জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির এক ভয়াবহ চালচিত্র তুলে ধরেন।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি বিগত ১৬ বছরের অপশাসন, ভ্রান্ত নীতি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চলা লাগামহীন লুটপাটের বিশদ খতিয়ান পেশ করেন।
অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান, বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকার কেবল অর্থনীতিকেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়নি, বরং দেশের প্রতিটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়ে গেছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের সময় যে দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে মূল সূচকগুলোকে ইতিবাচক ধারায় আনা হয়েছিলো, গত ১৬ বছরে তা ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থাৎ ৭.১৭ শতাংশে। কিন্তু পরবর্তীতে ভয়াবহ দুর্বৃত্তায়নের কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে সেই প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশে নেমে আসে এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়।"
তিনি আরও যোগ করেন, ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের যে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। একইভাবে কৃষির প্রবৃদ্ধি ৫.৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৩.৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, যখন একটি অর্থনীতির শিল্প খাতের চালিকাশক্তি হারিয়ে যায়, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষিতে নিযুক্ত হওয়ায় দেশে ‘ছদ্ম-বেকারত্ব’ তীব্রতর হয়েছে এবং তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা আজ সীমিত।
সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও টাকার মান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০১-০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য ছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৯.৯৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র পুরো উল্টে গেছে এবং বিনিয়োগের ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যার ফলে বহিঃখাতের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হয়েছে।
মুদ্রার মানের করুণ দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, "২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭.২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে ১২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান অর্ধেক হয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।"
বাজেট ও মেগা প্রকল্পের সমালোচনা করে মন্ত্রী সংসদে জানান, আওয়ামী লীগ আমলে বাজেট ঘাটতির মান ছিল চরম প্রশ্নবিদ্ধ এবং মেগা প্রকল্পগুলো ছিল অতিমূল্যায়িত, যার সুফল জনগণ পায়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত 'শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি'র প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতেও দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে তিনি বলেন, "ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি ও ঋণখেলাপি বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতির মেরুদণ্ড আজ ধ্বংসের কিনারে। ২০০৫ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ১৩.৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.২০ শতাংশে। প্রকৃত চিত্র ঢাকতে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে ভুল তথ্য প্রদর্শন করা হয়েছে।"
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য শেষে সংসদে সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ 'গুমোট নীরবতা' বিরাজ করে।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ এপ্রিল ২০২৬
জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির এক ভয়াবহ চালচিত্র তুলে ধরেন।
সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি বিগত ১৬ বছরের অপশাসন, ভ্রান্ত নীতি এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চলা লাগামহীন লুটপাটের বিশদ খতিয়ান পেশ করেন।
অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান, বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকার কেবল অর্থনীতিকেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়নি, বরং দেশের প্রতিটি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়ে গেছে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের সময় যে দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের মাধ্যমে মূল সূচকগুলোকে ইতিবাচক ধারায় আনা হয়েছিলো, গত ১৬ বছরে তা ধুলিস্যাৎ করা হয়েছে।
বিগত সরকারের আমলের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর বাস্তব চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অর্থাৎ ৭.১৭ শতাংশে। কিন্তু পরবর্তীতে ভয়াবহ দুর্বৃত্তায়নের কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে সেই প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ শতাংশে নেমে আসে এবং মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছায়।"
তিনি আরও যোগ করেন, ২০০৫-০৬ সালে শিল্প খাতের যে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। একইভাবে কৃষির প্রবৃদ্ধি ৫.৭৭ শতাংশ থেকে কমে ৩.৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।
কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, যখন একটি অর্থনীতির শিল্প খাতের চালিকাশক্তি হারিয়ে যায়, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়। তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষিতে নিযুক্ত হওয়ায় দেশে ‘ছদ্ম-বেকারত্ব’ তীব্রতর হয়েছে এবং তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা আজ সীমিত।
সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও টাকার মান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০১-০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য ছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় ছিল জিডিপির ২৯.৯৪ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র পুরো উল্টে গেছে এবং বিনিয়োগের ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে, যার ফলে বহিঃখাতের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হয়েছে।
মুদ্রার মানের করুণ দশা তুলে ধরে তিনি বলেন, "২০০৫-০৬ সালে প্রতি ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৬৭.২ টাকা। ২০২৩-২৪ সালে তা ১১১ টাকা এবং ২০২৪-২৫ সালে ১২১ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ক্রমাগত অবচিতির কারণে ১৫ বছরে টাকার মান অর্ধেক হয়ে গেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।"
বাজেট ও মেগা প্রকল্পের সমালোচনা করে মন্ত্রী সংসদে জানান, আওয়ামী লীগ আমলে বাজেট ঘাটতির মান ছিল চরম প্রশ্নবিদ্ধ এবং মেগা প্রকল্পগুলো ছিল অতিমূল্যায়িত, যার সুফল জনগণ পায়নি।
তিনি উল্লেখ করেন, লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত 'শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি'র প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতেও দলীয়করণ ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে তিনি দাবি করেন। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে তিনি বলেন, "ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি ও ঋণখেলাপি বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতির মেরুদণ্ড আজ ধ্বংসের কিনারে। ২০০৫ সালে খেলাপি ঋণ ছিল ১৩.৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০.২০ শতাংশে। প্রকৃত চিত্র ঢাকতে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে ভুল তথ্য প্রদর্শন করা হয়েছে।"
অর্থমন্ত্রীর এই বক্তব্য শেষে সংসদে সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ 'গুমোট নীরবতা' বিরাজ করে।

আপনার মতামত লিখুন