নওগাঁর রাণীনগর ও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল। ২২০ হেক্টর আয়তনের এ বিলের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ২২টি ইনলেট খালের মোট দৈর্ঘ্য ১৮৫ কিলোমিটার, আর আউটলেট খালের দৈর্ঘ্য ২২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলটি স্থায়ী জলাবদ্ধতায় ভুগছে, যার ফলে আশপাশের ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। এতে করে ওই অঞ্চলের ২৩টি গ্রামের প্রায় সাত হাজার কৃষক পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিলটি খনন করা গেলে ইরি-বোরো ও রোপা-আমন—এই দুই মৌসুমে পূর্ণমাত্রায় ধান চাষ সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিবছর প্রায় ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের বাড়তি ফসল উৎপাদন করা যাবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা যায়, রক্তদহ বিলের আশপাশের এসব গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিল না খনন করায় জলাবদ্ধতা কমছে না, ফলে ধানের ফলন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি কমেছে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যও। বর্তমানে বিল এলাকায় কেবল বোরো মৌসুমে চাষ হয়। বিল পুনঃখনন সম্ভব হলে বাড়তি ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষক ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরবে বলে মনে করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং টেকসই প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় রক্তদহ বিল খনন অত্যন্ত জরুরি।
উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে রক্তদহ বিলের আউটলেট রতনডারা খালের ওপর ‘রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী’ এবং মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছে। প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এই পাখি পল্লী ও বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন। বিশেষ করে বর্ষায় এই এলাকার সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান বলেন, রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী'র সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যার বেশিরভাগের কাজ শেষের দিকে।
উপজেলার সিম্বা গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন ফকির, মোস্তাক হোসেন, জয়েদ ফকির ও খাগড়া গ্রামের আদুল হোসেন জানান, বিল এলাকায় তাদের জমি থাকলেও খননের অভাবে প্রতিবছর লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিল খনন করা গেলে বছরে দুইটি ফসল ফলানো সম্ভব হবে, পাশাপাশি বাড়বে দেশীয় মাছের উৎপাদন। এতে বিলের আশপাশের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবন বদলে যাবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতেও রক্তদহ বিল খনন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তারা।
নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, রক্তদহ বিল ও আশপাশের খাল খনন করা গেলে জলাবদ্ধতা দূর হয়ে বছরে কমপক্ষে দুইটি ফসল উৎপাদন সম্ভব। এতে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১২ মেট্রিক টন হিসাবে বাড়তি ৫৪ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা।
তিনি আরও জানান, খননকৃত মাটি দিয়ে ১০ ফুট চওড়া সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করা সম্ভব। খাল ও বিলের পাড় রক্ষায় রিটেইনিং ওয়াল ও কংক্রিট ব্লক বসানো গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। এছাড়া সড়কের পাশে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগিয়ে পাখির অভয়াশ্রম সৃষ্টি করা যাবে।
এতে ভূ-উপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। জাতীয় সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে রক্তদহ বিল পুনঃখননের জন্য ইতোমধ্যে উচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মার্চ ২০২৬
নওগাঁর রাণীনগর ও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক রক্তদহ বিল। ২২০ হেক্টর আয়তনের এ বিলের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ২২টি ইনলেট খালের মোট দৈর্ঘ্য ১৮৫ কিলোমিটার, আর আউটলেট খালের দৈর্ঘ্য ২২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিলটি স্থায়ী জলাবদ্ধতায় ভুগছে, যার ফলে আশপাশের ৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে। এতে করে ওই অঞ্চলের ২৩টি গ্রামের প্রায় সাত হাজার কৃষক পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিলটি খনন করা গেলে ইরি-বোরো ও রোপা-আমন—এই দুই মৌসুমে পূর্ণমাত্রায় ধান চাষ সম্ভব হবে। সেক্ষেত্রে প্রতিবছর প্রায় ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের বাড়তি ফসল উৎপাদন করা যাবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা যায়, রক্তদহ বিলের আশপাশের এসব গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বিল না খনন করায় জলাবদ্ধতা কমছে না, ফলে ধানের ফলন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি কমেছে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যও। বর্তমানে বিল এলাকায় কেবল বোরো মৌসুমে চাষ হয়। বিল পুনঃখনন সম্ভব হলে বাড়তি ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষক ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরবে বলে মনে করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো এবং টেকসই প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় রক্তদহ বিল খনন অত্যন্ত জরুরি।
উপজেলা প্রশাসন ইতোমধ্যে রক্তদহ বিলের আউটলেট রতনডারা খালের ওপর ‘রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী’ এবং মৎস্য অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছে। প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এই পাখি পল্লী ও বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করছেন। বিশেষ করে বর্ষায় এই এলাকার সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান বলেন, রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকা ও পাখি পল্লী'র সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যার বেশিরভাগের কাজ শেষের দিকে।
উপজেলার সিম্বা গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন ফকির, মোস্তাক হোসেন, জয়েদ ফকির ও খাগড়া গ্রামের আদুল হোসেন জানান, বিল এলাকায় তাদের জমি থাকলেও খননের অভাবে প্রতিবছর লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিল খনন করা গেলে বছরে দুইটি ফসল ফলানো সম্ভব হবে, পাশাপাশি বাড়বে দেশীয় মাছের উৎপাদন। এতে বিলের আশপাশের কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবন বদলে যাবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতেও রক্তদহ বিল খনন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তারা।
নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, রক্তদহ বিল ও আশপাশের খাল খনন করা গেলে জলাবদ্ধতা দূর হয়ে বছরে কমপক্ষে দুইটি ফসল উৎপাদন সম্ভব। এতে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১২ মেট্রিক টন হিসাবে বাড়তি ৫৪ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা।
তিনি আরও জানান, খননকৃত মাটি দিয়ে ১০ ফুট চওড়া সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার করা সম্ভব। খাল ও বিলের পাড় রক্ষায় রিটেইনিং ওয়াল ও কংক্রিট ব্লক বসানো গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। এছাড়া সড়কের পাশে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগিয়ে পাখির অভয়াশ্রম সৃষ্টি করা যাবে।
এতে ভূ-উপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। জাতীয় সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে রক্তদহ বিল পুনঃখননের জন্য ইতোমধ্যে উচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন