন লোটাসে ঝোঁক? তৃণমূলে দলত্যাগের ঝড়”

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একের পর এক ভূমিকম্পের পর এবার তার অভিঘাত সরাসরি আছড়ে পড়ল দিল্লির সংসদে। বিধানসভায় ভাঙনের পর এবার তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদরাও কার্যত বিদ্রোহের পথেই হাঁটলেন—যা শুধু একটি দলীয় সংকট নয়, বরং এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।সোমবার, লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা-র কাছে তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন লিখিতভাবে নিজেদের অবস্থান জানালেন। নেতৃত্বে ছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। শুধু তাই নয়, তাঁরা সংসদে আলাদা ব্লকের দাবিও জানিয়েছেন এবং সূত্রের খবর—এনডিএ-কে সমর্থনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক মহলে চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তার আগে মতিলাল নেহরু মার্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব-এর বাসভবনে বিদ্রোহী সাংসদদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক আরও জল্পনা উস্কে দেয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শতাব্দী রায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত মাল, সুখেন্দু শেখর রায়-সহ একাধিক সাংসদ। এমনকি রাজনৈতিক মহলের দাবি—এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী-ও।সংখ্যার অঙ্কই এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। দলত্যাগ বিরোধী আইনের চোখে বাঁচতে গেলে প্রয়োজন দলের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন—এবং বিদ্রোহীদের হাতে এখন সেই সংখ্যাই রয়েছে। ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন সাংসদ বিদ্রোহী শিবিরে—অর্থাৎ আইনি জটিলতা এড়ানোর পথ প্রায় পরিষ্কার।অন্যদিকে, এই পুরো পরিস্থিতিতে কার্যত কোণঠাসা তৃণমূল নেতৃত্ব। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে উপস্থিত থাকলেও এই ভাঙন রোখা যায়নি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটা শুধু সাংসদদের বিদ্রোহ নয়—এটা নেতৃত্বের উপর আস্থাহীনতার সরাসরি প্রতিফলন।একই চিত্র দেখা গিয়েছে রাজ্যেও। ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন ইতিমধ্যেই বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। অর্থাৎ, বিধানসভা হোক বা লোকসভা—তৃণমূলের ভিত কার্যত ভেঙে পড়ছে দুই দিক থেকেই।এখানেই প্রশ্ন উঠছে—এটা কি আদর্শগত লড়াই, নাকি নিছক ক্ষমতার রাজনীতি?সমালোচকদের দাবি, এতদিন তৃণমূলের ‘ক্রিম’ খেয়ে, ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করে, এখন পরিস্থিতি বদলাতেই অনেকেই নতুন করে ‘লোটাস’-এর দিকে ঝুঁকছেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক আদর্শ নয়—লোভ, সুযোগ আর ভবিষ্যতের নিরাপত্তাই এই দলত্যাগের মূল কারণ।এই প্রবণতা শুধু তৃণমূলের ক্ষতি করছে না—গণতন্ত্রের জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা। কারণ, ভোটাররা যাদের নির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে নির্বাচিত করেছিলেন, তাঁদের একাংশ আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন—যা জনমতের প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।এদিকে কলকাতাতেও চমক অব্যাহত। মেয়র পদ থেকে ফিরহাদ হাকিম-এর পদত্যাগ এবং তাঁর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক—এই জল্পনাকে আরও জোরদার করেছে যে, তৃণমূলের ভাঙন এখন সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।সব মিলিয়ে, বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে—যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস আর আগের জায়গায় নেই। প্রশ্ন একটাই—এই ভাঙনের শেষ কোথায়? এবং সবচেয়ে বড় কথা—জনতা কি এই ‘দলবদল রাজনীতি’কে মেনে নেবে?সময়ই তার উত্তর দেবে।

দুই রাষ্ট্রের মাঝে নীরব প্রশ্নচিহ্ন

সীমান্তের শূন্যরেখায় বসে আছেন ১১ জন মানুষ। একজন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, চারটি শিশু, একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তিন দিনের বেশি সময় ধরে তারা না পারছেন বাংলাদেশে ঢুকতে, না পারছেন ভারতে ফিরতে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে রোদ, বৃষ্টি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের দিন কাটছে। বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে এই দৃশ্য যেন মানবতার জন্য এক নীরব প্রশ্নচিহ্ন।এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় সাহিত্যের কালজয়ী চরিত্র ‘টোবা টেক সিংহ’কে। যে ব্যক্তি ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের সময় রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছিল। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সাদাত হাসান মাণ্টোর ‘টোবা টেক সিংহ’ গল্পের সেই নায়ক বারবার প্রশ্ন করত, “পাকিস্তান কুন জায়গা হ্যায়?” বিভক্তির বিভীষিকায় মাঝখানে পড়ে লোকটি কখনো নিজের পরিচয় খুঁজে পায়নি। ঠিক একই ট্র্যাজেডি ঘটছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। তবে এটা শুধু সাহিত্যের গল্প নয়,  শতভাগ বাস্তবতা। গত কয়েক মাসে হাজার দেড়েক বাংলাভাষীকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে ভারতে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তবে তারা আটক পড়েছেন ‘অবৈধ ঢোকার’ অভিযোগে।  গেল ২০২৫ সালের জুনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বিবিসহ তার ছেলেকে দিল্লিতে আটক করেছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। পরে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে সোনালী বিবি ও তার শিশুসন্তান আটক হয়। পরে তাদের ভারতে ফেরত পাঠানো হলেও স্বামীকে ফেরত নেয়নি বিএসএফ।সেই ঘটনায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে একপর্যায়ে এই মন্তব্য করতে হয়েছিল- “আইনকে কখনো কখনো মানবিক স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়”। আদালত নির্দেশ দিলেও স্বামীকে নিয়ে ফেরানোর ব্যবস্থা হয়নি, সোনালি একাই সন্তান জন্ম দিয়েছেন।মশালগাঁও সীমান্তের সেই ১১ জনের গল্পটাও যেন একই। প্রতিবন্ধী শিশুটির বাবা হয়তো বৃদ্ধ। কিন্তু দুই দেশের মাঝখানে আটকা পড়ে তারা নিজেদের ‘পরিচয়ের’ অপেক্ষায় কাতর। বাংলাদেশ বলছে আইন অনুসরণ করো। ভারত বলছে প্রমাণ দেখাও। এই দুই প্রশ্নের উত্তরের মাঝখানে অমানবিকতার শিকার অসহায় ১১টি প্রাণ।বিখ্যাত জার্মান-মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হান্না অ্যারেন্ডট বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে বড় মানবাধিকার হলো অধিকার থাকার অধিকার’। এই সীমান্তের রেখা যখন মানুষের দেহে ছেদচিহ্ন আঁকে, তখন দুই দেশের আইনের ফাঁক দিয়ে “মানুষ” পরিণত হয় ‘সমস্যা’য়। একদলকে ভাবা হয় ‘বোঝা’। অন্য দলকে ‘শত্রু’ আখ্যা দেওয়া হয়। অথচ কেউই তাদের বুকে টেনে নেয় না।রাষ্ট্রের পতাকা ও সীমানা মানুষের শরীরে এত গভীর দাগ কাটে যে সেসব কখনো মিলিয়ে যায় না। টোবা টেক সিংহ আজও জীবিত- সে লুকিয়ে আছে মশালগাঁওয়ের শূন্যরেখায় অপেক্ষারত অন্তঃসত্ত্বা ওই নারীর চোখে।মানচিত্রের সীমানার দাগ যখন রক্তে রূপ নেয়, তখন বুঝতে হবে- সীমানার চেয়ে বড় কিছু আছে: মানবতা। প্রশ্ন জাগে, আমরা কি দুই রাষ্ট্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোর ‘মানুষ’ থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারব? নাকি তাদের ‘পরিচয়ের লড়াইয়ে’ মাঠে ছেড়ে দেব; যতক্ষণ না তারা হারিয়ে যায় সময়ের গহ্বরে?রাষ্ট্রহীনতার এই অমানবিক কাণ্ড নিয়ন্ত্রিত না হলে প্রতিটি বাস্তুচ্যুত নাগরিক ভবিষ্যতে ‘মানুষ’ না হয়ে হয়ে যেতে পারে ‘একটি সংখ্যা’। সভ্যতার নামে এই ব্যর্থতার বিরুদ্ধে নীরব কণ্ঠস্বর জাগবে।এই আটকে পড়া মানুষগুলো বাস্তব জীবনের ‘টোবা টেক সিংহ’, যারা জীবন্ত অবস্থায় ইতিহাসের করুণ সাক্ষী হয়ে আছে।এমন কোনো আইন নেই যা মানুষকে ‘অমানুষ’ করার অনুমতি দেয়। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে ছুঁড়ে ফেলে, তখন মানবতার সভ্যতা বিব্রত হয়। সীমান্তের দুই পাশের প্রশাসন কি আজও তাদের ‘প্রমাণের’ অঙ্কে ব্যস্ত, যখন সামনে দাঁড়িয়ে আছে অসহায় ১১টি প্রাণ?

ভিডিও আরও দেখুন

চূড়ান্ত পর্বে গড়াল টুরাগ অ্যাক্টিভ ৬ষ্ঠ জাতীয় স্কোয়াশ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬

 আজ বুধবার (১০ জুন) রাজধানীর আর্মি স্কোয়াশ কমপ্লেক্সে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন হলো “টুরাগ অ্যাক্টিভ ৬ষ্ঠ জাতীয় স্কোয়াশ প্রতিযোগিতা ২০২৬” -এর চূড়ান্ত পর্ব। বাংলাদেশ স্কোয়াশ ফেডারেশনের আয়োজনে এবং টুরাগ অ্যাক্টিভ-উর্মী গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই প্রতিযোগিতায় দশটি গ্রুপে অংশ নিচ্ছে ২৮টি জেলার মোট ৩০টি ক্লাব/প্রতিষ্ঠানের বিজয়ী ও নির্বাচিত ১০০ জনের অধিক খেলোয়াড় (পুরুষ ৭৯ ও মহিলা ২৪ জন)। এবারের চূড়ান্ত পর্বে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে মোট নয়টি বিভাগে। এর মধ্যে রয়েছে উন্মুক্ত পুরুষ ও মহিলা বিভাগ, সৌখিন ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বিভাগ এবং অনূর্ধ্ব-১১, অনূর্ধ্ব-১৩ ও অনূর্ধ্ব-১৫ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েদের পৃথক বিভাগ। বাংলাদেশ স্কোয়াশ ফেডারেশন ৬ষ্ঠ বারের মত এ প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে। রাউন্ড-রবিন লীগ পদ্ধতিতে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে রাজধানীর তিনটি ভেন্যুতে—আর্মি স্কোয়াশ কমপ্লেক্স, বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি এবং আর্মি অফিসার্স মেস। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ স্কোয়াশ ফেডারেশনের সভাপতি মেজর জেনারেল মুঃ হাসান উজ জামান, এনডিইউ, এএফডাব্লিউসি, পিএসসি, এমফিল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থপনা পরিচালক জনাব, আসিফ আশরাফ।আরও উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) জি এম কামরুল ইসলাম, উন্নয়ন কমিটির প্রধান মেজর শফিউল্লাহ মাস্তান, উর্মি গ্রুপের পরিচালক জনাব, ফাইয়াজ রহমান, ব্যবস্থপনা পরিচালকের উপদেষ্টা এয়ার ভাইস মার্শাল (অবঃ) বদরুল আমিন। সিএফও জনাব, ময়নুল হাসান সহ উর্মী গ্রুপ ও ফেডারেশনের উর্ধতন কর্মকর্তা, প্রাক্তন ও বর্তমান খেলোয়াড় এবং অভিভাবকগণ।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ স্কোয়াশ ফেডারেশনের সভাপতি মেজর জেনারেল মুঃ হাসান উজ জামান বলেন, বিগত পাঁচ বছর আমাদের দেশে স্কোয়াশ যে ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে আমি মনে করি সামনে  সুদিন আসবেই। এ বছর রেকর্ড সংখ্যক খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ এবং সম্প্রতি এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়ানশীপ এবং নেপালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতা থেকে পুরস্কার অর্জন তার প্রমণ। ফেডারেশনকে এই ধারা অব্যহত রাখতে হবে এবং আরো বিস্তৃত ও বেগবান করতে হবে। আমি আশা করতে পারি যে এই প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহনকারী বয়স ভিত্তিক স্কোয়াশ খেলোয়াড়রাই আগামীদিনে জাতীয় দলে খেলবে এবং  বাংলাদেশের মান-সন্মান বৃদ্ধি করবে। নিয়মিত জাতীয় প্রতিযোগীতার পাশে থাকায় আমি উর্মি গ্রুপকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি এই প্রতিযোগীতার সার্বিক সাফলতা কামনা করার পাশাপাশি সম্পদ ও নিজস্ব কোর্টের অভাবসহ অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও স্কোয়াশ খেলা চালু, প্রচার ও প্রসারে ফেডারেশনের সকল মহতি উদ্যোগের সাথে থাকা সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।  বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থপনা পরিচালক জনাব, আসিফ আশরাফ বলেন, বাংলাদেশ স্কোয়াশ ফেডারেশনের সাথে যুক্ত হতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে স্কোয়াশের সম্ভাবনা অনেক। তরুণদের মধ্যে এই খেলাটির প্রতি আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। নিয়মিত জাতীয় পর্যায়ের আয়োজনের মাধ্যমে নতুন খেলোয়াড়দের সামনে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উর্মি গ্রুপ বিশ্বাস করে, একটি দেশের ভবিষ্যৎ,অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি একটি স্বাস্থ্যকর, উদ্যমী ও প্রতিযোগিতামুখী প্রজন্ম তৈরির মাধ্যমে গড়ে ওঠে। স্কোয়াশের মতো দ্রুতগতির ও দক্ষতাভিত্তিক খেলার মাধ্যমে ভবিষ্যতের চ্যাম্পিয়ন তৈরি হবে। উর্মি গ্রুপ ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগের পাশে থাকবে, যা দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার মতো খেলোয়াড় তৈরি করবে। বাংলাদেশ স্কোয়াশ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জি এম কামরুল ইসলাম বলেন, দেশের স্কোয়াশ খেলোয়াড় সরবরাহের মুল এলাকা কালশী, ভাষানটেক ও রজনীগন্ধার খেলোয়াড়দের অধিকাংশই সুবিধাবঞ্চিত নাজুক আর্থ-সামসজিক পরিবারের সন্তান। তারপরেও স্কুল-কলেজে পড়ুয়া সন্তানদের উল্লেখযোগ্য হারে স্কোয়াশ খেলায় অংশগ্রহণ প্রমান করে যে স্কোয়াশ একটি সম্ভাবনাময় খেলা যা বাংলাদেশে গণমানুষের খেলা হতে পারে। আমি আশা করছি এবারের আয়োজন দেশের স্কোয়াশ খেলোয়াড়দের সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে এই খেলায় আগ্রহী করে তুলবে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্কোয়াশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চূড়ান্ত পর্বে গড়াল টুরাগ অ্যাক্টিভ ৬ষ্ঠ জাতীয় স্কোয়াশ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬
৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৩ পিএম
এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজেলের বিন্দুমাত্র সংকট নেই, অকটেনের সংকট মোটরসাইকেল চালকদের তৈরি করা’। মন্ত্রীর এই বক্তব্য কি আপনি সমর্থন করেন?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ৮৫ জন