সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

ঋণখেলাপি ও রাজনীতির যোগসূত্র


রেজাউল করিম খোকন
রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ: ৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

ঋণখেলাপি ও রাজনীতির যোগসূত্র

দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণে খেলাপির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোটি টাকার বেশি ঋণসংবলিত অ্যাকাউন্টে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছর আগে এই হার ছিল ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে এ ধরনের ঋণের মোট খেলাপি পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণে নতুন নীতিমালা চালুর ফলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। আগে ১৮০ দিন অনাদায়ী থাকলে ঋণ খেলাপি হিসেবে গণ্য হতো, এখন তা কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের পর থেকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। তবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে হার কিছুটা কমেছে। নীতি সহায়তা ও ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে শিথিলতার কারণে এই সামান্য কমতি এসেছে।

নতুন নিয়মে ‘মন্দ মানে’ শ্রেণীকৃত হওয়ার পরই ঋণ অবলোপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে এ জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এই সুযোগে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ফলে কিছু ঋণ সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তবে প্রকৃত চিত্রে তেমন পরিবর্তন হয়নি।

গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো আড়ালে থাকা অনাদায়ী ঋণের তথ্য প্রকাশ পাওয়া। অতীতে বিভিন্ন উপায়ে এসব ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো। এখন সেই সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ হয়েছে। বিদেশি অডিট ফার্মের মাধ্যমে সম্পদ যাচাই এবং কিছু ব্যাংকের একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতির সঙ্গে ঋণখেলাপির সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঋণখেলাপিদের একটি অংশ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সংসদ সদস্যও হয়েছেন। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই।

বাস্তবে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে অনেক প্রার্থী আংশিক অর্থ পরিশোধ করে ঋণ নিয়মিত দেখান বা আদালতের স্থগিতাদেশ নেন। পরে তারা নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে জয়ী হলে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় যান, আর পরাজিত হলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখা যায়। এতে আইনের উদ্দেশ্য ভঙ্গ হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ওঠে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একবার নির্বাচিত হওয়ার পর ঋণখেলাপির কারণে কারও সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে—এমন নজির নেই। ফলে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকছে। এতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা তুলনামূলক কঠোরতার মুখে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু বড় ঋণগ্রহীতারা প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা পান। এই বৈষম্য আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা তৈরি করছে।

এ অবস্থায় নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা, মনোনয়নপত্র জমার নির্দিষ্ট সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা এবং নির্বাচিত হওয়ার পর পুনরায় খেলাপি হলে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান করা।

ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের স্বার্থে এসব সুপারিশ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা জরুরি। আইন প্রয়োগে কঠোরতা, প্রভাবমুক্ত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। ঋণখেলাপিদের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা না গেলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়বে এবং জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬


ঋণখেলাপি ও রাজনীতির যোগসূত্র

প্রকাশের তারিখ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণে খেলাপির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোটি টাকার বেশি ঋণসংবলিত অ্যাকাউন্টে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছর আগে এই হার ছিল ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে এ ধরনের ঋণের মোট খেলাপি পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণে নতুন নীতিমালা চালুর ফলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। আগে ১৮০ দিন অনাদায়ী থাকলে ঋণ খেলাপি হিসেবে গণ্য হতো, এখন তা কমিয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের পর থেকেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। তবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে হার কিছুটা কমেছে। নীতি সহায়তা ও ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে শিথিলতার কারণে এই সামান্য কমতি এসেছে।

নতুন নিয়মে ‘মন্দ মানে’ শ্রেণীকৃত হওয়ার পরই ঋণ অবলোপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। আগে এ জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। এই সুযোগে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ফলে কিছু ঋণ সাময়িকভাবে খেলাপির তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তবে প্রকৃত চিত্রে তেমন পরিবর্তন হয়নি।

গত দেড় বছরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হলো আড়ালে থাকা অনাদায়ী ঋণের তথ্য প্রকাশ পাওয়া। অতীতে বিভিন্ন উপায়ে এসব ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো। এখন সেই সুযোগ অনেকাংশে বন্ধ হয়েছে। বিদেশি অডিট ফার্মের মাধ্যমে সম্পদ যাচাই এবং কিছু ব্যাংকের একীভূতকরণের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতির সঙ্গে ঋণখেলাপির সম্পর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঋণখেলাপিদের একটি অংশ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সংসদ সদস্যও হয়েছেন। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই।

বাস্তবে দেখা যায়, নির্বাচনের আগে অনেক প্রার্থী আংশিক অর্থ পরিশোধ করে ঋণ নিয়মিত দেখান বা আদালতের স্থগিতাদেশ নেন। পরে তারা নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে জয়ী হলে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতায় যান, আর পরাজিত হলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখা যায়। এতে আইনের উদ্দেশ্য ভঙ্গ হয় এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন ওঠে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একবার নির্বাচিত হওয়ার পর ঋণখেলাপির কারণে কারও সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়েছে—এমন নজির নেই। ফলে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকছে। এতে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতারা তুলনামূলক কঠোরতার মুখে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু বড় ঋণগ্রহীতারা প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা পান। এই বৈষম্য আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থাহীনতা তৈরি করছে।

এ অবস্থায় নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের প্রার্থী হওয়া থেকে বিরত রাখা, মনোনয়নপত্র জমার নির্দিষ্ট সময়ের আগে ঋণ পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা এবং নির্বাচিত হওয়ার পর পুনরায় খেলাপি হলে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান করা।

ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের স্বার্থে এসব সুপারিশ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা জরুরি। আইন প্রয়োগে কঠোরতা, প্রভাবমুক্ত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। ঋণখেলাপিদের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা না গেলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়বে এবং জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]


সংবাদ - ঘটনা যখন সংবাদ তখন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত