সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

হয় দেবতা না হয় দানব!


আনোয়ারুল হক
আনোয়ারুল হক
প্রকাশ: ৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম

হয় দেবতা না হয় দানব!
দেশের মানুষের চাহিদা কিন্তু বেশি নয়। দলবাজির বিপরীতে দেশের মানুষ চায় দলনিরপেক্ষ প্রশাসন, দখলবাজদের হাত থেকে স্বস্তি

জাতি হিসেবে আমরা আবেগী। সুড়ঙ্গ শেষের ক্ষীণ আলোক রেখা দেখেই মনে করি, এই বুঝি আলোঝলমল মুক্ত আকাশের নিচে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু সে পর্যন্ত পৌঁছাতে যে কত খানাখন্দ, বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে তা আর বিবেচনায় থাকে না। এই যেমন জুলাই আন্দোলনের সফলতার প্রথম পর্যায়ে ছাত্রনেতৃত্বের ভুলগুলোকে সমালোচনার চোখে দেখা হয়নি। বরং সবখানেই প্রশংসার জোয়ারে তাদেরকে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের পক্ষে এমনভাবে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যেন তারা সব ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বয়ানটি পুরোপুরি বদলে গেছে। নেতৃত্বের একটা অংশের মনে গোপন এজেন্ডা থাকলেও সারা দেশে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের সামনে রাজনৈতিক দিশা না থাকায় খুব তাড়াতাড়ি তারা দিশাহীন হয়ে পড়েন। নানা গোষ্ঠী তাদের অনেককে ব্যবহার করতে শুরু করে। বদলিবাণিজ্য, তদবিরুবাণিজ্য, মব সহিংসতা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি- ধীরে ধীরে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে অনেকে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। যারা একদিন শ্লোগান তুলেছিলেন ‘দেশটা কারো বাপের নয়’ তাদের কারো কারো বক্তব্য শুনে ও কার্যক্রম দেখে মনে হয়েছিল দেশটা একান্তই তাদের বাপের। সমন্বয়ক নামটি কোথাও ভীতি সৃষ্টি আবার কোথাও উপহাসে পরিণত হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে যায় যে, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটি ছাড়া সারাদেশের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হয়। জুলাই অভ্যুত্থান দানবীয় মবতন্ত্রের পকেটস্থ হয়ে পড়ে। 

জুলাই আন্দোলনের পরে ৮ আগস্ট এক অলৌকিক বিভা নিয়ে ইউনূস যখন দেশে ফিরলেন তখন তো তিনি আলোর দিশারী! যিনি বাংলাদেশকে দুর্নীতি এবং কুশাসনের গহ্বর থেকে বের করে এক রূপকথার দেশে নিয়ে যেতে এসেছেন। মনে পড়ে পাকিস্তান আমলে সেই কৈশোরের দিনগুলোতে রাস্তার মোড়ে জেনারেল আইউব খানের ছবি সহ বিল বোর্ডে লেখা দেখতাম ‘ দি সেভিয়্যার হ্যাজ কাম টু সেইভ দি কান্ট্রি’। এস.এস.সি পরীক্ষার ইংরেজি প্রশ্নপত্রের রচনা অংশে ‘মাই ফেভারিট বুক’ কমন পড়ে যাওয়ায় শিক্ষকের শিখিয়ে দেয়ার মতো আইউব খানের আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টারস’ রচনা লিখলাম। অথচ কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই চোখের সামনে দেখলাম দেবতা বেশে আসা বন্ধু শুধু শত্রু নয় দানবের বেশেই বিদায় নিলেন। 

বিমানবন্দরে নেমেই ইউনূস বললেন, ‘কোনো রকম প্রতিহিংসামূলক কাজ করা যাবে না। আমার ওপর যদি আস্থা এবং বিশ্বাস রাখেন, তা হলে এটা নিশ্চিত করতে হবে। কারও ওপরে কোনো রকম হামলা করা যাবে না। বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। আমাদের সারা বাংলাদেশ একটা পরিবার। যারা বিপথে গিয়েছিলেন তাদেরও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কথা মানতে হবে। যদি না মানেন তবে এখানে আমার প্রয়োজন নেই, আমাকে বিদায় দেন।’ একেবারে দেবতাসম চরিত্র!

সেই তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ গ্রহণের চার দিন পরে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে বললেন, ‘আমি ছাত্রদের বলেছি, আপনাদের সম্মান করি। আর আপনারা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলেই এই দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।’ এর পরেই ইউনূস বলেন, ‘অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এসেছে। দানবী বিদায় নিয়েছে দেশ থেকে।’ এই শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করে ইউনূস ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে দিলেন সবখানে, সারাদেশে। দেশ জুড়ে নতুন গতি পেলো মবউল্লম্ফন আর প্রতিপক্ষ ও কাল্পনিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা নির্যাতন এবং অবশেষে খুনের মামলা দিয়ে আটক। গণঅভ্যুত্থান বন্দী হয়ে পড়ে দানবীয় মব সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কাছে। যেন জুলুম জবরদস্তি প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের মধ্যেই নিহিত ছিল জুলাইয়ের অভিপ্রায়, যেন এভাবেই ন্যায্যতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়!

ইউনূস ঘোষিত ‘দানবী’ তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কিন্তু তার সম্পর্ক একটা সময় পর্যন্ত ভালোই ছিলো। ১৯৯৭ সালের ২-৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋত সম্মেলনে যৌথ সভাপতি হিসেবে ইউনূসই শেখ হাসিনাকে মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনের সঙ্গে একত্রে দায়িত্ব দেন। হাসিনা তার বক্তব্যে "অধ্যাপক ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের অসামান্য কাজের" প্রশংসা করেন। তিনি বলেন "গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য দরিদ্রদের ক্ষুদ্রঋত প্রদানে নিযুক্ত ব্যাংকগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে আশাবাদ তৈরি করেছে"। ইউনূসও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এবং নারী ক্ষমতায়নে তাঁর অবদানের প্রশংসা করে বক্তব্য দেন। 

একটি দেশের কোনো নাগরিকের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি শুধু প্রাপকের গর্বের বিষয় নয়, তাঁর দেশের জন্যও গৌরবের। কিন্তু ২০০৬ সালের নোবেলে আমাদের কপাল পুড়লো! দেশে বিতর্ক শুরু হলো অর্থনীতিতে অবদান রেখে শান্তিতে নোবেল কেনো? এদিকে নোবেল লরিয়টও শুধু নোবেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলেন না। ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্েয তিনি বছরের প্রথমার্ধ থেকেই দেশের প্রথিতযশা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে সৎ প্রার্থীদের নির্বাচিত করার এক কর্মসূচি নিয়ে জেলায় জেলায় নাগরিক সভা শুরু করেন। এরই মাঝে আসে এক এগারো যাকে ডিপ স্টেইট কাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। 

প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে গুরুতর অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার ফলে সৃষ্ট নৈরাজ্য এবং শাসকদলের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নানামুখী প্রচেষ্টার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামো তথা সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে নিয়ে নেয়। এক এগারোর সরকার বা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ডিপ স্টেইটের ভূমিকার একটি স্থানীয় সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই পরিবর্তনে পরাশক্তিগুলোরও এক ধরনের মৌন বা প্রত্যক্ষ সমর্থন বিদ্যমান ছিল। আবার সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এমন ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে মনে হয় যেন দেবতার আবির্ভাব হয়েছে। 

এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে এক এগারো কিন্তু মানুষের মাঝে প্রাথমিকভাবে স্বস্তি নিয়ে আসায় জনসমর্থনও পেয়েছিলো। এরই মাঝে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। মজার বিষয় হচ্ছে ‘ দিল্লির জিনিজর’ থেকে দেশকে মুক্ত করার অবিরাম যোদ্ধা ইউনূস এ ঘোষণার আগে জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ভারত সফরে যান। সে সফরে অধ্যাপক ইউনূস ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং ৩১ জানুয়ারি দিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশের পরিস্থিতি ‘বাধ্য করলে’ তিনি রাজনীতিতে ‘যোগ দেবেন’। দিল্লিতে বসে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার সময় তিনি সম্ভবত শ্লোগানটি ভুলে গিয়েছিলেন, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’!

দেশে ফিরে ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ইউনূস পত্রিকার মাধ্যমে দেশের মানুষের উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল কীভাবে গঠন করা যায়, কিভাবে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে মনোনীত করা যায় - এসব বিষয় নিয়ে তিনি মানুষের মতামত এবং পরামর্শ জানতে চান। আর এক চিঠিতে তিনি বলেন তার দলের মূল শ্লোগান হবে এগিয়ে চলো বাংলাদেশ। আর দলের নীতি ও আদর্শ হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং দুর্নীতি ও দলীয়করণ মুক্ত প্রশাসন। পাঠক লক্ষ্য করুন দেড় যুগ আগে ইউনূসের দল ‘নাগরিক জনশক্তি’র নীতি ও আদর্শে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। দেবতাই বটে!

অধ্যাপক ইউনূস যখন রাজনীতিতে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেন তখন সেটির কড়া সমালোচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘যারা রাজনীতিতে নতুন আসে তারা ভয়ঙ্কর হয়। তাদের তৎপরতা সন্দেহ করার মতো। তারা জাতির ভালো করার পরিবর্তে আরও বেশি খারাপ করে।’ ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ফজলুল হক আমিনী আরও কঠোর মন্তব্য করে বলেন, ‘ড. ইউনুস দেশ, জাতি ও ইসলামের শত্রু।’ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হবার পরে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে জোরেশোরে চেষ্টা করেছিল। অধ্যাপক ইউনূস সেনা সমর্থিত সরকারের সমর্থন নিয়ে সে পরিস্থিতিরই সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এসে মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। সে পরিস্থিতিতে ইউনূস দল ঘোষণার তিন মাস পরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফকরুদ্দিনের সঙ্গে এক বৈঠকের পরে ঘোষণা করেন রাজনৈতিক দল করা তার কাজ নয়। 

২০০৭ সালে যেটা তার কাজ না বলেছিলেন বা ব্যর্থ হয়েছিলেন সে কাজে তিনি সফল হলেন দেড় যুগ পরে এসে ইসলামপন্থীদের সহযোগিতায়। তবে এর আগে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিলো না। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋত কার্যক্রমে ব্যাপক সংখ্যায় নারীদের অংশগ্রহণ ইসলাম পন্থীরা বা তার বর্তমান মিত্র জামাত কখনোই ভালো চোখে দেখে নাই। দেশের বহু স্থানে একসময় জামাত- শিবিরের কর্মীরা গ্রামীন ব্যাংকের শাখা অফিস আক্রমণ করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, সদস্যা নারীদের নিগ্রহ করেছে। ২০১২ সালে ইউনূস উগান্ডায় সমকামীদের বিচারের সমালোচনা করে অন্য তিন নোবেলজয়ীর সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। এর জন্যও ইসলাম পন্থীরা ইউনূসকে ‘ধর্মত্যাগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশে সভা সমাবেশও করে। কিন্তু আজ দু’জনে দুজনার!

ইউনূসের ২০০৭ সালের ‘নাগরিক শক্তি’ দলের আদর্শের মাঝে ছিলো ধর্ম নিরপেক্ষতা, আর আজ তার নতুন দল ‘নাগরিক পার্টি‘ সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার লড়াই করছে। নাগরিক শক্তির আদর্শের মাঝে ছিলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। আর আজ নাগরিক পার্টি দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামাতের কোলেই শুধু নয়; জামাত তাদের চালিকা শক্তি। এ যেন ২০০৭ এর ‘দেবতা’ ২০২৫ এ এসে ‘দানব’। ইউনূস তার প্রতিহিংসা চরিতার্থে সফল হয়েছেন, কিন্তু তাঁর চেয়ে বেশি সফল হয়েছে উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি। দুনিয়ার কোনো দেশে নিজ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে এমন কোনো দল জামাতের মতো ক্ষমতার কাছাকাছি নেই। গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ যদি ইসলামপন্থীদের এমনকি ধর্মীয় উগ্রবাদীদেরও সমর্থন করে তাদের সঙ্গে রাজনীতি ও যুক্তির লড়াই চলবে। তারা সমাজে বিভাজন চাপিয়ে দিতে চাইলে তখন প্রতিরোধও কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে। সর্বাত্মক প্রতিরোধই হবে সেই সময়ের ডাক। কিন্তু দেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধিতা শুধু নয় হানাদার বাহিনীর মন্ত্রীসভায় জায়গা নিয়ে, তাদের অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে বাঙালি নিধন, সংখ্যালঘু নিধন, মুক্তিযোদ্ধা নিধন, নারী ধর্ষন ও খুনের অপরাধী দল তাদের দলীয় ফোরামে প্রস্তাব নিয়ে এবং প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্তে নৈতিক ও আইনগতভাবে জায়গা নিতে পারে না— তা সে দল সংগঠনগত ও আর্থিকভাবে যত শক্তিশালীই হোক না কেন। আর যুদ্ধ অপরাধী দল হিসেবে জামায়াত ইসলামকে আজ অব্দি কিভাবে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার বাইরে আছে সে জবাব বর্তমান অতীত সব শাসকদেরকেই দিতে হবে। 

ইউনূস ক্ষমতায় থেকে ব্যবসায়ী (তার ভাষায় সামাজিক ব্যবসা) হিসাবেও সফল হয়েছেন। অনেকে বলেন, ইউনূস গ্রামীণের নামে ৪,০০০ কোটি টাকার একচেটিয়া ব্যবসা করিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রামীণের বকেয়া ছিল ৬৬৬ কোটি টাকা। ইউনূস ক্ষমতায় এসেই সেটা প্রথমে মওকুব করিয়েছেন। গত তিন-চার মাসের মধ্যে গ্রামীণের নামেই তিন-চারটি লাইসেন্স নিয়েছেন। গ্রামীণ জনশক্তি রপ্তানি, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। অর্থাৎ, তার সরকারই তার সংস্থাকে বিবিধ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। কেমন নীতিবান নোবেল লরিয়েট! আর বিদায়ের আগে গোপন চুক্তি করে তিনি দেশটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়ে গেলেন মার্কিনী স্বার্থের কাছে। এমন মার্কিনী বংশবদ বানিয়ে গেছেন যে আজ ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্বর হামলা, আগ্রাসন ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোনো সাহসী প্রতিবাদ বিবৃতি পর্যন্ত দিতে পারে না। জামাত সহ ইসলাম পছন্দ দলগুলোও মিনমিন ভাষায় বিবৃতি দিচ্ছে। কোনো দেশ থেকে তেল আমদানি করার আগে বাংলাদেশ সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদনপত্র পাঠাতে হয়। হায়রে দ্বিতীয় স্বাধীনতা! আর এবার নাকি আমরা সভ্য হলাম!

তিনি ব্যবসা করছেন, করুন। কিন্তু একটা প্রজন্মকে বিশেষত তরুণদের একটা অংশকে তিনি যে পথে (জামাতের পথে) নিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে বিনয়ী হওয়ার বিপরীতে উদ্ধত করে গেলেন— দেশের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কি হতে পারে? দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে ছাত্রদের একাংশের মাঝে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে, তারা আর শিক্ষকদের সালাম দেয় না; শিক্ষককেই নতজানু হয়ে ঐ সব ছাত্রকে সালাম দিতে হয়। শিক্ষক হেনস্তার যে রেকর্ড দেশে হয়েছে তা কলংকের মানে ‘গ্রীনিচ বুক অব রেকর্ডস’ এ জায়গা পেতে পারে। শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি?

এক যুগেরও বেশি সময়কাল গণতন্ত্রকে বন্দী করে রেখে, নানা কৌশলে নির্বাচন থেকে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে, নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বা অলিগার্কদের প্রভাব এবং আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকাকে প্রাধান্য দিয়ে, সামান্য কোটা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ সংঘঠিত করে ‘ডিপ স্টেইটকে’ রেজিম চেঞ্জের সুযোগ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বিদায় হলেন। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির দায় তো প্রধানত তাকেই নিতে হবে। 

আওয়ামী লীগ বিহীন একটি নির্বাচন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তাদের ক্ষমতায় আরোহনের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ এখনও পার হয় নি। তাই ডিপ স্টেইটের বাঁধন তারা ছিন্ন করতে পারছেন কিনা সে বিষয়ে এত তাড়াতাড়ি মন্তব্য নাই বা করলাম। বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে তাদের দলকে সমর্থন করেন না এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তারা নেবেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেয়া যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। 

দেশের মানুষের চাহিদা কিন্তু বেশি নয়। দলবাজির বিপরীতে দেশের মানুষ চায় দলনিরপেক্ষ প্রশাসন, দখলবাজদের হাত থেকে স্বস্তি। চায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কথা বলার, মত প্রকাশের ও সংগঠন করার মুক্ত পরিবেশ। ধনিক শ্রেণীর তেলা মাথায় বেশি বেশি তেল দিয়ে উপচেপড়া তেলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কোনোরকমে দিন গুজরান করবে— মানুষ এই অমানবিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। মানুষ চায় ন্যায্য কর্ম সংস্থান, আইনের শাসন, সুশাসন। বাংলাদেশের মানুষ আর দেবতা দেখতে চায় না, দানব তো নয়ই!

[ লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

(লেখকের নিজস্ব মত)

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬


হয় দেবতা না হয় দানব!

প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

জাতি হিসেবে আমরা আবেগী। সুড়ঙ্গ শেষের ক্ষীণ আলোক রেখা দেখেই মনে করি, এই বুঝি আলোঝলমল মুক্ত আকাশের নিচে পৌঁছে গেলাম। কিন্তু সে পর্যন্ত পৌঁছাতে যে কত খানাখন্দ, বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে হবে তা আর বিবেচনায় থাকে না। এই যেমন জুলাই আন্দোলনের সফলতার প্রথম পর্যায়ে ছাত্রনেতৃত্বের ভুলগুলোকে সমালোচনার চোখে দেখা হয়নি। বরং সবখানেই প্রশংসার জোয়ারে তাদেরকে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। তাদের পক্ষে এমনভাবে বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যেন তারা সব ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বয়ানটি পুরোপুরি বদলে গেছে। নেতৃত্বের একটা অংশের মনে গোপন এজেন্ডা থাকলেও সারা দেশে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রদের সামনে রাজনৈতিক দিশা না থাকায় খুব তাড়াতাড়ি তারা দিশাহীন হয়ে পড়েন। নানা গোষ্ঠী তাদের অনেককে ব্যবহার করতে শুরু করে। বদলিবাণিজ্য, তদবিরুবাণিজ্য, মব সহিংসতা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি- ধীরে ধীরে এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে অনেকে জড়িয়ে পড়তে থাকেন। যারা একদিন শ্লোগান তুলেছিলেন ‘দেশটা কারো বাপের নয়’ তাদের কারো কারো বক্তব্য শুনে ও কার্যক্রম দেখে মনে হয়েছিল দেশটা একান্তই তাদের বাপের। সমন্বয়ক নামটি কোথাও ভীতি সৃষ্টি আবার কোথাও উপহাসে পরিণত হয়। পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে যায় যে, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক কমিটি ছাড়া সারাদেশের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হয়। জুলাই অভ্যুত্থান দানবীয় মবতন্ত্রের পকেটস্থ হয়ে পড়ে। 

জুলাই আন্দোলনের পরে ৮ আগস্ট এক অলৌকিক বিভা নিয়ে ইউনূস যখন দেশে ফিরলেন তখন তো তিনি আলোর দিশারী! যিনি বাংলাদেশকে দুর্নীতি এবং কুশাসনের গহ্বর থেকে বের করে এক রূপকথার দেশে নিয়ে যেতে এসেছেন। মনে পড়ে পাকিস্তান আমলে সেই কৈশোরের দিনগুলোতে রাস্তার মোড়ে জেনারেল আইউব খানের ছবি সহ বিল বোর্ডে লেখা দেখতাম ‘ দি সেভিয়্যার হ্যাজ কাম টু সেইভ দি কান্ট্রি’। এস.এস.সি পরীক্ষার ইংরেজি প্রশ্নপত্রের রচনা অংশে ‘মাই ফেভারিট বুক’ কমন পড়ে যাওয়ায় শিক্ষকের শিখিয়ে দেয়ার মতো আইউব খানের আত্মজীবনীমূলক বই ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টারস’ রচনা লিখলাম। অথচ কৈশোর শেষ হওয়ার আগেই চোখের সামনে দেখলাম দেবতা বেশে আসা বন্ধু শুধু শত্রু নয় দানবের বেশেই বিদায় নিলেন। 

বিমানবন্দরে নেমেই ইউনূস বললেন, ‘কোনো রকম প্রতিহিংসামূলক কাজ করা যাবে না। আমার ওপর যদি আস্থা এবং বিশ্বাস রাখেন, তা হলে এটা নিশ্চিত করতে হবে। কারও ওপরে কোনো রকম হামলা করা যাবে না। বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। আমাদের সারা বাংলাদেশ একটা পরিবার। যারা বিপথে গিয়েছিলেন তাদেরও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কথা মানতে হবে। যদি না মানেন তবে এখানে আমার প্রয়োজন নেই, আমাকে বিদায় দেন।’ একেবারে দেবতাসম চরিত্র!

সেই তিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ গ্রহণের চার দিন পরে একটি সাংবাদিক বৈঠক করে বললেন, ‘আমি ছাত্রদের বলেছি, আপনাদের সম্মান করি। আর আপনারা আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন বলেই এই দায়িত্ব আমি গ্রহণ করেছি।’ এর পরেই ইউনূস বলেন, ‘অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এসেছে। দানবী বিদায় নিয়েছে দেশ থেকে।’ এই শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করে ইউনূস ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে দিলেন সবখানে, সারাদেশে। দেশ জুড়ে নতুন গতি পেলো মবউল্লম্ফন আর প্রতিপক্ষ ও কাল্পনিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা নির্যাতন এবং অবশেষে খুনের মামলা দিয়ে আটক। গণঅভ্যুত্থান বন্দী হয়ে পড়ে দানবীয় মব সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কাছে। যেন জুলুম জবরদস্তি প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের মধ্যেই নিহিত ছিল জুলাইয়ের অভিপ্রায়, যেন এভাবেই ন্যায্যতা ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়!

ইউনূস ঘোষিত ‘দানবী’ তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কিন্তু তার সম্পর্ক একটা সময় পর্যন্ত ভালোই ছিলো। ১৯৯৭ সালের ২-৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ক্ষুদ্রঋত সম্মেলনে যৌথ সভাপতি হিসেবে ইউনূসই শেখ হাসিনাকে মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিন্টনের সঙ্গে একত্রে দায়িত্ব দেন। হাসিনা তার বক্তব্যে "অধ্যাপক ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের অসামান্য কাজের" প্রশংসা করেন। তিনি বলেন "গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য দরিদ্রদের ক্ষুদ্রঋত প্রদানে নিযুক্ত ব্যাংকগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে আশাবাদ তৈরি করেছে"। ইউনূসও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এবং নারী ক্ষমতায়নে তাঁর অবদানের প্রশংসা করে বক্তব্য দেন। 

একটি দেশের কোনো নাগরিকের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি শুধু প্রাপকের গর্বের বিষয় নয়, তাঁর দেশের জন্যও গৌরবের। কিন্তু ২০০৬ সালের নোবেলে আমাদের কপাল পুড়লো! দেশে বিতর্ক শুরু হলো অর্থনীতিতে অবদান রেখে শান্তিতে নোবেল কেনো? এদিকে নোবেল লরিয়টও শুধু নোবেল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকলেন না। ২০০৬ সালের শেষ দিকে রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্েয তিনি বছরের প্রথমার্ধ থেকেই দেশের প্রথিতযশা কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে পরবর্তী নির্বাচনে সৎ প্রার্থীদের নির্বাচিত করার এক কর্মসূচি নিয়ে জেলায় জেলায় নাগরিক সভা শুরু করেন। এরই মাঝে আসে এক এগারো যাকে ডিপ স্টেইট কাঠামোরই বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। 

প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে গুরুতর অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতার ফলে সৃষ্ট নৈরাজ্য এবং শাসকদলের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার নানামুখী প্রচেষ্টার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামো তথা সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে নিয়ে নেয়। এক এগারোর সরকার বা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ডিপ স্টেইটের ভূমিকার একটি স্থানীয় সংস্করণ হিসেবে অভিহিত করা যায়। এই পরিবর্তনে পরাশক্তিগুলোরও এক ধরনের মৌন বা প্রত্যক্ষ সমর্থন বিদ্যমান ছিল। আবার সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবে দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এমন ভাবমূর্তি সৃষ্টি করে মনে হয় যেন দেবতার আবির্ভাব হয়েছে। 

এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে এক এগারো কিন্তু মানুষের মাঝে প্রাথমিকভাবে স্বস্তি নিয়ে আসায় জনসমর্থনও পেয়েছিলো। এরই মাঝে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। মজার বিষয় হচ্ছে ‘ দিল্লির জিনিজর’ থেকে দেশকে মুক্ত করার অবিরাম যোদ্ধা ইউনূস এ ঘোষণার আগে জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে ভারত সফরে যান। সে সফরে অধ্যাপক ইউনূস ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং ৩১ জানুয়ারি দিল্লীতে এক সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, দেশের পরিস্থিতি ‘বাধ্য করলে’ তিনি রাজনীতিতে ‘যোগ দেবেন’। দিল্লিতে বসে রাজনীতিতে যোগ দেয়ার সময় তিনি সম্ভবত শ্লোগানটি ভুলে গিয়েছিলেন, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’!

দেশে ফিরে ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক ইউনূস পত্রিকার মাধ্যমে দেশের মানুষের উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল কীভাবে গঠন করা যায়, কিভাবে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচনে মনোনীত করা যায় - এসব বিষয় নিয়ে তিনি মানুষের মতামত এবং পরামর্শ জানতে চান। আর এক চিঠিতে তিনি বলেন তার দলের মূল শ্লোগান হবে এগিয়ে চলো বাংলাদেশ। আর দলের নীতি ও আদর্শ হবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং দুর্নীতি ও দলীয়করণ মুক্ত প্রশাসন। পাঠক লক্ষ্য করুন দেড় যুগ আগে ইউনূসের দল ‘নাগরিক জনশক্তি’র নীতি ও আদর্শে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। দেবতাই বটে!

অধ্যাপক ইউনূস যখন রাজনীতিতে আসার প্রক্রিয়া শুরু করেন তখন সেটির কড়া সমালোচনা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘যারা রাজনীতিতে নতুন আসে তারা ভয়ঙ্কর হয়। তাদের তৎপরতা সন্দেহ করার মতো। তারা জাতির ভালো করার পরিবর্তে আরও বেশি খারাপ করে।’ ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ফজলুল হক আমিনী আরও কঠোর মন্তব্য করে বলেন, ‘ড. ইউনুস দেশ, জাতি ও ইসলামের শত্রু।’ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হবার পরে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে জোরেশোরে চেষ্টা করেছিল। অধ্যাপক ইউনূস সেনা সমর্থিত সরকারের সমর্থন নিয়ে সে পরিস্থিতিরই সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এসে মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। সে পরিস্থিতিতে ইউনূস দল ঘোষণার তিন মাস পরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফকরুদ্দিনের সঙ্গে এক বৈঠকের পরে ঘোষণা করেন রাজনৈতিক দল করা তার কাজ নয়। 

২০০৭ সালে যেটা তার কাজ না বলেছিলেন বা ব্যর্থ হয়েছিলেন সে কাজে তিনি সফল হলেন দেড় যুগ পরে এসে ইসলামপন্থীদের সহযোগিতায়। তবে এর আগে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিলো না। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋত কার্যক্রমে ব্যাপক সংখ্যায় নারীদের অংশগ্রহণ ইসলাম পন্থীরা বা তার বর্তমান মিত্র জামাত কখনোই ভালো চোখে দেখে নাই। দেশের বহু স্থানে একসময় জামাত- শিবিরের কর্মীরা গ্রামীন ব্যাংকের শাখা অফিস আক্রমণ করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, সদস্যা নারীদের নিগ্রহ করেছে। ২০১২ সালে ইউনূস উগান্ডায় সমকামীদের বিচারের সমালোচনা করে অন্য তিন নোবেলজয়ীর সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন। এর জন্যও ইসলাম পন্থীরা ইউনূসকে ‘ধর্মত্যাগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে দেশে সভা সমাবেশও করে। কিন্তু আজ দু’জনে দুজনার!

ইউনূসের ২০০৭ সালের ‘নাগরিক শক্তি’ দলের আদর্শের মাঝে ছিলো ধর্ম নিরপেক্ষতা, আর আজ তার নতুন দল ‘নাগরিক পার্টি‘ সংবিধান থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার লড়াই করছে। নাগরিক শক্তির আদর্শের মাঝে ছিলো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন। আর আজ নাগরিক পার্টি দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামাতের কোলেই শুধু নয়; জামাত তাদের চালিকা শক্তি। এ যেন ২০০৭ এর ‘দেবতা’ ২০২৫ এ এসে ‘দানব’। ইউনূস তার প্রতিহিংসা চরিতার্থে সফল হয়েছেন, কিন্তু তাঁর চেয়ে বেশি সফল হয়েছে উগ্র ধর্মান্ধ শক্তি। দুনিয়ার কোনো দেশে নিজ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছে এমন কোনো দল জামাতের মতো ক্ষমতার কাছাকাছি নেই। গণতান্ত্রিক দেশে মানুষ যদি ইসলামপন্থীদের এমনকি ধর্মীয় উগ্রবাদীদেরও সমর্থন করে তাদের সঙ্গে রাজনীতি ও যুক্তির লড়াই চলবে। তারা সমাজে বিভাজন চাপিয়ে দিতে চাইলে তখন প্রতিরোধও কর্তব্য হয়ে দাঁড়াবে। সর্বাত্মক প্রতিরোধই হবে সেই সময়ের ডাক। কিন্তু দেশের জন্মযুদ্ধের বিরোধিতা শুধু নয় হানাদার বাহিনীর মন্ত্রীসভায় জায়গা নিয়ে, তাদের অক্সিলিয়ারি ফোর্স হিসেবে বাঙালি নিধন, সংখ্যালঘু নিধন, মুক্তিযোদ্ধা নিধন, নারী ধর্ষন ও খুনের অপরাধী দল তাদের দলীয় ফোরামে প্রস্তাব নিয়ে এবং প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা না করে দেশের রাজনৈতিক বন্দোবস্তে নৈতিক ও আইনগতভাবে জায়গা নিতে পারে না— তা সে দল সংগঠনগত ও আর্থিকভাবে যত শক্তিশালীই হোক না কেন। আর যুদ্ধ অপরাধী দল হিসেবে জামায়াত ইসলামকে আজ অব্দি কিভাবে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার বাইরে আছে সে জবাব বর্তমান অতীত সব শাসকদেরকেই দিতে হবে। 

ইউনূস ক্ষমতায় থেকে ব্যবসায়ী (তার ভাষায় সামাজিক ব্যবসা) হিসাবেও সফল হয়েছেন। অনেকে বলেন, ইউনূস গ্রামীণের নামে ৪,০০০ কোটি টাকার একচেটিয়া ব্যবসা করিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে গ্রামীণের বকেয়া ছিল ৬৬৬ কোটি টাকা। ইউনূস ক্ষমতায় এসেই সেটা প্রথমে মওকুব করিয়েছেন। গত তিন-চার মাসের মধ্যে গ্রামীণের নামেই তিন-চারটি লাইসেন্স নিয়েছেন। গ্রামীণ জনশক্তি রপ্তানি, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। অর্থাৎ, তার সরকারই তার সংস্থাকে বিবিধ সুবিধা পাইয়ে দিয়েছে। কেমন নীতিবান নোবেল লরিয়েট! আর বিদায়ের আগে গোপন চুক্তি করে তিনি দেশটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে দিয়ে গেলেন মার্কিনী স্বার্থের কাছে। এমন মার্কিনী বংশবদ বানিয়ে গেছেন যে আজ ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্বর হামলা, আগ্রাসন ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কোনো সাহসী প্রতিবাদ বিবৃতি পর্যন্ত দিতে পারে না। জামাত সহ ইসলাম পছন্দ দলগুলোও মিনমিন ভাষায় বিবৃতি দিচ্ছে। কোনো দেশ থেকে তেল আমদানি করার আগে বাংলাদেশ সরকারকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদনপত্র পাঠাতে হয়। হায়রে দ্বিতীয় স্বাধীনতা! আর এবার নাকি আমরা সভ্য হলাম!

তিনি ব্যবসা করছেন, করুন। কিন্তু একটা প্রজন্মকে বিশেষত তরুণদের একটা অংশকে তিনি যে পথে (জামাতের পথে) নিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে বিনয়ী হওয়ার বিপরীতে উদ্ধত করে গেলেন— দেশের জন্য এর চেয়ে বড় ক্ষতি আর কি হতে পারে? দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে ছাত্রদের একাংশের মাঝে এমন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে, তারা আর শিক্ষকদের সালাম দেয় না; শিক্ষককেই নতজানু হয়ে ঐ সব ছাত্রকে সালাম দিতে হয়। শিক্ষক হেনস্তার যে রেকর্ড দেশে হয়েছে তা কলংকের মানে ‘গ্রীনিচ বুক অব রেকর্ডস’ এ জায়গা পেতে পারে। শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি?

এক যুগেরও বেশি সময়কাল গণতন্ত্রকে বন্দী করে রেখে, নানা কৌশলে নির্বাচন থেকে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে, নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বা অলিগার্কদের প্রভাব এবং আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকাকে প্রাধান্য দিয়ে, সামান্য কোটা বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞ সংঘঠিত করে ‘ডিপ স্টেইটকে’ রেজিম চেঞ্জের সুযোগ করে দিয়ে শেখ হাসিনা বিদায় হলেন। এ পরিস্থিতি সৃষ্টির দায় তো প্রধানত তাকেই নিতে হবে। 

আওয়ামী লীগ বিহীন একটি নির্বাচন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। বিএনপি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তাদের ক্ষমতায় আরোহনের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ এখনও পার হয় নি। তাই ডিপ স্টেইটের বাঁধন তারা ছিন্ন করতে পারছেন কিনা সে বিষয়ে এত তাড়াতাড়ি মন্তব্য নাই বা করলাম। বিএনপিকে এটা বিবেচনায় রাখতে হবে তাদের দলকে সমর্থন করেন না এমন বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন এই আশা নিয়ে যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা এবার দেশ পরিচালনা করবেন। দেশের জন্মযুদ্ধ বিরোধী শক্তির কাছে এবার অন্তত নত হবেন না। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে আগের মতো একতরফা বয়ান না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেই সামরিক নেতৃত্বকে মর্যাদা দেয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তারা নেবেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বহুমাত্রিকতাকে স্বীকৃতি দেয়া যা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন সেটা বিএনপি নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলে বিভাজনের শক্তি ও উগ্রপন্থা পরাজিত হবে। 

দেশের মানুষের চাহিদা কিন্তু বেশি নয়। দলবাজির বিপরীতে দেশের মানুষ চায় দলনিরপেক্ষ প্রশাসন, দখলবাজদের হাত থেকে স্বস্তি। চায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, কথা বলার, মত প্রকাশের ও সংগঠন করার মুক্ত পরিবেশ। ধনিক শ্রেণীর তেলা মাথায় বেশি বেশি তেল দিয়ে উপচেপড়া তেলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কোনোরকমে দিন গুজরান করবে— মানুষ এই অমানবিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। মানুষ চায় ন্যায্য কর্ম সংস্থান, আইনের শাসন, সুশাসন। বাংলাদেশের মানুষ আর দেবতা দেখতে চায় না, দানব তো নয়ই!

[ লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

(লেখকের নিজস্ব মত)


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত