সংবাদ

জামায়াত এমপির প্রকল্পে ‘পরিবারতন্ত্র’, ক্ষোভ তৃণমূলে


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রংপুর
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, রংপুর
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম

জামায়াত এমপির প্রকল্পে ‘পরিবারতন্ত্র’, ক্ষোভ তৃণমূলে
তুলারামপুরে গ্রামের রাস্তা ইট দিয়ে সলিং করার আগেই অর্ধেক বরাদ্দ উত্তোলন। ইনসেটে জামায়াতের এমপি মো. নুরল আমিন।

রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের জামায়াতের জাতীয় সংসদ সদস্য মো. নুরল আমিনের অনুকূলে বরাদ্দ হওয়া টিআর, কাবিখা ও কাবিটা’র একাধিক প্রকল্পে ভাগিনা ভগ্নিপতিসহ তার স্বজনদের প্রকল্পের সভাপতি বানিয়ে কাজ শুরু করেই বরাদ্দের অর্ধেক চাল ও নগদ অর্থ উত্তোলন করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ জামায়াতের তৃণমুল পর্যায়ের নেতা কর্মীরা।

পীরগঞ্জ উপজেলা পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের টেস্ট রিলিফ (টিআর) প্রকল্পের জন্য ৩০ লাখ টাকা কাবিটার ২৫ লাখ টাকা ও কাবিখা প্রকল্পের জন্য ৪০ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য সরকারের বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছেন সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন। তার সংসদীয় আসনে বিভিন্ন এলাকায় টিআরের (নগদ অর্থ) ১৪টি, কাবিটার ১১টি ও কাবিখার ৫টিসহ মোট ৩০টি প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ বিভাজন করে প্রকল্প দাখিল করা হয় তার স্বাক্ষরে।

তবে প্রকল্পের কাজ শুরু না করেই বরাদ্দকৃত অর্থ ও খাদ্য শস্যের অর্ধেক উত্তোলন করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। খবরটি জানাজানি হওয়ায় পীরগঞ্জ উপজেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ফাঁস হয়ে পড়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. নুরল আমিনের ভাগিনা, ভগ্নিপতিসহ স্বজনদের নাম।

পিআইও ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পীরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের তুলারামপুর গ্রামে এমপি’র বিশেষ বরাদ্দের দুটি প্রকল্পের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। একটি কাবিখা প্রকল্পে-১০ মেট্রেক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দে তুলারামপুরে ইয়াকুব আলীর বাড়ির সামনে ওয়াক্তিয়া নামাজ ঘর উন্নয়ন ও মাঠে মাটি ভরাটকরণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের সভাপতি হয়েছেন জামায়াত এমপির চাচাতো বোনের স্বামী ভগ্নিপতি ইয়াকুব আলী। 

অপর প্রকল্পটি একই গ্রামের ইয়াকুবের বাড়ি থেকে মশফিকের বাড়িগামী রাস্তা সলিং করণ, ইয়াকুবের পুকুরপাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণ ও মাটি ভরাট। এ প্রকল্পের সভাপতি হয়েছেন সালমান শরিফ শাওন। যিনি অন্য প্রকল্পের সভাপতি ইয়াকুব আলীর ছেলে। এই দুই প্রকল্পের সভাপতি পিতা-পুত্র। তারা দু’জনই এমপির ভাগ্নে ও ভগ্নিপতি। 

এছাড়াও অন্যান্য প্রকল্পে নিকট আত্মীয়, দলীয় বিভিন্ন পদের নেতা-কর্মীদের সভাপতি করা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে এমপির নিজের অত্মীয় স্বজনদের। কিছু প্রকল্প জামায়াত দলীয় নেতাকর্মীদের নামে। যারা এমপির অত্যন্ত আস্থাভাজন। 

বিষয়টি জানাজানি হলে সর্বত্র আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। এ ব্যাপারে তুলারামপুর গ্রামের বাসিন্দা মুকুল মিয়া জানান, একই ওয়াক্তিয়া ঘরের জন্য একাধিক প্রকল্পে এমপি তার বোনজামাইকে রাখাসহ ভাগ্নে প্রকল্প সভাপতি করায় তার সঠিক বাস্তবায়ন কেমন হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

একই গ্রামের মঞ্জু মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তুলারামপুর গ্রামে পুরতান জামে মসজিদ রয়েছে। যেখানে নিয়মিত শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। মসজিদটির উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হলেও সেখানে কোনো বরাদ্দ না দিয়ে স্বজনপ্রীতি করে এমপি তার আত্মীয়-স্বজনদের প্রকল্প দিয়েছেন।

অপরদিকে, প্রকল্পের সভাপতি জামায়াত এমপির ভগ্নিপতি ইয়াকুব আলী বলেন, “প্রকল্পে কত টাকা বা কী বরাদ্দ আছে, সেটা আমি জানি না। অফিস থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে, তাই কাজ করছি।”

অপর প্রকল্পের সভাপতি সালমান শরিফ বলেন, ‘এমপি সম্পর্কে আমার মামা হয়। সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। আমরা শতভাগ কাজ করব। প্রকল্পের একটি টাকাও মেরে খাব না। কাজ যাতে স্বচ্ছ হয়, এ জন্য আমাদের দিছে। কাজে অনিয়ম হলে তো জামায়াত থেকে আগে ধরবে। আমার বাবা জামায়াতের ওয়ার্ড সেক্রেটারি।’

এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে পীরগঞ্জ পৌর জামায়াতের এক নেতা বলেন, ভাগনে ও ভগ্নিপতির নামে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি সত্য। এটা লুকিয়ে রাখার কিছু নেই। দুই–চার দিন পর হলেও সেটা উন্মোচন হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজ বলেন, দুই প্রকল্পের একটিতে ১০ টন, একটিতে ৮ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দের অর্ধেক ছাড় করানো হয়েছে। এমপির ভাগনে হোক আর ভগ্নিপতি হোক, যেই হোক না কেন কাজ দেখে বাকি বরাদ্দ ছাড় করা হবে।

অপরদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, কাজ না করে খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ নেই। কাজ বুঝে নিয়ে বরাদ্দ ছাড় করা হবে।

এদিকে, জিআর প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার এই প্রকল্পের বরাদ্দ দেয়া শুরু হয়েছে বলে পিআইও দপ্তর সুত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনকে বেশ কয়েকবার কল করা হলে “পরে কথা হবে” বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


জামায়াত এমপির প্রকল্পে ‘পরিবারতন্ত্র’, ক্ষোভ তৃণমূলে

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬

featured Image

রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের জামায়াতের জাতীয় সংসদ সদস্য মো. নুরল আমিনের অনুকূলে বরাদ্দ হওয়া টিআর, কাবিখা ও কাবিটা’র একাধিক প্রকল্পে ভাগিনা ভগ্নিপতিসহ তার স্বজনদের প্রকল্পের সভাপতি বানিয়ে কাজ শুরু করেই বরাদ্দের অর্ধেক চাল ও নগদ অর্থ উত্তোলন করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ জামায়াতের তৃণমুল পর্যায়ের নেতা কর্মীরা।

পীরগঞ্জ উপজেলা পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের টেস্ট রিলিফ (টিআর) প্রকল্পের জন্য ৩০ লাখ টাকা কাবিটার ২৫ লাখ টাকা ও কাবিখা প্রকল্পের জন্য ৪০ মেট্রিক টন খাদ্য শস্য সরকারের বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছেন সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন। তার সংসদীয় আসনে বিভিন্ন এলাকায় টিআরের (নগদ অর্থ) ১৪টি, কাবিটার ১১টি ও কাবিখার ৫টিসহ মোট ৩০টি প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ বিভাজন করে প্রকল্প দাখিল করা হয় তার স্বাক্ষরে।

তবে প্রকল্পের কাজ শুরু না করেই বরাদ্দকৃত অর্থ ও খাদ্য শস্যের অর্ধেক উত্তোলন করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। খবরটি জানাজানি হওয়ায় পীরগঞ্জ উপজেলা জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ফাঁস হয়ে পড়ে জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. নুরল আমিনের ভাগিনা, ভগ্নিপতিসহ স্বজনদের নাম।

পিআইও ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পীরগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের তুলারামপুর গ্রামে এমপি’র বিশেষ বরাদ্দের দুটি প্রকল্পের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। একটি কাবিখা প্রকল্পে-১০ মেট্রেক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দে তুলারামপুরে ইয়াকুব আলীর বাড়ির সামনে ওয়াক্তিয়া নামাজ ঘর উন্নয়ন ও মাঠে মাটি ভরাটকরণ প্রকল্প। এই প্রকল্পের সভাপতি হয়েছেন জামায়াত এমপির চাচাতো বোনের স্বামী ভগ্নিপতি ইয়াকুব আলী। 

অপর প্রকল্পটি একই গ্রামের ইয়াকুবের বাড়ি থেকে মশফিকের বাড়িগামী রাস্তা সলিং করণ, ইয়াকুবের পুকুরপাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণ ও মাটি ভরাট। এ প্রকল্পের সভাপতি হয়েছেন সালমান শরিফ শাওন। যিনি অন্য প্রকল্পের সভাপতি ইয়াকুব আলীর ছেলে। এই দুই প্রকল্পের সভাপতি পিতা-পুত্র। তারা দু’জনই এমপির ভাগ্নে ও ভগ্নিপতি। 

এছাড়াও অন্যান্য প্রকল্পে নিকট আত্মীয়, দলীয় বিভিন্ন পদের নেতা-কর্মীদের সভাপতি করা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ প্রকল্পের সভাপতি করা হয়েছে এমপির নিজের অত্মীয় স্বজনদের। কিছু প্রকল্প জামায়াত দলীয় নেতাকর্মীদের নামে। যারা এমপির অত্যন্ত আস্থাভাজন। 

বিষয়টি জানাজানি হলে সর্বত্র আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। এ ব্যাপারে তুলারামপুর গ্রামের বাসিন্দা মুকুল মিয়া জানান, একই ওয়াক্তিয়া ঘরের জন্য একাধিক প্রকল্পে এমপি তার বোনজামাইকে রাখাসহ ভাগ্নে প্রকল্প সভাপতি করায় তার সঠিক বাস্তবায়ন কেমন হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

একই গ্রামের মঞ্জু মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তুলারামপুর গ্রামে পুরতান জামে মসজিদ রয়েছে। যেখানে নিয়মিত শতাধিক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। মসজিদটির উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হলেও সেখানে কোনো বরাদ্দ না দিয়ে স্বজনপ্রীতি করে এমপি তার আত্মীয়-স্বজনদের প্রকল্প দিয়েছেন।

অপরদিকে, প্রকল্পের সভাপতি জামায়াত এমপির ভগ্নিপতি ইয়াকুব আলী বলেন, “প্রকল্পে কত টাকা বা কী বরাদ্দ আছে, সেটা আমি জানি না। অফিস থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে, তাই কাজ করছি।”

অপর প্রকল্পের সভাপতি সালমান শরিফ বলেন, ‘এমপি সম্পর্কে আমার মামা হয়। সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। আমরা শতভাগ কাজ করব। প্রকল্পের একটি টাকাও মেরে খাব না। কাজ যাতে স্বচ্ছ হয়, এ জন্য আমাদের দিছে। কাজে অনিয়ম হলে তো জামায়াত থেকে আগে ধরবে। আমার বাবা জামায়াতের ওয়ার্ড সেক্রেটারি।’

এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে পীরগঞ্জ পৌর জামায়াতের এক নেতা বলেন, ভাগনে ও ভগ্নিপতির নামে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি সত্য। এটা লুকিয়ে রাখার কিছু নেই। দুই–চার দিন পর হলেও সেটা উন্মোচন হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আব্দুল আজিজ বলেন, দুই প্রকল্পের একটিতে ১০ টন, একটিতে ৮ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দের অর্ধেক ছাড় করানো হয়েছে। এমপির ভাগনে হোক আর ভগ্নিপতি হোক, যেই হোক না কেন কাজ দেখে বাকি বরাদ্দ ছাড় করা হবে।

অপরদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, কাজ না করে খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করার কোনো সুযোগ নেই। কাজ বুঝে নিয়ে বরাদ্দ ছাড় করা হবে।

এদিকে, জিআর প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার এই প্রকল্পের বরাদ্দ দেয়া শুরু হয়েছে বলে পিআইও দপ্তর সুত্রে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে রংপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনকে বেশ কয়েকবার কল করা হলে “পরে কথা হবে” বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত