দুটি বর্ণের ‘নারী’ শব্দটি শুধু একটি লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করে না বরং, তিনি মমতা, শক্তি ও সৃজনশীলতার প্রতীক। জননী, জায়া, ভগিনী ও কন্যা প্রতিটি পরিচয়ে নারী মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি অগ্রযাত্রার পেছনে নারীর অবদান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবক্ষেত্রেই নারীর উপস্থিতি মানবতার ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে। তাই কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীরা নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রে নারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের মোট ভোটাধিকারপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই নারী।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অবদান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া কৃষি খাত, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, করপোরেট খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রশাসন, আইন ও গণমাধ্যমসহ নানা পেশায় নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। অনেক নারী উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন।
এই অগ্রগতির বিপরীত চিত্রও আমাদের সমাজে বিদ্যমান। নারীর প্রতি বৈষম্য, সহিংসতা ও অবমূল্যায়ন আজও একটি বড় সামাজিক সমস্যা। ধর্ষণ, হত্যা, যৌন হয়রানি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও নারী পাচার— এসব অপরাধ সমাজে উদ্বেগজনকভাবে ঘটছে। অনেক সময় নারীরা নিজেদের ঘরেও নিরাপদ নয়। পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক চাপ ও কুসংস্কারের কারণে বহু নারী নীরবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাঙ্গনেও নারীরা নানা ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হন। কর্মক্ষেত্রে সমান কাজের জন্য সমান মজুরি না পাওয়া, পদোন্নতিতে বৈষম্য, নিরাপত্তাহীন পরিবেশ এবং বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক নারী সামাজিক মাধ্যমেও কটূক্তি ও অপমানজনক মন্তব্যের শিকার হন, যা তাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ধরনের ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতিই সৃষ্টি করে না; বরং একটি সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। যখন একটি সমাজ নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সমাজের সামগ্রিক মানবিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ। পরিবার থেকেই ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সমান মর্যাদা ও সম্মানের শিক্ষা দিতে হবে। সমাজে নারীকে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে মূল্যায়ন করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং ব্রেস্টফিডিং জোনের ব্যবস্থা করা হলে তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। বিজ্ঞাপন, সিনেমা বা সামাজিক মাধ্যমে নারীকে পণ্য বা বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। তাই এ ধরনের উপস্থাপনাকে নিরুৎসাহিত করা এবং নারীর সম্মানজনক উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
নারী ও পুরুষ একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা একে অন্যের পরিপূরক। পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতেই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে। একটি সুস্থ ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তুলতে নারীর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্যই অপরিহার্য। অতএব, নারীর প্রগতি ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি উন্নত, মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নির্মাণ করতে।
লাবণ্য বিশ্বাস
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
দুটি বর্ণের ‘নারী’ শব্দটি শুধু একটি লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করে না বরং, তিনি মমতা, শক্তি ও সৃজনশীলতার প্রতীক। জননী, জায়া, ভগিনী ও কন্যা প্রতিটি পরিচয়ে নারী মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি অগ্রযাত্রার পেছনে নারীর অবদান গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সবক্ষেত্রেই নারীর উপস্থিতি মানবতার ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে। তাই কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীরা নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিসহ নানা ক্ষেত্রে নারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বাংলাদেশের মোট ভোটাধিকারপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই নারী।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীদের অবদান দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া কৃষি খাত, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, করপোরেট খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রশাসন, আইন ও গণমাধ্যমসহ নানা পেশায় নারীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন। অনেক নারী উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছেন।
এই অগ্রগতির বিপরীত চিত্রও আমাদের সমাজে বিদ্যমান। নারীর প্রতি বৈষম্য, সহিংসতা ও অবমূল্যায়ন আজও একটি বড় সামাজিক সমস্যা। ধর্ষণ, হত্যা, যৌন হয়রানি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বাল্যবিবাহ ও নারী পাচার— এসব অপরাধ সমাজে উদ্বেগজনকভাবে ঘটছে। অনেক সময় নারীরা নিজেদের ঘরেও নিরাপদ নয়। পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক চাপ ও কুসংস্কারের কারণে বহু নারী নীরবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাঙ্গনেও নারীরা নানা ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হন। কর্মক্ষেত্রে সমান কাজের জন্য সমান মজুরি না পাওয়া, পদোন্নতিতে বৈষম্য, নিরাপত্তাহীন পরিবেশ এবং বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক নারী সামাজিক মাধ্যমেও কটূক্তি ও অপমানজনক মন্তব্যের শিকার হন, যা তাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ধরনের ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতিই সৃষ্টি করে না; বরং একটি সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। যখন একটি সমাজ নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সমাজের সামগ্রিক মানবিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করা কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ। পরিবার থেকেই ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সমান মর্যাদা ও সম্মানের শিক্ষা দিতে হবে। সমাজে নারীকে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে মূল্যায়ন করার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মজীবী নারীদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং ব্রেস্টফিডিং জোনের ব্যবস্থা করা হলে তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। বিজ্ঞাপন, সিনেমা বা সামাজিক মাধ্যমে নারীকে পণ্য বা বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করে। তাই এ ধরনের উপস্থাপনাকে নিরুৎসাহিত করা এবং নারীর সম্মানজনক উপস্থাপনাকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
নারী ও পুরুষ একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা একে অন্যের পরিপূরক। পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতেই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে। একটি সুস্থ ও সচেতন প্রজন্ম গড়ে তুলতে নারীর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণের জন্যই অপরিহার্য। অতএব, নারীর প্রগতি ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি উন্নত, মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বৈষম্যমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নির্মাণ করতে।
লাবণ্য বিশ্বাস
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

আপনার মতামত লিখুন