ভালোবাসার এ এক অনন্য উদাহরণ। যেকোনো প্রেমের গল্পকেও হার মানায়। যুক্তরাষ্ট্রের কেনেথ ও হেলেন ফেলামলি দম্পতি একসঙ্গে কাটিয়েছেন ৭০ বছর। আর এই দীর্ঘ পথচলায় তারা কখনো এক রাতের জন্যও আলাদা থাকেননি।কেনেথ ও হেলেন ফেলামলির জীবন ভালোবাসার এক জীবন্ত সংজ্ঞা।তাদের দাম্পত্য জীবনের গল্প আজও মানুষকে আবেগাপ্লুত করে। শেখায় কীভাবে দুটি প্রাণ এক হয়ে থাকতে পারে। তাদের আট সন্তান, নাতি-নাতনি ও আত্মীয়স্বজন এখনও সেই স্মৃতি রোমন্থন করে চলেছেন। তাদের একে অপরের চোখে দেখতেন ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার অনির্বচনীয় ছবি।কেনেথ ও হেলেনের বিবাহবন্ধন হয়েছিল ১৯৪০-এর দশকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কেনেথ সেনাবাহিনীতে চাকরি করলেও তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরেনি। তারা ছিলেন একে অপরের ছায়া। সকালের নাশতার টেবিলে শুরু হতো তাদের দিন। আর রাতের শেষ কথাও হতো পরস্পরের জন্য। জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় মুহূর্ত, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না- সবকিছু ভাগ করেছেন তারা সমানভাবে।পরিবারের সদস্যরা জানান, বাবা-মায়ের সম্পর্ক ছিল নিঃসন্দেহে আদর্শ। তাদের আট সন্তানের লালন-পালন থেকে শুরু করে সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব তারা পালন করেছেন একসঙ্গে। সংসারের নিত্যদিনের কাজ যেমন রান্না-বাজার, আবার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, সবকিছুতেই ছিল তাদের সমান অংশগ্রহণ।ফেলামলি দম্পতির অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো- তারা কখনো আলাদা থাকেননি। পরিবারের সদস্যরা গর্বের সঙ্গে বলেন, ‘বাবা-মা কখনো এক রাতের জন্যও আলাদা থাকেননি। সেটা যেকোনো পরিস্থিতিতেই হোক না কেন।’একবার তারা ফেরিতে ভ্রমণ করছিলেন। সেখানে থাকার ব্যবস্থা এমন ছিল যে তাদের আলাদা বিছানায় ঘুমাতে হতো। কিন্তু এই দম্পতি তা মানতে রাজি হননি। তাদের অভিযোগ ছিল, কোনোভাবেই তারা আলাদা ঘুমাতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত কী করলেন জানেন? একটি বাঙ্ক বেডের নিচের অংশে- যেখানে সাধারণত একজনের ঘুমানোর জায়গা- তারা দুজন একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লেন। শুধু যাতে রাতটুকুও আলাদা না কাটে!২০১৪ সাল। হেলেনের বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর তিনি চলে যান চিরদিনের জন্য। কিন্তু তার যাত্রার সঙ্গী কেনেথ তার সঙ্গে ছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। হেলেনের মৃত্যুর খবর পরিবারের জন্য ছিল যেমন বেদনার, তেমনি কেনেথের জন্যও ছিল এক অসহনীয় শূন্যতা।হেলেনের চলে যাওয়ার মাত্র ১৫ ঘণ্টা পর কেনেথও শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। অথচ ১৫ ঘণ্টাই যেন ছিল তাদের পৃথিবীর শেষ বিচ্ছেদ।পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, এত বছরের সঙ্গীকে হারিয়ে কেনেথ আর বেঁচে থাকতে চাননি। তারা বলেন, ‘বাবা মাকে একা যেতে দিতে চাননি। তারা সবসময় একসঙ্গে ছিলেন, শেষটাও একসঙ্গেই হতে চেয়েছিলেন।’ তারা সাত দশক একসঙ্গে কাটিয়েছেন। প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, প্রতিটি ভোর-বিকেল ছিল তাদের একতার সাক্ষী। জীবনের শেষ প্রহরেও তারা আলাদা থাকলেন মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য। তারপর আবার মিলিত হলেন এক অনন্ত যাত্রায়।এই দম্পতির গল্প শুধু পরিবারের নয়, পুরো বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে আছে। কারণ ভালোবাসার গল্প কখনো পুরোনো হয় না। কেনেথ ও হেলেন যেন আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেলেন- সত্যিকারের ভালোবাসা মৃত্যুকেও জয় করে।