উৎসব হলো বিনোদনের উপলক্ষ্য। আবার কোনো কোনো বিনোদন আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। গ্রামীণ পরিবেশ কিংবা শহুরে জীবন— যেখানেই হোক না কেনো, কর্মব্যস্ততার মধ্যে মানুষের বিনোদনের প্রয়োজন হয়। তাতে মনের ক্লান্তি দূর হয়, কর্মস্পৃহা বাড়ে। সামাজিক জীবনেও বিনোদনের নানান উপলক্ষ্য মানুষ উদ্ভাবন করেছে নিজেদের প্রয়োজনে। এর একটা দিক হলো সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, আর আনন্দের আয়োজন। গল্প করা কিংবা আড্ডা দেওয়া বাঙালি সংস্কৃতিরই অংশ। এর সঙ্গে মনের আনন্দেরও যোগ আছে। সবচেয়ে বড় দিক হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করা। যেমন নতুন ধান উঠলে বাঙালির ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব হয়, বিশেষ সময়ের পিঠা উৎসব, বর্ষাকালে কর্মহীন সময়ে গ্রামীণ কৃষকের জটলা এবং মুড়িমুড়কির ব্যবস্থা; সেটাও এক রকমের উৎসব— সুস্থ সময় কাটানোর উপলক্ষ্য। এসব আয়োজন কখনো কখনো বড় আকারে হয়, পুরো এলাকার মানুষকে নিয়ে। এটাও সামাজিক আচার, সম্প্রীতির উপলক্ষ্য। এসবের আয়োজনে মনের জড়তা দূর হয়, মনে ফূর্তি আসে। একঘেয়ে জীবনযাপন তো কেউ চায় না। তা মনকে ক্লান্ত করে, শরীরে জড়তা আনে।
আমাদের সামাজিক পরিবেশে উৎসবের যত আয়োজন, সবকিছু সময়ের প্রয়োজনে হয়েছে; সংঘ-ভাবনা থেকে হয়েছে। সামাজিকতা প্রতিষ্ঠিত আচার। এটা বাঙালির সংস্কৃতি। তেমন একটি উপলক্ষ্য আমাদের পহেলা বৈশাখ। বলা বাহুল্য, এটি হলো বাংলা সনের প্রথম দিন। আমাদের জন্য গর্বের বিষয় যে, আমরা সভ্যতার তুলাদণ্ডে কোনোভাবেই পিছিয়ে-পড়া জাতি নই। শির উঁচু করে আমরাও বলতে পারি— আমাদের নিজস্ব পঞ্জিকা আছে, ঐতিহ্য আছে, স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস আছে, আমাদের নিজস্ব পোশাক আছে। এসবই সংস্কৃতির নির্ণায়ক দিক। আমাদের যে-দিনপঞ্জিকা, তা মুগল সম্রাট আকবরের আমলে প্রবর্তিত কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বৎসর-গণনা পদ্ধতি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবর স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে কর বা রাজস্ব আদায়ের সুবিধা-অনুযায়ী এই বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন। কথিত আছে, তাঁর সময়ে দেশে বেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছিলো। উৎপাদিত কৃষিপণ্য সে সময় বিদেশেও রফতানি হতো বলে জানা যায়। সেই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে হিজরি সন অনুযায়ী কৃষকদের নিকট থেকে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু হিজরি সনের গণনা চাঁদের ওপর নির্ভরশীল বলে কৃষকের ফলন তোলার সঙ্গে ঠিকমতো তা মিলতো না। ঠিক সময়ে ফলন না-ওঠায় সম্রাটের ধার্যকৃত কর কৃষকেরা সময়মতো দিতে পারতো না। এতে ভীষণ ভোগান্তি হতো প্রজাদের। কৃষকদের খাজনা প্রদানের সুবিধার্থে সম্রাট রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজিকে সৌর সন ও হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন একটি সন প্রবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। জানা যায়, সম্রাট আকবরের সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে এই নতুন বাংলা সন চালু হয়েছিলো। প্রথমে এটিকে ‘ফসলি সন’ বলা হয়েছিলো, পরে বঙ্গ অঞ্চলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বলা হয় ‘বঙ্গাব্দ’। অবশেষে যা ‘বাংলা সন’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
বঙ্গাব্দ প্রচলের শুরুতে সন গণনায় মূল ভিত্তি ছিলো আঞ্চলিক আবহাওয়া-নির্ভর ফসল তোলার হিসেব, ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে জনসাধারণের বার্ষিক বকেয়া আদায়ের সুবিধা, এবং সওদাগর দোকানদার ও রাজা-রাজরাদের বকেয়া আদায় এবং নতুন হিসেব খোলার ব্যবস্থা ইত্যাদির ওপর। বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের প্রচলন সত্ত্বেও ইংরেজ-শাসনের সময় থেকে সামাজিক সকল আয়োজনে খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি ‘গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার’ ব্যবহৃত হতো। পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনে থাকায় এর ব্যাপক প্রভাব ছিলো। শুধু বর্ষপঞ্জিকা নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইংরেজদের প্রভাবে এ অঞ্চলের মানুষ প্রভাবিত হতো। কারণ হলো, তারা শিক্ষাদীক্ষায় ছিলো অগ্রণী, বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অগ্রগামী, এবং সামাজিক শৃঙ্খলায় সংঘবদ্ধ। তারা কখনো অশিক্ষার কূপমণ্ডূকতায় আবদ্ধ ছিলো না। আমরা এগোতে পারিনি, তারা পেরেছে। আমরা তাদের আবিষ্কারের ফসল ভোগ করছি এবং তার জন্য মুনাফা দিয়ে যাচ্ছি। বিল গেটস, স্টিভ জবস্, জোকার বার্গ-এর আবিষ্কারের সুফল নিয়ে তারা ব্যবসা করে যাচ্ছে। এককথায় জীবনের সর্বক্ষেত্রে তারা আমাদের উপর প্রভাববিস্তারী। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, বিভেদ আছে— কিন্তু তারা সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক আচারের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন চিন্তা পোষণ করে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরাও আজ অনুভব করছি, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদেরও ঐকমত্য পোষণ করা আবশ্যক। তা না হলে আমরা আরও পিছিয়ে পড়বো; বাঙালি-সত্তা ধীরে ধীরে বিপন্ন হয়ে পড়বে। দেখছি— আমাদের আশেপাশের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। উন্নত হয়েছে সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া। আমরা কেন তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে এগোতে পারলাম না? সেই প্রশ্ন মনে জাগা উচিৎ। এর উত্তর হলো— ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সহনশীল-মানুষ হতে পারিনি। বরং আমরা পিছিয়ে পড়েছি দিন-দিন। মানসিক উন্নতি সাধন না হলে, জ্ঞানের দ্বার প্রশস্ত না হলে অর্থনৈতিক উন্নতি মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— বাঙালিরা পারে! এখনো পারবে। আমরা ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক-বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারি, ভিন্ন ধর্মীয়বোধ লালন করতে পারি— তা এর জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। বাঙালিকে তার ঐতিহ্য ধারণ করতে হবে। আমরা একই আবহাওয়ায় লালিত জনগোষ্ঠী, একই ভাষায় কথা বলি, একই বাতাসে শ্বাস গ্রহণ করি। অতএব, আমাদের মাঝে সমাজবোধ সমপর্যায়ের, সাংস্কৃতিক বন্ধন উন্নত। আমাদের কাছে আমাদের নববর্ষ এক; আমরা এক ভুবনের বাসিন্দা।
বাঙালি যে পারে তার নজির আমাদের কাছেই আছে। একদিন বাঙালি জাতিসত্তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিলাম। পাকিস্তানের অসম আচরণের বিরুদ্ধে বাঙালিত্বের বোধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে শামিল হতে পেরেছিলাম। স্বাধিকারের দাবি তুলে একজোট হয়ে বাঙালির জন্য আলাদা জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম। পেরেছিলাম এজন্য যে— বাঙালিত্বের চেতনায় আমরা একত্রিত হতে পেরেছিলাম সেদিন, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে অগ্রসর হতে পেরেছিলাম। তখন জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে বাঙালিত্বের বোধ কাজ করেছিলো। বাঙালিরা আবার সমবেতভাবে বাঙালি ঐতিহ্যের কাছে হাত পেতেছে, বাঙালি সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিকতাকে অন্তরে ধারণ করেছে। আমরা অবশ্যই পারবো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে, উন্নত জাতিরাষ্ট্র হতে। আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা, বাংলার আবহাওয়ায় আমরা বেড়ে উঠি। বাংলার হাজার বছরের লালিত বিশ্বাসে বাঙালি সংস্কৃতির পত্তন হয়েছে একদিন। আমাদের সন্তানেরা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে জানান দিচ্ছে এই বারতা— ‘আমরা বাঙালি, আমরা সংস্কৃতিবান জাতি’।
সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনাচার, জীবনযাপনের পদ্ধতি। এটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক বিধান। আমাদের বর্ষবিদায়ের আচার ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ আছে, ইংরেজি ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’-এর মতো। অনেকে এটি হিসেবে রাখে না। কিন্তু উৎসব হিসেবে, আনন্দের যোগ হিসেবে দুটো পালন করে পৃথিবীকে আমরা জানান দিতে পারি যে— তোমাদের অনেকের যেমন ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ আছে, আমাদেরও আছে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’। চৈত্রসংক্রান্তি উৎসবের সঙ্গে বিগত দিনের ঐতিহ্যের একটা সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের প্রথম দিনে ‘হালখাতা’ খোলা, অর্থাৎ নতুন খাতা খোলা যেন এও এক উৎসবের মতো আয়োজন ব্যবসায় ভুবনে। এসবই সংস্কৃতির সম্পদ। মানুষের রুচি পরিবর্তন হয়, জীবনধারা পরিবর্তন হয়— কিন্তু সংস্কৃতিতে তেমন বড় কোনো পরিবর্তন হয় না। ধরা যাক মালয়েশিয়ার কথা। মালয়েশিয়া ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত তাদের প্রশাসনিক রাজধানীর নাম রেখেছে প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুর রহমানের নামে। নাম— ‘পুত্রজয়’ অর্থাৎ ভূমিপুত্রের জয় হোক (তারা উচ্চারণ করে পুত্রজয়া)। ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাদের কোনো দ্বিধা নেই। তারা বেছে নিয়েছে সংস্কৃত শব্দ ‘পুত্র জয়ঃ’। সেরকম ‘ব্রুনাই’ কিংবা ইন্দোনেশিয়াও তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আন্তরিক।
মানুষের সংস্কৃতি তো চেতনারই অংশ, ঐতিহ্যের ধারক— যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে অতীত-ইতিহাস। বাঙালির জীবনধারায়ও পহেলা বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক আবহমানকালের। এর সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক জড়িত, লোকাচার জড়িত— যা কালক্রমে লোকজ সংস্কৃতি হিসেবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিবান জাতি— পৃথিবীর মানুষ জানে। আমাদের এখন জাতীয় সংহতির বড় প্রয়োজন। মধ্যাকাশের প্লেনের মতোই আমরা যেন পার করছি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া! এই দুর্যোগ ধৈর্য ধরে কাটিয়ে উঠতে হবে। আমাদের একুশ, আমাদের পহেলা বৈশাখ, আমাদের অন্যান্য জাতীয় উৎসবগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে একদিন আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জাতীয়-ঐক্য মুখ থুবড়ে পড়বে! আমাদের সেই গৌরবোজ্জ্বল ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলনের মতো ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জ্বীবিত থাকতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের বড় পরিচয়— আমরা সবাই বাঙালি। সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সার্বিক কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করতে না-পারলে আমাদের অর্জনও ব্যর্থ হবে। জাতীয় প্রগতির লক্ষ্যে বাংলা নববর্ষসহ সাংস্কৃতিক সকল ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা আবশ্যক। আজ এই বোধই হোক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় আমাদের।

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬
উৎসব হলো বিনোদনের উপলক্ষ্য। আবার কোনো কোনো বিনোদন আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। গ্রামীণ পরিবেশ কিংবা শহুরে জীবন— যেখানেই হোক না কেনো, কর্মব্যস্ততার মধ্যে মানুষের বিনোদনের প্রয়োজন হয়। তাতে মনের ক্লান্তি দূর হয়, কর্মস্পৃহা বাড়ে। সামাজিক জীবনেও বিনোদনের নানান উপলক্ষ্য মানুষ উদ্ভাবন করেছে নিজেদের প্রয়োজনে। এর একটা দিক হলো সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, আর আনন্দের আয়োজন। গল্প করা কিংবা আড্ডা দেওয়া বাঙালি সংস্কৃতিরই অংশ। এর সঙ্গে মনের আনন্দেরও যোগ আছে। সবচেয়ে বড় দিক হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করা। যেমন নতুন ধান উঠলে বাঙালির ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব হয়, বিশেষ সময়ের পিঠা উৎসব, বর্ষাকালে কর্মহীন সময়ে গ্রামীণ কৃষকের জটলা এবং মুড়িমুড়কির ব্যবস্থা; সেটাও এক রকমের উৎসব— সুস্থ সময় কাটানোর উপলক্ষ্য। এসব আয়োজন কখনো কখনো বড় আকারে হয়, পুরো এলাকার মানুষকে নিয়ে। এটাও সামাজিক আচার, সম্প্রীতির উপলক্ষ্য। এসবের আয়োজনে মনের জড়তা দূর হয়, মনে ফূর্তি আসে। একঘেয়ে জীবনযাপন তো কেউ চায় না। তা মনকে ক্লান্ত করে, শরীরে জড়তা আনে।
আমাদের সামাজিক পরিবেশে উৎসবের যত আয়োজন, সবকিছু সময়ের প্রয়োজনে হয়েছে; সংঘ-ভাবনা থেকে হয়েছে। সামাজিকতা প্রতিষ্ঠিত আচার। এটা বাঙালির সংস্কৃতি। তেমন একটি উপলক্ষ্য আমাদের পহেলা বৈশাখ। বলা বাহুল্য, এটি হলো বাংলা সনের প্রথম দিন। আমাদের জন্য গর্বের বিষয় যে, আমরা সভ্যতার তুলাদণ্ডে কোনোভাবেই পিছিয়ে-পড়া জাতি নই। শির উঁচু করে আমরাও বলতে পারি— আমাদের নিজস্ব পঞ্জিকা আছে, ঐতিহ্য আছে, স্থানীয় আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস আছে, আমাদের নিজস্ব পোশাক আছে। এসবই সংস্কৃতির নির্ণায়ক দিক। আমাদের যে-দিনপঞ্জিকা, তা মুগল সম্রাট আকবরের আমলে প্রবর্তিত কৃষিব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বৎসর-গণনা পদ্ধতি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবর স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে কর বা রাজস্ব আদায়ের সুবিধা-অনুযায়ী এই বাংলা সন প্রবর্তন করেছিলেন। কথিত আছে, তাঁর সময়ে দেশে বেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছিলো। উৎপাদিত কৃষিপণ্য সে সময় বিদেশেও রফতানি হতো বলে জানা যায়। সেই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে হিজরি সন অনুযায়ী কৃষকদের নিকট থেকে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু হিজরি সনের গণনা চাঁদের ওপর নির্ভরশীল বলে কৃষকের ফলন তোলার সঙ্গে ঠিকমতো তা মিলতো না। ঠিক সময়ে ফলন না-ওঠায় সম্রাটের ধার্যকৃত কর কৃষকেরা সময়মতো দিতে পারতো না। এতে ভীষণ ভোগান্তি হতো প্রজাদের। কৃষকদের খাজনা প্রদানের সুবিধার্থে সম্রাট রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজিকে সৌর সন ও হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন একটি সন প্রবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। জানা যায়, সম্রাট আকবরের সিংহাসন-আরোহণের সময় থেকে এই নতুন বাংলা সন চালু হয়েছিলো। প্রথমে এটিকে ‘ফসলি সন’ বলা হয়েছিলো, পরে বঙ্গ অঞ্চলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বলা হয় ‘বঙ্গাব্দ’। অবশেষে যা ‘বাংলা সন’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
বঙ্গাব্দ প্রচলের শুরুতে সন গণনায় মূল ভিত্তি ছিলো আঞ্চলিক আবহাওয়া-নির্ভর ফসল তোলার হিসেব, ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষেত্রে জনসাধারণের বার্ষিক বকেয়া আদায়ের সুবিধা, এবং সওদাগর দোকানদার ও রাজা-রাজরাদের বকেয়া আদায় এবং নতুন হিসেব খোলার ব্যবস্থা ইত্যাদির ওপর। বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের প্রচলন সত্ত্বেও ইংরেজ-শাসনের সময় থেকে সামাজিক সকল আয়োজনে খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি ‘গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার’ ব্যবহৃত হতো। পৃথিবীর বেশিরভাগ অঞ্চল ব্রিটিশ শাসনে থাকায় এর ব্যাপক প্রভাব ছিলো। শুধু বর্ষপঞ্জিকা নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইংরেজদের প্রভাবে এ অঞ্চলের মানুষ প্রভাবিত হতো। কারণ হলো, তারা শিক্ষাদীক্ষায় ছিলো অগ্রণী, বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে অগ্রগামী, এবং সামাজিক শৃঙ্খলায় সংঘবদ্ধ। তারা কখনো অশিক্ষার কূপমণ্ডূকতায় আবদ্ধ ছিলো না। আমরা এগোতে পারিনি, তারা পেরেছে। আমরা তাদের আবিষ্কারের ফসল ভোগ করছি এবং তার জন্য মুনাফা দিয়ে যাচ্ছি। বিল গেটস, স্টিভ জবস্, জোকার বার্গ-এর আবিষ্কারের সুফল নিয়ে তারা ব্যবসা করে যাচ্ছে। এককথায় জীবনের সর্বক্ষেত্রে তারা আমাদের উপর প্রভাববিস্তারী। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, বিভেদ আছে— কিন্তু তারা সামাজিক ও রাষ্ট্রনৈতিক আচারের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন চিন্তা পোষণ করে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে আমরাও আজ অনুভব করছি, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদেরও ঐকমত্য পোষণ করা আবশ্যক। তা না হলে আমরা আরও পিছিয়ে পড়বো; বাঙালি-সত্তা ধীরে ধীরে বিপন্ন হয়ে পড়বে। দেখছি— আমাদের আশেপাশের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। উন্নত হয়েছে সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া। আমরা কেন তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে এগোতে পারলাম না? সেই প্রশ্ন মনে জাগা উচিৎ। এর উত্তর হলো— ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সহনশীল-মানুষ হতে পারিনি। বরং আমরা পিছিয়ে পড়েছি দিন-দিন। মানসিক উন্নতি সাধন না হলে, জ্ঞানের দ্বার প্রশস্ত না হলে অর্থনৈতিক উন্নতি মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়— বাঙালিরা পারে! এখনো পারবে। আমরা ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক-বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে পারি, ভিন্ন ধর্মীয়বোধ লালন করতে পারি— তা এর জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। বাঙালিকে তার ঐতিহ্য ধারণ করতে হবে। আমরা একই আবহাওয়ায় লালিত জনগোষ্ঠী, একই ভাষায় কথা বলি, একই বাতাসে শ্বাস গ্রহণ করি। অতএব, আমাদের মাঝে সমাজবোধ সমপর্যায়ের, সাংস্কৃতিক বন্ধন উন্নত। আমাদের কাছে আমাদের নববর্ষ এক; আমরা এক ভুবনের বাসিন্দা।
বাঙালি যে পারে তার নজির আমাদের কাছেই আছে। একদিন বাঙালি জাতিসত্তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিলাম। পাকিস্তানের অসম আচরণের বিরুদ্ধে বাঙালিত্বের বোধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে শামিল হতে পেরেছিলাম। স্বাধিকারের দাবি তুলে একজোট হয়ে বাঙালির জন্য আলাদা জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলাম। পেরেছিলাম এজন্য যে— বাঙালিত্বের চেতনায় আমরা একত্রিত হতে পেরেছিলাম সেদিন, অসাম্প্রদায়িক আদর্শের ভিত্তিতে অগ্রসর হতে পেরেছিলাম। তখন জাতীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে বাঙালিত্বের বোধ কাজ করেছিলো। বাঙালিরা আবার সমবেতভাবে বাঙালি ঐতিহ্যের কাছে হাত পেতেছে, বাঙালি সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিকতাকে অন্তরে ধারণ করেছে। আমরা অবশ্যই পারবো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে, উন্নত জাতিরাষ্ট্র হতে। আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা, বাংলার আবহাওয়ায় আমরা বেড়ে উঠি। বাংলার হাজার বছরের লালিত বিশ্বাসে বাঙালি সংস্কৃতির পত্তন হয়েছে একদিন। আমাদের সন্তানেরা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে জানান দিচ্ছে এই বারতা— ‘আমরা বাঙালি, আমরা সংস্কৃতিবান জাতি’।
সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনাচার, জীবনযাপনের পদ্ধতি। এটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এক বিধান। আমাদের বর্ষবিদায়ের আচার ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ আছে, ইংরেজি ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’-এর মতো। অনেকে এটি হিসেবে রাখে না। কিন্তু উৎসব হিসেবে, আনন্দের যোগ হিসেবে দুটো পালন করে পৃথিবীকে আমরা জানান দিতে পারি যে— তোমাদের অনেকের যেমন ‘থার্টিফার্স্ট নাইট’ আছে, আমাদেরও আছে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’। চৈত্রসংক্রান্তি উৎসবের সঙ্গে বিগত দিনের ঐতিহ্যের একটা সম্পর্ক রয়েছে। পরের দিন পহেলা বৈশাখ। নতুন বছরের প্রথম দিনে ‘হালখাতা’ খোলা, অর্থাৎ নতুন খাতা খোলা যেন এও এক উৎসবের মতো আয়োজন ব্যবসায় ভুবনে। এসবই সংস্কৃতির সম্পদ। মানুষের রুচি পরিবর্তন হয়, জীবনধারা পরিবর্তন হয়— কিন্তু সংস্কৃতিতে তেমন বড় কোনো পরিবর্তন হয় না। ধরা যাক মালয়েশিয়ার কথা। মালয়েশিয়া ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত তাদের প্রশাসনিক রাজধানীর নাম রেখেছে প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুঙ্কু আবদুর রহমানের নামে। নাম— ‘পুত্রজয়’ অর্থাৎ ভূমিপুত্রের জয় হোক (তারা উচ্চারণ করে পুত্রজয়া)। ঐতিহ্য সংরক্ষণে তাদের কোনো দ্বিধা নেই। তারা বেছে নিয়েছে সংস্কৃত শব্দ ‘পুত্র জয়ঃ’। সেরকম ‘ব্রুনাই’ কিংবা ইন্দোনেশিয়াও তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আন্তরিক।
মানুষের সংস্কৃতি তো চেতনারই অংশ, ঐতিহ্যের ধারক— যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে অতীত-ইতিহাস। বাঙালির জীবনধারায়ও পহেলা বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক আবহমানকালের। এর সঙ্গে আবহাওয়ার সম্পর্ক জড়িত, লোকাচার জড়িত— যা কালক্রমে লোকজ সংস্কৃতি হিসেবে স্থায়ী রূপ পেয়েছে। বাঙালি সংস্কৃতিবান জাতি— পৃথিবীর মানুষ জানে। আমাদের এখন জাতীয় সংহতির বড় প্রয়োজন। মধ্যাকাশের প্লেনের মতোই আমরা যেন পার করছি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া! এই দুর্যোগ ধৈর্য ধরে কাটিয়ে উঠতে হবে। আমাদের একুশ, আমাদের পহেলা বৈশাখ, আমাদের অন্যান্য জাতীয় উৎসবগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে একদিন আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জাতীয়-ঐক্য মুখ থুবড়ে পড়বে! আমাদের সেই গৌরবোজ্জ্বল ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলনের মতো ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জ্বীবিত থাকতে হবে, ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। আমাদের বড় পরিচয়— আমরা সবাই বাঙালি। সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সার্বিক কল্যাণে নিজেকে নিবেদন করতে না-পারলে আমাদের অর্জনও ব্যর্থ হবে। জাতীয় প্রগতির লক্ষ্যে বাংলা নববর্ষসহ সাংস্কৃতিক সকল ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা আবশ্যক। আজ এই বোধই হোক সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় আমাদের।

আপনার মতামত লিখুন