সংবাদ

নির্বাচিত

জিললুর রহমান-এর বাছাই ১০টি কবিতা


প্রকাশ: ৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৫ পিএম

জিললুর রহমান-এর বাছাই ১০টি কবিতা

জিললুর রহমান-এর বাছাই ১০টি কবিতা


মা অথবা রেমেদিওস লা বেয়া

কী ধবধবে সুন্দর ফর্সা মুখশ্রী তোমার!

সুরমা লাগানো বোঁজা চোখের পাপড়ি 

সফেদ সেলাইহীন নতুন জামায় 

নিথর শরীর তৈরি অনন্ত যাত্রার…

তুমি শয‍্যাশায়ী অচল হাত পা নিয়ে, 

শ্বাস ছিল দৃষ্টি ছিল —

নাকে নল, স‍্যালাইন সেট আর ক‍্যাথেটারে রোবোটিক ভাব

তারপর হঠাৎ আকাশে উড়ে গেলে

মনে হলো এইমাত্র কাপড় ভাঁজ করতে করতে

আকাশের পেয়েছো আহ্বান, রেমেদিউস লা বেয়া অথবা মা।

সাথে শুধু নিয়ে গেলে রূপ…

জীবনের কোলাহল রান্নাকান্না মেহমানদারী

সন্তানের মঙ্গল প্রার্থনা ছেড়ে,

কামিনী ফুলের গন্ধে মৌ মৌ 

অতিপ্রিয় তোমার উঠোন থেকে উড়ে গেলে,

আমাদের হৃদয়ে ছড়িয়ে মোহ…

সৌন্দর্যই কেবল তোমার সাথে 

রয়ে গেল, উড়ে গেল এবং ছড়িয়ে গেল…

০৬ জুলাই ২০২৬, সকাল ৯.২৫, চট্টগ্রাম 


মা তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছো? 

আজ ছ’বছর শুয়ে আছো বোধহীন বাকরুদ্ধ,

মাঝে মাঝে খোলা দৃষ্টি — আমাকে চিনতে পারো? 

একদিন তোমার সৌন্দর্য দেখে 

পৃথিবীর সব রূপ ভুলতে বসেছিলাম—

আজ তুমি অস্থিচর্মসার, চোখ দুটো গভীর গর্তে ডুবেছে,

দু’হাতের আঙুলগুলো তো জলভরা গ্লাভসের মতো টলটল করে…

তুমি টের পাচ্ছো জীবনের এই তীব্র ব‍্যথা? 

চিকিৎসাশাস্ত্র নীরব শীতল— ব‍্যর্থ মনোরথ;

গুনে যাচ্ছি পালস রেট — কমছে কমছে,

রক্ত চাপ গণনা রহিত, নাসারন্ধ্রে টিউব আর টিউব— 

অক্সিজেনের অভাব বেড়ে যাচ্ছে; 

কিডনিও ক্ষান্ত হয়েছে— ফুলে যাচ্ছো তুমি ধীরে ধীরে…

তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো মা?

০৩ জুলাই ২০২৬ রাত ০৮.০৬, ঢাকা বিমানবন্দর 


বনভূমি কথাই শোনে না

(উৎসর্গ: কবি আবুল হাসান)

অসুস্থ মানুষ শুয়ে লম্বালম্বি 

ঝরে পড়া হলুদ পাতার গন্ধে হেমন্ত-শীতের, 

অথবা রেললাইন ছিঁড়েখুঁড়ে 

অকস্মাৎ বেহিসেবী ট্রেন বেরিয়ে পড়েছে—

ওরা ভেসে যেতে চায় স্রোতে।

বনভূমিকে বলছি তাদের খবর নিও…

চামড়া ছড়ে যাওয়া ঘেও কুকুরের 

টানা গোঙানির শব্দ,

ডাল কেটে নেওয়া গাছের ক্রন্দন,

শুয়ে থাকা অসুস্থ মানুষ কিংবা

জীবন ছিটকে পড়া বৃন্ত‍চ্যুত পাতা…

বনভূমিকে বলছি, একটু খেয়াল রেখো…

চারপাশে শুধু শোঁ শোঁ বাতাসের গান

গাছেরা অনড় আর পাখিদের অনন্ত কূজন 

পাহাড়ি ঝিরির জল কুলকুল বহমান 

বনভূমি কথাই শোনে না। 

০২ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা ৬.৪৩ চট্টগ্রাম 



ব্রুকলিন ব্রিজের নিচেই 

শুয়ে থাকে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নেরা, 

বোধিবৃক্ষতলে বিষপান শেষে বুদ্ধ— 

শিশুদের ভীত মুখ — আবার পিতার গায়ে 

ভয়াবহ গুলির আঘাত লাগে কিনা অথবা বিষের, 

সামনে আপাত বহমান স্থির ইস্টার্ন রিভার 

ওপারে ম‍্যানহাটান নিষ্পলক স্কাইস্ক্রাপারের সারি 

বুকে দুঃখী বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্র 

ব্রুকলিন ব্রিজের নিচেই 

শুয়ে থাকে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নেরা—

ধুঁকে চলা মানুষের ভোঁতা চোখ স্বপ্নহীন, 

জানে, র‍্যাডিক‍্যাল চেন্জ ইজন’ট ফ্রি

৩০ মে ২০২৬, পূর্বাহ্ণ ২.১৬; ব্রুকলিন


দূরদৃষ্টি

দূরের জঙ্গল অচেনা গাছ সব সবুজ গাঢ় রং

নিকটে ফিরলেই তোমার চেনা ঘ্রাণ জটিল রংঢং

দূরের নীলাকাশ হালকা মেঘে ঢাকা পাখির কোলাহল 

এদিকে হাহাকার ভাত ও কাপড়ের জন‍্য যত ছল 

যেমন মৃগদল নিত‍্য চঞ্চল দূরের স্বপ্নেরা 

নিকট মানে যত হৃদয় বিক্ষত জীবন জালে ঘেরা 

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রাত ১০.০৩ চট্টগ্রাম


সেই নিরো নেই সেই বাঁশিও নিখোঁজ 

প্রত‍্যেক দেশেই থাকে একজন শাসনকর্তা 

তারা কেউ কেউ উড়ে যায় কেউ উড়ে উড়ে আসে 

যেন তারা একেকটা ফড়িং 

তারা এলে গেলে 

বাড়ে দাম তেলের নুনের ডিম ডলারের

মুদ্রা ফেঁপে ওঠে মূল‍্য ফুলে যায় 

বাস ভাড়া উবারের বিল ফুডপান্ডা ডেলিভারি চার্জ বাড়িভাড়া বিষম বিপুল হারে বাড়ে 

মানুষের মূল্য শুধু কমে

তবু মহানন্দে তৈল মর্দনের ধুম চলে  

চাটাচাটি মজুদদারীর বৃহস্পতি তুঙ্গে 

জলে স্থলে অন্তরীক্ষে ভাতে জলে গোলার আগুনে মানুষেরা মরে 

সেই নিরো নেই সেই বাঁশিও নিখোঁজ 

মেলে খোঁজ তবে কার…

১৬ মে ২০২৬ পূর্বাহ্ণ ২:০৭ঢাকা 


সেলাইদিদির মে

পাড়ার মেদুর কোণে পরিত্যক্ত পাঁচতলা বাড়িটায় দিনরাত বাতি জ্বলে,

শত শত সেলাইদিদির হাত পাল্লা দিয়ে খটাখট খটাখট মেশিন চালায়। 

সেই সূর্যোদয়ে বাড়ি থেকে এসে সন্ধ্যা উজিয়ে ফেরে, 

মাঝে মাঝে খুকখুক খুকখুক কাশে। 

ঘামে চকচকে মুখে আলো খেলে বটে, ঘামসিক্ত শাড়িবোরকার থেকে বোঁটকা বিকট গন্ধ ভাসে। 

প্রতিদিন ওভারটাইম — তবু বেতনের কোন নিয়ম কানুন নেই,

মাসের অর্ধেক পার করে কিস্তি পাওয়াই দস্তুর। 

উঠোনের এক কোণে হঠাৎ উঠেছে ফুটে লাল টুকটুকে মে ফুল। 

সেলাইদিদির জানা নেই কেন ফোটে এই ফুল,

কেন বড় বাবুদের ছুটি থাকে পহেলা মে—

তার তো রয়েছে তাড়া 

মে দিবসেও ভোর হয় কারখানার ভেঁপুর শব্দে। 

০৯ মে ২০২৬ বিকেল ০৪.৫৮ ঢাকা। 



শীতরাতে কাতরাতে কাতরাতে 

কতদূর পাহাড়ের কুয়াশায় ঢেকে গেল প্রেয়সীর মুখ,

হাহাকার বারবার — ভাসে চোখে ঠোঁট আর লাজুক চিবুক। 

কুয়াশায় পথঘাট নদী টিলা সব মুছে যেতে যেতে 

নক্ষত্র তবুও জ্বলো শীতরাতে কাতরাতে কাতরাতে! 

সব আলো নিভে গেলো, ঢেকে গেলো স্বপ্নহীন দেশ— 

নক্ষত্র, কিসের জন‍্য নিদ্রাহীন বাউলের বেশ! 

আনাজ ফুরালে তার চাষ হবে আমদানি হবে একদিন,

বিবেক ফুরালে পাবো কোন পথে কোথা থেকে কিছু কিছু ঋণ?

স্বপ্ন কবে গেল উবে কোন পরীদের রাজ‍্যে দেশান্তর!

আমরা বলির পাঁঠা বালুচরে বালু দিয়ে নিত‍্য বাঁধি ঘর …

২৯ জানুয়ারি ২০২৫, পূর্বাহ্ণ ০১.৫৩



পথ পাশে

নালার পাড়ের পথে তুলে রাখা ময়লার স্তুপ, 

নাক চেপে ধরে পাশ কাটিয়ে হাঁটছি,

যেতে যেতে হঠাৎ থমকে থেমে যাই—

অথবা জঞ্জাল নিজে থামালো আমাকে।

ফুলগাছটির পাশে ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ, 

মাথার ওপর জ্বলে রূপালী পূর্ণিমা — আর টুইংকল টুইংকল ছোট্ট তারা 

আমাকে অচল করে রাখে সুন্দর ও অসুন্দর,

দুপক্ষই মানুষকে আটকে রেখেছে। 

হঠাৎ সে গাছ থেকে টুপ করে ঝরে একটা গন্ধরাজ 

তারপর চারপাশে হরিণের ছোটাছুটি 

ঘূর্ণমান ময়ূরের ছড়ানো পেখম — 

আমি হাঁটি পাশে পাশে, সুন্দর অথবা জঞ্জালের…

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পূর্বাহ্ণ ১২.০৯ চট্টগ্রাম 


উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে

বিস্ফারিত লাল রঙে ভাসছে আকাশ —

কমলা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে 

                 ধোঁয়ার কুণ্ডলী সব গগন ছুঁয়েছে,

তার সাথে পাল্লা দিয়ে ওড়ে 

                  মানুষ —বোকাট্টা ঘুড়ি,

ধোঁয়ার স্তম্ভের চারপাশে চলে মুণ্ডহীন  মানুষের 

অশেষ তওয়াফ উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে—

সুফিনৃত‍্যে নিমগ্ন সামান্য লোক 

                অসামান্য এবাদতের ভঙ্গিতে…

শত শাদা পুঁটলির ভেতরে 

শায়িত নিস্তব্ধ শিশু—

কারও হাত কারও পা কারওবা মাথাই উড়েছে লাল আসমানে,

               যেন সব ভলিবল নেতানিয়াহুর।

গর্জমান বিমানের ফুঁয়ে ধ্বসে পড়ে

সুউচ্চ দালানগুলো, বালুকাবেলার ঘর — কালের পাউডার…

              

১৪ জুন ২০২৫, রাত ৯.৫৪

চট্টগ্রাম  


জিললুর রহমানের জন্ম ১৬ নভেম্বর ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম শহরে।  মূলত একজন চিকিৎসক এবং পেশাগতভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। প্যাথলজি (রোগতত্ত্ব) বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি (M.Phil ও PhD) অর্জন করেছেন এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। 

তিনি আশির দশক থেকে সাহিত্যচর্চায় যুক্ত আছেন।  মূলত কবি হিসেবে পরিচিত হলেও সাহিত্যিক প্রবন্ধ ও বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। তুর্কি কবি নাজিম হিকমতের 'রুবাইয়াৎ' তিনিই প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন।

জিললুর রহমানের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম:

  • কাব্যগ্রন্থ: অন্য মন্ত্র, শাদা অন্ধকার, ডায়োজিনিসের হারিকেন, আত্মজার প্রতি ও অন্যান্য কবিতা, হঠাৎ রাজেন্দ্রপুর, এবং পপলার বন মরে পড়ে আছে
  • প্রবন্ধ/নিবন্ধ: উত্তর আধুনিকতা: এ সবুজ করুণ ডাঙায়, অমৃত কথা, এবং কবিতা: পাঠে পাঠান্তরে
  • অনুবাদগ্রন্থ: নাজিম হিকমতের রুবাইয়াৎ, এমিলি ডিকিনসনের কবিতা, এবং আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্ব: কয়েকটি অনুবাদ

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬


জিললুর রহমান-এর বাছাই ১০টি কবিতা

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

জিললুর রহমান-এর বাছাই ১০টি কবিতা


মা অথবা রেমেদিওস লা বেয়া

কী ধবধবে সুন্দর ফর্সা মুখশ্রী তোমার!

সুরমা লাগানো বোঁজা চোখের পাপড়ি 

সফেদ সেলাইহীন নতুন জামায় 

নিথর শরীর তৈরি অনন্ত যাত্রার…


তুমি শয‍্যাশায়ী অচল হাত পা নিয়ে, 

শ্বাস ছিল দৃষ্টি ছিল —

নাকে নল, স‍্যালাইন সেট আর ক‍্যাথেটারে রোবোটিক ভাব


তারপর হঠাৎ আকাশে উড়ে গেলে

মনে হলো এইমাত্র কাপড় ভাঁজ করতে করতে

আকাশের পেয়েছো আহ্বান, রেমেদিউস লা বেয়া অথবা মা।

সাথে শুধু নিয়ে গেলে রূপ…


জীবনের কোলাহল রান্নাকান্না মেহমানদারী

সন্তানের মঙ্গল প্রার্থনা ছেড়ে,

কামিনী ফুলের গন্ধে মৌ মৌ 

অতিপ্রিয় তোমার উঠোন থেকে উড়ে গেলে,

আমাদের হৃদয়ে ছড়িয়ে মোহ…


সৌন্দর্যই কেবল তোমার সাথে 

রয়ে গেল, উড়ে গেল এবং ছড়িয়ে গেল…


০৬ জুলাই ২০২৬, সকাল ৯.২৫, চট্টগ্রাম 



মা তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছো? 



আজ ছ’বছর শুয়ে আছো বোধহীন বাকরুদ্ধ,

মাঝে মাঝে খোলা দৃষ্টি — আমাকে চিনতে পারো? 


একদিন তোমার সৌন্দর্য দেখে 

পৃথিবীর সব রূপ ভুলতে বসেছিলাম—

আজ তুমি অস্থিচর্মসার, চোখ দুটো গভীর গর্তে ডুবেছে,

দু’হাতের আঙুলগুলো তো জলভরা গ্লাভসের মতো টলটল করে…


তুমি টের পাচ্ছো জীবনের এই তীব্র ব‍্যথা? 


চিকিৎসাশাস্ত্র নীরব শীতল— ব‍্যর্থ মনোরথ;

গুনে যাচ্ছি পালস রেট — কমছে কমছে,

রক্ত চাপ গণনা রহিত, নাসারন্ধ্রে টিউব আর টিউব— 

অক্সিজেনের অভাব বেড়ে যাচ্ছে; 

কিডনিও ক্ষান্ত হয়েছে— ফুলে যাচ্ছো তুমি ধীরে ধীরে…


তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো মা?


০৩ জুলাই ২০২৬ রাত ০৮.০৬, ঢাকা বিমানবন্দর 



বনভূমি কথাই শোনে না

(উৎসর্গ: কবি আবুল হাসান)



অসুস্থ মানুষ শুয়ে লম্বালম্বি 

ঝরে পড়া হলুদ পাতার গন্ধে হেমন্ত-শীতের, 

অথবা রেললাইন ছিঁড়েখুঁড়ে 

অকস্মাৎ বেহিসেবী ট্রেন বেরিয়ে পড়েছে—

ওরা ভেসে যেতে চায় স্রোতে।

বনভূমিকে বলছি তাদের খবর নিও…


চামড়া ছড়ে যাওয়া ঘেও কুকুরের 

টানা গোঙানির শব্দ,

ডাল কেটে নেওয়া গাছের ক্রন্দন,

শুয়ে থাকা অসুস্থ মানুষ কিংবা

জীবন ছিটকে পড়া বৃন্ত‍চ্যুত পাতা…

বনভূমিকে বলছি, একটু খেয়াল রেখো…


চারপাশে শুধু শোঁ শোঁ বাতাসের গান

গাছেরা অনড় আর পাখিদের অনন্ত কূজন 

পাহাড়ি ঝিরির জল কুলকুল বহমান 

বনভূমি কথাই শোনে না। 


০২ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা ৬.৪৩ চট্টগ্রাম 



ব্রুকলিন ব্রিজের নিচেই 



শুয়ে থাকে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নেরা, 

বোধিবৃক্ষতলে বিষপান শেষে বুদ্ধ— 

শিশুদের ভীত মুখ — আবার পিতার গায়ে 

ভয়াবহ গুলির আঘাত লাগে কিনা অথবা বিষের, 

সামনে আপাত বহমান স্থির ইস্টার্ন রিভার 

ওপারে ম‍্যানহাটান নিষ্পলক স্কাইস্ক্রাপারের সারি 

বুকে দুঃখী বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্র 


ব্রুকলিন ব্রিজের নিচেই 

শুয়ে থাকে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নেরা—

ধুঁকে চলা মানুষের ভোঁতা চোখ স্বপ্নহীন, 

জানে, র‍্যাডিক‍্যাল চেন্জ ইজন’ট ফ্রি


৩০ মে ২০২৬, পূর্বাহ্ণ ২.১৬; ব্রুকলিন



দূরদৃষ্টি

দূরের জঙ্গল অচেনা গাছ সব সবুজ গাঢ় রং

নিকটে ফিরলেই তোমার চেনা ঘ্রাণ জটিল রংঢং


দূরের নীলাকাশ হালকা মেঘে ঢাকা পাখির কোলাহল 

এদিকে হাহাকার ভাত ও কাপড়ের জন‍্য যত ছল 


যেমন মৃগদল নিত‍্য চঞ্চল দূরের স্বপ্নেরা 

নিকট মানে যত হৃদয় বিক্ষত জীবন জালে ঘেরা 


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রাত ১০.০৩ চট্টগ্রাম



সেই নিরো নেই সেই বাঁশিও নিখোঁজ 



প্রত‍্যেক দেশেই থাকে একজন শাসনকর্তা 

তারা কেউ কেউ উড়ে যায় কেউ উড়ে উড়ে আসে 

যেন তারা একেকটা ফড়িং 

তারা এলে গেলে 

বাড়ে দাম তেলের নুনের ডিম ডলারের

মুদ্রা ফেঁপে ওঠে মূল‍্য ফুলে যায় 

বাস ভাড়া উবারের বিল ফুডপান্ডা ডেলিভারি চার্জ বাড়িভাড়া বিষম বিপুল হারে বাড়ে 

মানুষের মূল্য শুধু কমে


তবু মহানন্দে তৈল মর্দনের ধুম চলে  

চাটাচাটি মজুদদারীর বৃহস্পতি তুঙ্গে 

জলে স্থলে অন্তরীক্ষে ভাতে জলে গোলার আগুনে মানুষেরা মরে 


সেই নিরো নেই সেই বাঁশিও নিখোঁজ 

মেলে খোঁজ তবে কার…


১৬ মে ২০২৬ পূর্বাহ্ণ ২:০৭ঢাকা 



সেলাইদিদির মে



পাড়ার মেদুর কোণে পরিত্যক্ত পাঁচতলা বাড়িটায় দিনরাত বাতি জ্বলে,

শত শত সেলাইদিদির হাত পাল্লা দিয়ে খটাখট খটাখট মেশিন চালায়। 


সেই সূর্যোদয়ে বাড়ি থেকে এসে সন্ধ্যা উজিয়ে ফেরে, 

মাঝে মাঝে খুকখুক খুকখুক কাশে। 

ঘামে চকচকে মুখে আলো খেলে বটে, ঘামসিক্ত শাড়িবোরকার থেকে বোঁটকা বিকট গন্ধ ভাসে। 

প্রতিদিন ওভারটাইম — তবু বেতনের কোন নিয়ম কানুন নেই,

মাসের অর্ধেক পার করে কিস্তি পাওয়াই দস্তুর। 


উঠোনের এক কোণে হঠাৎ উঠেছে ফুটে লাল টুকটুকে মে ফুল। 

সেলাইদিদির জানা নেই কেন ফোটে এই ফুল,

কেন বড় বাবুদের ছুটি থাকে পহেলা মে—

তার তো রয়েছে তাড়া 

মে দিবসেও ভোর হয় কারখানার ভেঁপুর শব্দে। 


০৯ মে ২০২৬ বিকেল ০৪.৫৮ ঢাকা। 



শীতরাতে কাতরাতে কাতরাতে 



কতদূর পাহাড়ের কুয়াশায় ঢেকে গেল প্রেয়সীর মুখ,

হাহাকার বারবার — ভাসে চোখে ঠোঁট আর লাজুক চিবুক। 


কুয়াশায় পথঘাট নদী টিলা সব মুছে যেতে যেতে 

নক্ষত্র তবুও জ্বলো শীতরাতে কাতরাতে কাতরাতে! 


সব আলো নিভে গেলো, ঢেকে গেলো স্বপ্নহীন দেশ— 

নক্ষত্র, কিসের জন‍্য নিদ্রাহীন বাউলের বেশ! 


আনাজ ফুরালে তার চাষ হবে আমদানি হবে একদিন,

বিবেক ফুরালে পাবো কোন পথে কোথা থেকে কিছু কিছু ঋণ?


স্বপ্ন কবে গেল উবে কোন পরীদের রাজ‍্যে দেশান্তর!

আমরা বলির পাঁঠা বালুচরে বালু দিয়ে নিত‍্য বাঁধি ঘর …


২৯ জানুয়ারি ২০২৫, পূর্বাহ্ণ ০১.৫৩



পথ পাশে



নালার পাড়ের পথে তুলে রাখা ময়লার স্তুপ, 

নাক চেপে ধরে পাশ কাটিয়ে হাঁটছি,

যেতে যেতে হঠাৎ থমকে থেমে যাই—

অথবা জঞ্জাল নিজে থামালো আমাকে।


ফুলগাছটির পাশে ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ, 

মাথার ওপর জ্বলে রূপালী পূর্ণিমা — আর টুইংকল টুইংকল ছোট্ট তারা 

আমাকে অচল করে রাখে সুন্দর ও অসুন্দর,

দুপক্ষই মানুষকে আটকে রেখেছে। 


হঠাৎ সে গাছ থেকে টুপ করে ঝরে একটা গন্ধরাজ 

তারপর চারপাশে হরিণের ছোটাছুটি 

ঘূর্ণমান ময়ূরের ছড়ানো পেখম — 

আমি হাঁটি পাশে পাশে, সুন্দর অথবা জঞ্জালের…


২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পূর্বাহ্ণ ১২.০৯ চট্টগ্রাম 



উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে



বিস্ফারিত লাল রঙে ভাসছে আকাশ —

কমলা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে 

                 ধোঁয়ার কুণ্ডলী সব গগন ছুঁয়েছে,

তার সাথে পাল্লা দিয়ে ওড়ে 

                  মানুষ —বোকাট্টা ঘুড়ি,

ধোঁয়ার স্তম্ভের চারপাশে চলে মুণ্ডহীন  মানুষের 

অশেষ তওয়াফ উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে—

সুফিনৃত‍্যে নিমগ্ন সামান্য লোক 

                অসামান্য এবাদতের ভঙ্গিতে…


শত শাদা পুঁটলির ভেতরে 

শায়িত নিস্তব্ধ শিশু—

কারও হাত কারও পা কারওবা মাথাই উড়েছে লাল আসমানে,

               যেন সব ভলিবল নেতানিয়াহুর।


গর্জমান বিমানের ফুঁয়ে ধ্বসে পড়ে

সুউচ্চ দালানগুলো, বালুকাবেলার ঘর — কালের পাউডার…

              

১৪ জুন ২০২৫, রাত ৯.৫৪

চট্টগ্রাম  


জিললুর রহমানের জন্ম ১৬ নভেম্বর ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম শহরে।  মূলত একজন চিকিৎসক এবং পেশাগতভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। প্যাথলজি (রোগতত্ত্ব) বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি (M.Phil ও PhD) অর্জন করেছেন এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্যাথলজি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। 

তিনি আশির দশক থেকে সাহিত্যচর্চায় যুক্ত আছেন।  মূলত কবি হিসেবে পরিচিত হলেও সাহিত্যিক প্রবন্ধ ও বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। তুর্কি কবি নাজিম হিকমতের 'রুবাইয়াৎ' তিনিই প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন।

জিললুর রহমানের প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম:

  • কাব্যগ্রন্থ: অন্য মন্ত্র, শাদা অন্ধকার, ডায়োজিনিসের হারিকেন, আত্মজার প্রতি ও অন্যান্য কবিতা, হঠাৎ রাজেন্দ্রপুর, এবং পপলার বন মরে পড়ে আছে
  • প্রবন্ধ/নিবন্ধ: উত্তর আধুনিকতা: এ সবুজ করুণ ডাঙায়, অমৃত কথা, এবং কবিতা: পাঠে পাঠান্তরে
  • অনুবাদগ্রন্থ: নাজিম হিকমতের রুবাইয়াৎ, এমিলি ডিকিনসনের কবিতা, এবং আধুনিকোত্তরবাদের নন্দনতত্ত্ব: কয়েকটি অনুবাদ



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত