সংবাদ

ফিচার

বিশ্বের প্রথম স্বাধীন নারী রাজ্য: জৈন্তিয়ার বিস্ময়কর ইতিহাস

উত্তর-পূর্ব ভারত ও বর্তমান বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে একসময় বিস্তৃত ছিল জৈন্তিয়া রাজ্য। যুদ্ধ, কূটনীতি, ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পাশাপাশি এই রাজ্যের রয়েছে আরও একটি বিশেষ পরিচয়। মাতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো ও নারীকেন্দ্রিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থার কারণে অনেক গবেষক জৈন্তিয়া রাজ্যকে বিশ্বের প্রথম স্বাধীন নারী রাজ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, তবু দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে জৈন্তিয়ার এই বৈশিষ্ট্য নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাসে বাঞ্চারুর শাসনামল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জঙ্ঘাকালী পূজায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি, আর তার উদ্যোগেই জঙ্ঘাকালীর উদ্দেশ্যে নরবলির প্রথা চালু হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, এমনকি ব্রিটিশ শাসনামল পর্যন্ত এই প্রথা জৈন্তিয়ায় প্রচলিত ছিল।বাঞ্চারুর পর সিংহাসনে বসেন কামদেব। সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তার। পূর্ব বাংলার সংস্কৃত পণ্ডিত ভোজ বর্মা দেবের সঙ্গে ছিল তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। ১০৯০ খ্রিষ্টাব্দে রাজা কামদেবকে সম্মান জানিয়ে ‘বিজয় রাঘবিয়া’ নামে একটি গ্রন্থ রচিত হয়।পরবর্তী শাসক ভীমবল পাহাড়ি শাসকদের বিদ্রোহের মুখে রাজ্য কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারেননি। জৈন্তিয়া যুদ্ধে পরাজয়ের পর তাকে হত্যা করা হয়, অথবা অপমানিত হয়ে তিনি রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যান - ইতিহাসে এমন উল্লেখ রয়েছে। এরপর তার মন্ত্রী কেদারেশ্বর রায় ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং জৈন্তিয়ায় ব্রাহ্মণ রাজবংশের সূচনা করেন।১৬১৮ সালে রাজা ধন মানিক জয় করেন ডিমরুয়া। এরপর কাছারি রাজ্যের মাইবংয়ের রাজা যশো নারায়ণ শতরুদমনের সঙ্গে তার যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে নিজের কন্যার বিয়ে দেন তিনি আহোম রাজা সুসেনঘফার সঙ্গে। পরে আহোম বাহিনী কাছারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে ধন মানিক ও জৈন্তিয়া বাহিনী নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পায়।১৬৭৬ সালে জৈন্তিয়ার রাজা বিদ্রোহ করেন মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। আখবারাতে উল্লেখ রয়েছে, তিনি দেড় হাজার পদাতিক সৈন্য নিয়ে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল লুণ্ঠন করেন এবং সিলেট দুর্গ অবরোধ করেন। জবাবে শায়েস্তা খান ইরাদত খান ও বিহারের খড়্গপুর রাজ্যের রাজা তাহাওয়ার সিংকে অভিযানে পাঠান। তাদের যৌথ অভিযানে পরাজিত হন জৈন্তিয়ার রাজা এবং রাজ্য আবার মোগল নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।১৭০৭ সালে জৈন্তিয়ার রাজা রাম সিং কাছারি রাজাকে অপহরণ করলে জৈন্তিয়ায় অভিযান চালান আহোম রাজা রুদ্র সিং সুখরুংফা। রাজধানী জৈন্তিয়াপুর পর্যন্ত পৌঁছে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় আহোম বাহিনী। বহু নিরীহ মানুষ নিহত হন, অনেকের কান-নাক কেটে দেওয়া হয়। পরে বিদ্রোহ করে আহোম বাহিনীকে পরাজিত করে জৈন্তিয়ারা নিজেদের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করে। তবে বন্দী অবস্থায় মারা যান রাম সিং এবং সিংহাসনে বসেন তার পুত্র জয়ো নারায়ণ।১৭৫৭ সালে নংক্রেম-খিনরিয়াম খাসি প্রধান সোনাপুর দুয়ার বন্ধ করে দিলে বন্ধ হয়ে যায় জৈন্তিয়া ও আহোম রাজ্যের মধ্যকার বাণিজ্য। পরে আহোম রাজা সুরেম্ফা স্বর্গদেও রাজেশ্বর সিংয়ের উদ্যোগে দুয়ারটি আবার খুলে দেওয়া হয়।১৭৬৫ সালে বাংলার দেওয়ানি লাভের পর ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয় জৈন্তিয়া রাজ্যের। বর্তমান বাংলাদেশের জৈন্তিয়াপুর তখন ছিল রাজ্যের রাজধানী। ১৭৭৪ সালে জৈন্তিয়ায় প্রথম ব্রিটিশ অভিযানের নেতৃত্ব দেন মেজর হেনিকার। জৈন্তিয়াদের চুনাপাথরের খনি ছিল বাংলার বদ্বীপে চুনের অন্যতম প্রধান উৎস। তবে দ্রুতই অবনতি ঘটে ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের। একই বছর ব্রিটিশ বাহিনী আক্রমণের মুখে পড়ে এবং ১৭৯৯ সালের পর থেকে জৈন্তিয়ারা ধীরে ধীরে হারাতে থাকে সমতল অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ।১৮২১ সালে জৈন্তিয়াদের একটি দল কয়েকজন ব্রিটিশ প্রজাকে অপহরণ করে কালীপূজায় বলি দেওয়ার চেষ্টা করে। তদন্তে ব্রিটিশরা জানতে পারে, অন্তত ১০ বছর ধরে বার্ষিক প্রথা হিসেবে এটি চলে আসছিল। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পুরোহিত বলির শিকার ব্যক্তির গলা কেটে ফেলতেন এবং সন্তানসন্ততির আশায় সেই রক্তে স্নান করতেন জৈন্তিয়া রাজকুমারী। এই ঘটনার পর জৈন্তিয়া রাজাকে কড়া সতর্কবার্তা দেয় ব্রিটিশরা। ১৮২৪ সালে ডেভিড স্কটের সঙ্গে একটি চুক্তি হলেও পরের বছর আবার বলিদানের চেষ্টা করা হয়।প্রথম ইঙ্গ-বর্মী যুদ্ধের পর সুরমা নদীর উত্তরের অঞ্চল জৈন্তিয়া রাজার শাসনে থাকতে দেয় ব্রিটিশরা। কিন্তু ১৮৩২ সালে চারজন ব্রিটিশকে অপহরণ করা হলে তাদের মধ্যে তিনজনকে ফালজুরের একটি হিন্দু মন্দিরে বলি দেওয়া হয়। একজন পালিয়ে গিয়ে পুরো ঘটনা জানান ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে। অপরাধীদের বিচারে রাজা অস্বীকৃতি জানালে জৈন্তিয়া রাজ্যে অভিযান চালায় ব্রিটিশ বাহিনী এবং ১৮৩৫ সালের ১৫ মার্চ রাজ্যটি যুক্ত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে।এরপর রাজাকে সিলেটে তার সম্পত্তি ভোগের অধিকার এবং মাসিক ৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়। ১৫ জন দলৈ ও চারজন সরদারের মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনা করত ব্রিটিশরা। সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে বিচারের ক্ষমতা ছিল তাঁদের হাতে।ব্রিটিশ শাসনের পরও বৃহত্তর সিলেটে জৈন্তিয়ার প্রশাসনিক পরিচয় পুরোপুরি বিলীন হয়নি। জৈন্তিয়াপুরী রাজ (পুরীরাজ), জাফলং, চৈরকাটা ও ফলজুর - এই চারটি পরগনা রাজস্ব প্রশাসনের অংশ হিসেবে বহাল ছিল। পুরীরাজের আয়তন ছিল ৫৯ দশমিক ১৫ বর্গমাইল এবং ১৮৭৫ সালে ভূমি রাজস্ব ছিল ৩২৫ পাউন্ড। ফলজুরের আয়তন ছিল ৫১ দশমিক ৮৪ বর্গমাইল, ভূমি রাজস্ব ছিল ৩০১ পাউন্ড। চৈরকাটার আয়তন ছিল ৩৭ দশমিক ৮৮ বর্গমাইল; সেখানে জমিদারি ছিল ৭৪৯টি এবং ভূমি রাজস্ব ছিল ২৭৬ পাউন্ড। জাফলংয়ের আয়তন ছিল ৪০ দশমিক ০৭ বর্গমাইল; সেখানে জমিদারি ছিল ৩৪২টি এবং ভূমি রাজস্ব আদায় হতো ২৭৯ পাউন্ড।ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে আজ জৈন্তিয়া রাজ্য আর রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে নেই। তবে এর শাসনব্যবস্থা, মাতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বহুমাত্রিক ইতিহাস এখনো গবেষক, ইতিহাসবিদ ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের আগ্রহের অন্যতম বিষয় হয়ে আছে।

বিশ্বের প্রথম স্বাধীন নারী রাজ্য: জৈন্তিয়ার বিস্ময়কর ইতিহাস