গাজীপুর, শ্রীপুর ও ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় মাটির ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যায়। কিন্তু সেই পানি এখন আর আগের মতো পান করার উপযোগী থাকছে না। অনেক ক্ষেত্রে পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির বিভিন্ন গুণগত মানদণ্ডও ঠিক থাকছে না। বিশেষ করে কারখানার আশপাশের পানিতে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?
দীর্ঘদিন ধরে পানি পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করছি। বিভিন্ন দেশের মানুষ আমাদের কাছে আসেন। তাদের সঙ্গে পানি নিয়ে কথা হয়। তাদের পানিসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা জানতে চাই। তাদের কথা শুনি, ভাবি এবং বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবু তাদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা থেকে শেখার চেষ্টা করি। যেসব দেশে পানির সংকট তীব্র, সেসব দেশের মানুষ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আমরাও এখন খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। ঢাকা শহরের পানির পরিস্থিতি নাজুক। ঢাকা ওয়াসাও নানা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
আমরা বিভিন্ন জায়গায় শূন্য তরল বর্জ্য নির্গমন বা জেডএলডি নিয়ে কাজ করছি। এর অর্থ হলো, পানি পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তরল বর্জ্য নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা। সেদিন মালয়েশিয়ার একজন বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন। তার সঙ্গে অনেক কথা হলো। তিনি আমাদের বুড়িগঙ্গা নদীও দেখেছেন। আমাকে বললেন, ‘তোমাদের পানির প্রতি এমন অযত্ন দেখে আমি সত্যিই কষ্ট পেয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি গল্প শোনালেন। একবার দক্ষিণ আফ্রিকার একটি শুষ্ক অঞ্চলে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে একটি শিশু অসুস্থ ছিল। জ্বরের কারণে তীব্র পিপাসায় শিশুটি মায়ের কাছে পানি খাওয়ার জন্য বারবার কাকুতি-মিনতি করছিল। কিন্তু মা কোথাও পানি পাচ্ছিলেন না। তাদের দেশে একধরনের ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়, যা পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে দিলে দ্রুত ময়লা নিচে জমে যায় এবং পানি কিছুটা পরিষ্কার হয়। তিনি ঘর থেকে সেই ট্যাবলেট নিয়ে এলেন।
একটি অপরিষ্কার পুকুরে ট্যাবলেটটি প্রয়োগ করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে ময়লাগুলো নিচে জমে গেল। ওপরের পানি কিছুটা স্বচ্ছ হয়ে উঠল। আমি সেই দৃশ্য দেখছিলাম।
কিছুক্ষণ পর শিশুটির মা একটি পেয়ালায় পানি তুলে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন। তীব্র পিপাসায় শিশুটি পানি খেতে মুখ বাড়িয়েও শেষ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমি বুঝতে পারলাম, পানির স্বাদ খুব খারাপ। দেখতে পরিষ্কার মনে হলেও পানি ছিল অনেকটা আঠালো ও ঘন। মা অন্য জায়গা থেকে আবার পানি তুলে শিশুটিকে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু শিশুটি সেই পানিও খেল না। নিজের আঞ্চলিক ভাষায় বারবার পানি চেয়ে যেতে লাগল।
সন্তানকে পানি খাওয়াতে না পেরে মা কাঁদতে শুরু করলেন। দৃশ্যটি দেখে আমার চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল হাউমাউ করে কাঁদি। শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে নিজের ব্যাগে থাকা সামান্য পানি শিশুটিকে দিলাম।
সেই মুহূর্তের আনন্দ ছিল পৃথিবীর সেরা আনন্দগুলোর একটি। পানির জন্য মানুষ কতটা কষ্টে আছে, সাঈদ, তুমি বিশ্বাসও করতে পারবে না—বিশেষজ্ঞ আমাকে এ কথাই বলেছিলেন।
কথা বলতে বলতে তিনি আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তার চোখে জল এসে গেল। আমি তার অনুভূতি বুঝতে পারছিলাম।
শেষে তিনি বললেন, ‘তোমাদের নতুন প্রজন্মকে পানি নিয়ে কথা বলতে শেখাও। পানি রক্ষা করতেই হবে। পানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তোমাদের নদীগুলোর যত্ন নাও।’
এমন আবেগঘন গল্প শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। অথচ আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলেও পানির সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির সন্ধানে আমরা মাটির আরও গভীরে যাচ্ছি। একসময় হয়তো মাটির এত গভীরে যেতে হবে যে লাভা উঠে আসবে, তবু পানি মিলবে না। অথচ এসব দেখেও আমরা যেন অবাক হচ্ছি না, উদ্বিগ্নও হচ্ছি না।
যা-ই হোক, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে গবেষণা, পানি পরিশোধন এবং পুনর্ব্যবহারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। নদী, খাল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে পানির গুরুত্ব বোঝাতে হবে। নিরাপদ পানি শুধু আমাদের প্রয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারও। পৃথিবীতে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে।
[লেখক: রসায়নবিদ]

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬
গাজীপুর, শ্রীপুর ও ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় মাটির ৩০ থেকে ৪০ ফুট গভীরে পানি পাওয়া যায়। কিন্তু সেই পানি এখন আর আগের মতো পান করার উপযোগী থাকছে না। অনেক ক্ষেত্রে পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পানির বিভিন্ন গুণগত মানদণ্ডও ঠিক থাকছে না। বিশেষ করে কারখানার আশপাশের পানিতে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?
দীর্ঘদিন ধরে পানি পরিশোধন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করছি। বিভিন্ন দেশের মানুষ আমাদের কাছে আসেন। তাদের সঙ্গে পানি নিয়ে কথা হয়। তাদের পানিসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা জানতে চাই। তাদের কথা শুনি, ভাবি এবং বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের দেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় অনেক পার্থক্য রয়েছে। তবু তাদের অভিজ্ঞতা ও ধারণা থেকে শেখার চেষ্টা করি। যেসব দেশে পানির সংকট তীব্র, সেসব দেশের মানুষ পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আমরাও এখন খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। ঢাকা শহরের পানির পরিস্থিতি নাজুক। ঢাকা ওয়াসাও নানা বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
আমরা বিভিন্ন জায়গায় শূন্য তরল বর্জ্য নির্গমন বা জেডএলডি নিয়ে কাজ করছি। এর অর্থ হলো, পানি পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তরল বর্জ্য নির্গমন শূন্যে নামিয়ে আনা। সেদিন মালয়েশিয়ার একজন বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন। তার সঙ্গে অনেক কথা হলো। তিনি আমাদের বুড়িগঙ্গা নদীও দেখেছেন। আমাকে বললেন, ‘তোমাদের পানির প্রতি এমন অযত্ন দেখে আমি সত্যিই কষ্ট পেয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি গল্প শোনালেন। একবার দক্ষিণ আফ্রিকার একটি শুষ্ক অঞ্চলে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে একটি শিশু অসুস্থ ছিল। জ্বরের কারণে তীব্র পিপাসায় শিশুটি মায়ের কাছে পানি খাওয়ার জন্য বারবার কাকুতি-মিনতি করছিল। কিন্তু মা কোথাও পানি পাচ্ছিলেন না। তাদের দেশে একধরনের ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়, যা পুকুর বা জলাশয়ের পানিতে দিলে দ্রুত ময়লা নিচে জমে যায় এবং পানি কিছুটা পরিষ্কার হয়। তিনি ঘর থেকে সেই ট্যাবলেট নিয়ে এলেন।
একটি অপরিষ্কার পুকুরে ট্যাবলেটটি প্রয়োগ করলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যে ময়লাগুলো নিচে জমে গেল। ওপরের পানি কিছুটা স্বচ্ছ হয়ে উঠল। আমি সেই দৃশ্য দেখছিলাম।
কিছুক্ষণ পর শিশুটির মা একটি পেয়ালায় পানি তুলে তাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করলেন। তীব্র পিপাসায় শিশুটি পানি খেতে মুখ বাড়িয়েও শেষ মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে নিল। আমি বুঝতে পারলাম, পানির স্বাদ খুব খারাপ। দেখতে পরিষ্কার মনে হলেও পানি ছিল অনেকটা আঠালো ও ঘন। মা অন্য জায়গা থেকে আবার পানি তুলে শিশুটিকে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু শিশুটি সেই পানিও খেল না। নিজের আঞ্চলিক ভাষায় বারবার পানি চেয়ে যেতে লাগল।
সন্তানকে পানি খাওয়াতে না পেরে মা কাঁদতে শুরু করলেন। দৃশ্যটি দেখে আমার চোখ দিয়েও পানি গড়িয়ে পড়ছিল। ইচ্ছে হচ্ছিল হাউমাউ করে কাঁদি। শেষ পর্যন্ত কাঁদতে কাঁদতে নিজের ব্যাগে থাকা সামান্য পানি শিশুটিকে দিলাম।
সেই মুহূর্তের আনন্দ ছিল পৃথিবীর সেরা আনন্দগুলোর একটি। পানির জন্য মানুষ কতটা কষ্টে আছে, সাঈদ, তুমি বিশ্বাসও করতে পারবে না—বিশেষজ্ঞ আমাকে এ কথাই বলেছিলেন।
কথা বলতে বলতে তিনি আবারও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তার চোখে জল এসে গেল। আমি তার অনুভূতি বুঝতে পারছিলাম।
শেষে তিনি বললেন, ‘তোমাদের নতুন প্রজন্মকে পানি নিয়ে কথা বলতে শেখাও। পানি রক্ষা করতেই হবে। পানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তোমাদের নদীগুলোর যত্ন নাও।’
এমন আবেগঘন গল্প শুনে আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। অথচ আমাদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলেও পানির সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পানির সন্ধানে আমরা মাটির আরও গভীরে যাচ্ছি। একসময় হয়তো মাটির এত গভীরে যেতে হবে যে লাভা উঠে আসবে, তবু পানি মিলবে না। অথচ এসব দেখেও আমরা যেন অবাক হচ্ছি না, উদ্বিগ্নও হচ্ছি না।
যা-ই হোক, সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে গবেষণা, পানি পরিশোধন এবং পুনর্ব্যবহারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। নদী, খাল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে পানির গুরুত্ব বোঝাতে হবে। নিরাপদ পানি শুধু আমাদের প্রয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারও। পৃথিবীতে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে।
[লেখক: রসায়নবিদ]

আপনার মতামত লিখুন