গত ১১ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় একটি গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের একটিই পরিচয়—আমরা সবাই ‘বাংলাদেশি’। এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই। আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’। সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে সুরক্ষিত।” তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী সেখানে বলেছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং অযৌক্তিক। এই আন্তর্জাতিক পরিভাষা ব্যবহারের পেছনে এক ধরনের ‘পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ’ বা ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।”
প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি যদি এতটাই অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক হয়, তাহলে অতীতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে এই শব্দের ব্যবহার হলো কীভাবে? বিএনপির নেত্রী ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে বাণী দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছিলেন, সুযোগ এলে সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা, আয়কর আইন ২০২৩, অর্থ আইন ১৯৯৫ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-সহ বিভিন্ন আইন ও নীতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের বিশেষ বিধান রয়েছে।
২০২৬ সালের বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দেশব্যাপী কর্মসংস্থান’ শিরোনামের ‘সমঅধিকার ও অন্তর্ভুক্তি’ অংশে বলা হয়েছে, ‘বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি, হরিজন, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, আদিবাসী এবং পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি ও বেসরকারি খাতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন করা হবে।’ বর্তমান ডেপুটি স্পিকার বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ও সংসদে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও প্রকৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এই ভূখণ্ডের মাটির সঙ্গে বহু জনগোষ্ঠীর রয়েছে দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানেই বসবাস করে আসছেন। অথচ রাজনৈতিক, আইনি ও সামাজিক এক জটিলতার কারণে আজ এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কাগজে-কলমে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে আপত্তি থাকলেও বাস্তবতার বাংলাদেশে এসব জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পরিভাষায় তাদের ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ ইত্যাদি পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। এর পর থেকেই পরিচয়ের প্রশ্নে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে—রাজপথে, সেমিনারে, আলোচনা সভায় সর্বত্রই। প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংস্কৃতি ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, সাহিত্যের পাতায় এবং বাস্তবতার জমিনে ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি তাই টিকে আছে।
রাষ্ট্রীয় পরিভাষা যা-ই হোক, দেশের গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং ইতিহাস-সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে ‘আছে’ এবং ‘নাই’-এর এই দোলাচলের পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট রয়েছে বলেই মনে হয়। রাষ্ট্রের একটি আশঙ্কা হতে পারে যে, ‘আদিবাসী’ শব্দটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক আইন ও অধিকার কাঠামোর আলোকে ভূমি, সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসনসহ নানা প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসতে পারে। কিন্তু সম্ভাব্য রাজনৈতিক বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় কি কোনো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা যায়? জাতীয় ঐক্য রক্ষা এবং নাগরিকের স্বতন্ত্র পরিচয় স্বীকার—এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখারও কোনো কারণ নেই।
সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, পাহান, মুণ্ডা ও মালপাহাড়িয়ার মতো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রসীমা প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই বরেন্দ্রভূমি ও সমতল অঞ্চলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে আসছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নিয়েছেন; স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদেরও অবদান রয়েছে। সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক রীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনার কাঠামো রয়েছে। অনেকের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও রয়েছে। ফলে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে স্বীকার করা বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈচিত্র্যকেই স্বীকার করা।
মন্ত্রীদ্বয়ের বক্তব্যের পর আদিবাসী সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, পরিচয় ও নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করা ইতিহাস বিকৃতির শামিল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বাস্তবতা হলো, শুধু নাম বদলে দিলে মানুষের সংকট বদলে যায় না। সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, পাহান, রাজোয়াড় ও তুরীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, ভূমি হারানো, ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন—এমন খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসে। স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি তাদের নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে লড়াই করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় পরিভাষার বিতর্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাদের বাস্তব অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ‘আদিবাসী’ বলা হবে, নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’—এই বিতর্কের একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দিক অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, পরিচয়ের প্রশ্নটি মানুষের মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভূমির অধিকার, শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শুধু পরিভাষা পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান হবে না।
বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থেই একটি অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে দেশের বৈচিত্র্যকে স্বীকার করতেই হবে। জাতীয় পরিচয় সবার জন্য অভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই অভিন্ন পরিচয়ের ভেতরেও ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়ের বৈচিত্র্য থাকতে পারে। তাই ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে অস্বীকার বা দমন করার পরিবর্তে সংবিধান, আইন, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রীয় অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই হবে একটি পরিণত, ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের পরিচয়।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গত ১১ আগস্ট রাজধানী ঢাকায় একটি গোলটেবিল বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের একটিই পরিচয়—আমরা সবাই ‘বাংলাদেশি’। এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই। আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’। সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে সুরক্ষিত।” তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী সেখানে বলেছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ শব্দটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এবং অযৌক্তিক। এই আন্তর্জাতিক পরিভাষা ব্যবহারের পেছনে এক ধরনের ‘পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ’ বা ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।”
প্রশ্ন হচ্ছে, ‘আদিবাসী’ শব্দটি যদি এতটাই অপ্রাসঙ্গিক ও অযৌক্তিক হয়, তাহলে অতীতে রাষ্ট্র ও রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে এই শব্দের ব্যবহার হলো কীভাবে? বিএনপির নেত্রী ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহার করে বাণী দিয়েছিলেন। ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেছিলেন, সুযোগ এলে সংবিধান সংশোধন করে আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা, আয়কর আইন ২০২৩, অর্থ আইন ১৯৯৫ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-সহ বিভিন্ন আইন ও নীতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণের বিশেষ বিধান রয়েছে।
২০২৬ সালের বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দেশব্যাপী কর্মসংস্থান’ শিরোনামের ‘সমঅধিকার ও অন্তর্ভুক্তি’ অংশে বলা হয়েছে, ‘বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তি, হরিজন, তৃতীয় লিঙ্গ, দলিত, আদিবাসী এবং পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি ও বেসরকারি খাতকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে বাস্তবমুখী নীতি প্রণয়ন করা হবে।’ বর্তমান ডেপুটি স্পিকার বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ও সংসদে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও প্রকৃতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। এই ভূখণ্ডের মাটির সঙ্গে বহু জনগোষ্ঠীর রয়েছে দীর্ঘদিনের নিবিড় সম্পর্ক। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এখানেই বসবাস করে আসছেন। অথচ রাজনৈতিক, আইনি ও সামাজিক এক জটিলতার কারণে আজ এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
কাগজে-কলমে ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে আপত্তি থাকলেও বাস্তবতার বাংলাদেশে এসব জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পরিভাষায় তাদের ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ ইত্যাদি পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। এর পর থেকেই পরিচয়ের প্রশ্নে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে—রাজপথে, সেমিনারে, আলোচনা সভায় সর্বত্রই। প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তারা নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, সংস্কৃতি ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, সাহিত্যের পাতায় এবং বাস্তবতার জমিনে ‘আদিবাসী’ পরিচয়টি তাই টিকে আছে।
রাষ্ট্রীয় পরিভাষা যা-ই হোক, দেশের গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং ইতিহাস-সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনায় ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে ‘আছে’ এবং ‘নাই’-এর এই দোলাচলের পেছনে একটি গভীর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট রয়েছে বলেই মনে হয়। রাষ্ট্রের একটি আশঙ্কা হতে পারে যে, ‘আদিবাসী’ শব্দটির সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক আইন ও অধিকার কাঠামোর আলোকে ভূমি, সংস্কৃতি, স্বায়ত্তশাসনসহ নানা প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসতে পারে। কিন্তু সম্ভাব্য রাজনৈতিক বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় কি কোনো জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা যায়? জাতীয় ঐক্য রক্ষা এবং নাগরিকের স্বতন্ত্র পরিচয় স্বীকার—এই দুটি বিষয়কে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখারও কোনো কারণ নেই।
সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, রাজোয়াড়, তুরী, সিং, পাহান, মুণ্ডা ও মালপাহাড়িয়ার মতো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রসীমা প্রতিষ্ঠার বহু আগে থেকেই বরেন্দ্রভূমি ও সমতল অঞ্চলে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে বসবাস করে আসছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করেছে, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধেও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ অংশ নিয়েছেন; স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাদেরও অবদান রয়েছে। সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সামাজিক রীতি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনার কাঠামো রয়েছে। অনেকের নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও রয়েছে। ফলে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে স্বীকার করা বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈচিত্র্যকেই স্বীকার করা।
মন্ত্রীদ্বয়ের বক্তব্যের পর আদিবাসী সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, পরিচয় ও নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একটি জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র অস্তিত্ব অস্বীকার করা ইতিহাস বিকৃতির শামিল। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। বাস্তবতা হলো, শুধু নাম বদলে দিলে মানুষের সংকট বদলে যায় না। সাঁওতাল, উরাঁও, কোল, কোডা, মাহালী, মুণ্ডা, মালপাহাড়িয়া, পাহান, রাজোয়াড় ও তুরীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, ভূমি হারানো, ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন—এমন খবর প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসে। স্বাধীনতার এত বছর পরও যদি তাদের নিজেদের পরিচয় ও অধিকার নিয়ে লড়াই করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় পরিভাষার বিতর্কের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাদের বাস্তব অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের ‘আদিবাসী’ বলা হবে, নাকি ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’—এই বিতর্কের একটি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দিক অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, পরিচয়ের প্রশ্নটি মানুষের মর্যাদা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভূমির অধিকার, শিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া শুধু পরিভাষা পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান হবে না।
বাংলাদেশকে যদি প্রকৃত অর্থেই একটি অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে দেশের বৈচিত্র্যকে স্বীকার করতেই হবে। জাতীয় পরিচয় সবার জন্য অভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সেই অভিন্ন পরিচয়ের ভেতরেও ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়ের বৈচিত্র্য থাকতে পারে। তাই ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে অস্বীকার বা দমন করার পরিবর্তে সংবিধান, আইন, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে একটি সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্রীয় অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করাই হবে একটি পরিণত, ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের পরিচয়।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন