সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বাজারে ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমুক


প্রকাশ: ৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

বাজারে ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমুক
বিঘাপ্রতি আলু চাষে যেখানে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা, সেখানে উৎপাদিত ৮০ -৯০ প্যাকেট আলু বিক্রি করে চাষির হাতে আসছে মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা

উৎসবের মৌসুম এলেই অসাধু চক্রের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক স্তরে বারবার এই নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করলেও পরিস্থিতির স্থায়ী কোনো বদল ঘটেনি। বাজারের আগুনের ছেঁকায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষিপণ্যের বাজারে এখন চরম হাহাকার। বাংলাদেশের দিগন্তজোড়া মাঠে ফলন ভালো হলেও চাষির চোখে আজ জল।

আলুর কথাই বলা যাক। বিঘাপ্রতি আলু চাষে যেখানে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা, সেখানে উৎপাদিত ৮০ -৯০ প্যাকেট আলু বিক্রি করে চাষির হাতে আসছে মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা। হিসেব কষলে দেখা যায়, বিঘাপ্রতি লোকসানের বোঝা ১৫ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিরুপায় চাষি যখন মাঠ থেকে মাত্র ৩ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন, সেই একই আলু সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়ে যাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।

প্রায় প্রতিটি ফসল উৎপাদন করে তারা লোকসান দিয়েই চলেছে। যেকোনো কৃষিপণ্য সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। মাঝপথে ৫ থেকে ৬ গুণ মুনাফা সরাসরি চলে যাচ্ছে ফড়িয়া আর সিন্ডিকেট চালানো মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অতি সাধারণ খাবার ডাল, আলুসেদ্ধও আজ মধ্যবিত্তের কাছে বিলাসিতা। এদিকে ফলের অস্বাভাবিক দাম পুষ্টির সংকটের পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। প্রয়োজনীয় ফলের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে সস্তা ও অস্বাস্থ্যকর তৈলাক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। নিম্নমানের তেলে ভাজা খাবারে থাকা ‘অ্যাক্রাইলামাইড’ পাকস্থলীর এসিডের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, যা থেকে দীর্ঘমেয়াদি পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক ইরোশন দেখা দিতে পারে।

অর্থাৎ এই অসাধুচক্র শুধু মানুষের পকেট কাটছে না, বরং সমাজকে এক দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হিমঘর মালিক ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এই অরাজকতা থামানো অসম্ভব। বাংলাদেশের কৃষি আর জনস্বাস্থ্য বাঁচাতে দরকার শক্ত হাতের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও সঠিক পরিকল্পনা।

ফড়িয়াদের উৎপাত বা কালোবাজারি হলো এমন একটি সমস্যা যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এর ফলে চাহিদা বাড়ে এবং পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে মানুষের হাতে থাকা অতিরিক্ত অর্থ ফড়েদের পকেটে যায়, যা মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য হয়।

ফড়িয়াদের উৎপাত রোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া খুবই জরুরি। যেমন বাজার মনিটরিং। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা। সরাসরি কেনাবেচা। যেমন কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে সরাসরি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা।

আইনি ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ ফড়িয়াদের বা কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আলু প্রক্রিয়াকরণ শিল্প যেমন চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা স্টার্চ শিল্পের প্রসার ঘটানো। এতে অতিরিক্ত উৎপাদনের ব্যবহার সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, কৃষককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা বাড়ানো। চতুর্থত, অতিরিক্ত উৎপাদন রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতই এগিয়ে যাক কৃষকের জীবন যদি অনিশ্চয়তায় ভরা থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একদিকে কৃষক কৃষিপণ্যের লোকসান গুনছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বেশি দাম দিচ্ছেন। মাঝখানে লাভের গুড় খাচ্ছে অন্য কেউ। কৃষিপ্রধান দেশের গর্ব তখনই সত্যি হবে, যখন কৃষকের ঘরে স্থিতি ফিরবে। নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে- ক্ষেতে যদি কৃষকের ঘাম ঝরে, তবে লাভের গুড় খাওয়া ব্যক্তিরা কারা কারা

লিয়াকত হোসেন খোকন

রূপনগর, ঢাকা

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬


বাজারে ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমুক

প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

উৎসবের মৌসুম এলেই অসাধু চক্রের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনিক স্তরে বারবার এই নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করলেও পরিস্থিতির স্থায়ী কোনো বদল ঘটেনি। বাজারের আগুনের ছেঁকায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষিপণ্যের বাজারে এখন চরম হাহাকার। বাংলাদেশের দিগন্তজোড়া মাঠে ফলন ভালো হলেও চাষির চোখে আজ জল।

আলুর কথাই বলা যাক। বিঘাপ্রতি আলু চাষে যেখানে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা, সেখানে উৎপাদিত ৮০ -৯০ প্যাকেট আলু বিক্রি করে চাষির হাতে আসছে মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা। হিসেব কষলে দেখা যায়, বিঘাপ্রতি লোকসানের বোঝা ১৫ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিরুপায় চাষি যখন মাঠ থেকে মাত্র ৩ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন, সেই একই আলু সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়ে যাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।

প্রায় প্রতিটি ফসল উৎপাদন করে তারা লোকসান দিয়েই চলেছে। যেকোনো কৃষিপণ্য সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। মাঝপথে ৫ থেকে ৬ গুণ মুনাফা সরাসরি চলে যাচ্ছে ফড়িয়া আর সিন্ডিকেট চালানো মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অতি সাধারণ খাবার ডাল, আলুসেদ্ধও আজ মধ্যবিত্তের কাছে বিলাসিতা। এদিকে ফলের অস্বাভাবিক দাম পুষ্টির সংকটের পাশাপাশি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। প্রয়োজনীয় ফলের অভাবে মানুষ বাধ্য হয়ে সস্তা ও অস্বাস্থ্যকর তৈলাক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। নিম্নমানের তেলে ভাজা খাবারে থাকা ‘অ্যাক্রাইলামাইড’ পাকস্থলীর এসিডের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়, যা থেকে দীর্ঘমেয়াদি পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক ইরোশন দেখা দিতে পারে।

অর্থাৎ এই অসাধুচক্র শুধু মানুষের পকেট কাটছে না, বরং সমাজকে এক দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। হিমঘর মালিক ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়া এই অরাজকতা থামানো অসম্ভব। বাংলাদেশের কৃষি আর জনস্বাস্থ্য বাঁচাতে দরকার শক্ত হাতের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও সঠিক পরিকল্পনা।

ফড়িয়াদের উৎপাত বা কালোবাজারি হলো এমন একটি সমস্যা যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। এর ফলে চাহিদা বাড়ে এবং পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে মানুষের হাতে থাকা অতিরিক্ত অর্থ ফড়েদের পকেটে যায়, যা মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য হয়।

ফড়িয়াদের উৎপাত রোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া খুবই জরুরি। যেমন বাজার মনিটরিং। নিয়মিত বাজার পরিদর্শন ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা। সরাসরি কেনাবেচা। যেমন কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে সরাসরি পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা।

আইনি ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ ফড়িয়াদের বা কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আলু প্রক্রিয়াকরণ শিল্প যেমন চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা স্টার্চ শিল্পের প্রসার ঘটানো। এতে অতিরিক্ত উৎপাদনের ব্যবহার সম্ভব হবে। তৃতীয়ত, কৃষককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা বাড়ানো। চতুর্থত, অতিরিক্ত উৎপাদন রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতই এগিয়ে যাক কৃষকের জীবন যদি অনিশ্চয়তায় ভরা থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। একদিকে কৃষক কৃষিপণ্যের লোকসান গুনছেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বেশি দাম দিচ্ছেন। মাঝখানে লাভের গুড় খাচ্ছে অন্য কেউ। কৃষিপ্রধান দেশের গর্ব তখনই সত্যি হবে, যখন কৃষকের ঘরে স্থিতি ফিরবে। নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে- ক্ষেতে যদি কৃষকের ঘাম ঝরে, তবে লাভের গুড় খাওয়া ব্যক্তিরা কারা কারা

লিয়াকত হোসেন খোকন

রূপনগর, ঢাকা


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত