জ্বালানি আমদানির ফাঁদে বাংলাদেশ, সমাধান কীভাবে
জ্বালানি শক্তি আধুনিক সভ্যতার প্রাণ। গাড়ি থেকে শুরু করে ঘরের বাতি, এমনকি বেডসাইড টেবিলে পড়ে থাকা ফিটনেস ট্র্যাকার—সবই চলে শক্তিতে। কিন্তু বিশ্বের এই শক্তি ব্যবস্থা নিয়ে বড় সমস্যা আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো, এই শক্তির ৮০ শতাংশের বেশি আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে, যা জলবায়ু সংকটের প্রধান কারণ। অন্যদিকে, বিশ্বের ৬৫ কোটির বেশি মানুষ এখনও বিদ্যুৎবিমুখ।সম্প্রতি জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি প্রকাশিত ‘গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট আউটলুক-সেভেন্থ এডিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই সমস্যার সমাধানের পথও দেখানো হয়েছে।৮২টি দেশের ২৮৭ জন বিজ্ঞানীর এই প্রতিবেদন বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং দূষণ ও বর্জ্য—এই তিনটি সংকট পরস্পর সংযুক্ত।তাদের মতে, শক্তি, খাদ্য, বর্জ্য ও পরিবেশ—এই ব্যবস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে রূপান্তর করতে পারলে ২০৭০ সালের মধ্যে বার্ষিক ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব। এই প্রতিবেদনের আলোকে যখন বাংলাদেশের দিকে তাকানো যায়, তখন দেখা যায়—আমরা ঠিক কোন পথে হাঁটছি? বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন।২০০২ সাল থেকেই জানা ছিল, বাংলাদেশের সাশ্রয়ী জ্বালানির প্রধান উৎস—প্রাকৃতিক গ্যাস—২০৩০-৩১ সালের মধ্যে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বিগত সরকারগুলো আমদানিকৃত জ্বালানির সাহায্যে তাৎক্ষণিক সমাধানের পথ বেছে নিয়েছে।গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি বলছে, গত কয়েক দশকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের ৯৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৫ শতাংশেরও কম। অথচ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে কোনো ভ্যাট নেই, অগ্রিম আয়করও ন্যূনতম—ফলে এর ওপর করের বোঝা মাত্র ৯.৫ শতাংশ।অন্যদিকে, সৌর প্যানেল, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বা বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তির ওপর করের বোঝা ৬১ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে এলএনজি ব্যবসায়ীরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন প্রায় ১ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা, আর নবায়নযোগ্য শক্তি খাত পড়ে আছে বাড়তি করের বোঝায়। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি কিলোওয়াট-আওয়ারে গড়ে ৭.৫ টাকা করে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের ২০ শতাংশ সরবরাহ করা। অথচ সিপিডির বিশ্লেষণ বলছে, এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বছরে ১ হাজার ৬৬২ মেগাওয়াট সোলার প্যানেল বসাতে হবে। চলতি অর্থবছরে সাতটি সোলার প্রকল্প (৬৪০ মেগাওয়াট) অনুমোদন পায়নি।অন্যদিকে, নবায়নযোগ্য শক্তি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ (লিথিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট, কপার) উত্তোলন নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। গ্রিনপিসের এক প্রতিবেদন বলছে, এই খনিজ আহরণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমি দখল, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন ও পরিবেশ ধ্বংসের ঝুঁকি রয়েছে।কিন্তু সমাধানও আছে—পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বাড়ানো, ব্যাটারি রিসাইক্লিং জোরদার করা এবং সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মতো বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহার করলে খনিজ চাহিদা ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব।জিও-৭ প্রতিবেদনের মূল বার্তা হচ্ছে, একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি সমস্যা তৈরি করলে চলবে না। এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে যেমন তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা করা যাচ্ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে বাড়ছে বিদ্যুৎ খরচ ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ। অন্যদিকে, সঠিক নীতিমালা ও কর অবকাঠামো তৈরি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সহজলভ্য করলেই সমাধান সম্ভব।সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে বলেছেন, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানি নির্ভরতার কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি কূপ খনন শেষ করে জাতীয় গ্রিডে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে।কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়।সিপিডি ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধ করে সৌরশক্তি ও স্মার্ট গ্রিডে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং এলএনজি আমদানিতে ভ্যাট ফিরিয়ে আনা- এই উদ্যোগগুলোই পারে শক্তি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে।বিশ্ব যদি সঠিক পথে এগোতে চায়, তবে বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটতে বাধ্য। কারণ জিও-৭ বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বায়ুদূষণ কমিয়ে ৯০ লাখ অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। আর ২০৭০ সালের মধ্যে ২০০ মিলিয়ন মানুষ দারিদ্র্য ও ক্ষুধা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন।কিন্তু সেটা সম্ভব হবে কেবলমাত্র সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই।সূত্র: জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি