পহেলা বৈশাখকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) চলছে বর্ণিল প্রস্তুতি। বাঙালির সর্বজনীন এই উৎসবকে সামনে রেখে চারুকলা অনুষদের আয়োজনে এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রায় উঠে আসছে ঐতিহ্য, বৈশ্বিক সংকট ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সমন্বিত চিত্র।
চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব আমাদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করায়।” তিনি আরও বলেন, “এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতিকে স্বতন্ত্র ও উন্নত হিসেবে তুলে ধরে।”
বৈচিত্র্যময় মোটিভে সময়ের বার্তা
এবারের শোভাযাত্রায় বেশ কিছু ব্যতিক্রমী মোটিভ স্থান পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি, ইলিশ মাছ, টমটম গাড়ি এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের মুখোশ।
চারুকলা অনুষদের শিক্ষক একেএম আরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা যেন আবার সেই পুরোনো দিনে ফিরে যাচ্ছি, যখন ঘোড়ার গাড়িই ছিল প্রধান বাহন। বর্তমান জ্বালানি সংকট সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।”
তিনি জানান, এবারের শোভাযাত্রায় প্রধান মোটিফ হিসেবে থাকছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি, যা শক্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “শোভাযাত্রায় বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক জাতীয় মাছ ইলিশ, শৈশবের স্মৃতিবাহী টমটম গাড়ি এবং প্রাচীন রাজা-বাদশা ও ঐতিহাসিক চরিত্রের নানা মুখোশ স্থান পাচ্ছে।” পাশাপাশি বিশ্বে চলমান যুদ্ধের প্রভাব তুলে ধরতে একটি ইনস্টলেশন আর্ট প্রদর্শনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির জানান, “বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তেল সংকট ও যানবাহনের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় এনে এসব মোটিভ নির্ধারণ করা হয়েছে।”
শ্রম-সৃজনের মেলবন্ধন
শোভাযাত্রার মোটিভ তৈরিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। বাঁশের বেত, লোহার রড ও ফ্রেমের ওপর কাগজ লাগিয়ে রঙ-তুলির ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম। এতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও পরিশ্রম ফুটে উঠছে।
মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী নাসির বলেন, গত বছর রমজানের কারণে আমরা বৃহৎ পর্যায়ে শোভাযাত্রা করতে না পারলেও সবার সম্মিলিত পর্যায়ে সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এইবারে আমরা নানা ধরনের ঐতিহাসিক মুখোশ তৈরী করেছি। এছাড়া শিক্ষকদের সাথে সম্মিলিতভাবে কাজটি করার কারণে নানাধরণের বিষয় আয়ত্তে আনা যাচ্ছে এবং ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা তৈরী হচ্ছে।
স্পনসরবিহীন আয়োজন
অর্থায়নের বিষয়ে অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “এই আয়োজনের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশেষ করে উপাচার্যের ফান্ড থেকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শ্রম ও সহযোগিতাও রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অতীতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হলেও এখন তাদের প্রচারণার আধিক্যে সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় স্পনসর নেওয়া হচ্ছে না।”
সংযত আয়োজন
এবার শোভাযাত্রাকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিপাদ্য নির্ধারণে বিতর্ক এড়াতে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো স্লোগান নির্ধারণ করা হয়নি।
এছাড়া চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও ইনস্টলেশন আর্টে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয় নীতির আলোকে অনুষ্ঠানের সময় ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উন্মুক্ত উৎসব
এই আয়োজন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রিকশা-ভ্যান চালকরাও এই শোভাযাত্রা উপভোগ করতে ভিড় করেন। র্যালির পাশাপাশি গানসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন থাকবে।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “এ ধরনের উৎসব যদি গ্রামেগঞ্জে আরও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সামাজিক বিভেদ কমে গিয়ে একটি সুন্দর ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।”

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ এপ্রিল ২০২৬
পহেলা বৈশাখকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) চলছে বর্ণিল প্রস্তুতি। বাঙালির সর্বজনীন এই উৎসবকে সামনে রেখে চারুকলা অনুষদের আয়োজনে এবারের বৈশাখী শোভাযাত্রায় উঠে আসছে ঐতিহ্য, বৈশ্বিক সংকট ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সমন্বিত চিত্র।
চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব আমাদের সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করায়।” তিনি আরও বলেন, “এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই বিশ্ব দরবারে বাঙালি জাতিকে স্বতন্ত্র ও উন্নত হিসেবে তুলে ধরে।”
বৈচিত্র্যময় মোটিভে সময়ের বার্তা
এবারের শোভাযাত্রায় বেশ কিছু ব্যতিক্রমী মোটিভ স্থান পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি, ইলিশ মাছ, টমটম গাড়ি এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের মুখোশ।
চারুকলা অনুষদের শিক্ষক একেএম আরিফুল ইসলাম বলেন, “আমরা যেন আবার সেই পুরোনো দিনে ফিরে যাচ্ছি, যখন ঘোড়ার গাড়িই ছিল প্রধান বাহন। বর্তমান জ্বালানি সংকট সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।”
তিনি জানান, এবারের শোভাযাত্রায় প্রধান মোটিফ হিসেবে থাকছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি, যা শক্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “শোভাযাত্রায় বাঙালির ঐতিহ্যের প্রতীক জাতীয় মাছ ইলিশ, শৈশবের স্মৃতিবাহী টমটম গাড়ি এবং প্রাচীন রাজা-বাদশা ও ঐতিহাসিক চরিত্রের নানা মুখোশ স্থান পাচ্ছে।” পাশাপাশি বিশ্বে চলমান যুদ্ধের প্রভাব তুলে ধরতে একটি ইনস্টলেশন আর্ট প্রদর্শনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির জানান, “বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তেল সংকট ও যানবাহনের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় এনে এসব মোটিভ নির্ধারণ করা হয়েছে।”
শ্রম-সৃজনের মেলবন্ধন
শোভাযাত্রার মোটিভ তৈরিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। বাঁশের বেত, লোহার রড ও ফ্রেমের ওপর কাগজ লাগিয়ে রঙ-তুলির ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন শিল্পকর্ম। এতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও পরিশ্রম ফুটে উঠছে।
মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী নাসির বলেন, গত বছর রমজানের কারণে আমরা বৃহৎ পর্যায়ে শোভাযাত্রা করতে না পারলেও সবার সম্মিলিত পর্যায়ে সর্বোচ্চ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এইবারে আমরা নানা ধরনের ঐতিহাসিক মুখোশ তৈরী করেছি। এছাড়া শিক্ষকদের সাথে সম্মিলিতভাবে কাজটি করার কারণে নানাধরণের বিষয় আয়ত্তে আনা যাচ্ছে এবং ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা তৈরী হচ্ছে।
স্পনসরবিহীন আয়োজন
অর্থায়নের বিষয়ে অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “এই আয়োজনের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, বিশেষ করে উপাচার্যের ফান্ড থেকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শ্রম ও সহযোগিতাও রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অতীতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হলেও এখন তাদের প্রচারণার আধিক্যে সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় স্পনসর নেওয়া হচ্ছে না।”
সংযত আয়োজন
এবার শোভাযাত্রাকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিপাদ্য নির্ধারণে বিতর্ক এড়াতে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো স্লোগান নির্ধারণ করা হয়নি।
এছাড়া চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও ইনস্টলেশন আর্টে তুলে ধরা হচ্ছে। সরকারের বিদ্যুৎ সাশ্রয় নীতির আলোকে অনুষ্ঠানের সময় ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উন্মুক্ত উৎসব
এই আয়োজন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রিকশা-ভ্যান চালকরাও এই শোভাযাত্রা উপভোগ করতে ভিড় করেন। র্যালির পাশাপাশি গানসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন থাকবে।
অধ্যাপক হুমায়ুন কবির বলেন, “এ ধরনের উৎসব যদি গ্রামেগঞ্জে আরও ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সামাজিক বিভেদ কমে গিয়ে একটি সুন্দর ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।”

আপনার মতামত লিখুন