সংবাদ

দুর্গোৎসবের ক্রম-বিবর্তন এবং অন্তর্নিহিত বার্তা


শেখর ভট্টাচার্য
শেখর ভট্টাচার্য
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০১ এএম

দুর্গোৎসবের ক্রম-বিবর্তন এবং অন্তর্নিহিত বার্তা
বাঙালি হিন্দুদের প্রাণের সঙ্গে, আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আনন্দোৎসবের নাম দুর্গাপূজা

শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের এক বৃহৎ উৎসব। বাঙালি হিন্দুদের প্রাণের সঙ্গে, আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আনন্দোৎসবের নাম দুর্গাপূজা। মহালয়ায় আগমনবার্তা জানিয়ে, ষষ্ঠীতে আরম্ভ হয়ে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী শেষে দশমীতে সিঁদুরখেলা ও বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব। হিন্দুদের এক বহুল আরাধ্যা ও জনপ্রিয় দেবী হলেন দুর্গা। সনাতন হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মা দুর্গার বাস হিমালয়ের কৈলাসে। দুর্গতি নাশের জন্য তিনি পৃথিবীতে নেমে আসেন পাঁচ দিনের জন্য।

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, অসুরদের রাজা মহিষাসুর তপস্যা করে ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গ কেড়ে নেয়। অসুর হলো অশুভ শক্তির প্রকাশ। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালে মহাত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা হয়ে দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাই হিন্দুধর্মাবলম্বীরা অশুভ শক্তির বিনাশ ও দুর্গতি নাশের আশায় শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিবছর দুর্গাপূজা করে থাকেন।

‘দুর্গা’ শব্দটি দুর্গ থেকে আগত। পুরাণমতে, দুর্গ নামক অসুরকে বধ করার জন্য তিনি দুর্গা। দুর্গা শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘অপরাজেয়’, ‘দুর্গম’। আবার দুর্গতিনাশিনী অর্থেও দুর্গা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। শশীভূষণ দাশগুপ্ত ভারতীয় শক্তিসাধনা নিয়ে গবেষণায় দুর্গা শব্দের উৎপত্তির স্তরগুলো পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন। তার মতে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, দুর্গা হলেন ‘দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’, অর্থাৎ দুর্গের রক্ষাকর্ত্রী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দুর্গা দশভুজা, দশপ্রহরণধারিণী, সিংহবাহিনী, মহিষাসুরমর্দিনী। দুর্গাপ্রতিমায় তাকে সেভাবেই দেখতে পাই। তিনি অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করছেন। আবার তিনি মাতৃস্বরূপা, শক্তির প্রতীক, সমগ্র জগতের মা। হিন্দুধর্মমতে, তিনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের শক্তি, মাতৃরূপ, পরম ব্রহ্মময়ী। তিনি সমস্ত সৃষ্টিসংসারকে মায়ের মতো আগলে রাখেন। হিন্দুধর্মের শাক্ত উপাসনা ও তন্ত্র শাখার প্রধান দেবী হলেন দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত শক্তির উপাসনা; মাতৃশক্তি ও নারীশক্তির উপাসনার উৎসব।

আবার এই বাংলাতেই কেবল তিনি সপরিবারে পূজিতা। ‘দুর্গা’ শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্‌বেদ ও অথর্ববেদে। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীরূপে দুর্গাকে প্রথম দেখা যায়। এ ছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতেও দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বেদে দুর্গা দেবী হিসেবে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। দুর্গাপূজা ও মহিষাসুরবধের কাহিনি—এসব কিছুই হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদে পাওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ দেবী হিসেবে দুর্গার আবির্ভাব হয় বৌদ্ধধর্ম-পরবর্তী যুগে; প্রথম মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্যে’ (৪০০ু৬০০ খ্রিস্টাব্দ), যা ৭০০ শ্লোকবিশিষ্ট ‘দুর্গাসপ্তশতী’ বা ‘চণ্ডী’ নামে পরিচিত। এখানেই রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের দুর্গাপূজার কাহিনি, মহিষাসুরবধ, শুম্ভ-নিশুম্ভ ও চণ্ড-মুণ্ডবধের কাহিনি পাওয়া যায়।

দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত থাকলেও ‘পৌরাণিক কাহিনি’ অনুযায়ী, ‘সত্যযুগে’ রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে’ আছে, দুর্গাপূজার ‘প্রথম প্রবর্তক’ ছিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’; দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন স্বয়ং ‘ব্রহ্মা’। তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন ‘মহাদেব’। ‘দেবীভাগবত পুরাণ’ অনুসারে, ‘ব্রহ্মার মানসপুত্র’ ‘মনু’ ‘ক্ষীরোদসাগরের তীরে’ দুর্গার আরাধনা করে বর লাভ করেছিলেন। এসব কাহিনি পুরাণের।

শাস্ত্র ও পুরাণ থেকে বেরিয়ে এসে মর্ত্যে, অর্থাৎ অবিভক্ত বাংলায়, দুর্গাপূজার আয়োজন প্রথম কে করেছিলেন, এ নিয়ে গবেষকদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। সবকিছুর প্রথম নিয়ে মানুষের মনে একটি কৌতূহল কাজ করে, অর্থাৎ ‘কে প্রথম প্রবর্তক’। দুর্গাপূজার ক্ষেত্রেও ‘কে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন’, তা নিয়ে আপামর জনগণের মধ্যে একটি কৌতূহল আছে। ‘পৌরাণিক মতে’ ‘সত্যযুগে’ ‘রাজা সুরথ’ এই পূজার প্রবর্তক। তেমনি ‘কলিযুগে’, অর্থাৎ আধুনিক যুগে, এই পূজার প্রবর্তক কে? তা নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই।

আনন্দের বিষয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত বিশ্বাস এবং বিভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে আধুনিক যুগে বাংলার মানচিত্রে প্রথম দুর্গাপূজাটি করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষে ‘রাজশাহীর তাহেরপুরের ভুঁইঞা রাজা’ ‘কংসনারায়ণ’। সেটা ‘তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে’—এটি হলো প্রচলিত বিশ্বাস। ‘কংসনারায়ণের’ পরে ‘ভাদুড়িয়ার রাজা’ ‘জগৎনারায়ণ’ দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, ‘কংসনারায়ণের’ পূজার ৩৮ বছর আগে ‘শেরশাহের’ কাছ থেকে ‘জায়গির’ পেয়ে ‘দামোদর নদে’র কোনো এক ধারে পূজা করেছিলেন ‘যশোচন্দ্র’ (১৫৪৫)।

‘খান চৌধুরী আমানতুল্লা’ সাহেব তার ‘কোচবিহারের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন—‘অহোমরাজের প্রতিভূগণ আসামে প্রত্যাবৃত হইয়া কামতারাজ্যের বিবিধ আচার-ব্যবহারের সংবাদ অহোমরাজের সমক্ষে প্রকাশ করিয়াছিলেন, কামতাপুরে দশভুজা দুর্গার মূর্তির আড়ম্বরযুক্ত পূজাপদ্ধতির বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অহোমরাজ নিজ রাজ্যে উক্ত পূজার প্রবর্তন করিয়াছিলেন।’

বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর হয়ে বলা যায়, সন-তারিখের বিচারে ‘রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের’ ‘মনুসংহিতার টীকাকার’, তথা ‘কুল্লুক ভট্ট’র পৌত্র ‘কংসনারায়ণ’ প্রবর্তিত দুর্গাপূজার (১৫৮০) ১৮ বছর আগে ‘মহারাজা নরনারায়ণ’ ‘কোচরাজ্যে’ দুর্গাপূজা করেছিলেন। যা বাংলার মানচিত্রের বাইরে প্রথম দুর্গাপূজা। (৬২৮)

দুর্গাপূজা আদিকালে ছিল রাজা-রাজড়াদের পূজা। সচ্ছল জমিদার কিংবা রাজাদের ছাড়া এ পূজা সাধারণের জন্য আয়োজন করা দুরূহ ছিল। দুর্গাপূজা কীভাবে উচ্চবিত্তদের মণ্ডপ থেকে সাধারণের কাছে এসেছিল, সেই গল্পটি বড় মধুর। দুর্গাপূজার সর্বজনীনতার সূচনা হয়েছিল ‘বারোয়ারি’ পূজার মাধ্যমে।

বারোয়ারি দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয় ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। বারোজন যুবক মিলে চাঁদা তুলে এ পূজা শুরু করেন। তারা দেখেন, দুর্গাপূজায় প্রচুর খরচ, যা সর্বসাধারণের সাধ্যের বাইরে। তাই তারা সর্বসাধারণের জন্য এ ‘একচালা’ প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করেন।

বারোজন বন্ধু বা ‘ইয়ার’ (ফারসিতে ‘ইয়ার’ মানে বন্ধু) মিলে এ পূজা আরম্ভ করায় একে বলা হয় বারোয়ারি দুর্গাপূজা। এরপর কালের বিবর্তনে দুর্গাপূজা বর্তমান সর্বজনীন রূপ নেয়। কালে কালে পূজার জৌলুশ বৃদ্ধিতে নিত্যনতুন অনুষঙ্গ যোগ হয়। আজকাল ঐতিহ্যবাহী একচালা ভেঙে বহুচালাবিশিষ্ট দুর্গাপূজা হয়। বাংলাদেশের কুমারটুলিগুলোতেও বিভিন্ন আঙ্গিকে নানা ঢঙের, নানা রূপের বৈচিত্র‍্যময় প্রতিমা নির্মাণ হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন পূজামণ্ডপে আলোকোজ্জ্বল দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের পূজাগুলো থিমের ভিত্তিতে না হলেও এর বর্ণিল ও আন্তরিক আয়োজন ভক্তদের হৃদয় হরণ করে। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন। এই ভূগ্রামের প্রধান শহরগুলো, বিশেষ করে লন্ডন, প্যারিস, টরন্টো, মন্ট্রিয়েল, নিউইয়র্ক, মিশিগানসহ পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাংলাদেশ। এসব বনলতাময় প্রবাসে প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাঙালি হিন্দুরা দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকেন। রাজাদের পরিবার থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজা এখন বিশ্বজনীন রূপ পেয়েছে।

মা দুর্গা হলেন দুর্গতিনাশিনী, অর্থাৎ সব দুঃখ-দুর্দশার বিনাশকারী। তিনি অন্যায় ও অসত্যের প্রতীক মহিষাসুরকে নিধন করার জন্যই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অসত্য, যুদ্ধবিগ্রহের এই ক্রান্তিকালে মা দুর্গার আদর্শ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। মাতৃ-আরাধনার উদ্দেশ্যকে সফল করার লক্ষ্যে প্রতিটি পূজার আয়োজন যদি নিবেদিত হয়, তাহলে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য সারা বিশ্বের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হবে এবং বিশ্ববাসী মাতৃ-আরাধনার তাৎপর্য সহজেই অনুধাবন করতে সমর্থ হবে। দুর্গাপূজা তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, এমনকি বৈশ্বিক সংহতি রক্ষায় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি পূজা। পৃথিবীর সকল রাবণরূপী অসুরের বিনাশের জন্য দেবী দুর্গার আরাধনার গুরুত্ব অসীম। ‘রাবণস্য বিনাশায় রামসানুগ্রহায় চ অকালে বোধিতা দেবী।’ অর্থাৎ, রাবণকে বিনাশের জন্য রামের প্রতি অনুগ্রহবশত অকালে দেবী দুর্গা বোধিত হয়েছিলেন। দুষ্ট শক্তি রাবণকে বধ করার জন্য রাম নিদ্রিত অবস্থায় দেবীর পূজা করেছিলেন অকালবোধনের মাধ্যমে। আমাদের অন্তরের রাবণকে বিনাশ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তাই দুর্গাপূজার আয়োজন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তিসহকারে করা উচিত।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬


দুর্গোৎসবের ক্রম-বিবর্তন এবং অন্তর্নিহিত বার্তা

প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

শারদীয় দুর্গোৎসব সনাতন ধর্মাবলম্বীদের, বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের এক বৃহৎ উৎসব। বাঙালি হিন্দুদের প্রাণের সঙ্গে, আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আনন্দোৎসবের নাম দুর্গাপূজা। মহালয়ায় আগমনবার্তা জানিয়ে, ষষ্ঠীতে আরম্ভ হয়ে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী শেষে দশমীতে সিঁদুরখেলা ও বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয় পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব। হিন্দুদের এক বহুল আরাধ্যা ও জনপ্রিয় দেবী হলেন দুর্গা। সনাতন হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী, মা দুর্গার বাস হিমালয়ের কৈলাসে। দুর্গতি নাশের জন্য তিনি পৃথিবীতে নেমে আসেন পাঁচ দিনের জন্য।

হিন্দু পুরাণ অনুসারে, অসুরদের রাজা মহিষাসুর তপস্যা করে ব্রহ্মার বরে বলীয়ান হয়ে দেবতাদের কাছ থেকে স্বর্গ কেড়ে নেয়। অসুর হলো অশুভ শক্তির প্রকাশ। স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতালে মহাত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূতা হয়ে দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তাই হিন্দুধর্মাবলম্বীরা অশুভ শক্তির বিনাশ ও দুর্গতি নাশের আশায় শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিবছর দুর্গাপূজা করে থাকেন।

‘দুর্গা’ শব্দটি দুর্গ থেকে আগত। পুরাণমতে, দুর্গ নামক অসুরকে বধ করার জন্য তিনি দুর্গা। দুর্গা শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো ‘অপরাজেয়’, ‘দুর্গম’। আবার দুর্গতিনাশিনী অর্থেও দুর্গা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। শশীভূষণ দাশগুপ্ত ভারতীয় শক্তিসাধনা নিয়ে গবেষণায় দুর্গা শব্দের উৎপত্তির স্তরগুলো পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন। তার মতে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, দুর্গা হলেন ‘দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী’, অর্থাৎ দুর্গের রক্ষাকর্ত্রী। হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দুর্গা দশভুজা, দশপ্রহরণধারিণী, সিংহবাহিনী, মহিষাসুরমর্দিনী। দুর্গাপ্রতিমায় তাকে সেভাবেই দেখতে পাই। তিনি অশুভ শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে বধ করছেন। আবার তিনি মাতৃস্বরূপা, শক্তির প্রতীক, সমগ্র জগতের মা। হিন্দুধর্মমতে, তিনি সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের শক্তি, মাতৃরূপ, পরম ব্রহ্মময়ী। তিনি সমস্ত সৃষ্টিসংসারকে মায়ের মতো আগলে রাখেন। হিন্দুধর্মের শাক্ত উপাসনা ও তন্ত্র শাখার প্রধান দেবী হলেন দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত শক্তির উপাসনা; মাতৃশক্তি ও নারীশক্তির উপাসনার উৎসব।

আবার এই বাংলাতেই কেবল তিনি সপরিবারে পূজিতা। ‘দুর্গা’ শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্‌বেদ ও অথর্ববেদে। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীরূপে দুর্গাকে প্রথম দেখা যায়। এ ছাড়া রামায়ণ ও মহাভারতেও দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বেদে দুর্গা দেবী হিসেবে এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না। দুর্গাপূজা ও মহিষাসুরবধের কাহিনি—এসব কিছুই হিন্দুদের মূল ধর্মগ্রন্থ বেদে পাওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ দেবী হিসেবে দুর্গার আবির্ভাব হয় বৌদ্ধধর্ম-পরবর্তী যুগে; প্রথম মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্যে’ (৪০০ু৬০০ খ্রিস্টাব্দ), যা ৭০০ শ্লোকবিশিষ্ট ‘দুর্গাসপ্তশতী’ বা ‘চণ্ডী’ নামে পরিচিত। এখানেই রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের দুর্গাপূজার কাহিনি, মহিষাসুরবধ, শুম্ভ-নিশুম্ভ ও চণ্ড-মুণ্ডবধের কাহিনি পাওয়া যায়।

দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে একাধিক কিংবদন্তি প্রচলিত থাকলেও ‘পৌরাণিক কাহিনি’ অনুযায়ী, ‘সত্যযুগে’ রাজা সুরথ প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। ‘ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে’ আছে, দুর্গাপূজার ‘প্রথম প্রবর্তক’ ছিলেন ‘শ্রীকৃষ্ণ’; দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন স্বয়ং ‘ব্রহ্মা’। তৃতীয়বার দুর্গাপূজা করেছিলেন ‘মহাদেব’। ‘দেবীভাগবত পুরাণ’ অনুসারে, ‘ব্রহ্মার মানসপুত্র’ ‘মনু’ ‘ক্ষীরোদসাগরের তীরে’ দুর্গার আরাধনা করে বর লাভ করেছিলেন। এসব কাহিনি পুরাণের।

শাস্ত্র ও পুরাণ থেকে বেরিয়ে এসে মর্ত্যে, অর্থাৎ অবিভক্ত বাংলায়, দুর্গাপূজার আয়োজন প্রথম কে করেছিলেন, এ নিয়ে গবেষকদের কাছ থেকে বেশ কিছু তথ্য জানা যায়। সবকিছুর প্রথম নিয়ে মানুষের মনে একটি কৌতূহল কাজ করে, অর্থাৎ ‘কে প্রথম প্রবর্তক’। দুর্গাপূজার ক্ষেত্রেও ‘কে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন’, তা নিয়ে আপামর জনগণের মধ্যে একটি কৌতূহল আছে। ‘পৌরাণিক মতে’ ‘সত্যযুগে’ ‘রাজা সুরথ’ এই পূজার প্রবর্তক। তেমনি ‘কলিযুগে’, অর্থাৎ আধুনিক যুগে, এই পূজার প্রবর্তক কে? তা নিয়েও কৌতূহলের শেষ নেই।

আনন্দের বিষয়, বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত বিশ্বাস এবং বিভিন্ন তথ্যের ওপর নির্ভর করে আধুনিক যুগে বাংলার মানচিত্রে প্রথম দুর্গাপূজাটি করেছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর শেষে ‘রাজশাহীর তাহেরপুরের ভুঁইঞা রাজা’ ‘কংসনারায়ণ’। সেটা ‘তৃতীয় মোগল সম্রাট আকবরের আমলে’—এটি হলো প্রচলিত বিশ্বাস। ‘কংসনারায়ণের’ পরে ‘ভাদুড়িয়ার রাজা’ ‘জগৎনারায়ণ’ দুর্গাপূজা শুরু করেছিলেন। অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, ‘কংসনারায়ণের’ পূজার ৩৮ বছর আগে ‘শেরশাহের’ কাছ থেকে ‘জায়গির’ পেয়ে ‘দামোদর নদে’র কোনো এক ধারে পূজা করেছিলেন ‘যশোচন্দ্র’ (১৫৪৫)।

‘খান চৌধুরী আমানতুল্লা’ সাহেব তার ‘কোচবিহারের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন—‘অহোমরাজের প্রতিভূগণ আসামে প্রত্যাবৃত হইয়া কামতারাজ্যের বিবিধ আচার-ব্যবহারের সংবাদ অহোমরাজের সমক্ষে প্রকাশ করিয়াছিলেন, কামতাপুরে দশভুজা দুর্গার মূর্তির আড়ম্বরযুক্ত পূজাপদ্ধতির বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া অহোমরাজ নিজ রাজ্যে উক্ত পূজার প্রবর্তন করিয়াছিলেন।’

বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর হয়ে বলা যায়, সন-তারিখের বিচারে ‘রাজশাহী জেলার তাহেরপুরের’ ‘মনুসংহিতার টীকাকার’, তথা ‘কুল্লুক ভট্ট’র পৌত্র ‘কংসনারায়ণ’ প্রবর্তিত দুর্গাপূজার (১৫৮০) ১৮ বছর আগে ‘মহারাজা নরনারায়ণ’ ‘কোচরাজ্যে’ দুর্গাপূজা করেছিলেন। যা বাংলার মানচিত্রের বাইরে প্রথম দুর্গাপূজা। (৬২৮)

দুর্গাপূজা আদিকালে ছিল রাজা-রাজড়াদের পূজা। সচ্ছল জমিদার কিংবা রাজাদের ছাড়া এ পূজা সাধারণের জন্য আয়োজন করা দুরূহ ছিল। দুর্গাপূজা কীভাবে উচ্চবিত্তদের মণ্ডপ থেকে সাধারণের কাছে এসেছিল, সেই গল্পটি বড় মধুর। দুর্গাপূজার সর্বজনীনতার সূচনা হয়েছিল ‘বারোয়ারি’ পূজার মাধ্যমে।

বারোয়ারি দুর্গাপূজা প্রথম শুরু হয় ১৭৯০ সালে হুগলি জেলার গুপ্তিপাড়ায়। বারোজন যুবক মিলে চাঁদা তুলে এ পূজা শুরু করেন। তারা দেখেন, দুর্গাপূজায় প্রচুর খরচ, যা সর্বসাধারণের সাধ্যের বাইরে। তাই তারা সর্বসাধারণের জন্য এ ‘একচালা’ প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করেন।

বারোজন বন্ধু বা ‘ইয়ার’ (ফারসিতে ‘ইয়ার’ মানে বন্ধু) মিলে এ পূজা আরম্ভ করায় একে বলা হয় বারোয়ারি দুর্গাপূজা। এরপর কালের বিবর্তনে দুর্গাপূজা বর্তমান সর্বজনীন রূপ নেয়। কালে কালে পূজার জৌলুশ বৃদ্ধিতে নিত্যনতুন অনুষঙ্গ যোগ হয়। আজকাল ঐতিহ্যবাহী একচালা ভেঙে বহুচালাবিশিষ্ট দুর্গাপূজা হয়। বাংলাদেশের কুমারটুলিগুলোতেও বিভিন্ন আঙ্গিকে নানা ঢঙের, নানা রূপের বৈচিত্র‍্যময় প্রতিমা নির্মাণ হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশাল আকৃতির দৃষ্টিনন্দন পূজামণ্ডপে আলোকোজ্জ্বল দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের পূজাগুলো থিমের ভিত্তিতে না হলেও এর বর্ণিল ও আন্তরিক আয়োজন ভক্তদের হৃদয় হরণ করে। বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুরা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছেন। এই ভূগ্রামের প্রধান শহরগুলো, বিশেষ করে লন্ডন, প্যারিস, টরন্টো, মন্ট্রিয়েল, নিউইয়র্ক, মিশিগানসহ পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাংলাদেশ। এসব বনলতাময় প্রবাসে প্রাণের উচ্ছ্বাসে বাঙালি হিন্দুরা দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকেন। রাজাদের পরিবার থেকে বারোয়ারি দুর্গাপূজা এখন বিশ্বজনীন রূপ পেয়েছে।

মা দুর্গা হলেন দুর্গতিনাশিনী, অর্থাৎ সব দুঃখ-দুর্দশার বিনাশকারী। তিনি অন্যায় ও অসত্যের প্রতীক মহিষাসুরকে নিধন করার জন্যই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে অন্যায়, অসত্য, যুদ্ধবিগ্রহের এই ক্রান্তিকালে মা দুর্গার আদর্শ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। মাতৃ-আরাধনার উদ্দেশ্যকে সফল করার লক্ষ্যে প্রতিটি পূজার আয়োজন যদি নিবেদিত হয়, তাহলে দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য সারা বিশ্বের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হবে এবং বিশ্ববাসী মাতৃ-আরাধনার তাৎপর্য সহজেই অনুধাবন করতে সমর্থ হবে। দুর্গাপূজা তাই পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, এমনকি বৈশ্বিক সংহতি রক্ষায় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি পূজা। পৃথিবীর সকল রাবণরূপী অসুরের বিনাশের জন্য দেবী দুর্গার আরাধনার গুরুত্ব অসীম। ‘রাবণস্য বিনাশায় রামসানুগ্রহায় চ অকালে বোধিতা দেবী।’ অর্থাৎ, রাবণকে বিনাশের জন্য রামের প্রতি অনুগ্রহবশত অকালে দেবী দুর্গা বোধিত হয়েছিলেন। দুষ্ট শক্তি রাবণকে বধ করার জন্য রাম নিদ্রিত অবস্থায় দেবীর পূজা করেছিলেন অকালবোধনের মাধ্যমে। আমাদের অন্তরের রাবণকে বিনাশ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য তাই দুর্গাপূজার আয়োজন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ভক্তিসহকারে করা উচিত।

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত