সংবাদ

কবিতা

এ সপ্তাহের কবিতা

ফারুক, তাকিয়ে দেখো বিমল গুহ    [কবি ফারুক মাহমুদের ৭৫তম জন্মদিনে] ফারুক, তাকিয়ে দেখো তোমার উঠোনে আজ স্রোতঃস্বিনী ধারা বাড়ির সীমানা জুড়ে নৌকোর আকার সারি সারি পাল, পঙক্তি-আঁকা কবিতার পাল—যা তুমি উড়িয়েছিলে বাতাসের স্রোতে একদিন দুরন্ত মেঘের মতন|   কী তুমুল মাড়িয়ে এসেছো পথ, মনে পড়ে?সহজ তো ছিলো না কিছুই  আজ এতকাল পর তাকিয়ে কি দেখেছো একবার  কোন সে মায়াবী টানে গৃহত্যাগী সন্তের মতন দিকভোলাঘুরেছো প্রান্তরে অন্ধ আবেগে তখন? এখন অনেক বেলা| রবীন্দ্রনাথের মতো বলতে কি পারো‘খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ পাথর’— সেই ঘোরলাগা শ্লোক?আঙিনায় দেখো কারা বসে আছে চুপ,হাত তুলে কারা নাচে উল্লাস-বেলায় এই দিনে?      বলি— সত্তরের শব্দকারিগর আমরাই তো দাঁড়িয়ে দুপুর-রাস্তায় সমবেত উচ্চারণে পৃথিবীর ঘুম ভাঙিয়েছিসাজিয়েছি রংয়ের বেসাতি খোলামাঠে লাইন-বাই-লাইন দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলনের ব্যবচ্ছেদে—এই তো সেদিন!  আজ তাকিয়ে দেখি পৃথিবীর বয়স বেড়েছে| বরণীয় বরষাশামস হক কবির অন্তরে তুমি কাঙ্ক্ষিত সমাদৃত, বর্ষা—গায়কের কণ্ঠে মেঘমল্লার রাগ;তাপিত ধরণীর কাছে হিমেল পরশপত্রপল্লবকুলে শুচি শ্যামলিমা স্নিগ্ধতাদায়িনীমৃত্তিকার তুমি শ্রেষ্ঠ প্রেমিকানিমেষেই চুষে নেয় তোমাকে সুতীব্র চুম্বনে| তোমার আগমনে কারো রসনা তৃপ্ত ভুনা খিচুড়ি-মাংসের ব্যঞ্জনায়ভেকেরা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে স্বাগত জানায়ঝিল্লির উল্লাসে বিদূরিত রাতের নিস্তব্ধতা| অথচ দেখো— অতি নগণ্য কচুর পাতাটিও কীভাবে তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে!কখনো তুমি বিনষ্টের হোতা, পঙ্কিল কর্দমাক্ত পথঘাটকেঁচো কিলবিল কদর্য বরষা! অতিবর্ষণ মানুষকে করে বিনিদ্র: মাঠের পর মাঠ শুধু ˆথ ˆথ পানি,  অজস্র ফসলের হানিতোমার প্রবল তোড়ে ভেসে যায় প্রান্তজনের পর্ণ কুঠির  কখনো তুমি একচোখা, স্বজনপ্রিয়তুমি চেরাপুঞ্জির প্রেয়সী আর মরুদেশের কাছে প্রবাসীখেটে খাওয়া মানুষের কাছে তুমি এক শঙ্কা মহাভয়!তারা কাজহীন প্রতিদিন| তবুও তুমি বরেণ্য হে বরষাকদম ফুলের ডালি সাজিয়ে মেঘকন্যাকে করছি বরণশুধু পারিনি, তাদের কিছু দিতে যাদের অশ্রুতেবর্ষা নামে সারাটি বছর| ***  অস্তিত্বের গোপন ভাষারোকেয়া ইসলাম বৃষ্টি নামে অনুচ্চারিত শব্দের ভেতর প্রতিটি ফোঁটা যেন সময়ের বিচূর্ণ আয়না,নিজের ক্ষতচিহ্ন দেখে চমকে উঠিমেঘেরও  নির্বাসন অত্যাবশ্যকপৃথিবীর বুকে অশ্রু চিহ্ন রেখে যায়|বর্ষার নদী সমুদ্র সমর্পণেনিজেকে হারানোর মহৎ শিল্প|গাছেরা বৃষ্টির জল ছুঁয়ে সবুজ উচ্চারণ করে,মানুষের কাছে উত্তরহীন অসমাপ্ত প্রশ্ন| বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়েহঠাৎ মনে হয় স্মৃতির দীর্ঘ ক্যানভাসেদরজার ওপাশে একটি অনুপস্থিত মুখ| দুই শ’ ষাটে জেগে থাকা সোডিয়াম  আলোআষাঢ়ের সরবে ঝরে পড়ে অবিরাম, জমাট ভালবাসা একদিন হৃদ আকাশে গভীর মেঘ হতে চায়... মানব-হৃদয়সুহিতা সুলতানা হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর চলে যেতে ইচ্ছে করেহোক জনপদ জনশূন্য! জীবনে বেঁচে থাকারজন্য স্থবিরতা ভাল| মধ্যদুপুরে রূঢ় সমুদ্রেরনীল জলের কথা মনে করিয়ে দেয়| শহরছেড়ে বিচূর্ণ হতে হতে প্রাচীন নগরের ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আমারও মনে হতেথাকে মানুষের রক্তাক্ত চোখের চেয়ে ˆজ্যষ্ঠেরতাতানো ইতস্তত ছায়া ঢের ভাল! এই যেমানুষের আদিম উল্লাস আর তালকানা খেলাবড় প্রাণহীন, অনুভূতিহীন অমীমাংসিত পক্ষপাতকৃত্রিম হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে বিবর্ণ মানব-হৃদয়আর তার পরিণতি! বোধহীন মানুষের ইতিহাসবড় বেদনার কেবলি হৃদয়হীন দৃশ্যের সংকল্পযেদিকে তাকাই আগুনে ঝলসে যাচ্ছে মুখ ওমুখোশ! লোভী রমণীদের স্বার্থের কাছে জীবনওস্তব্ধ প্রতিভাহীন| যতদূর চোখ যায় আষাঢ়েগল্পর মতো অনুশীলন! তারপরও অপেক্ষা ওযুক্তির কোনো মূল্য নেই! সত্যটা আসলে কী?কবিতার মতো অনিবার্য শব্দের কাছে হাঁটুমুড়েবসে থাকলেই কি দূর আকাশ দেখা যায়?সারি সারি প্রাসাদের প্রতিযোগিতায় ঢেকেগেছে নীল আকাশ, মুখ থুবড়ে পড়েছে স্বপ্নেরধ্বনি! অকূলে জীবনও বেঁকেচুরে যায়! অর্ধেকজীবনের জন্য আর কারও প্রয়োজন নেই!*** স্যামন রান জুনান নাশিত এসবই একদিন নিয়ম হয়ে যায়তুমি শোক ভুলে যাবেসবুজ ঘাসে ঢেকে যাবে দূরের স্যানোটাফমাথার ওপর ওড়ানো ছাই শেষের বিন্দুতে মিলে গেলেওবুকের পাঁজর ভাঙা দীর্ঘশ্বাসদিনদিনই নতজানু হবেরেলিঙ থেকে ঝুলে থাকা পাতার ভাঁজে পোকার দাপট উপেক্ষা করেই পিলপিল হেঁটে যাবে বৃক্ষের বাড়ন্ত শরীর| এসব জেনেই বর্ষার বিমুগ্ধ সংসার আমাদের হাতের তালুতে ফোটেকখনও রোদ, কখনও বৃষ্টির ছাঁট মুখে নিয়ে জীবন একাকী হাঁটে তপস্যার ভিড়েমাঝরাতে মেঘের ফাঁকে উঁকি দেয়া চাঁদআমাদেরও লক্ষ্য করেবেদনার লগ্নিতে শূন্য বুকের ভেতর কতোটা তাপ, কতোটা হাহাকারজমে জমে শুদ্ধ সারং হয়ে ওঠেরোদের চাবুক তা জেনেই আরো প্রখর আরো আগ্রাসী হবেএকদিন রেলিঙ থেকে ঝুলে থাকা সুবজের ঘ্রাণ আটকে দেবেচাবুক তোলা রোদের দু’হাত| তাই ভেঙে পড়ো না, অপেক্ষা করোসহ্য করো শোকের বিষাদএকদিন সবকিছু নিয়ম হয়ে যাবেতখন মনেই হবে না স্যামন রান কতো যে কষ্টকর!***    গার্হস্থ্য নাওসঞ্জয় দেওয়ান বরফের চাঙ্গড় ভাঙে দেহ আঙ্গিনায়হাড্ডিসার শরীরে শীতল হাওয়াসুষুপ্ত শিরায় বিয়াসের মৃতরেখা| স্বচ্ছ জলের ধারায় বৈঠা হাতে পৃথুলা তরুণীহাতের চেটোয়  কালঘামআদি প্রেমিক ছিটায় এক কোষ জলপাটাতনের বুকপাঁজর কাঁপে  জলবাসরে| মেডুসার অভিশপ্ত প্রেমিকপ্রথম অভিসারে অন্ধ হয়েঅদ্যাবধি টেনে চলছে গার্হস্থ্য নাও|***   যিশুর মতো লটকে থাকা ঘুড়িসুমন শামস গোঁত্তা খেয়ে ঘুড়িটা হঠাৎ আটকে গেছে| ছুটবার শেষ চেষ্টার পর আত্মসমর্পণ| সংগোপনে তবুও সে পালাতে চায়| বাতাসের একটু দোলাতেই সাপ বেজির লড়াই| ক্লান্ত অবসন্ন সে লড়াই থিতিয়ে এলে ঘুড়িটা আবার জিভ ছেড়ে দেয়া লাশের মতো ঝুলে পড়ে| পালাবার জন্য প্রতিদিন লড়তে লড়তে ঘুড়িটা আরও বেশি পেঁচিয়ে যেতে থাকে| তারপর ছিঁড়েখুঁড়ে যিশুর মতো লটকে থাকে অনন্তকাল| মুক্তিপাগল মানুষরাও পেরেকবিদ্ধ যিশু হয়ে যায় পালাতে পালাতে এভাবেই একদিন|*** তিলঊর্মি রহমান আমাকে পাওয়ার আগে,তুমি আমাকে আবিষ্কার করতে চাইতে|আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, যখন জানলামতুমি আমার ঠোঁটের তিল দেখেইএকজন্ম কাটিয়ে দেবে বলে ভেবেছ|আমিও প্রেমে পড়লাম|নিজেকে আবিষ্কৃত হতে দেখার বাসনা হলো আমার|তুমি আবিষ্কার করলেআমার আরও দুটো গভীর কালো তিল!তারপর আরও দুটো|এখন আর আমার ঠোঁটের তিল তোমায় টানে না|মৃদু আলোয় তুমি আরওচারটে তিল খুঁজতে থাকো|নতুন কিছুর খোঁজ না পেয়ে হতাশ হও!অথচ তুমি জানোই না, ভালোবাসলেএকটা তিলকেই বারবার আবিষ্কারেরআনন্দ পাওয়া যায়|***প্রেম নিজেই সালোকসংশ্লেষরোখসানা ইয়াসমিন মণি আজ বৃষ্টিতে ভিজবে বলেকিছু রৌদ্র আনফ্রেন্ড করেছিলে,অথচ তোমার পাতায় তুমিরৌদ্রের কাছেই ক্লোরোফিল চেয়েছিলে| এই অহর্নিশ বাষ্প-বিলাসী খেলায়আমাকেও নিয়েছো জলের মেলায়;চারিপাশে আজ এক মোহগ্রস্ত ঊর্ধ্বশ্বাস,আমিও হয়েছি পাগল অবুঝ চারাগাছ| যে বৃষ্টির লোভে তুমি বিবাগী হলে,অথচ শিকড়ের অমোঘ সালোকসংশ্লেষণে—ভুল করে আলোক-বিমুখ ছায়ায় চড়ে,নিজের সবুজটুকুই সঁপে দিলে মরণে| আমাকে দিয়েছো আজ তোমার সমস্ত আলো,সবুজ হারানোর ক্ষতটাই তুমি বেসেছ ভালো;অবশেষে রোদ্দুরের মরীচিকার দিন শেষেপ্রেমকেই বাঁচিয়েছ তুমি আমার সংশ্লেষে|***  হাসনাহেনার গন্ধফরিদা ফারহানা নিরুত্তর কিছু প্রশ্ন সারাজীবনধোঁয়াশার এক জাল হয়ে ঝুলে থাকে পাওয়া-না-পাওয়ার মাঝপথে|হাজারো শূন্যতার বিস্তারযেন রোজই সেখানে ফুলহয়ে ফোটে|তুমি মাঝরাতের অন্ধকার হয়ে নেমে যাও মনের অলিগলিতে|স্নানের শেষে ভেজা গামছায়ভেসে ওঠে তোমার চোখের দৃষ্টি|আমি এখনো খুঁজে যাইসলজ্জ প্রশান্তির সেই মুখের গঠন|তুমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মদিনে হাসনাহেনার গন্ধ হয়েআমাকে বিভোর করে দেবেআর সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পথএখনো বুঝি বাকি|***   আগন্তুক নয়ন আহমেদ মটমট করে ভেঙে যাচ্ছে হরিৎ যোগাযোগ| সম্পর্কের রেণু|দ্যাখো ভঙ্গুর কালের বর্ণমালা! খেঁজুর পাতার মতো চিরল চিরল গভীরতা কাঁদছে একাকী|কাঁদছে সমূহ ধানখেত|তার শব্দ শোনো| আহা! আশ্রয় কামনা করে খালি হাতে ফিরে গেছে সবুজ আগুন|তুমি প্রেম কাকে বলো? কাকে বলে সভ্যতা? পথে পথে গড়াগড়ি খায় চোখ ও দৃশ্যের মাতৃভাষা| সবই আহত|হায় পঙ্গুকাল! যুদ্ধ ও ঘৃণার বিপরীতে কোনো ফুল ফোটানো গেল না| তবুও অপেক্ষা করো| হয়তো নিজেকেই ভালোবেসে পরিচর্যা করছে সূর্যমুখীর মতো কোনও আগন্তুক| ***  তবু জেগে থাকেফেরদাউসী কুঈন তোমাকে  মুছে দিতে উদ্যত আরেকটি তুমিখুব নীরবে খুব সন্তর্পণে| আমি বিস্ময়ে দেখি;উজ্জ্বল জোছনার ঠিকরে পড়া আলোসব কিছু গিলে নেয় আপন সৌন্দর্য|হয়ত ভীষণ অপেক্ষায় ছিলাম—আলো নিভে দিতে জ্বলুক আরেকটি আলো,ঝুম বৃষ্টি ঝরুক শান্ত নদীর জলে| এই যে রেলের ঝিকঝিক শব্দ,নদীর তীরে ঠেউদোলানো কাশফুলের বন্যা,শান্ত নদীর জলে সোনাগলা আলোয়পাখিদের ফেরার গান, স্মৃতির ˆসন্যদল ঝাঁকে ঝাঁকে উঁকি দেয় ইথারে, হারানো সুর তবু হারায় না— মিষ্টি দোয়েল হয়ে রয়ে যায় কোথাও... 

এ সপ্তাহের কবিতা