সুনামগঞ্জের দিগন্তজোড়া ১৩৭টি হাওর। প্রতি বছর চৈত্র-বৈশাখ মাসে বোরো ফসলে ভরে ওঠে এ জনপদ। ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমির এই ফসল আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে প্রতি বছর সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মাণ করে হাজার কিলোমিটার মাটির `ডুবন্ত বাঁধ'।
কিন্তু বর্ষা আসতেই সেই কোটি কোটি টাকার মাটি মিশে যায় পানিতে। একদিকে বাঁধের টাকা যেমন জলে যাচ্ছে, অন্যদিকে সেই মাটিতেই ভরাট হচ্ছে নদী। যা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে হাওরের পরিবেশ ও কৃষি অর্থনীতিকে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি বছরই বাঁধের বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ছে। ২০১৮ সালে যেখানে ব্যয় হয়েছিল ৮০ কোটি টাকা, চলতি বছরে তা দাঁড়িয়েছে ১৪৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ গত কয়েক বছরে বরাদ্দের অঙ্ক প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
বিগত কয়েক বছরের চিত্র বলছে, শুকনো মৌসুমে মাটির স্তূপ দিয়ে যে বাঁধ বানানো হয়, বর্ষার ঢলে তার সিংহভাগই নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
জামালগঞ্জ উপজেলার কামিনীপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল হান্নান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে সুরমা-বৌলাই নদীতে চৈত্র মাসেও ২০-৩০ হাত পানি থাকত। এখন সেখানে নৌকা আটকে যায়। নদী ভরাট হওয়ায় হাওরের পানি নামার জায়গা পায় না। নদী খনন না করে কেবল বাঁধ দিলে সমাধান হবে না।’
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর বাঁধের মাটি ও পাহাড় থেকে আসা পলি নদীর তলদেশ ভরাট করে দিচ্ছে। ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই হাওর প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়ের মতে, এই বাঁধ নির্মাণ প্রক্রিয়াটি ‘অপরিকল্পিত’।
তিনি বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে মাটি ফেলা হয়, তা নদীতে গিয়ে মিশছে। নদী খননের উদ্যোগ নেই, অথচ অকার্যকর বাঁধে সরকার টাকা ঢালছে।’
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা এটিকে ‘অবৈজ্ঞানিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ২০১৭ সাল থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও কোনো গবেষণা ছাড়াই বাঁধ দেওয়ায় জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মো. মামুন হাওলাদার দাবি করেন, প্রতিটি বাঁধ সমীক্ষা করেই করা হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে স্থায়ী সমাধান নদী খননেই নিহিত।
তিনি জানান, ১৩টি নদীর ৩০৩ কিলোমিটার খননের জন্য ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প প্রস্তাবনা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাইাধীন রয়েছে।
এদিকে প্রতি বছরের মতো এবারও সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা। জেলার অর্ধেক হাওরের বোরো ফসল এখন জলাবদ্ধতার শিকার। ২০২৪ সালেও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে স্লুইসগেট নির্মাণের দাবি উঠেছিল। তখন কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলেও কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এবারও বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় হাওরপাড়ের কৃষকেরা চরম উদ্বেগ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা ছাড়া কেবল মাটির বাঁধ দিয়ে এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না—এটাই এখন রূঢ় বাস্তবতা।
আপনার মতামত লিখুন