সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

পেট্রোল পুরোটাই দেশীয় পণ্য, রেশনিং নিয়ে প্রশ্ন



পেট্রোল পুরোটাই দেশীয় পণ্য, রেশনিং নিয়ে প্রশ্ন

পেট্রোল বাংলাদেশি পণ্য। আমদানি করতে হয় না। সরকার চাইলে চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন করতে পারে। দেশের গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাসের উপজাত হিসেবে যে কনডেনসেট পাওয়া যায়, তা পরিশোধনের মাধ্যমে পেট্রোল উৎপাদন হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলের মোট চাহিদা ও বিক্রি ছিল প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন, যার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পদক্ষেপ হিসেবে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং শুরু করেছে সরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ি, এখন থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত মোটরসাইকেল চালকরা দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার) দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে।

এসইউভি, জিপ, মাইক্রোবাস দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। এছাড়া পিকআপ, লোকাল বাস প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ লিটার, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, কনটেইনার ট্রাক ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে।

প্রশ্ন উঠেছে, পেট্রোল যদি দেশীয় পণ্য হয় এবং চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন সক্ষমতা থাকে তাহলে রেশনিং করার প্রয়োজন কী?

সাধারণ মানুষের অভিমত

মগবাজারের বাসিন্দা শেফিক রহমান সুমন এ বিষয়ে সংবাদকে বলেন, “নিউজে দেখছি পেট্রোল নাকি দেশেই হয়। আমদানি করা লাগে না। তাহলে পেট্রোল কেন দুই লিটার করে দিতে হবে।

সুমন জানান, তিনি তার বাইকে একবারে ১০ লিটার তেল নেন। এটা দিয়ে তার এক সপ্তাহ বা দু-একদিন কমবেশি চলে।

তার প্রশ্ন, “একটা লোক কি প্রতিদিন একবার করে পাম্পে যাবে? লাইন দিয়ে ওয়েট করবে? তার কি আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই!”

তার ভাষায়, “বাইক যারা চালান, কেউ কেউ হয়ত প্রতিদিন তেল নেন। তবে অনেকের জন্যই প্রতিদিন পাম্পে যাওয়া অত্যন্ত ঝামেলার বিষয়।”

সুমন বলেন, “সরকারের উচিৎ এ বিষয়ে ভেবে দেখা। সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জনগণের ভোগান্তি দূর করা।”

পেট্রোলের রেশনিং নিয়ে সুমনের মতো প্রশ্ন অনেকেরই। মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, এমন অন্তত বিশ জনের সঙ্গে গেল রোববার (৮ মার্চ) কথা হয়েছে সংবাদের। তাদের সবাই পেট্রোলে রেশিনিংয়ের বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

পুরান ঢাকা বনগ্রামের বাসিন্দা মো. ইলিয়াস নিয়মিত মোটরসাইকেল চালান। জ্বালানিতে রেশনিং প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি সংবাদকে বলেন, “এইডা কোন কথা অইল (হলো)! দুই লিটার তেলে কী অয় (হয়) ভাই? রিজার্ভেই তো পইড়া থাকে দেড় লিটার। স্টার্ট দিয়ে পিকআপ মাইরা একটু সামনে বাড়লেইতো বাকী আধা লিটার শেষ। সারাদিন চালামু কেমনে?”

আরেক বাইকার সংবাদকে জানান, গত দুই দিনে তিনি ঢাকার বেশকিছু পাম্পে গেছেন। সব জায়গায় বাইকারদের ভিড়। এতে অন্য যানবাহন তেল নিতে ঢুকতেই পাড়ছে না। তার মতে, মোটরসাইকেলগুলোতে অন্তত ৫ লিটার তেল দিয়ে দিলে এই জটলা একেবারেই কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যেহেতু যুদ্ধ চলছে, দেশে তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে সাধারণ মানুষ মজুত নিয়ে আতঙ্কিত হচ্ছে, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছে। তার মতে, সরকার তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দেওয়ায় আরও আতঙ্ক ছড়াতে পারে। এজন্য জনগণকে সঠিক বার্তা দিতে হবে।

এ খাতের একাধিক বিশ্লেষকের মতে, সরকার যখনই রেশনিংয়ের ঘোষণা দিয়েছে, জনমনে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রেতারা মনে করছেন, তেলের মজুত শেষ। দ্রুত তেল কিনতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণকে বিষয়টি জানাতে হবে, বোঝাতে হবে। দেশীয় পেট্রোলে মজুত নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকারকে এই তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

পেট্রোল-অকটেনের চাহিদা ও সরবরাহ

দেশে পেট্রোলের মোট চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ দৈনিক চাহিদা প্রায় এক হাজার ২৬৫ মেট্রিক টন।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) দেশের মোট পেট্রোলের প্রায় ১৬ শতাংশ সরবরাহ করে। বেসরকারি শোধনাগারগুলো বাকি ৮৪ শতাংশ পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করে। এরা মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত ‘কনডেনসেট’ শোধন করে এটি উৎপাদন করে।

গত বছর পেট্রোলের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়েছে। চলতি বছরেও পেট্রোল আমদানির কোনো পরিকল্পনা বিপিসির নেই। সংস্থটি বলছে, এবারও দেশীয় উৎপাদন থেকেই চাহিদা মেটানো যাবে।

এদিকে, দেশে উৎপাদিত পেট্রোলের সঙ্গে ‘অকটেন বুস্টার’ নামের রাসায়নিক মিশিয়ে অকটেন উৎপাদন করা হয়। এই অকটেন বুস্টার আমদানি করতে হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে অকটেনের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ, দৈনিক চাহিদা প্রায় এক হাজার ১৩৬ মেট্রিক টন। প্রতি বছরই অকেটেনের চাহিদার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দেশীয় উৎপাদন হচ্ছে, বাকিটা আমদানি করা হচ্ছে। দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলো থেকে অকটেন কেনে বিপিসি। বেসরকারি গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া ‘কনডেনসেট’ প্রক্রিয়াজাত করে অকটেন তৈরি করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো।

পেট্রোল ও অকটেনের সম্মিলিত বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ মেট্রিক টন হলেও দেশের রিফাইনারিগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৬ লাখ টন। অর্থাৎ, পেট্রোল উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় না, বরং অভ্যন্তরীণ রিফাইনারিগুলোই চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। তবে পেট্রোলের চাহিদা কম থাকায় কম উৎপাদন করা হয়। কারণ বেশী উৎপাদন করা হলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই জ্বালানি রাপ্তানির সুযোগ সীমিত।

ডিজেলের চাহিদা ও আমদানি

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ মেট্রিক টন। এটি দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ।

দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে দৈনিক চাহিদা প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের মানু আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কিনছে বলে ডিজেলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে দৈনিক ২৫ হাজার টনে পৌঁছেছে।

ডিজেলের চাহিদার মাত্র ১৮ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ দেশীয়ভাবে মেটানো হয়। চট্টগ্রামের ইআরএল এবং কিছু বেসরকারি শোধনাগার মিলিয়ে এই উৎপাদন হয়। প্রতি মাসে অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলো থেকে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হয়।

ডিজেলের চাহিদার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ মূলত ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং আরব দেশগুলো থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন ২০২৩ সালে তৎকালিন আওয়ামী লীগ সরকার উদ্বোধন করে। এই পাইপ লাইনের সক্ষমতা ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল যা উত্তরের ৮ জেলায় সরবরাহ করা যাবে। এই তেল ভারতের শিলিগুড়ির নুমালি গড় থেকে আসে।

ডিজেল দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি। ভারী যানবাহন, কৃষি যন্ত্রপাতি, এবং শিল্প কারখানায় এর চাহিদা অপরিসীম। বর্তমানে বৈশ্বিক ও স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা সংকট তৈরি হলেও, ১ লাখ ৮১ হাজার টন মজুত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ জ্বালানি মন্ত্রীর

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গেল শনিবার বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, “মজুত আছে, কিন্তু যুদ্ধ কবে থামবে কেউ তো আমরা জানি না।”

এই প্রেক্ষিতে সঞ্চয় করা হচ্ছে জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “৯ তারিখ আমাদের আরও দুটি ভেসেল আসছে, সুতরাং ঘাটতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যেহেতু যুদ্ধ চলছে, আমাদের খুব হিসাব করে চলতে হবে।”

বিপিসি যা বলছে

বিপিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টনের মতো। তবে ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দৈনিক চাহিদা ছাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩০০ টন।

বিপিসির দেওয়া গেল শনিবারের হিসেবে, পেট্রলের মজুত আছে ১৫ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন। রোববার থেকে দৈনিক ১ হাজার ৭০ হাজার মেট্রিক টন করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে বর্তমান মজুত দিয়ে ১৫ দিন চলবে।

এছাড়া ইআরএল থেকে প্রতিদিন ৪০০ মেট্রিক টন করে পেট্রল পাওয়া যাবে। বেসরকারি শোধনাগার থেকেও আসবে নিয়মিত।

বিপিসির বলছে, মার্চ মাসে দেশের সরকারি-বেসরকারি শোধনাগার থেকে পেট্রল ও অকটেন মিলিয়ে ৪০ হাজার টন সরবরাহ আসতে পারে। তাই আপাতত মজুত শেষ হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আমদানি করা না গেলে মাসে ইআরএলের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রোববার (৭ মার্চ) থেকে দিনে ৯১৩ মেট্রিক টন করে অকটেন সরবরাহ করা হবে। শনিবার পর্যন্ত অকটেনের মজুত ছিল ২৩ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন। দিনে ৯১৩ মেট্রিক টন করে সরবরাহ করলে এই পরিমাণ তেল দিয়ে ২৫ দিনের মতো চলবে। পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে মার্চেই ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন মজুতে যুক্ত হবে। আরও ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উৎস খোঁজা হচ্ছে।

দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ১৩৬ মেট্রক টন ধরে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন মজুতে যুক্ত হলে তা দিয়ে চলা যাবে ৪৪ দিন।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান সংবাদকে বলেন, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বন্দর থেকে চাহিদার ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে ২০ শতাংশ। তিনি মনে করেন, তাই আপাতত বড় ঝুঁকি নেই। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘয়িত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকেটর প্রভাব দেশেও পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬


পেট্রোল পুরোটাই দেশীয় পণ্য, রেশনিং নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ০৯ মার্চ ২০২৬

featured Image

পেট্রোল বাংলাদেশি পণ্য। আমদানি করতে হয় না। সরকার চাইলে চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন করতে পারে। দেশের গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে গ্যাসের উপজাত হিসেবে যে কনডেনসেট পাওয়া যায়, তা পরিশোধনের মাধ্যমে পেট্রোল উৎপাদন হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলের মোট চাহিদা ও বিক্রি ছিল প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন, যার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পদক্ষেপ হিসেবে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং শুরু করেছে সরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ি, এখন থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত মোটরসাইকেল চালকরা দৈনিক সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার) দৈনিক সর্বোচ্চ ১০ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে।

এসইউভি, জিপ, মাইক্রোবাস দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫ লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। এছাড়া পিকআপ, লোকাল বাস প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ লিটার, দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, কনটেইনার ট্রাক ২০০ থেকে ২২০ লিটার ডিজেল নিতে পারবে।

প্রশ্ন উঠেছে, পেট্রোল যদি দেশীয় পণ্য হয় এবং চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন সক্ষমতা থাকে তাহলে রেশনিং করার প্রয়োজন কী?

সাধারণ মানুষের অভিমত

মগবাজারের বাসিন্দা শেফিক রহমান সুমন এ বিষয়ে সংবাদকে বলেন, “নিউজে দেখছি পেট্রোল নাকি দেশেই হয়। আমদানি করা লাগে না। তাহলে পেট্রোল কেন দুই লিটার করে দিতে হবে।

সুমন জানান, তিনি তার বাইকে একবারে ১০ লিটার তেল নেন। এটা দিয়ে তার এক সপ্তাহ বা দু-একদিন কমবেশি চলে।

তার প্রশ্ন, “একটা লোক কি প্রতিদিন একবার করে পাম্পে যাবে? লাইন দিয়ে ওয়েট করবে? তার কি আর খেয়ে দেয়ে কাজ নেই!”

তার ভাষায়, “বাইক যারা চালান, কেউ কেউ হয়ত প্রতিদিন তেল নেন। তবে অনেকের জন্যই প্রতিদিন পাম্পে যাওয়া অত্যন্ত ঝামেলার বিষয়।”

সুমন বলেন, “সরকারের উচিৎ এ বিষয়ে ভেবে দেখা। সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জনগণের ভোগান্তি দূর করা।”

পেট্রোলের রেশনিং নিয়ে সুমনের মতো প্রশ্ন অনেকেরই। মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, এমন অন্তত বিশ জনের সঙ্গে গেল রোববার (৮ মার্চ) কথা হয়েছে সংবাদের। তাদের সবাই পেট্রোলে রেশিনিংয়ের বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

পুরান ঢাকা বনগ্রামের বাসিন্দা মো. ইলিয়াস নিয়মিত মোটরসাইকেল চালান। জ্বালানিতে রেশনিং প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি সংবাদকে বলেন, “এইডা কোন কথা অইল (হলো)! দুই লিটার তেলে কী অয় (হয়) ভাই? রিজার্ভেই তো পইড়া থাকে দেড় লিটার। স্টার্ট দিয়ে পিকআপ মাইরা একটু সামনে বাড়লেইতো বাকী আধা লিটার শেষ। সারাদিন চালামু কেমনে?”

আরেক বাইকার সংবাদকে জানান, গত দুই দিনে তিনি ঢাকার বেশকিছু পাম্পে গেছেন। সব জায়গায় বাইকারদের ভিড়। এতে অন্য যানবাহন তেল নিতে ঢুকতেই পাড়ছে না। তার মতে, মোটরসাইকেলগুলোতে অন্তত ৫ লিটার তেল দিয়ে দিলে এই জটলা একেবারেই কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যেহেতু যুদ্ধ চলছে, দেশে তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে সাধারণ মানুষ মজুত নিয়ে আতঙ্কিত হচ্ছে, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছে। তার মতে, সরকার তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দেওয়ায় আরও আতঙ্ক ছড়াতে পারে। এজন্য জনগণকে সঠিক বার্তা দিতে হবে।

এ খাতের একাধিক বিশ্লেষকের মতে, সরকার যখনই রেশনিংয়ের ঘোষণা দিয়েছে, জনমনে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রেতারা মনে করছেন, তেলের মজুত শেষ। দ্রুত তেল কিনতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণকে বিষয়টি জানাতে হবে, বোঝাতে হবে। দেশীয় পেট্রোলে মজুত নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকারকে এই তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

পেট্রোল-অকটেনের চাহিদা ও সরবরাহ

দেশে পেট্রোলের মোট চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ দৈনিক চাহিদা প্রায় এক হাজার ২৬৫ মেট্রিক টন।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) দেশের মোট পেট্রোলের প্রায় ১৬ শতাংশ সরবরাহ করে। বেসরকারি শোধনাগারগুলো বাকি ৮৪ শতাংশ পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করে। এরা মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের উপজাত ‘কনডেনসেট’ শোধন করে এটি উৎপাদন করে।

গত বছর পেট্রোলের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হয়েছে। চলতি বছরেও পেট্রোল আমদানির কোনো পরিকল্পনা বিপিসির নেই। সংস্থটি বলছে, এবারও দেশীয় উৎপাদন থেকেই চাহিদা মেটানো যাবে।

এদিকে, দেশে উৎপাদিত পেট্রোলের সঙ্গে ‘অকটেন বুস্টার’ নামের রাসায়নিক মিশিয়ে অকটেন উৎপাদন করা হয়। এই অকটেন বুস্টার আমদানি করতে হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে অকটেনের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ, দৈনিক চাহিদা প্রায় এক হাজার ১৩৬ মেট্রিক টন। প্রতি বছরই অকেটেনের চাহিদার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দেশীয় উৎপাদন হচ্ছে, বাকিটা আমদানি করা হচ্ছে। দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলো থেকে অকটেন কেনে বিপিসি। বেসরকারি গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া ‘কনডেনসেট’ প্রক্রিয়াজাত করে অকটেন তৈরি করে বেসরকারি কোম্পানিগুলো।

পেট্রোল ও অকটেনের সম্মিলিত বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ মেট্রিক টন হলেও দেশের রিফাইনারিগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৬ লাখ টন। অর্থাৎ, পেট্রোল উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় না, বরং অভ্যন্তরীণ রিফাইনারিগুলোই চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে। তবে পেট্রোলের চাহিদা কম থাকায় কম উৎপাদন করা হয়। কারণ বেশী উৎপাদন করা হলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে এই জ্বালানি রাপ্তানির সুযোগ সীমিত।

ডিজেলের চাহিদা ও আমদানি

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ মেট্রিক টন। এটি দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ।

দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে দৈনিক চাহিদা প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে দেশের মানু আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কিনছে বলে ডিজেলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে দৈনিক ২৫ হাজার টনে পৌঁছেছে।

ডিজেলের চাহিদার মাত্র ১৮ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ দেশীয়ভাবে মেটানো হয়। চট্টগ্রামের ইআরএল এবং কিছু বেসরকারি শোধনাগার মিলিয়ে এই উৎপাদন হয়। প্রতি মাসে অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলো থেকে গড়ে প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হয়।

ডিজেলের চাহিদার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ মূলত ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং আরব দেশগুলো থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।

বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন ২০২৩ সালে তৎকালিন আওয়ামী লীগ সরকার উদ্বোধন করে। এই পাইপ লাইনের সক্ষমতা ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল যা উত্তরের ৮ জেলায় সরবরাহ করা যাবে। এই তেল ভারতের শিলিগুড়ির নুমালি গড় থেকে আসে।

ডিজেল দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জ্বালানি। ভারী যানবাহন, কৃষি যন্ত্রপাতি, এবং শিল্প কারখানায় এর চাহিদা অপরিসীম। বর্তমানে বৈশ্বিক ও স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা সংকট তৈরি হলেও, ১ লাখ ৮১ হাজার টন মজুত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ জ্বালানি মন্ত্রীর

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গেল শনিবার বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক থেকে বেরিয়ে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, “মজুত আছে, কিন্তু যুদ্ধ কবে থামবে কেউ তো আমরা জানি না।”

এই প্রেক্ষিতে সঞ্চয় করা হচ্ছে জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “৯ তারিখ আমাদের আরও দুটি ভেসেল আসছে, সুতরাং ঘাটতি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও যেহেতু যুদ্ধ চলছে, আমাদের খুব হিসাব করে চলতে হবে।”

বিপিসি যা বলছে

বিপিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টনের মতো। তবে ১ থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দৈনিক চাহিদা ছাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩০০ টন।

বিপিসির দেওয়া গেল শনিবারের হিসেবে, পেট্রলের মজুত আছে ১৫ হাজার ৫১৭ মেট্রিক টন। রোববার থেকে দৈনিক ১ হাজার ৭০ হাজার মেট্রিক টন করে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে বর্তমান মজুত দিয়ে ১৫ দিন চলবে।

এছাড়া ইআরএল থেকে প্রতিদিন ৪০০ মেট্রিক টন করে পেট্রল পাওয়া যাবে। বেসরকারি শোধনাগার থেকেও আসবে নিয়মিত।

বিপিসির বলছে, মার্চ মাসে দেশের সরকারি-বেসরকারি শোধনাগার থেকে পেট্রল ও অকটেন মিলিয়ে ৪০ হাজার টন সরবরাহ আসতে পারে। তাই আপাতত মজুত শেষ হওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আমদানি করা না গেলে মাসে ইআরএলের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রোববার (৭ মার্চ) থেকে দিনে ৯১৩ মেট্রিক টন করে অকটেন সরবরাহ করা হবে। শনিবার পর্যন্ত অকটেনের মজুত ছিল ২৩ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন। দিনে ৯১৩ মেট্রিক টন করে সরবরাহ করলে এই পরিমাণ তেল দিয়ে ২৫ দিনের মতো চলবে। পাশাপাশি দেশীয় উৎস থেকে মার্চেই ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন মজুতে যুক্ত হবে। আরও ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন আমদানির উৎস খোঁজা হচ্ছে।

দৈনিক গড় চাহিদা ১ হাজার ১৩৬ মেট্রক টন ধরে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার মেট্রিক টন অকটেন মজুতে যুক্ত হলে তা দিয়ে চলা যাবে ৪৪ দিন।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান সংবাদকে বলেন, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া বন্দর থেকে চাহিদার ৮০ শতাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালি হয়ে আসে ২০ শতাংশ। তিনি মনে করেন, তাই আপাতত বড় ঝুঁকি নেই। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘয়িত বৈশ্বিক জ্বালানি সংকেটর প্রভাব দেশেও পড়বে।


সংবাদ | বাংলা নিউজ পোর্টাল - সর্বশেষ খবর, রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত