বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, কৃষি, বিনিয়োগ, নগর উন্নয়ন, পরিবহন, পরিবেশ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় উন্নয়ন প্রশ্ন।
বাংলাদেশের প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পখাত ও সরকারের সমন্বয়ে অন্তত আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা তৈরি করা।
শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের আলোচনায় প্রায়ই প্রশ্ন আসে, দেশে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি?
দিনের সব সময় বিদ্যুতের চাহিদা সমান নয়। সন্ধ্যায় যখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ে, দোকানপাট খোলা থাকে এবং শিল্পকারখানাও উৎপাদনে থাকে, তখন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল বাড়লে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চার্জ দেওয়াও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ও কম চাহিদার সময় অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল চার্জ, কৃষির সেচ পাম্প এবং যেসব শিল্পে সম্ভব, তাদের কিছু কার্যক্রম কম চাহিদার সময়ে স্থানান্তরে আর্থিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
কৃষকদের জন্য নির্দিষ্ট কম চাহিদার সময়ে সেচের বিদ্যুতে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও ভাবা যায়। এতে কৃষকের ব্যয় কমবে এবং জাতীয় ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।
একই সঙ্গে দিনের আলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, ঋতু, মানুষের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় কার্যক্রম, ব্যবসা ও পরিবহন বিবেচনায় সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কিছু ব্যবসার সময় মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তন করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় কি না, তা পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা যেতে পারে।
বড় শিল্পকে জ্বালানি নিরাপত্তার অংশীদার করতে হবে
একটি বড় শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে উঠলে বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা ও অন্যান্য সরকারি অবকাঠামোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়। তাই বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সময় একটি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা উচিত।
বড় শিল্পের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয় বা অন্য গ্রহণযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো প্রকল্পের কারণে নতুন বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র বা বিতরণ অবকাঠামো প্রয়োজন হলে উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক নিয়মে সেই ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতেও বলা যেতে পারে।
অর্থাৎ, যে উন্নয়ন নতুন জ্বালানি চাহিদা সৃষ্টি করবে, তাকে সেই চাহিদা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থারও অংশীদার হতে হবে।
প্রতি ১০টি বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা
বাংলাদেশের জমি সীমিত। তাই শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, ছাদ ও স্থানীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নতুন আবাসিক এলাকায় প্রতি ১০ বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সঞ্চয়ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। দিনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার হবে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা যাবে অথবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দেওয়া যাবে।
মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ের বিপুল ছাদকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। নতুন বড় উপাসনালয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা এবং পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। একই নীতি বিদ্যালয়, কলেজ, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং সরকারি ভবনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব।
প্রয়োজন জাতীয় ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা হলো সব সময় সমান উৎপাদন হয় না। তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ধরে রাখার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় ব্যাটারিভিত্তিক বিদ্যুৎ সঞ্চয়কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। চাহিদা কম অথচ উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সেখানে সংরক্ষণ করা হবে। আবার সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা, হঠাৎ কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়া বা জরুরি পরিস্থিতিতে সেই বিদ্যুৎ জাতীয় ব্যবস্থায় ফেরত দেওয়া যাবে। এগুলো এক ধরনের ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’ হিসেবে কাজ করবে।
সরকারের পাশাপাশি যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীকেও এমন সঞ্চয়কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কাছেও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু আমরা কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করি তার ওপর নয়, প্রয়োজনের জন্য কতটা বিদ্যুৎ ধরে রাখতে পারি তার ওপরও নির্ভর করবে।
নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও মৌসুমি প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে হবে
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের নদী, খাল-বিল, হাওর, বৃষ্টিপাত ও মৌসুমি আবহাওয়াকে শুধু দুর্যোগের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এগুলোকে কীভাবে জ্বালানি ও পানি নিরাপত্তার অংশ করা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
সব নদীতে বড় বাঁধ বাস্তবসম্মত নয়। তবে কোথায় ছোট আকারের জলবিদ্যুৎ বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা যেতে পারে। উপযুক্ত জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা যায়, অবশ্যই মৎস্যসম্পদ, নৌচলাচল, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
একইভাবে বর্ষার বিপুল পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন বড় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপের পাশাপাশি পানি উত্তোলন ও সরবরাহে ব্যবহৃত বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে। নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও বাতাসকে শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারযোগ্য জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ও এক ধরনের উৎপাদন
নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অপচয় কমানোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল অর্থ, জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু উন্নত ভবন নকশা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, দক্ষ শীতাতপ ব্যবস্থা, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত শিল্পযন্ত্রের মাধ্যমে চাহিদা কমানো অনেক ক্ষেত্রে আরও সাশ্রয়ী। তাই সাশ্রয় করা বিদ্যুৎও এক অর্থে উৎপাদিত বিদ্যুৎ।
প্রয়োজন জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচক
আমার পিএইচডি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জ্বালানি, পরিবেশ ও পানির টেকসই উন্নয়ন সূচক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে তা দিয়ে সাফল্য বিচার না করে দেখতে হবে, জ্বালানির কত অংশ নিজস্ব উৎস থেকে আসছে, আমদানিনির্ভরতা কত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কত, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যয় কত, অপচয় কত, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কতক্ষণ হচ্ছে এবং সাধারণ পরিবার ও শিল্পের জন্য জ্বালানি কতটা সাশ্রয়ী।
যা আমরা নিয়মিত পরিমাপ করি না, তা কার্যকরভাবে উন্নত করাও কঠিন।
শেষ কথা
বাংলাদেশের প্রয়োজন ২০৩০, ২০৪০ এবং ২০৫০ সালকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা। সেখানে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, সৌর ও বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয়, বৈদ্যুতিক যানবাহন, কৃষি, শিল্প, পানি এবং জ্বালানি সাশ্রয়কে একই পরিকল্পনায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ চাইলে বর্তমান সংকট থেকেই ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী পথ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন খণ্ডিত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অনুমানের পরিবর্তে তথ্য ও গবেষণা এবং একক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকার, বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।
জ্বালানি শুধু আলো জ্বালানোর বিষয় নয়। এটি কৃষকের উৎপাদন, শিল্পের শক্তি, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, হাসপাতালের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের আস্থা, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ভিত্তি। তাই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা আসলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশেরই পরিকল্পনা।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক:ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়ান লোকাল গভর্নমেন্ট; পিএইচডি গবেষক, সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া]

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এটি এখন জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, কৃষি, বিনিয়োগ, নগর উন্নয়ন, পরিবহন, পরিবেশ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় উন্নয়ন প্রশ্ন।
বাংলাদেশের প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, শিল্পখাত ও সরকারের সমন্বয়ে অন্তত আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের একটি বাস্তবসম্মত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা তৈরি করা।
শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের আলোচনায় প্রায়ই প্রশ্ন আসে, দেশে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি?
দিনের সব সময় বিদ্যুতের চাহিদা সমান নয়। সন্ধ্যায় যখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ে, দোকানপাট খোলা থাকে এবং শিল্পকারখানাও উৎপাদনে থাকে, তখন জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল বাড়লে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চার্জ দেওয়াও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ও কম চাহিদার সময় অনুযায়ী বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে চালু করা যেতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল চার্জ, কৃষির সেচ পাম্প এবং যেসব শিল্পে সম্ভব, তাদের কিছু কার্যক্রম কম চাহিদার সময়ে স্থানান্তরে আর্থিক সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।
কৃষকদের জন্য নির্দিষ্ট কম চাহিদার সময়ে সেচের বিদ্যুতে বিশেষ ছাড় দেওয়ার কথাও ভাবা যায়। এতে কৃষকের ব্যয় কমবে এবং জাতীয় ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।
একই সঙ্গে দিনের আলোকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, ঋতু, মানুষের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় কার্যক্রম, ব্যবসা ও পরিবহন বিবেচনায় সরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কিছু ব্যবসার সময় মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তন করলে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয় কি না, তা পরীক্ষামূলকভাবে যাচাই করা যেতে পারে।
বড় শিল্পকে জ্বালানি নিরাপত্তার অংশীদার করতে হবে
একটি বড় শিল্পকারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল বা বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে উঠলে বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা ও অন্যান্য সরকারি অবকাঠামোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়। তাই বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সময় একটি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা উচিত।
বড় শিল্পের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি নির্দিষ্ট অংশ নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয় বা অন্য গ্রহণযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে। কোনো প্রকল্পের কারণে নতুন বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র বা বিতরণ অবকাঠামো প্রয়োজন হলে উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ ও যৌক্তিক নিয়মে সেই ব্যয়ের একটি অংশ বহন করতেও বলা যেতে পারে।
অর্থাৎ, যে উন্নয়ন নতুন জ্বালানি চাহিদা সৃষ্টি করবে, তাকে সেই চাহিদা সামাল দেওয়ার ব্যবস্থারও অংশীদার হতে হবে।
প্রতি ১০টি বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা
বাংলাদেশের জমি সীমিত। তাই শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, ছাদ ও স্থানীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নতুন আবাসিক এলাকায় প্রতি ১০ বা ২০টি বাড়ির জন্য যৌথ সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সঞ্চয়ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। দিনে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয়ভাবে ব্যবহার হবে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা যাবে অথবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় দেওয়া যাবে।
মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গির্জা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ের বিপুল ছাদকেও কাজে লাগানো যেতে পারে। নতুন বড় উপাসনালয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা এবং পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ অর্থায়নের মাধ্যমে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে। একই নীতি বিদ্যালয়, কলেজ, হাসপাতাল, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং সরকারি ভবনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা সম্ভব।
প্রয়োজন জাতীয় ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’
সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বড় সীমাবদ্ধতা হলো সব সময় সমান উৎপাদন হয় না। তাই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ধরে রাখার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় ব্যাটারিভিত্তিক বিদ্যুৎ সঞ্চয়কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। চাহিদা কম অথচ উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সেখানে সংরক্ষণ করা হবে। আবার সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদা, হঠাৎ কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হওয়া বা জরুরি পরিস্থিতিতে সেই বিদ্যুৎ জাতীয় ব্যবস্থায় ফেরত দেওয়া যাবে। এগুলো এক ধরনের ‘বিদ্যুৎ ভান্ডার’ হিসেবে কাজ করবে।
সরকারের পাশাপাশি যথাযথ নীতিমালার মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীকেও এমন সঞ্চয়কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্পাঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের কাছেও এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু আমরা কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করি তার ওপর নয়, প্রয়োজনের জন্য কতটা বিদ্যুৎ ধরে রাখতে পারি তার ওপরও নির্ভর করবে।
নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও মৌসুমি প্রকৃতিকে কাজে লাগাতে হবে
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আমাদের নদী, খাল-বিল, হাওর, বৃষ্টিপাত ও মৌসুমি আবহাওয়াকে শুধু দুর্যোগের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। এগুলোকে কীভাবে জ্বালানি ও পানি নিরাপত্তার অংশ করা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
সব নদীতে বড় বাঁধ বাস্তবসম্মত নয়। তবে কোথায় ছোট আকারের জলবিদ্যুৎ বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা যেতে পারে। উপযুক্ত জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা যায়, অবশ্যই মৎস্যসম্পদ, নৌচলাচল, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় জীবিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
একইভাবে বর্ষার বিপুল পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন বড় আবাসিক, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রকল্পে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপের পাশাপাশি পানি উত্তোলন ও সরবরাহে ব্যবহৃত বিদ্যুতের চাহিদাও কমবে। নদী, বৃষ্টি, সূর্য ও বাতাসকে শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারযোগ্য জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।
জ্বালানি সাশ্রয়ও এক ধরনের উৎপাদন
নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি অপচয় কমানোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল অর্থ, জ্বালানি ও অবকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু উন্নত ভবন নকশা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, দক্ষ শীতাতপ ব্যবস্থা, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্রপাতি এবং উন্নত শিল্পযন্ত্রের মাধ্যমে চাহিদা কমানো অনেক ক্ষেত্রে আরও সাশ্রয়ী। তাই সাশ্রয় করা বিদ্যুৎও এক অর্থে উৎপাদিত বিদ্যুৎ।
প্রয়োজন জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচক
আমার পিএইচডি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জ্বালানি, পরিবেশ ও পানির টেকসই উন্নয়ন সূচক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় টেকসই জ্বালানি সূচক কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
শুধু কত মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে তা দিয়ে সাফল্য বিচার না করে দেখতে হবে, জ্বালানির কত অংশ নিজস্ব উৎস থেকে আসছে, আমদানিনির্ভরতা কত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ কত, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যয় কত, অপচয় কত, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কতক্ষণ হচ্ছে এবং সাধারণ পরিবার ও শিল্পের জন্য জ্বালানি কতটা সাশ্রয়ী।
যা আমরা নিয়মিত পরিমাপ করি না, তা কার্যকরভাবে উন্নত করাও কঠিন।
শেষ কথা
বাংলাদেশের প্রয়োজন ২০৩০, ২০৪০ এবং ২০৫০ সালকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি পথনকশা। সেখানে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান, সৌর ও বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ সঞ্চয়, বৈদ্যুতিক যানবাহন, কৃষি, শিল্প, পানি এবং জ্বালানি সাশ্রয়কে একই পরিকল্পনায় আনতে হবে।
বাংলাদেশ চাইলে বর্তমান সংকট থেকেই ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী পথ তৈরি করতে পারে। প্রয়োজন খণ্ডিত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অনুমানের পরিবর্তে তথ্য ও গবেষণা এবং একক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সরকার, বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।
জ্বালানি শুধু আলো জ্বালানোর বিষয় নয়। এটি কৃষকের উৎপাদন, শিল্পের শক্তি, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ, হাসপাতালের নিরাপত্তা, বিনিয়োগের আস্থা, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ভিত্তি। তাই বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা আসলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশেরই পরিকল্পনা।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক:ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়ান লোকাল গভর্নমেন্ট; পিএইচডি গবেষক, সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া]

আপনার মতামত লিখুন