সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

নারীর গল্প


সাঈদ চৌধুরী
সাঈদ চৌধুরী
প্রকাশ: ৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

নারীর গল্প
ভ্যানে করে একজন প্রবীণ নারীকে আরেকজন নারী পরম নির্ভরতায় নিয়ে যাচ্ছেন

সেদিন অফিসে যাওয়ার সময় দেখলাম ভ্যানে করে একজন প্রবীণ নারীকে আরেকজন নারী পরম নির্ভরতায় নিয়ে যাচ্ছেন। হয়তো হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন ।

বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে প্রথমে একজন নারীকেই হাসপাতালে যাওয়ার সঙ্গী হতে হয়। যে কিচ্ছু জানেনা তাকেই একদিন দায়িত্ব নিতে হয় সবার আগে। ভারী একটি প্রেস্ক্রিপশন যখন রাতের বেলা ডাক্তার এসে ধরিয়ে দেন তখনও কিচ্ছু না বুঝে দৌড়াতে হয় ফার্মেসিতে ! কতটা অন্তর্মুখী হয় নারীরা তা আমাদের মা, দাদীকে দেখেছি । বাঙালি নারীর সকল অন্তর্মুখীতাকে জয় করার সময় হল বিপদের সময় । তারা কোনো কাজে একটুও পিছপা হয়না, তারা কখনই ঘরে বসে থাকেনা ।

তারা শ্রমের জন্য পরিবার থেকে আলাদা কোনো পঁয়সাও নেয়না। গ্রামের বাড়িগুলোতে একটি করে ডিম, মুরগী, দুধ বিক্রি করে জমানো টাকার একটি অংশ বাড়ির পুরুষ সদস্যদের দেয় অনায়াসেই এই নারীরাই । যত খারাপ উদাহরণ নারীদের নিয়ে আপনারা শোনেন তা কেবল মাত্র এক শতাংশেরও কম ! আমরা

যখন নারী অধিকার বলতে সমতায়নের কথা বলি সেখানে গত কয়েকদিনও নারী সহিসংতা বন্ধ হয়নি । সেদিনও শ্রীপুরে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে একজন পাষন্ড স্বামী !

শিশুগুলো কাঁদছে। আমরা ফেইসবুকে স্ক্রল করে চলে যাচ্ছি। সাংবাদিকরা এসে ছবি তুলছে, সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করার চেষ্টা করছে । হয়ত আসামি ধরা পড়বে কিন্তু আর কোনোদিন শিশুগুলো মায়ের আদর পাবেনা, আর কোনোদিন মা

তাদের এক প্লেটে নিয়ে খাবার খাওয়াবেনা। গণবিদারী চিৎকারে বুক ভারী হয়ে আসবে বলে এড়িয়ে যাচ্ছি। আমরা যারা বাসে উঠলে নারীদের সিট ছেড়ে বসতে দিতে চাই তাদেরও এক পক্ষ

প্রচন্ড রকম অন্যভাবে দেখে । কেউ কেউ বলেও সমান অধিকার চায় তবে বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেনা কেন! অনেক কথা অনেক প্রশ্ন কিন্তু কোনো ধরনের সিমপ্যাথি বা সৌন্দর্য সামাজিকভাবে তৈরি করা যায়নি। এটা আমাদের জন্য ব্যর্থতার।

অথচ বিপদের সময়, ক্লান্তি লগ্নে, আনন্দ উদযাপনে, ফরমাইসে, ভার দেয়ায়, খোটা নেয়ার সময় সব ক্ষেত্রে নারীই প্রধান উপাদান সংসারে । সব কথা মুখ বুজে সহ্য করবার এক অসাধারণ কেমিস্ট্রি নিয়ে জীবন বয়ে বেড়াতে হয় প্রতিটি নারীকে। যে আজ কিশোর হয়ে উঠছে সে বাইরে বের হলে সে যে কোনো মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে এসেছে সেটাই ভুলে যায়! অথচ প্রথম প্রেম নামক যে শব্দ সেখানেও পুরুষের জন্য নারীই একমাত্র উপায়। যার সঙ্গে অনেক প্রেম তার সঙ্গেই আবার অধিকারের গল্প। অধিকারের গল্প হয়ে তা শেষ হয় ভাঙ্গণের তীব্র আক্ষেপে !

কার দোষ কার গুণের তর্কে না গিয়ে প্রতিটি ঘর থেকে যদি নারীর সম্মানকে অগ্রাধিকার না দেয়া যায় তবে কখনই নারী কথাটির তাৎপর্যকে সামনে আনা যাবেনা । ধর্ম দিয়ে নারীকে সম্মান করার যে পবিত্রতা সেখানেও দেখেছি প্রয়োগিক অর্থে সীমাবদ্ধতা দেখান মানুষরা! মনে পরে শৈশবে সেই সব দুপুরের কথা যে দুপুরে ক্লান্তি শরীর নিয়ে মায়ের কোলে ভাত ঘুম দিতেন? তারপর চকচকে একটা বিকেল আসতো। মায়ের আচলে চোখ মুছেই দৌঁড়ে চলে যেতেন খেলার মাঠে । তারপর কত হই হুল্লোর, কত খেলা আর কত শৈশবের মুক্ত ডানা মেলা । সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরতেন সেই মা আবার দাঁড়িয়ে থাকতো বাড়ির কাঁচা উঠোন পাড় হয়ে ভাঙা কোনো দরজার পার্শ কাঠ ধরে ।

আমরা এভাবেই বড় হয়েছি । বড় হওয়ার পর জীবন শিখতে শিখতে শুধু অধিকারের গল্প শুনি চারপাশে। তারপর দেখি অধিকারতো দূরের কথা এ যেন এক অসম সমাজ ব্যবস্থা। সংসদ থেকে শুরু করে ঘরের উঠোন পর্য ন্ত নারী আছে সব জায়গায় কিন্তু কোথায় যেন নারীর উপস্থিতিকেও অস্বীকার করা হয় । এই আবছা অন্ধকার বাস্তব জীবনে নেই। ছবিতে দেখা যাওয়া নির্ভরতার প্রতীক যে নারী সে যদি সামান্য মনোযোগহীন হন তবে এই অসুস্থ মানুষটি যেমন তার জীবন হারাবে তেমনি সামাজিকভাবে যদি এই প্রতিকী

ছবিটিকে গ্রহণ করেন তবে দেখবেন নারী ছাড়া বা নারীকে বাদ দিয়ে আমরাও

এমনি একটা ভঙ্গুর সমাজকেই প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত সবাই!

[লেখক: রসায়নবিদ]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬


নারীর গল্প

প্রকাশের তারিখ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সেদিন অফিসে যাওয়ার সময় দেখলাম ভ্যানে করে একজন প্রবীণ নারীকে আরেকজন নারী পরম নির্ভরতায় নিয়ে যাচ্ছেন। হয়তো হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন ।

বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে প্রথমে একজন নারীকেই হাসপাতালে যাওয়ার সঙ্গী হতে হয়। যে কিচ্ছু জানেনা তাকেই একদিন দায়িত্ব নিতে হয় সবার আগে। ভারী একটি প্রেস্ক্রিপশন যখন রাতের বেলা ডাক্তার এসে ধরিয়ে দেন তখনও কিচ্ছু না বুঝে দৌড়াতে হয় ফার্মেসিতে ! কতটা অন্তর্মুখী হয় নারীরা তা আমাদের মা, দাদীকে দেখেছি । বাঙালি নারীর সকল অন্তর্মুখীতাকে জয় করার সময় হল বিপদের সময় । তারা কোনো কাজে একটুও পিছপা হয়না, তারা কখনই ঘরে বসে থাকেনা ।

তারা শ্রমের জন্য পরিবার থেকে আলাদা কোনো পঁয়সাও নেয়না। গ্রামের বাড়িগুলোতে একটি করে ডিম, মুরগী, দুধ বিক্রি করে জমানো টাকার একটি অংশ বাড়ির পুরুষ সদস্যদের দেয় অনায়াসেই এই নারীরাই । যত খারাপ উদাহরণ নারীদের নিয়ে আপনারা শোনেন তা কেবল মাত্র এক শতাংশেরও কম ! আমরা

যখন নারী অধিকার বলতে সমতায়নের কথা বলি সেখানে গত কয়েকদিনও নারী সহিসংতা বন্ধ হয়নি । সেদিনও শ্রীপুরে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে একজন পাষন্ড স্বামী !

শিশুগুলো কাঁদছে। আমরা ফেইসবুকে স্ক্রল করে চলে যাচ্ছি। সাংবাদিকরা এসে ছবি তুলছে, সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করার চেষ্টা করছে । হয়ত আসামি ধরা পড়বে কিন্তু আর কোনোদিন শিশুগুলো মায়ের আদর পাবেনা, আর কোনোদিন মা

তাদের এক প্লেটে নিয়ে খাবার খাওয়াবেনা। গণবিদারী চিৎকারে বুক ভারী হয়ে আসবে বলে এড়িয়ে যাচ্ছি। আমরা যারা বাসে উঠলে নারীদের সিট ছেড়ে বসতে দিতে চাই তাদেরও এক পক্ষ

প্রচন্ড রকম অন্যভাবে দেখে । কেউ কেউ বলেও সমান অধিকার চায় তবে বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেনা কেন! অনেক কথা অনেক প্রশ্ন কিন্তু কোনো ধরনের সিমপ্যাথি বা সৌন্দর্য সামাজিকভাবে তৈরি করা যায়নি। এটা আমাদের জন্য ব্যর্থতার।

অথচ বিপদের সময়, ক্লান্তি লগ্নে, আনন্দ উদযাপনে, ফরমাইসে, ভার দেয়ায়, খোটা নেয়ার সময় সব ক্ষেত্রে নারীই প্রধান উপাদান সংসারে । সব কথা মুখ বুজে সহ্য করবার এক অসাধারণ কেমিস্ট্রি নিয়ে জীবন বয়ে বেড়াতে হয় প্রতিটি নারীকে। যে আজ কিশোর হয়ে উঠছে সে বাইরে বের হলে সে যে কোনো মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে এসেছে সেটাই ভুলে যায়! অথচ প্রথম প্রেম নামক যে শব্দ সেখানেও পুরুষের জন্য নারীই একমাত্র উপায়। যার সঙ্গে অনেক প্রেম তার সঙ্গেই আবার অধিকারের গল্প। অধিকারের গল্প হয়ে তা শেষ হয় ভাঙ্গণের তীব্র আক্ষেপে !

কার দোষ কার গুণের তর্কে না গিয়ে প্রতিটি ঘর থেকে যদি নারীর সম্মানকে অগ্রাধিকার না দেয়া যায় তবে কখনই নারী কথাটির তাৎপর্যকে সামনে আনা যাবেনা । ধর্ম দিয়ে নারীকে সম্মান করার যে পবিত্রতা সেখানেও দেখেছি প্রয়োগিক অর্থে সীমাবদ্ধতা দেখান মানুষরা! মনে পরে শৈশবে সেই সব দুপুরের কথা যে দুপুরে ক্লান্তি শরীর নিয়ে মায়ের কোলে ভাত ঘুম দিতেন? তারপর চকচকে একটা বিকেল আসতো। মায়ের আচলে চোখ মুছেই দৌঁড়ে চলে যেতেন খেলার মাঠে । তারপর কত হই হুল্লোর, কত খেলা আর কত শৈশবের মুক্ত ডানা মেলা । সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরতেন সেই মা আবার দাঁড়িয়ে থাকতো বাড়ির কাঁচা উঠোন পাড় হয়ে ভাঙা কোনো দরজার পার্শ কাঠ ধরে ।

আমরা এভাবেই বড় হয়েছি । বড় হওয়ার পর জীবন শিখতে শিখতে শুধু অধিকারের গল্প শুনি চারপাশে। তারপর দেখি অধিকারতো দূরের কথা এ যেন এক অসম সমাজ ব্যবস্থা। সংসদ থেকে শুরু করে ঘরের উঠোন পর্য ন্ত নারী আছে সব জায়গায় কিন্তু কোথায় যেন নারীর উপস্থিতিকেও অস্বীকার করা হয় । এই আবছা অন্ধকার বাস্তব জীবনে নেই। ছবিতে দেখা যাওয়া নির্ভরতার প্রতীক যে নারী সে যদি সামান্য মনোযোগহীন হন তবে এই অসুস্থ মানুষটি যেমন তার জীবন হারাবে তেমনি সামাজিকভাবে যদি এই প্রতিকী

ছবিটিকে গ্রহণ করেন তবে দেখবেন নারী ছাড়া বা নারীকে বাদ দিয়ে আমরাও

এমনি একটা ভঙ্গুর সমাজকেই প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত সবাই!

[লেখক: রসায়নবিদ]



সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত